কুলু কুলু করিয়া ক্ষুদ্র খালটি বহিয়া যাইতেছে, পার্শ্বে স্বর্ণবশার উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়। স্কুলের অবস্থিতি এবং চারিদিকের প্রাকৃতিক শোভা বড়ই মনোরম। মধ্যস্থলে একটি নাতিবৃহত্ জলাশয়। তাহার চারি পাড়ে চারিটি বাঁধা ঘাট, চারি পাড়ের চারিটি সুন্দর টীনের ঘরের দরজা পর্য্যন্ত উঠিয়াছে। পুকুরের চারিধারের ফুলের বাগান, এবং তাহার মধ্যে অনেক গুলি কাল ও শাদা প্রস্তরের মূর্ত্তি, স্কুলের স্বত্বাধিকারীর আধুনিক রুচির পরিচয় দিতেছে। স্কুল-গৃহের অনুমান শত গজ দূর দিয়া ডিষ্ট্রিক্টবোর্ডের রাস্তা চলিয়া গিয়াছে। স্কুল-প্রাঙ্গণটি একটি উচ্চ সড়ক দ্বারা সেই রাস্তার সহিত সংযোজিত। স্থানটি বড় নির্জ্জন, বিদ্যামন্দির প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত স্থানই বটে। স্কুল-প্রাঙ্গণের নীচেই বহুদূর পর্য্যন্ত বহুবিস্তৃত শস্যশ্যামল মাঠ, তাহাতে ধান এবং পাটের গাছই বেশী। দূরে একটি উচ্চ মঠের চূড়া আম্রের বাগান ও বাঁশের ঝাড়ের উপর দিয়া মস্তক তুলিয়া সগর্ব্বে দণ্ডায়মান।

স্কুল-গৃহের অনতিদূরে, পথটির পার্শ্বে, হেডমাষ্টার মহাশয়ের বাসা। ছোটখাট তিনটি খড়ের ঘর টাট্টি দিয়া ঘেরাও করা। কিন্তু যে করুণামূর্ত্তি তথায় বহু বত্সর ধরিয়া বিরাজ করিতেছিল তাহার অভাবে স্থানটি যেন ম্রিয়মাণ; আজ প্রায় চারি বত্সর হইল হেডমাষ্টার মহাশয়ের চির আনন্দময়ী গৃহিণী একটি অষ্টমবর্ষীয়া কন্যা রাখিয়া সকলকে কাঁদাইয়া আনন্দধামে চলিয়া গিয়াছেন। হূতষষ্টি অন্ধের মত চিরস্নেহময় বৃদ্ধ আপনাকে প্রথমে নিতান্তই নিরাশ্রয় মনে করিয়াছিলেন, কিন্তু সেই শোকমলিন নিরাশাবিজড়িত সন্ধ্যায়, সদ্য মাতৃহীনা অসহায়া বালিকা, সুরমা যখন তাহার কোমল হস্তে, পিতার শোকবিশীর্ণ হস্তখানি ধরিয়া, অশ্রু ভারাক্রান্ত স্বরে ডাকিল ‘‘বাবা’’, তখন তিনি যেন জীবনের এক নূতন উদ্দেশ্য, এক অভিনব শৃঙ্খল দেখিতে পাইলেন এবং চোখের জল মুছিয়া জীবনের ছিন্ন সূত্র আর একবার দ্বিগুণ উত্সাহে গাথিতে আরম্ভ করিলেন। একাধারে পিতৃমাতৃ-স্নেহপূর্ণ হূদয়ের আশ্রয়ে বালিকাটি বাড়িতে লাগিল।

ছেলেবেলা হইতেই সুরমার স্বভাব বালিকাসুলভ নহে, কিছু অচঞ্চল— কিছু গম্ভীর! মাতা জীবিত থাকিতে গৃহকার্য্যের সময় তাহাকে যাহা কিছু পারিত সাহায্য করিত, অবসর সময়ে আপন মনে বসিয়া কত কি খেলা করিত। পাড়ার কোন কোন চঞ্চল মেয়ে ঝড়ের মত আসিয়া তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া বলিত ‘‘আয়না ভাই আমাদের বাড়ী, খেলি গিয়ে।’’ সুরমা তাহার আয়ত সুন্দর ডাগর চোখ দুটি তুলিয়া ধীর শান্ত স্বরে বলিত— ‘‘না ভাই, আমার ভাল লাগে না।’’ তাহার চোখের এবং কথার এমনি এক বিশেষ ভাব থাকিত যে তাহার আর প্রতিবাদ চলিত না।

