In mussalmani Bengali, A mixture of Urdu and Bengali- very popular among moslems in Calcutta and Dacca.

কথাটি লিখেছেন প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক ও প্রাচ্যবিদ রেভারেন্ড জেমস লঙ। ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত প্রথম মুদ্রিত বাংলা বইয়ের তালিকায় তিনি মুসলমান লিখিত গ্রন্থকে মুসলমানি গ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করেন। মুসলমানের ব্যবহৃত ভাষা চিহ্নিত হয় মুসলমানি বাংলা হিসেবে। পরিসংখ্যানবিদ ও ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টারও পরবর্তী সময়ে জেমস লঙের পথ অনুসরণ করে মুসলমানদের ব্যবহৃত বাংলাকে মুসলমানি বাংলা বলে চিহ্নিত করেন। আঠারো-উনিশ শতকের পুঁথি রচয়িতাদের অনেকেই নিজেদের লেখা বই নিয়ে একই দাবি করেছেন। ১৮৫৭ সালে লেখা কবি দানীশের গোলবা সানোয়ার লিখেছেন, তিনি তার কাব্যটি মোছলমানি বাংলা ভাষায় তরজমা করেছেন। অন্যদিকে ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত মোহাম্মদ সেকান্দার আহকামুল আফিফা গ্রন্থের প্রচ্ছদে বলেছেন, ‘মুসলমানি স্বদেশী ভাষায় বিরচিত।’ ১৮৮০ সালে প্রকাশিত গোলাম মাওলার লেখা শাহ রুমের কেচ্ছায় বলা হচ্ছে, মোছলমানি মিষ্ট ভাষায় রচনা করাইয়া ছাপিল। ‘মুসলমানি স্বদেশী ভাষা’ কিংবা ‘মোছলমানি মিষ্ট ভাষা’ নামকরণ যেন বাংলা ভাষার ইতিহাসে ভিন্ন এক দ্যোতনা তৈরি করে।

পূর্ববঙ্গের জনপদের সঙ্গে মুসলমানি বাংলার সম্পর্ক গভীর। দীর্ঘদিন ধরে আসাম, পূর্ব বাংলা, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশার মুসলিম সমাজের সাহিত্যচর্চার প্রধান মাধ্যম ছিল এ ভাষা। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর থেকেই এ অঞ্চলে যে জাতিগত সংকরায়ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখনই মুসলমানি ভাষার জন্ম নেয়। বাংলায় সুফিদের বড় একটা অংশ এসেছে মধ্য এশিয়া থেকে। এখানকার জনজীবনে সুফিদের প্রভাব যেমন জাতিগত শেকড় সন্ধানে বারবার উঠে আসে, তেমনি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে তাদের শব্দভাণ্ডারও। এখানে সুফি আদর্শের পাশাপাশি ছড়িয়েছে তাদের ব্যবহৃত ভাষাও; সেখানে ভূমিকা রেখেছে শাসকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা। মনে রাখা দরকার, মুসলমানরা যখন বাংলায় প্রবেশ করেছে, তখনো বাংলা ভাষা বর্তমানের মতো পরিণত রূপ লাভ করেনি। ডব্লিউ হান্টার মনে করেন, ভাটি বাংলায় ইসলামের প্রভাবের মধ্য দিয়ে মুসলমানি বাংলার জন্ম।

পুঁথিবিশারদ আবুল কাসিম মুহাম্মদ আদমুদ্দীনের দাবি, সাধু বাংলার জন্মের সময়েই মুসলমানি বাংলাও জন্মগ্রহণ করেছে। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের উৎসাহে হিন্দু কবিরা যখন সংস্কৃত কাব্যের অনুবাদে ব্যস্ত, মুসলিম কবিরাও তখন আরবি, ফারসি ও হিন্দি কাহিনী থেকে অনুবাদ করেছেন। দুটি ভাষা তখন থেকেই সমান্তরালে বেড়ে উঠতে থাকে। পুঁথির ভাষাই যে বর্তমানের চলিত ভাষার পূর্বসূরি, সেটা মধ্যযুগের পুস্তকে দেখা যায়। বিভাজনটা হয়েছে মূলত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পরে। তখন থেকেই সংস্কৃতবহুল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজীয় পণ্ডিতি বাংলা ও দোভাষী মুসলমানি বাংলা হিসেবে আলাদা হয়। অথচ ভারতচন্দ্র পর্যন্ত মধ্যযুগের হিন্দু কবিরাও যে আরবি ও ফারসি ভাষা ব্যবহার করেছেন, তার দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি। ফলে মুসলমানি স্বদেশী ভাষা বাংলা ভাষার ইতিহাসে সাময়িক বা কৃত্রিম কোনো প্রবণতা না, জাতিগত সংকরায়ণের ফলে অনিবার্য ভাষিক বিবর্তন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বড় একটা অংশজুড়েই এর বিস্তৃতি। আঠারো ও উনিশ শতকে এ ভাষায় বিপুলসংখ্যক পুঁথি লেখা হয়েছে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। প্রেসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

পুঁথি সাহিত্যের লেখকরা পুঁথির ভাষাকে ছলিছ বা সহজ কিংবা চলিত বাংলা বলে অভিহিত করেছেন। চাহার দরবেশ রচনায় কবি মুহম্মদ দানীশ পুঁথির ভাষাকে চলতি বাংলা বলেছেন। ফররুখ আহমেদেরও চলতি ভাষার পুঁথি নামে একটা সনেট আছে। তবে ভাষা ও সাহিত্যের পণ্ডিতরা এর নামকরণ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। কাজী আবদুল মান্নান তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভে দোভাষী শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অবশ্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ‘মিশ্র ভাষা’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে চান। নাম যেটাই হোক, এ ভাষার কাঠামো এবং ভাষায় লেখা বই বেশ চমকপ্রদ। এ ভাষায় লিখিত ইসলামী নীতিমূলক পুঁথির নামকরণ সাধারণত আরবি ভাষাতেই হতো। উদাহরণ হিসেবে আসে হেদায়েতুল ইসলাম, তোহফা ও মেসবাহুল ইসলামের নাম। বিষয়বস্তু কাহিনীনির্ভর হলে নায়ক কিংবা নায়িকার নাম কিংবা উভয়ের নাম অনুসরণ করেই রাখা হতো বইয়ের নাম। আমির হামজার পুঁথি, জৈগুনের পুঁথি, গাজি কালু ও চম্পাবতী পুঁথি এক্ষেত্রে মোক্ষম নজির। অনূদিত হলে বইয়ের নাম মূল বইয়ের নামের অনুগামী হতো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আলিফ লাইলা ও ফতুহশ শামের কথা।

মুসলমানি বাংলায় লিখিত সাহিত্যের উপমাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরবি ও ফারসি সাহিত্য থেকে নেয়া। কাউকে সম্পদশালী বুঝাতে কারুন কিংবা শাদ্দাদ, সুদর্শন পুরুষ বুঝাতে ইউসুফ এবং রূপবতী নারীকে তুলনা দেয়ার জন্য জুলেখাকে টানা হতো। কাউকে দানশীল বোঝাতে হাতেম কিংবা ন্যায়পরায়ণ বোঝানোর জন্য নওশেরওয়ার উপমা দেয়া হতো। বীরত্ব বোঝাতে রুস্তম ও বিজয় বোঝাতে সেকান্দারের নাম নেয়া হতো তুলনায়। এছাড়া নারীর ভ্রুকে কামানের সঙ্গে, মুখকে গোলাপের সঙ্গে, নাককে আরবি বর্ণ আলিফের সঙ্গে তুলনা দেয়া হয়েছে।

পুঁথিতে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার বাহুল্য ছিল। পরবর্তী সময়ে অপ্রচলিত শব্দও বেশি ব্যবহার হয়েছে। কখনো দেখা গেছে আরবি শব্দের সঙ্গে বাংলা বিভক্তি যোগ করে ক্রিয়াপদ তৈরি করা হয়েছে। তালাশ শব্দের সঙ্গে তালাশিল, ফেরে তালাশিয়া এবং নিকল শব্দের সঙ্গে নিকালনা, নিকলিল, যায় নিকলিয়া ইত্যাদি। পুঁথিকাররা যে তাদের ভাষাজ্ঞান নিয়ে কেবল আরবি কিংবা ফারসির ওপর নির্ভর করেছিলেন, তা না। তারা নতুন শব্দবন্ধ তৈরি করতে চেয়েছেন, যার ছাপ পুঁথিজুড়ে। ভাষায় আরবি ও ফারসি শব্দের অধিক ব্যবহারের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, আরবি ও ফারসির আবহে বসবাস। দ্বিতীয়ত, আরবি ও ফারসি সাহিত্য থেকে অনুবাদের কারণে এবং মূল ভাষার সমান্তরালে বাংলা শব্দের অভাববোধ থেকে। এছাড়া ছন্দের খাতিরেও আরবি ও ফারসি শব্দ পুঁথিতে ব্যবহার করা হতে পারে। কিন্তু এসব শব্দ তৎকালীন বাংলার জনজীবনে অপরিচিত ছিল না। যদি অপরিচিত থাকত, তাহলে বাংলা ও আসামের ভরা জলসায় পাঠের চর্চা থাকত না। থাকত না আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাও। যারা পুঁথি পড়তেন বা শুনতেন, তাদের কাছে আরবি ও উর্দুর মিশেলে সৃষ্ট এ ভাষা মোটেও দুর্বোধ্য ছিল না। দুই-তিনটি বই পড়া বা শোনার পরই ভাষা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতেন। তার পরও যদি দুই-চারটি শব্দ দুর্বোধ্য থাকত, সাহিত্য রস আস্বাদন করতে অসুবিধা হতো না মোটে।