সেই বালিকা সুরমা পিতার স্নেহ ও যত্নে বর্দ্ধিতা হইয়া এখন যৌবনের প্রারম্ভে দণ্ডায়মানা। নবীন বসন্তের মধুর মলয় হিল্লোলে যেন একটি কুসুম ধীরে ফুটিয়া উঠিতেছে। বাল্যকালের অচঞ্চল ভাব এখনও সমভাবে বর্ত্তমান, কিন্তু মনোহর চোখ দুটি যেন কোন অজানিত আশঙ্কায় ক্ষণে ক্ষণে চমকিয়া উঠিয়া চকিতে চারিদিকে ভ্রমণ করিয়া আইসে। গৃহকার্য্যের প্রায় সমস্ত ভারই এখন সুরমার উপর পড়িয়াছে। পিতাকে সম্মুখে বসাইয়া খাওয়াইয়া তাঁহার সেবা শুশ্রূষা করিয়া সে যেন এক গভীর তৃপ্তি লাভ করে। বৃদ্ধ পিতা যখন ভোজনান্তে স্কুলে চলিয়া যান, তখন সুরমা পাড়ায় কোন্ বাড়ী লোক অভাবে রোগীর শুশ্রূষা চলিতেছে না,— কোন্ শিশুর মায়ের অসুখ, কাজেই অযত্নের অবধি নাই, এই সকল খুঁজিতে বাহির হয়। স্কুল ছুটি হইবার পূর্ব্বেই বাসায় ফিরিয়া আসিয়া সে পিতার জন্য বহু যত্নে জলখাবার তৈয়ার করিতে প্রবৃত্ত হয়। হেডমাষ্টার মহাশয় যখন বাসার দরজায় আসিয়া স্নেহার্দ্র কণ্ঠে ডাকেন ‘‘মা’’,— বালিকা তখন হাতের কাজ ফেলিয়া ছুটিয়া বাহির হয়। পিতার হস্ত হইতে পুরাতন ছাতাটি লইয়া সহাস্য ব্যগ্রতার সহিত গ্রামের তুচ্ছ দৈনন্দিন খবর সকল পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানাইতে প্রবৃত্ত হয়!

সুরমার পিতা কোন কোন দিন জল খাইয়া পাড়াতে বেড়াইতে বাহির হন, কোন দিন বা ঘরে বসিয়াই লেখা পড়া করেন। সুরমা এই সময় একখানি পুস্তক লইয়া স্কুলের পুকুরের বাঁধা ঘাটে যাইয়া বসে। স্নিগ্ধ বাতাস ধানের ক্ষেতে ঢেউ তুলিয়া— তাহার নিবিড় কৃষ্ণ কেশগুচ্ছ দোলাইয়া, পুকুরের জল ক্ষুদ্র বীচি-বিক্ষুব্ধ করিয়া হাসিতে হাসিতে চলিয়া যায়,— আর সুরমার তরুণ হূদয়ে কি যেন একটা অননুভূতপূর্ব্ব ভাবের ঢেউ উঠিতে থাকে। খালের উপর দিয়া কত মাঝি তাহাদের ছোট নৌকাগুলিতে ছোট পাল তুলিয়া গলা ছাড়িয়া সারিগান গাহিয়া চলিয়া যায়। অমনি সুরমার নিজেদের গ্রামের কথা মনে পড়ে। সে তাহাদের গ্রামের খালে, বিকাল বেলা মায়ের সঙ্গে ছোট একটি কলসী লইয়া জল আনিতে যাইত, সেখানেও অমনি ভরা পালের নৌকা দেখিত, অমনি সারি গান শুনিত,— মাকে প্রত্যেক নৌকার বিষয়ে অসংখ্য প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিত। হায়, সেই মা এখন কোথায়! ভাবিতে ভাবিতে বিন্দুর পর বিন্দু অশ্রু গড়াইয়া পড়িত।

এইরূপে দিন কাটিতেছিল। বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র শান্তিস্থল কন্যাটিকে, এত শীঘ্র পরের হাতে সমর্পণ করিয়া দিতে হেডমাষ্টার মহাশয়ের মন সরিতেছিল না, কাজেই সুরমার বিবাহের জন্য তত চেষ্টা হয় নাই। তবে এখন বাধ্য হইয়া চেষ্টা করিতে হইতেছিল,— তাও মনের মত পাত্র পাওয়া যায় কৈ?

 

২

স্কুল বসিয়াছে। সমুদ্রের কল্লোলের মত একটা বিপুল কলকল ধ্বনি উঠিয়া সেই স্কুল-প্রাঙ্গণকে মুখরিত করিতে ছিল। এগারটা বাজিল, মাষ্টারগণ সব ক্লাসে গেলেন,— আর সব চুপ! সে বিস্তৃত গৃহ কয়টিতে যে মানুষ আছে তাহা কেবল মাষ্টার মহাশয়দিগের তন্দ্রা-বিজড়িত হুঙ্কার ধ্বনি শুনিয়াই বুঝা যাইতেছিল।

হেডমাষ্টার মহাশয় প্রথম শ্রেণীতে যাইয়া বসিলেন। তাঁহার মুখে একটি স্পষ্ট বিষাদের চিহ্ন। কি যেন একটা বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস থাকিয়া থাকিয়া হূদয়ে হাহাকার করিয়া উঠিতেছে, এবং তিনি প্রাণপণ বলে তাহা চাপিয়া রাখিতে চেষ্টা করিতেছেন! হেডমাষ্টার মহাশয় একটা পুস্তকের দিকে চাহিয়া আছেন। ছাত্রগণ শোক ও সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাঁহার মুখের দিকে তাকাইয়া! কাহারও মুখে কথা নাই!

মাষ্টার মহাশয় যে পুস্তকখানি পড়িতেছিলেন না, তাহা তাঁহার শূন্য দৃষ্টি দেখিয়াই বুঝা যাইতেছিল। কতক্ষণ পরে তিনি পুস্তকখানি টেবিলের উপরে রাখিয়ে দিলেন। ছাত্রদের কারও মুখে না চাহিয়া মাটির দিকে চাহিয়া বলিলেন— “কাল ত আমি চলে যাব”; — আর কিছু বলিবার পূর্বেই প্রবল অশ্রু-বেগ তাঁহার স্বর রুদ্ধ করিয়া দিল! একটি ছাত্র দাঁড়াইয়া অশ্রুপূর্ণ নেত্রে বলিল— “না ‘সার’ আপনাকে আমরা কিছুতেই যেতে দিব না।” “না, — না, আমার জন্য আর”— প্রবল অশ্রুপ্রবাহ অবশিষ্ট কথা ভাসাইয়া লইয়া গেল। টেবিলে মুষ্টিবদ্ধ হস্তের উপর মস্তক রাখিয়া মাষ্টার মহাশয় নিজ হূদয়ের আবেগ সম্বরণ করিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু বৃথা চেষ্টা; এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা,— শেষে অবিরল ধারে নয়নজল ঝরিতে লাগিল। ছাত্র গণও অশ্রুজলে ভাসিতেছিল। তাঁহারা তাহাদের জীবনে কখনও বৃদ্ধ হেড-মাষ্টার মহাশয়ের চক্ষে জল দেখে নাই! আত্মসম্বরণ অসাধ্য দেখিয়া মাষ্টার মহাশয় দ্রুতপদে লাইব্রেরীতে চলিয়া গেলেন।

স্কুলের সেক্রেটারী এবং স্বত্বাধিকারী পশ্চিমে এক ক্ষুদ্র সহরে আইনের ব্যবসায়ে যথেষ্ট ধনসম্পত্তি ও ভূসম্পত্তি করিয়াছিলেন; কাজেই গ্রামে আসা তাহার কদাচিত্ ঘটিয়া উঠিত। কিন্তু সে জন্য তাহার গ্রামের উন্নতির প্রতি দৃষ্টির অভাব ছিল না। তিনি গ্রামে দাতব্য চিকিত্সালয়, স্কুল এবং একটি নাতিবৃহত্ লাইব্রেরী করিয়া দিয়াছিলেন।

আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, তাহার কিছু পূর্ব্বে এই উদারহূদয় মহাত্মার মৃত্যু হইয়াছে। তাঁহার উপযুক্ত এম, এ, বি, এল, পুত্র তাঁহার ব্যবসায় এবং গ্রামস্থ স্কুল, চিকিত্সালয় ইত্যাদি দূর হইতেই পরিচালিত করিয়া আসিতেছিলেন। এমন সময় এই নবীন সেক্রেটারীর এক পুরাতন সহপাঠী আসিয়া ধরিয়া পড়িল— “আমাকে তোমার স্কুলের হেডমাষ্টারীটা দিয়ে দাও”। সেক্রেটারী মহাশয় কিছু ভাবিলেন— কিছু কাশিলেন এবং একটি দীর্ঘ হাই তুলিয়া বলিলেন— “তাই ত,!” কিন্তু বন্ধুটি নাছোড়বান্দা, কাজেই অগত্যা স্বীকার করিতে হইল।

কিন্তু যদিও বৃদ্ধ হেডমাষ্টার চোখের সামনে নাই তথাপি তাহাকে এই বয়সে কাজ হইতে বরখাস্ত করিতে নবীন সেক্রেটারীর প্রচুর চক্ষুলজ্জা বোধ হইতে লাগিল। হেডমাষ্টার মহাশয়ের প্রতি কিছুতেই কোন অন্যায় হইতে দিতে পারেন না, অথচ বন্ধুর অনুরোধও রক্ষা করা চাই। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া শেষে তিনি লিখিলেন যে হেডমাষ্টার মহাশয়ের বিশ্রাম করিবার সময় হইয়াছে, এই বয়সে তাঁহাকে কষ্ট দেওয়া তিনি ঠিক মনে করেন না, কাজেই আর একজন হেডমাষ্টার নিযুক্ত করা গেল। বৃদ্ধ হেডমাষ্টারকে তাঁহার বেতনের এক তৃতীয়াংশ পেন্সন্স্বরূপ দেওয়া যাইবে। তিনি যেন মঙ্গলবার দিন নূতন হেডমাষ্টারকে কার্য্য বুঝাইয়া দেন।

এই পত্র পাইয়া বৃদ্ধের মস্তকে আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। স্কুলের সঙ্গে যে তাঁহার বিচ্ছেদ হইতে পারে এ কথা তাঁহার কখনও মনে হয় নাই। এযে নিতান্তই অসম্ভব। পুত্রহীন বৃদ্ধের সমস্ত রুদ্ধ পুত্রস্নেহ স্কুলটিকে এবং স্কুলের ছাত্রদিগকে ঘিরিয়াই সার্থক হইতেছিল। তিনি স্কুলের আরম্ভ হইতে হেডমাষ্টার। যৌবনে উদ্যম দিয়া, প্রৌঢ়াবস্থায় সমস্ত পরিণত বুদ্ধি ও ক্ষমতা দিয়া এবং এখন বৃদ্ধাবস্থায় মঙ্গলস্নেহ দিয়া যাহা গড়িয়া তুলিয়াছেন, ও পালন করিয়া আসিতেছেন, আজ সেই চিরজীবনের সাধনার ধন স্কুলটিকে ছাড়িয়া যাইতে হইবে মনে করিয়া তাঁহার হূদয় ভাঙ্গিয়া যাইতে লাগিল। তাঁহার মনে স্কুল সম্বন্ধীয় শত দিনের শত তুচ্ছ ঘটনা উদিত হইতে লাগিল, আর দীর্ঘবিশ্বাস কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতে লাগিল। বৃদ্ধের নিজের জন্য কোন ভাবনাই ছিল না। জীবনে যথেষ্ট অর্থ সঞ্চয় করিয়াছেন, বাড়ীতেও যথেষ্ট যায়গা জমি ছিল। কিন্তু স্কুলটি যে তাঁহারই হূদয়শৌণিতে সঞ্জীবিত, — স্কুলটি যে তাঁহারই! সুরমা পিতার পরিবর্ত্তন দেখিয়া অবাক হইয়া গেল!

 

৩.

যেদিন হেডমাষ্টার মহাশয় ক্লাসে চোখের জল ফেলিলেন, সেদিন ছাত্রমহলে এক ভয়ানক বিদ্রোহের ভাব দেখা গেল। সকলের মুখেই এক কথা, “আমাদের হেডমাষ্টারকে আমরা কিছুতেই যাইতে দিবনা।” হেডমাষ্টার মহাশয়ের পদচ্যুতি শুনিয়া গ্রামের ভদ্রলোকগণ যে দুঃখিত না হইয়াছিলেন এমত নহে, তবে বহুদিন হইতে এর চেয়ে ঢের বেশী দুঃখ ও অন্যায় সহ্য করিতে করিতে তাঁহাদের ধৈর্য্যটা বেশ শক্ত হইয়া আসিয়াছিল। অন্যায় দেখিলে গম্ভীরভাবে ঘাড় নাড়িয়া বলিতেন— “তাই ত!” খুব বেশী হইলে অন্যায়কারীর নিন্দা করিতেন, এর বেশী কিছু করা তাহাদের স্বভাববিরুদ্ধ।

কিন্তু ছেলে দলের স্বভাব ও কার্য্যপ্রণালী কিছু বিপরীত। সেই দিন বিকালে ফুটবল খেলা কিছুতেই জমিল না। ফুটবল খেলা রাখিয়া দিয়া প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েকটি অগ্রণী ছাত্র যাইয়া খালের পাড়ে একটা আম গাছের ছায়ায় বসিল। কাহারও মন শান্ত ছিলনা, সকলেই মনে মনে সদ্যধৃত পেটিকারুদ্ধ সর্পের মত গর্জ্জন করিতেছিল। সুরেশ বলিল— “কি করা যায় বল দেখি।”

মতি। আয় সকলে মিলে আর এক স্কুলে চলে যাই।

হেম। তাহলে আর ‘সার’ এর উপকার কি হল?

মদন। আচ্ছা সেক্রেটারী বেটার কি বিবেচনা!

সুরেশ। ও ষ্টুপিডের কি একটা বিবেচনা আছে? সেক্রেটারী হয়ে যেন নবাব হয়েছেন।

নবকুমার। আয় আমরা সকলে মিলে উদ্যোগ করে আর একটা স্কুল খুলে দেই।

রোহিণী। তাও কি সম্ভব? পাগল আর কি!

গোপীনাথ। আয় স্কুল-ইনেস্পকটারের কাছে দরখাস্ত করি।

মদন। তাতেও কিছু ফল হবে না।

মধুসূদন এতক্ষণ কি ভাবিতেছিল। সে বলিল,— “দেখ ও সব কিছু নয়; যদি প্রতীকার কর্ত্তে হয় তবে আমাদের নূতন হেডমাষ্টারকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে এখানে তার চাকরী সুখের হবে না!”

সুরেশ। সে কি হবে?

মধু। আমি খবর পেয়েছি যে নূতন হেডমাষ্টার আজ সন্ধ্যাবেলায় এখানে এসে পৌঁছবেন। চল আমরা খালের উপর সাঁকোটার ধারে তার ভাল রকম অভ্যর্থনার বন্দোবস্ত করিগে।

সকলেই মহা উত্সাহিত হইয়া উঠিল; সুরেশ বলিল “যদি কেউ দেখে, তবে ত রাষ্টিকেট হতে হবে।”

মধু। সন্ধ্যাকালে ওখানে কে দেখতে আসবে? — আর এতে রাষ্টিকেট হই তো হ’ব।

সকলেই স্বীকৃত হইয়া ঘরে ফিরিয়া গেল।

দিনের আলোক উচ্চ হইতে উচ্চতর বৃক্ষের মস্তকে আশ্রয় লইতেছিল, এবং পূর্বদিক হইতে সন্ধ্যার অন্ধকার বিজয়ী সৈন্যের মত পশ্চাদ্ধাবিত হইয়া পদে পদে সমস্ত দখল করিয়া লইতেছিল; এমন সময় সুরেশ, মতি, মধু, হেম, ইত্যাদি একে একে আসিয়া উপরোক্ত সাঁকোর কাছে সম্মিলিত হইল। সকলেরই মুখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, গায়ে গঞ্জি, এবং কাপড় মালকোচা মারিয়া পরা! সাঁকোর দুইধারে দুইটা ঝোপ ছিল, সমান সংখ্যায় তাহারা সেই দুই ঝোপে লুকাইয়া রহিল।

সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমেই ঘনাইয়া আসিতে লাগিল। মশকের দলও ভোজ্য সামগ্রী গৃহের দরজায়ই দেখিয়া আনন্দে কোলাহল বাধাইয়া দিল। বালকগণও শারীরিক ও মানসিক অশান্তিতে অস্থির হইয়া উঠিতে লাগিল। এমন সময় একটি যুবক সাঁকোর সম্মুখে বাইসাইকেল হইতে অবতরণ করিলেন। যুবকটির মাথায় টেরী, গায়ে সিল্কের সার্টের উপর সিল্কের চাদর শক্ত করিয়া কোমরে জড়ান, পায়ে বুট-জুতা এবং শরীরে অসীম বল, — এসব ঝোপ হইতেও বেশ দেখা গেল। যুবক এক হাতে সাইকেল ধরিয়া শীষ্ দিতে দিতে কেবল সাঁকোতে পা দিয়াছেন, এমন সময় দুই দিক হইতে বালকগণ ব্যাঘ্রের মত তাহার ঘাড়ে লাফাইয়া পড়িল,— এবং “আরো হেডমাষ্টার হতে আসেব?” বলিয়া মুষলধারে মুষ্টিবর্ষণ করিতে লাগিল। যুবক প্রথমটা একটু চমকিয়া উঠিয়া ছিলেন: ব্যাপারটা বুঝিয়া যেই আত্মরক্ষার উদ্যম করিতে যাইবেন, অমনি একটা ধাক্কা লাগিয়া, জীর্ণ সাঁকো হইতে সাইকেল সমেত একেবারে খালে পড়িয়া গেলেন। বালকগণ ছুটিয়া পলাইয়া গেল।

খালে জল ও কাদা প্রায় সমান ছিল, কাজেই পড়িয়াও যুবক বিশেষ কোন আঘাত পাইলেন না। সাইকেলটি একহাতে ধরিয়া কর্দ্দমপ্রোথিত সবুট পদ ধীরে ধীরে সঞ্চালিত করিয়া যাইয়া অপর পাড়ে উঠিলেন। খাড়া পাড় বাহিয়া উঠিতে পা পিছলিয়া ছোটখাট দুইটি একটি আছাড় খাইয়াছিলেন, বলাই বাহুল্য।

 

৪

পাড়ে উঠিয়া ঘাসের উপর বসিয়া যুবক পা হইতে বুট খসাইতে প্রবৃত্ত হইলেন। নিজের অদ্ভুত অবস্থা-বৈষম্য স্মরণ করিয়া অদম্য যুবকের খুব হাসি পাইতে লাগিল।

ঘরে জল না থাকায় সুরমা এ সময় খালের ঘাটে জল নিতে আসিয়াছিল। তখনও একেবারে অন্ধকার হয় নাই। কিছু দূরের লোক তখনও বেশ চিনা যায়। সুরমা এই অস্পষ্ট সন্ধ্যালোকে নির্জ্জন খালের পাড়ে একটি লোক বসিয়া থাকিতে দেখিয়া একটু চমকিয়া উঠিল। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়া দেখিয়াই বুঝিল যে এ কোনরূপে খালে পড়িয়া গিয়াছিল, — কাপড় চোপড় সমস্ত ভিজা ও কাদামাখা। এই দৃশ্য দেখিয়াই করুণারূপিণী বালিকার হূদয়ে দয়া উছলিয়া উঠিল। সে ধীরে ধীরে যুবকের নিকটে যাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, — “আপনি কি এই খালে পড়িয়া গিয়াছিলেন?”

সময় সময়, এবং সময় বিশেষে এক একটি স্বর বড়ই মিষ্ট, বড়ই চিরপ্রার্থিত, বড়ই চিরপরিচিতের মত লাগে, সুরমার স্বরও বোধ হয় যুবকের নিকট সেই রকম একটা কিছু লাগিয়াছিল; নচেত্ এই করুণাপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে যুবকের একটু বিলম্ব হইবে কেন?

যুবক বলিলেন— হাঁ, খালেই পড়ে গিয়েছিলাম!

সু। লাগেনি ত?

যু। না, বেশী লাগেনি।

সু। কি করে পড়ে গেলেন?

যু। পা পিছলে পড়ে গিয়েছি।

সু। আপনি কোথা থেকে এসেছেন?

যু। সে অনেক দূর।

সু। যাচ্ছিলেন কোথায়?

যু। বেড়াতে বের হয়েছিলাম।

সু। এখন এই রাত্রিবেলা কোথায় যাবেন?

যুবক একটা ঔপন্যাসিক ব্যাপারের আশায় মনে মনে উত্ফুল্ল হইয়া উঠিলেন এবং কৃত্রিম দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন— “তাইতো ভাবিছ!”

করুণারূপিণী বালিকা আগ্রহের সহিত বলিল— “আমাদের বাড়ী চলুন না এখন?”

যু। তোমাদের বাড়ী কতদূর?

বালিকা অঙ্গুলি সঙ্কেতে দেখাইয়া বলিল, “এই যে সামেন,— দেখা যায়।”

যু। তোমাদের বাড়ীতে কে আছে?

সু। বাবা আছেন, ভুলুয়ার মা আছে,— আর কেউ নেই।

যু। আমি গেলে তোমার বাবা যদি রাগ করেন?

সু। না, তা করবেন কেন? তিনি কত খুশি হবেন!

যু। তবে চল;— এই বলিয়া যুবক বাইসিকেল ধরিয়া ভিজা জুতাই পায়ে দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। বালিকা জল লইয়া আসিয়া তাঁহার পাশাপাশি চলিতে লাগিল।

কলসের জল ছল ছল করিতে লাগিল, বালিকার হাতের বালা ঠিন্ ঠিন্ করিয়া মিঠা বাজিতে লাগিল, বাইসাইকেল হইতে অস্ফুট শব্দ উঠিতে লাগিল— আর যুবকের হূদয়ে কিসের এক অননুভূতপূর্ব্ব লঘু আনন্দের তরঙ্গ উঠিতে লাগিল!

যুবক জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘‘তোমার বাবা কি করেন?’’

সু। তিনি এখানকার স্কুলের হেডমাস্টার। কিন্তু কালই চলে যাবেন।

যুবক একটু চমকিয়া উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন কেন?

সু। ‘যাদের স্কুল, তারা আর একজন মাস্টার রেখেছে। আচ্ছা আপনি জানেন, বাবাকে ওরা কেন ছাড়িয়ে দিল? বাবার সেই দিন অবধি আর মুখে হাসি নাই। কত নাকি কেঁদেছেন; মা যখন মরলেন’— বলিতে বলিতে ব্যথিতা বালিকার স্বর নিরুদ্ধ অশ্রুভারে গম্ভীর হইয়া আসিল— ‘তখনও’ বাবাকে চোখের জল ফেলতে দেখিনি!

যুবকের হূদয়ে কে যেন ‘অকৃতজ্ঞ! অকৃতজ্ঞ! অকৃতজ্ঞ’ বলিয়া তীব্র কশাঘাত করিতে লাগিল। যুবক অনুতাপ ও সহানুভূতিপূর্ণ স্বরে বলিলেন, ‘আচ্ছা তোমার বাবার যাতে যেতে না হয় তা আমি করব।’

যুবকের ক্ষমতা কি, সেই প্রশ্ন বালিকার মনেও উঠিল না, সরলা বালিকা কেবল উচ্ছ্বসিত আনন্দে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল ‘করবেন?’ সে কথায় কতই নির্ভর, কতই আশা, কতই বিশ্বাস মিশ্রিত ছিল।

এই সময় উভয়ে সুরমাদের বাসার সম্মুখে আসিয়া পৌঁছিল। হেডমাষ্টার মহাশয় সুরমার দেরি দেখিয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। সুরমা  বলিল— ‘এই যে আমাদের বাড়ী,— চলুন।’ সুরমাকে একটি অপরিচিত যুবকের সঙ্গে আসিতে দেখিয়া হেডমাষ্টার মহাশয় একটু বিস্মিত হইলেন। সুরমা আগে যাইয়া বলিল— ‘বাবা! ইনি খালে পড়ে ছিলেন। আমি আমাদের বাড়ী নিয়ে এসেছি। ইনি বলেছেন তোমার স্কুল ছেড়ে যেতে হবে না!’ এই বলিয়া সে আনন্দে কলস রাখিতে গেল।

এই সময় যুবক আসিয়া হেডমাষ্টার মহাশয়কে প্রণাম করিল। হেডমাষ্টার মহাশয় বিস্মিত হইয়া বলিলেন— ‘এ কি প্রতুল, তুমি এ অবস্থায় এখানে কোথা থেকে আসলে?’

প্রতুল বিনয়াবনত স্বরে বলিল ‘আজ্ঞে, বাড়ী আসিছলাম।’

হে। খালে পড়ে গেলে কি করে?

প্র। সাঁকোটার উপর যখন এসেছি তখন কতগুলা ছোড়া কোথা থেকে এসে ‘আরো হেডমাষ্টার হবে’ বলে একেবারে জলে ফেলে দিল। 

হেডমাষ্টার মহাশয় শুনিয়া বড়ই দুঃখিত হইলেন; বলিলেন— ‘লাগেনিত?’

প্র। আজ্ঞে, না, বেশি লাগে নাই।

হে। তোমাকে এখন কিছুতেই বাড়ী যেতে দিচ্ছিনা, চল কাপড়গুলি ছেড়ে শেষে কথা বলা যাবে এখন।

সুরমা কলস রাখিয়া পিতার কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। পিতাকে যুবকের সঙ্গে পরিচিতের মত কথা বলিতে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘বাবা— তুমি একে চেন নাকি?’ হেডমাষ্টার মহাশয় হাসিয়া বলিলেন— ‘এই যে আমাদের সেক্রেটারী, এই ছোড়াইত আমাকে ছাড়িয়ে দিয়েছে।’

সুরমা একবার মাত্র কৌতূহল-মিশ্রিত বিস্মিত দৃষ্টিতে প্রতুলের দিকে চাহিল; পরমুহূর্তেই কোথা হইতে তাহার পর্বতপ্রমাণ লজ্জা আসিয়া উপস্থিত হইল। লজ্জায় রক্তিম হইয়া সে ছুটিয়া পলাইল।

খাওয়া দাওয়ার পর প্রতুলের বিবরণ হইতে বুঝা গেল যে তাহার বন্ধু নূতন হেডমাস্টার এবং সে একত্র আসিতে ছিল। পথে তাঁহার বন্ধু জ্বর হইয়া এক আত্মীয় বাড়ী রহিয়া গিয়াছে। প্রতুল একাই বাড়ী আসিতেছিল, তার পরে এ সকল কাণ্ড।

*       *       *

মহাধুমধামে প্রতুলের সহিত সুরমার বিবাহ হইয়া গেল। সম্বন্ধের প্রস্তাবটা প্রতুলের বন্ধুই করিয়াছিলেন।

হেডমাষ্টার মহাশয় নিজ পদেই বহাল রহিলেন। প্রতুলের বন্ধু সহকারী হেডমাষ্টার নিযুক্ত হইলেন।

*       *       *

বাসর ঘরে গভীর রাত্রে, সকলে চলিয়া গেলে পরে প্রতুল স্নেহকম্পিত স্বরে ডাকিল— “সুরমা— সুরু!”

লজ্জায়, আনন্দে, কৃতজ্ঞতায়, সুরমার ক্ষুদ্র হূদয়খানি উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতেছিল!

 

গুরুভক্তি গল্পটি ‘হাসি ও অশ্রু’ গল্পগ্রন্থে প্রকাশিত। এই গল্পগ্রন্থটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়।