অনুবাদের ক্ষেত্রে বিদেশী শব্দ স্থানীয় ভাষায় প্রবেশ করা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সংস্কৃত থেকে অনুবাদের ক্ষেত্রেও এটা ঘটেছে। এজন্য দেখা যায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শকুন্তলার অনুবাদ, কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের অনুবাদ এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে সংস্কৃত শব্দের প্রাচুর্য। বাংলার সাধারণ মুসলিম পরিসরে সংস্কৃতবহুল সাধু বাংলার প্রচলন হয়নি। সাধু বাংলায় পুঁথি রচনা করলে তা মুসলিম জনসাধারণ্যে গৃহীতও হতো না। এ কারণে দেখা যায় ছয়ফল মুলুক বদিউজ্জামাল, বাহার দানেশ, হাতেম তাই ও তুতিনামার মতো জনপ্রিয় গ্রন্থগুলো সাধু ও মুসলিম উভয় বাংলায়ই রচনা করা হয়েছে পরবর্তী সময়ে। প্রকাশক এর মধ্য দিয়ে উভয় শ্রেণীর পাঠকের চাহিদা মেটানোর সিদ্ধান্ত নিতেন। হালের অনেক পণ্ডিত অভিযোগ করেন মুসলমানি বাংলা ছিল তৎকালীন অশিক্ষিত মুসলমানদের ভাষা। কিন্তু তখন প্রশ্ন ওঠে তাহলে শিক্ষা কী? কেবল বিশেষ কোনো ভাষা শিক্ষা? যারা পুঁথির পুস্তক অনুবাদ করেছেন, তারা যে ফারসি ও উর্দু ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন, তা তো নিশ্চিত। কেবল ভাষা না, তাদের পুঁথিগুলো ছন্দেও রচিত। সাধারণত পয়ার ছন্দ বেশি ব্যবহার হতো। ছন্দের একঘেয়েমি দূর করার জন্য ছিল যমক, লঘু ত্রিপদী, দীর্ঘ ত্রিপদী, লঘু চৌপদী প্রভৃতি। রচনার ছন্দনৈপুণ্য চমৎকার। নায়ক নায়িকার কথোপকথনে রয়েছে সুর তাল লয়। দৃশ্যপট চিত্রণেও রয়েছে মৌলিকতা। উদাহরণ যোলমতনামা পুঁথিতে হজরত আলি (রা.)-কে দিয়ে বেহাগ রাগিনীতে একটা ভজন গাওয়ানো হয়েছে। ভাষা, ভাব ও নন্দনতত্ত্বের সম্যক জ্ঞান ছাড়া এমনটা সম্ভব না। তবে এ কথা সত্য, যারা এ পুঁথি শুনতেন কিংবা পাঠ করতেন, তারা ছিলেন গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজীয় সাধু বাংলায় তাদের দখল ছিল না। কিন্তু বাংলায় মুদ্রণ শিল্পের বিকাশ ও বাঙালি মুসলমানের পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য এসব পুঁথির ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।

বখতিয়ার খলজি যে শতকে বাংলায় প্রবেশ করেন, একই শতকে বাংলায় দুজন সুপণ্ডিতের কথা জানা যায়। প্রথমজন গৌড়ের আখি সিরাজ, দ্বিতীয়জন সোনারগাঁর শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা। দ্বিতীয়জনের ফারসি কিতাব এখনো পাওয়া যায়। বাংলার ইতিহাসে বাংলার বাইরেও ফারসি ও উর্দু ভাষা যে চর্চিত হয়েছে, এটা তার নজির। বিশেষ করে হিন্দি ও উর্দু ছিল দ্বিতীয় মাতৃভাষার মতো। ফলে পুঁথির ভাষায় যখন ফারসি ও উর্দু প্রভাব দেখা যায়, সেটাকে আমদানি না বলে এখানকার জনজীবনের মিথস্ক্রিয়ার অনিবার্য পরিণতি ও ভাষিক গতিশীলতা হিসেবে গণ্য করাই যৌক্তিক।

আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা