এক.

১ জুলাই, ১৯১৪। ঢাকা শহরে সদ্য ভূমিষ্ঠ হয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চার একটি শিশু প্রতিষ্ঠান— ঢাকা জাদুঘর। এক তরুণ গবেষক সম্পদ-দরিদ্র এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ। বেতন মাত্র ২০০ টাকা, তাও সব মাসে সময় মতো হাতে আসে না; সংসার চলে কষ্টেসৃষ্টে। কিন্তু বিক্রমপুরের এই উদ্যমী গবেষকের তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। জাদুঘরের গবেষণার ফাঁকে ফাঁকে প্রত্নবস্তু সংগ্রহের খোঁজে তিনি ঘুরে বেড়ান দেশের আনাচে-কানাচে। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো নৌকায় চড়ে আবার কখনো গরুর গাড়িতে। সঙ্গে ক্যাম্বিসের ব্যাগে ব্রাশ, কালি ও শিলালিপির ছাপ তোলার সামান্য উপকরণ আর নিজের জন্য মুড়ির মোয়া, চিঁড়া, আখের গুড়; যেন পথেঘাটে অন্যের মুখাপেক্ষী না হতে হয়। অর্ধাহার, অনাহার আর কলেরা মহামারীর ভয়, তার অবিশ্রান্ত পথচলার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্যের প্রতি দুর্বার আকর্ষণই তার পথচলার ক্লান্তি দূর করেছিল। তার পরিশ্রম যে বৃথা যায়নি এর প্রমাণ তিনি অল্পদিনের মধ্যেই মফস্বলের এই খ্যাতিবিবর্জিত প্রতিষ্ঠানকে সারা ব্রিটিশ ভারতে পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাসচর্চার একটি অন্যতম মর্যাদাশালী গবেষণাকেন্দ্রে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার পরিশ্রমী ও মেধাবী গবেষণার আলোকে প্রাচীন বঙ্গ ও মধ্যযুগের ইতিহাসের (মধ্যযুগের) অনালোকিত কুঠুরিগুলো ধীর ধীরে দীপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি ঢাকা জাদুঘরের প্রথম ৩৩ বছরের অধ্যক্ষ, ইতিহাসবিদ, পুরাতাত্ত্বিক, সুলেখক, প্রাচীন লিপিবিশারদ ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী।

তিনিই সর্বপ্রথম বাংলার স্বাধীন সুলতানদের শাসনামলের সুনির্দিষ্ট কালক্রম নির্মাণ করে বাংলার স্বাধীন মুসলিম শাসনের গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য তুলে ধরেন। বাংলার পূর্বাঞ্চলে খড়গ, বর্মণ, চন্দ্র ও দেব নামের কতিপয় স্বাধীন রাজবংশের বংশানুক্রম ও তাদের শাসিত ভূভাগ সম্পর্কে পণ্ডিতমহলকে অবহিত করার কৃতিত্ব তারই। সুলতানি আমলে রাজা কংস ও দনুজমর্দন দেব যে একই ব্যক্তি তিনিই সর্বপ্রথম প্রমাণ করেছিলেন দনুজমর্দনের মুদ্রা বিশ্লেষণ করে। তার এই অভিমত আজ অবধি একটি নির্ভুল তথ্য হিসেবে গৃহীত হয়ে আছে।

৩৩ বছর একটানা অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করার পর ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারিতে নিমতলীর ঢাকা জাদুঘর চত্বরের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী। এই সুদীর্ঘ চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার বেতন হয়েছিল ২৬০ টাকা, প্রথম মাসিক বেতন ২০০ টাকা থেকে বেড়ে। ঢাকা জাদুঘরে যোগদানের আগে থেকেই গবেষণা ও প্রত্নবস্তু সংগ্রহে লিপ্ত ছিলেন নলিনীকান্ত। কখনো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উত্সাহে, কখনো বা নিজের একক প্রচেষ্টায়। তরুণ ভট্টশালীর গবেষণার মান এবং বিষয়বস্তুর গুরুত্ব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তারই প্রশংসা ও সুপারিশের ফলেই নলিনীকান্ত ঢাকা জাদুঘরে অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত  হয়েছিলেন। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় যে প্রতিভার আলো চিনতে ভুল করেননি, নলিনীকান্তের পরবর্তী জীবনের গবেষণার সুবর্ণ ফসল তা প্রমাণ করে দিয়েছে।

নলিনীকান্তের গবেষণার মালমসলা সংগ্রহের কেন্দ্র ছিল পূর্ববঙ্গ। পূর্ববঙ্গের অনেক শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি নিয়মিত ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রত্নবস্তু, পুঁথি, তাম্রলিপি, প্রস্তরমূর্তি আর শিলালিপির সন্ধানে। পথে চলতে চলতে পুরনো বাড়ির ভগ্নাবশেষ, প্রাচীন দীঘি বা উঁচু মাটির ঢিবি দেখলেই তার দৃষ্টি সজাগ হয়ে উঠত। তার অনুসন্ধিত্সু মন বলে উঠত এসব হেজেমজে যাওয়া দীঘি আর মাটির স্তূপের নিচে না জানি অতীতের কত স্মৃতি, কত প্রত্ন নিদর্শন লুকিয়ে আছে। জাদুঘরের সীমাবদ্ধ আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে মাটি খুঁড়ে এসব প্রত্নবস্তু উদ্ধার করা ছিল তার ক্ষমতার বাইরে। খোঁড়াখুঁড়ির মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পুরাকীর্তি উদ্ধারের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জ্ঞানও ছিল না তার, কিন্তু কোনো বাধাই তিনি মেনে নেননি। পুরাকীর্তি উদ্ধারের প্রতি তার দায়বদ্ধতাকে নেশাগ্রস্ততার সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। নিজের একটি লেখায় এই নেশার কথা বলে গেছেন এমনি ভাষায়—

“মনে অহরহ ইচ্ছা জাগিতেছে যে, স্বহস্তে কোদাল ধরিয়া সমস্ত উচ্চভূমি খুঁড়িয়া সমভূমি করিয়া দিই। প্রাচীন পুকুরগুলিকে প্রাচীন কটাহের মত ধরিয়া তুলি এবং উল্টাইয়া ফেলিয়া দিই দেখি তাহাদের অভ্যন্তরে কি আছে। কিন্তু দুর্বৃত্ত উদর দুই বেলা যথা সময়ে চোঁ চোঁ করিয়া জানাইয়া দেয় যে, রাজা অশোকের কটা ছিল হাতি তাহা না জানিলেও পৃথিবীর বিশেষ ক্ষতি বৃদ্ধি হইবে না। তথাপি নেশা ‘যারে ধরে তারে পাগল করে’। প্রত্নতত্ত্বের নেশাগ্রস্ত হতভাগ্যগণ আমার কথার সত্যতা সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিবেন।”

জনশ্রুতি, পুরাকীর্তি সংগ্রহের নেশায় একবার নাকি তিনি পুকুরের ধারে একনাগাড়ে চারদিন বসে রয়েছিলেন। যদিও জেলেদের দিয়ে জাল ফেলে বহু পরিশ্রমেও সেই পুরাকীর্তি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নলিনীকান্তর কাছে খবর পৌঁছেছিল যে, ওই পুকুরে তামার প্লেটের একটি ভাঙা টুকরো রাখা আছে। বলাবাহুল্য, সেবার নলিনীকান্তকে হতাশ হয়ে খালি হাতেই ঘরে ফিরতে হয়েছিল।

নলিনীকান্তের কর্মজীবনে এই ধরনের ঘটনা আরো কয়েকবার ঘটেছে, তবে সব সময়েই খালি হাতে তাকে ফিরতে হয়নি। যেমন ঘুঘুরাহাট এলাকায় একদল মূর্তিচোর স্থানীয় মানুষের তাড়া খেয়ে মূর্তি পুকুরে ফেলে পালিয়ে যায়। নলিনীকান্ত খবর পেয়েই পুকুর পাড়ে হাজির হয়ে সারা রাত জেগে থাকেন টর্চ হাতে। পরের দিন ভোর হলে মূর্তি পুকুর হতে উদ্ধার করে ঢাকা জাদুঘরে নিয়ে আসেন।

ভট্টশালী প্রত্নবস্তু সংগ্রহের সময়ে দেশাচারের সব প্রথা মেনে চলতেন। কখনো জোর-জবরদস্তি করে সংগ্রহে নেমেছেন এমন নজির নেই। স্থানীয় মানুষজনকে বুঝিয়ে তাদের সম্মতিতেই প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করেছেন। এই ব্যাপারে তার  ধৈর্য এবং লোকচরিত্র বোঝার ক্ষমতার অবশ্যই প্রশংসা করতে হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তার সংগ্রহ পদ্ধতি নিয়ে অনেক কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনীর জন্ম হয়েছে। আর আশ্চর্য যে তখনো টেলিফোন যুগ এসে পৌঁছেনি, তাই প্রত্নবস্তু পাওয়ার খবর পেতেন তিনি লোক মারফত। প্রথমেই জানতে চাইতেন নিদর্শনটি কীভাবে কার কাছে রক্ষিত আছে। যদি সংবাদ পেতেন যে প্রত্নবস্তুটি কোনো ব্রাহ্মণ পরিবারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে, তবে তিনি আদ্দি কাপড়ের পাঞ্জাবি, গলায় পুঁতির মালা এবং ধবধবে সাদা ধুতি পরে ব্রাহ্মণ বেশে হাজির হতেন। দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণ ভট্টশালীকে ব্রাহ্মণের বেশে দেখে ওই পরিবার বা প্রতিষ্ঠান সন্তুষ্ট হয়েই ভাস্কর্যটি জাদুঘরে দান করতে অরাজি হতো না, দ্বিধা করত না। আবার থানার দারোগা অথবা জেলা প্রশাসকের কাছে যেতে হলে তিনি অফিসের উপযুক্ত পোশাকেই অর্থাত্ শার্ট, প্যান্ট পরেই যেতেন। প্রয়োজন হলে নেকটাই ব্যবহার করতে দ্বিধা করতেন না— যদিও ভট্টশালী সব সময়ই ধুতি-পাঞ্জাবি পরে থাকতেন।

মাঝে মাঝে এই সংগ্রহের বাতিকে তাকে প্রতিকূল অবস্থারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। কারণ সেই সময়ে বাংলাদেশের ধর্মভীরু মানুষ মাটি খুঁড়তে গিয়ে বা ঘরের ভিত তৈরি করার সময় কোনো দেবমূর্তি বা ভাস্কর্য পেলে সেটি সিঁদুরের  টিপ দিয়ে ভক্তিভরে পুজো করে সযত্নে রেখে দিতেন। তাদের বিশ্বাস স্বয়ং বিধাতা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বিগ্রহটি তাদের দিয়েছেন, সুতরাং সহজেই এটি হাতছাড়া করতে চাইতেন না। একবার এক মূর্তি পাওয়ার খবর পেয়ে ভট্টশালী দ্রুত অকুস্থলে গিয়ে দেখেন সবাই মিলে বিগ্রহটির পুজো দেয়ায় ব্যস্ত। এহেন ভক্তি বিহ্বল পরিস্থিতিতে মূর্তি সংগ্রহ করার প্রস্তাব দেয়া শুধু দৃষ্টিকটুই নয় ক্ষেত্রবিশেষে বিপজ্জনক হতে পারে। সুতরাং পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিজের ব্রাহ্মণ পরিচয় দিয়ে ভট্টশালী নিজেই সেই পুজোয় যোগ দিলেন। স্থানীয় মানুষ তার ভক্তি, মন্ত্রোচ্চারণের মাধুর্যমণ্ডিত পুজো পদ্ধতি দেখে সিদ্ধান্তে আসেন যে, ঢাকা থেকে আগত এই ভদ্রলোক তাদের চেয়ে বিদ্বান এবং অবশ্যই খাঁটি ব্রাহ্মণ সন্তান। এমন ভক্তিমান মানুষের হাতে দিয়ে মূর্তিটি ঢাকা জাদুঘরের জন্য উপহার দিতে আর দ্বিধা করেননি তারা।

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম তার ‘নলিনীকান্ত ভট্টশালী’ বইয়ে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যা এখানে বিধৃত করা প্রাসঙ্গিক হতে পারে: কোনো এক গ্রামের এক হিন্দু ভদ্রলোক তার জমির মাটি খুঁড়তে গিয়ে একটি দেবীমূর্তি পেয়েছেন। ভক্তিভরে মূর্তিটি মন্দিরে স্থাপন করে পুজো আরম্ভ করার দিনক্ষণ স্থির করলেন। পুজোর দিনই ভট্টশালী দেবীমূর্তিটি সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে সেই গ্রামে গিয়ে হাজির। অবস্থা দেখে তিনি অপ্রস্তুত, তবে দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নিলেন। তখন সমবেত ভক্তমণ্ডলীকে জাদুঘরে মূর্তিটি উপহার দেয়ার পক্ষে বোঝাতে শুরু করলেন তার অনুকরণীয় বিনম্র ভঙ্গির যুক্তি দিয়ে। প্রথমে আপত্তি করলেও শেষে নলিনীকান্তর ব্যবহার এবং যুক্তিতে বশীভূত হয়ে ঢাকা জাদুঘরে ভাস্কর্যটি উপহার দিতে সম্মত হলেন। তারা হিন্দু পরিবারে কন্যার বিবাহ দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে উঠিয়ে দেয়ার সময় যে সব আচার, নিয়ম পালন করতে হয়, ঠিক তেমনি আচার-আচরণ ও যথোপযুক্ত মন্ত্র উচ্চারণ করে শত শত নর-নারীর উপস্থিতিতে মূর্তিটি ভট্টশালীর হাতে সমর্পণ করলেন।

গ্রন্থকার মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, “সার্বিক অবস্থা দেখে মনে হলো ভট্টশালী যেন পুত্রবধূকে ঘরে তুলে নিয়ে আসছেন।”

কোথাও মূর্তি হাতে পেলে তিনি মহানন্দে বাড়ি ফিরে এসে কুয়াতলায় বসে নিজ হাতে ভাস্কর্যের গায়ে লেগে থাকা কাদামাটি পরিষ্কার করতে লেগে যেতেন। তার চোখে-মুখে তখন ফুটে উঠত অসীম তৃপ্তি আর অনির্বচনীয় আনন্দ। বাড়ির ছেলেপুলেরা তার মুখ দেখেই তার মনের প্রসন্নতা টের পেত। এমন সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে দেরি করত না তারা। তাদের সব আবদার, দাবি-দাওয়া সেই সময় নলিনীকান্তর কাছ থেকে সহজেই আদায় কড়া যেত।

 

দুই.

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা সাহিত্য পরিষদের জন্য কুমিল্লা শহরের কাছে ভারেল্লা গ্রাম থেকে ‘লড়হচন্দ্র’ নামাঙ্কিত একটি নটেশ শিবমূর্তির পাদপীঠে উত্কীর্ণ লিপি সংগ্রহে তিনি কুমিল্লা গিয়েছিলেন। তার বন্ধু কুমিল্লার বড় কামতা গ্রামের বৈকুণ্ঠ দত্তর কাছ থেকে খবর পেয়েই লিপিসহ মূর্তিটি উদ্ধারের জন্য তার কুমিল্লা অভিযান। ভট্টশালী মূর্তিটির পাদপীঠে লিপির ছাপও বৈকুণ্ঠ বাবুর মারফত আগেই পেয়ে গিয়েছিলেন। তার মতে নটেশ মূর্তির লিপিতে বলা হয়েছে, ‘কর্মান্তের রাজা কুসুম দেবের পুত ভারুদেব এই মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।’ নলিনীকান্তর বিবেচনায় ভারেল্লা নামটি সম্ভবত ভারুদেবের নাম হতে এসেছে।

নলিনীকান্তের এই প্রত্ননিদর্শনটি সংগ্রহের একটি রসঘন বর্ণনা তার নিজের লেখা ‘প্রত্নানুসন্ধানের সুখ দুঃখ’ প্রবন্ধে বিধৃত হয়েছে। বৈকুণ্ঠ দত্ত জানিয়েছিলেন নটেশ মূর্তিটি কুমিল্লার বড় কামতা গ্রামের বাজারে পাওয়া গিয়েছে। বৈকুণ্ঠ দত্তের দেয়া এই তথ্য হাতে নিয়ে বড় কামতা বাজারে নলিনীকান্ত উপস্থিত হলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখলেন যে ভাস্কর্যটি ভেঙে খণ্ড খণ্ড করা হয়ে গেছে। তবে লিপিযুক্ত অংশটি তখনো অক্ষত আছে। দীর্ঘদিন ধরে ভাস্কর্যটি বাজারের বটগাছের গায়ে হেলান দেয়া অবস্থায় পড়েছিল। স্থানীয় মানুষ এর নানা অংশ ভেঙে নিয়ে ওজন করার বাটখারা বানাতে বেশি দিন অপেক্ষা করেনি। কাছেই একটি বড় দেবালয় বা রাজবাটির ভগ্নাবশেষ রয়েছে, বাজারের মানুষের মুখ থেকেই জানলেন যে কয়েক বছর আগে রাজবাটির ভগ্নাবশেষের পাশের পুকুরের মাটি তুলতে গিয়ে এসব মূর্তি উঠেছিল। বেশির ভাগই নানা জনে নিয়ে গেছে। শুধু এই নটেশ মূর্তিটিই বটগাছে হেলান দিয়ে অনেক দিন অক্ষত অবস্থায় টিকেছিল।

এর পর নলিনীকান্ত তার লেখার প্রসাদগুণে এই ভাস্কর্য সংগ্রহের পাণ্ডিত্যপূর্ণ শুকনো বর্ণনার পরিবর্তে এক পরিহাস স্নিগ্ধ রসসিক্ত বর্ণনা পাঠকদের উপহার দিয়েছেন। সেদিনের ঘটনা:

বাজারের মধ্যে নলিনীকান্ত সাড়ম্বরে নটেশ্বর লিপির ছাপ নিতে মগ্ন হয়ে পড়লেন।

চারদিকে লোকারণ্য হয়ে গেল। সকলেরই এক প্রশ্ন— এই মূর্তির মধ্যে এমন কি থাকতে পারে যার জন্য এই ভদ্রলোক ঢাকা হতে এতদূর এসেছেন। ‘‘কেহ কেহ সন্দেহ করতে লাগিল যে লিপিটিতে কোন গুপ্তধনের বিবরণ লিখিত আছে, তাহারই খোঁজে আমি (ভট্টশালী) আসিয়াছি।” এদের মনোভাব আঁচ করে তিনি একটি মুরব্বি গোছের মুসলিম ভদ্রলোককে কাছে ডেকে লিপিটির প্রত্যেক অক্ষর ধরে ধরে পড়ালেন এবং অতীত ইতিহাস উদ্ধারে এই লিপিটি কীভাবে সহায়ক হবে তা বুঝিয়ে দিলেন। এই লিপির সাহায্যে ইতিহাস লিখিত হবে শুনে স্থানীয় মধ্য বাঙ্গালা স্কুলের একটি ছেলে সভয়ে ভট্টশালীকে জিজ্ঞাসা করল যে, সেই ইতিহাস তাদের স্কুলে পড়তে হবে কিনা। তিনি উত্তরে জানালেন যে, ইতিহাস লিখিত হলে আর রক্ষা নাই, তাদের স্কুলে পড়তেই হবে। ভট্টশালী এরপর লিখেছেন, ‘‘ইহার পর আবার যখন ভারেল্লার উপর দিয়া যাই তখন ছেলেটির সঙ্গে দেখা হইয়াছিল। সালাম করিয়া ম্লান মুখে ছেলেটি জিজ্ঞাসা করিল, ইতিহাস কতদূর লেখা হইয়াছে? আমি আশ্বাস দিলাম এখনও তাহা আরম্ভ করিতে পারি নাই।”

নলিনীকান্ত যে কাঠখোট্টা পণ্ডিত মাত্র ছিলেন না, তার মধ্যে যে একটি রসিক পরিহাসপ্রবণ সুলেখক লুকিয়ে ছিল এই ঘটনাটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

 

তিন.

এবার মূর্তির ছাপ তোলার প্রক্রিয়ায় ফিরে যাই।

প্রথম ছাপখানা ভালো ওঠেনি কারণ পানি বেশি দেয়ায় সেটি নষ্ট হয়ে যায়। এসব দেখে একজন দর্শক ভট্টশালীকে বললেন, ছাপ তোলায় সময় নষ্ট না করে, ভট্টশালী তো নিজেই খোদ মূর্তিটি তুলে নিয়ে যেতে পারেন। কথা প্রসঙ্গে সেই ব্যক্তি আরো জানাল যে, গত বত্সর ‘দত্তের পুত বৈখণ্ড’ এসে লিপিটির ছাপ নিয়ে গেছে। ‘দত্তের পুত বৈখণ্ড’ শুনে নলিনীকান্ত হাতে আকাশ পেলেন। এই বৈখণ্ড যে তারই বন্ধু বৈকুণ্ঠ দত্ত— যিনি এই মূর্তিটির খবর পত্রযোগে পাঠিয়েছিলেন এবং যার ভরসায় তার কুমিল্লায় আগমন— এতে নলিনীকান্তর আর কোনো সন্দেহ রইল না। জিজ্ঞাসা করে জানলেন যে বৈখণ্ডের বাড়ি প্রায় তিন মাইল দূরে বড় রাস্তার ধারে। মূর্তিখানা সেই জায়গায় পর্যন্ত বয়ে দিয়ে আসতে পারে কিনা, জিজ্ঞাসা করলে অনেক ওজর-আপত্তির পর অনেক মজুরি কবুল করায় দুজন চাষী এই কাজে রাজি হলেন। নলিনীকান্ত তাদের দু’আনা বায়না দিয়ে ‘দত্তের পুত বৈখণ্ডের’ বাড়ি অভিমুখে পা বাড়ালেন।

‘বেলা প্রায় একটা বাজিয়াছিল, তখন পর্যন্ত জলবিন্দুও মুখে পড়ে নাই। সম্মুখে কর্ষিত এবং কর্তিত ধানের মাঠ, প্রখর সূর্য্য কিরণে তাতিয়া ভীষণ মরুভূমির মত ক্ষেত্র দেখাইতেছে। তাহার মধ্য দিয়া আমি একাকী অপরিচিত দেশে বৈকুণ্ঠ দত্তের বাড়ি খুঁজিয়া বাহির করিতে চলিয়াছি।’

অনেক ঘুরে, অনেক জিজ্ঞাসা করে বৈকুণ্ঠ দত্তের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে নলিনীকান্ত জানতে পারলেন যে বাড়িতে তিনি পৌঁছেছেন, সে বাড়ি গৃহস্বামীর নাম বৈকুণ্ঠ দত্ত হলেও তিনি তার বন্ধু বৈকুণ্ঠ বাবু নন। আবার এক নতুন বিপত্তি এসে দাঁড়াল। তবে গৃহস্বামী তাকে দ্রুত আশ্বস্ত করে বললেন, তিনি যাকে খুঁজছেন, তিনিও এই গৃহস্বামীর বিশেষ বন্ধু। গত বছর লিপির ছাপ তোলার জন্য তিনি ও বৈকুণ্ঠ বাবু একত্রে ভারেল্লা বাজারে গিয়েছিলেন। এবং তখনই নলিনীকান্ত ভট্টশালীর কথা শুনেছিলেন তিনি। নলিনীকান্তর বন্ধু বৈকুণ্ঠ দত্তের বাড়ি বড় কামতার রাস্তার ধারে ফেলে এসেছেন ভট্টশালী। এর পর নলিনীকান্ত এই নবপরিচিত বৈকুণ্ঠ দত্তের বাড়ির আতিথেয়তায় খুশি হয়ে পথশ্রম দূর করেছিলেন।

সেই মূর্তিবাহক চাষী দুজনের ১ ঘণ্টার মধ্যে এসে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু সন্ধে হয় হয়, অথচ তাদের দেখা নেই। সুতরাং ভট্টশালী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন, হতাশ হয়ে ভাবলেন এরা বোধহয় ফাঁকি দিয়ে কেটে পড়েছে। ঠিক হলো মাইলখানেক দূরে ময়নামতির পশ্চিমে যে বেহারাদের আড্ডা ছিল, সেখানে গিয়ে মুটে ঠিক করা যাবে। সঙ্গে সঙ্গে ময়নামতিও দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু ময়নামতিতে হাজির হয়ে বেহারাদের কাছে মূর্তি আনার প্রস্তাব করামাত্র তারা বলে উঠল, এ শিবের মূর্তি, এক টাকা দিলেও স্পর্শ করবে না তারা। কোনো এক সাহা নাকি মূর্তিগুলো তুলে গোমতী নদীতে ফেলে দেয়ার জন্য তাদের ৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি ছিল, তাতেও তারা রাজি হয়নি।

নলিনীকান্ত তাদের এই শেষ অসম্মতি অর্থাত্ গোমতী নদীতে মূর্তিগুলো ফেলে দিতে রাজি না হওয়ায় অনেক ধন্যবাদ দিয়ে হতাশ চিত্তে ফিরে এলেন। রাত্রি প্রায় সাড়ে ৮টা— এমন সময় সেই চাষী দুজন মূর্তি নিয়ে উপস্থিত হলো। পরদিন সকাল ৯টায় তিনি গরুর গাড়িতে মূর্তিটি নিয়ে কুমিল্লা রেলস্টেশনে পৌঁছালে ধূলিমাখা দেহে লোকচক্ষুর সমুখে গো-শকটে চেপে কুমিল্লার রাস্তায় তিনি দর্শনীয় বস্তু হতে চাননি। তাই গাড়োয়ানকে কুমিল্লা শহরের বাসার ঠিকানা দিয়ে মূর্তিসহ বাসায় চলে আসতে বলে তিনি হেঁটে বাসায় হাজির হলেন। বাসায় ফিরে স্নান-বিশ্রাম নিলেন, কিন্তু গাড়োয়ানের দেখা নেই। গাড়ির জন্য লোক পাঠালেন, পরে নিজেও বের হলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল গাড়োয়ান বাসার ঠিকানা ও নলিনীকান্তর পরিচয় সব ভুলে হতবুদ্ধি হয়ে স্থানীয় কলেজ হোস্টেলের কাছে গাড়ি থামিয়ে ছিলেন। হোস্টেলের ছেলেরা গাড়িতে চড়াও হয়ে মূর্তি নামিয়ে ফেলে এবং দাবি করে যে মূর্তি তারাই রেখে দেবে। ‘ইস্কুইল্যা বাবু’দের এহেন কাণ্ড দেখে গাড়োয়ানের অবশিষ্ট বুদ্ধিটুকুও লোপ পায় এবং সে নিশ্চেষ্ট হয়ে তাদের কার্যকলাপ দেখতে থাকে। এ অবস্থায় নলিনীকান্তর পাঠানো লোক গিয়ে ইস্কুইল্যা বাবুদের হাত থেকে মূর্তিসহ বেচারাকে উদ্ধার করে আনে।

এত ঝড়ঝাপ্টার পর মূর্তি বাসায় পৌঁছালে দলে দলে স্কুল-কলেজের ছেলে ও শহরের ভদ্রলোকেরা মূর্তি দেখতে আসতে লাগলেন। রাত্রি প্রায় ১০টা পর্যন্ত অনবরত তাকে মূর্তির পাদপীঠে কি লেখা আছে, তা ব্যাখ্যা করে শোনাতে হয়েছিল। অবশ্য এই উপলক্ষে অনেকের কাছ থেকে আরো বিগ্রহের অনুসন্ধান পেয়েছিলেন তিনি।

পরদিন ভোরে শহর থেকে আবার ঘোড়ার গাড়িতে রওনা হয়ে বন্ধুবর বৈকুণ্ঠ বাবুর বাড়িতে পৌঁছেছিলেন নলিনীকান্ত। এবার আর কোনো ভুল হয়নি। প্রবন্ধের উপসংহারে নলিনীকান্ত লিখেছেন—

“অবশেষে মূর্তিখানা পাইলাম, এবং বৈকুণ্ঠ বাবুরও খোঁজ পাইলাম, এই আনন্দে পথশ্রম, ক্ষুধা-তৃষ্ণা মোটেই বোধ হইতে ছিল না, প্রত্নানুসন্ধানের সুখ এইটুকুই।”

 

চার.

রক্ষণশীল বনেদি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হলেও জীবনযাত্রায় নলিনীকান্ত ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের মুক্তমনা মানুষ। তিনি ঢাকার প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ হাকিম হাবিবুর রহমান ও সৈয়দ তৈফুরের কাছে আরবি ও ফারসি ভাষা আয়ত্ত করে অনুবাদ করা শিখেছিলেন। এতে তিনি সুলতানি আমলের মুদ্রার লিপি পাঠের দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

১৩৪১ সালে ঢাকা থেকে হযরত শাহজালাল (র.) সম্পর্কিত তার প্রবন্ধটি বঙ্গে মুসলিম বিজয় নিয়ে একটি মূল্যবান গবেষণা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। এই প্রবন্ধে বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে হজরত শাহজালালের (র.) অবদানের ওপর বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় তার পাণ্ডিত্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি দায়বদ্ধতার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। এই প্রবন্ধে রাজা গৌর গোবিন্দের পরাজয়ের যথার্থ কারণ এবং রাজার পরাজয়ের ফলাফল গ্রহণযোগ্য যুক্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। তার এই ইতিহাস বোধ এবং অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের জন্য ঢাকা শহরের মুসলিম সমাজের বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় উত্সবে তিনি সাদরে আমন্ত্রিত হতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক অথবা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ফাতেহা-ইয়াজদহম অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে বিশেষ অতিথির ভাষণ দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত চল্লিশের দশকে ঢাকা শহর সাম্প্রদায়িকতার বিষে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল। সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো মুসলিম ছাত্রাবাসে অমুসলিম ব্যক্তিত্বের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হওয়াটা এক অসাধারণ ঘটনা।

উদার হূদয় নলিনীকান্তর অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি ঢাকার সমাজ জীবনে এতই সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছিল যে, তিনি কোন ধর্মের অনুসারী, সেদিন তা নিয়ে কেউ বাছ-বিচারে হাত দেয়নি।

১৯২৯ সালে ঢাকা জাদুঘরের উদ্যোগে প্রকাশিত তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘আইকনোগ্রাফি অব বুড্ডিস্ট অ্যান্ড ব্রাহমনিকাল স্কাল্পচার ইন দি ঢাকা মিউজিয়াম’ আজো একটি অমূল্য আকর গ্রন্থ হিসেবে সারা বিশ্বে সমাদৃত। তত্কালীন ঢাকা জাদুঘরে সংগৃহীত হয়নি, এমন অনেক ভাস্কর্যের বিবরণ এই বইয়ে রয়েছে।

এই বইয়ে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের নানা ভাস্কর্যের ইতিহাস, মূর্তিপূজার প্রচলনের ইতিবৃত্ত, নারী ও পুরুষ ভাস্কর্যের অবয়বের বিবরণী, ভাস্কর্যের পার্থক্যকরণের তুলনামূলক আলোচনা রয়েছে। এছাড়া কোন কাল পর্যায়ে কোন ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে এবং কোন প্রেক্ষাপটে এর আবির্ভাব ইত্যাদি বিবরণ সহজবোধ্য কিন্তু পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং প্রাঞ্জল ভাষায় লিখে গেছেন। অনাবিষ্কৃত একটি তাম্র শাসনের লিপির পাঠোদ্ধার করে তিনি এ পর্যন্ত অজানা খাদগ চন্দ্র বর্মন এবং দেব রাজাদের শাসনকাল সম্পর্কে নতুন তথ্য উপস্থাপন করেন, যা পূর্ব বাংলার মধ্যযুগের শাসনতান্ত্রিক ধারার একটি বৈজ্ঞানিক ক্রমবিবরণী নির্মাণে ব্যাপক সহায়তা করেছিল। তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে বলা হয় তিনি একাদশ শতাব্দীতে রচিত ‘অষ্টসহসি কা প্রাজ্ঞ পারমিতা’ নামে চিত্রিত পাণ্ডুলিপি থেকে কুমিল্লা-লালমাই অঞ্চলে ‘পট্টিকেরা’ নামে একটি বৌদ্ধ শাসিত রাজ্যের অস্তিত্ব তুলে ধরেন।

ভট্টশালী তাম্রলিপি ও শিলালিপির পাঠোদ্ধারে অভূতপূর্ব সুনাম অর্জন করেছিলেন। তিনি যেসব তাম্রশাসন ও শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো বেলাব, ঘুঘরাহাটি, নিদানীপুর, শ্রীচন্দ্রদেবের তাম্রশাসন, ভাওয়াল তাম্রশাসন এবং নালন্দা ও রাজা গোবিন্দচন্দ্রের শিলালিপি— ১৯২০ সালে ঢাকা রিভিউ ও এপিগ্রাফিকা ইন্ডিকা পত্রিকায় নলিনীকান্তর সমাচার দেবের ঘুঘরাহাটি (ঘুঘরাহাট্যি) তাম্রশাসনটি উত্থাপিত হলে পণ্ডিত মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’-এ কী লিখেছেন, পড়া যাক—

“তাম্রশাসনখানি ফরিদপুর জেলার খাগরাহাটি গ্রামে আবিষ্কৃত হইয়াছিল এবং উহা এখন ঢাকার চিত্রশালায় রক্ষিত আছে। ইহা হইতে জানিতে পারা যায় যে, মহারাজাধিরাজ শ্রীসমাচারদেবের রাজ্যকালে নব্যবকাশিকায় অন্তরঙ্গ উপরিক শ্রীজীবদত্ত শাসনকর্তা ছিলেন এবং তত্কর্তৃক নিযুক্ত বিষয়পতি পবিক্রক বারকমণ্ডলের শাসনকর্তা ছিলেন। এই সময়ে সুপ্রতীকস্বামী নামক একব্যক্তি জ্যেষ্ঠাধিকরণিক দামুক প্রমুখ বিষয়মহত্তরগণের নিকট একখণ্ড ভূমি ক্রয় করিবার জন্য আবেদন করিয়াছিল এবং তদনুসারে তিন কুল্যবাপ পরিমাণ ভূমি তাহাকে বিক্রীত হইয়াছিল। এই তাম্রলিপির উদ্ধৃত পাঠ বহুবার প্রকাশিত হইয়াছে তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত পার্জিটার (চধত্মরঃবত্) ও শ্রীযুক্ত নলিনীকান্ত ভট্টশালীর পাঠ অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য।”

 

প্রাচীন পুঁথি সম্পর্কে তার অবদান বিস্ময়কর। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, ঢাকা জাদুঘরের জন্য তালপাতার এক তুলট কাগজে লেখা বেশকিছু দুর্লভ পুঁথি সংগ্রহ করেছিলেন। কেবল পুঁথি সংগ্রহ করাই তার একমাত্র কৃতিত্ব নয়, তিনি বেশকিছু পুঁথির পাঠোদ্ধার করে সম্পাদনার কাজও করেছিলেন। তার সম্পাদিত পুঁথির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ময়নামতির গান, মীনচেতন ও গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস’। তার নিজের একটি লেখা দেখে জানা যায়, তিনি কবি রবীন্দ্রনাথকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত মীনচেতন গ্রন্থের একটি কপি উপহার হিসেবে পাঠান। রবীন্দ্রনাথ বইটি পড়ে ১৩২৪ বঙ্গাব্দের ২রা জ্যৈষ্ঠ তারিখে নলিনীকান্তকে যে চিঠি পাঠান, তা এখানে উদ্ধৃত করা হলো:

‘বিনয় সম্ভাষণপূর্বক নিবেদন— মীনচেতন বইখানি পাইয়া উপকৃত হইলাম। বাঙ্গলা ভাষার শব্দতত্ত্ব আলোচনায় আমার স্বাভাবিক উত্সুক্য আছে। সেই কারণে এ বইখানি আমার কাছে বিশেষ মূল্যবান। এরূপ আবিষ্কার ও প্রচার করিয়া ঢাকা সাহিত্য পরিষত্ গৌরব লাভ করিতেছেন এবং এই উদ্যোগে আপনি যে কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন, সে জন্য স্বদেশের হইয়া আমি আপনার নিকট কৃতজ্ঞতা নিবেদন করিলাম।

ইতি ২রা জ্যৈষ্ঠ ১৩২৪ ভবদীয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ (সৌজন্যে সাইফুদ্দিন চৌধুরী)

 

সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ নলিনীকান্তের কৈশরকাল থেকে। সৃজনশীল সাহিত্য বিষয়ে প্রথম গ্রন্থ ‘হাসি ও অশ্রু’ প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে ঢাকা থেকে। এতে ১১টি গল্পে হাসি ও আনন্দ ও বেদনার কাহিনী ছিল। গ্রন্থখানি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল বলেই ভারতের বেশকটি প্রাদেশিক ভাষায় এটি অনূদিত হয়। গল্পগুলো পড়ে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. রাইনথার্জ ভাগনার বইটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। তবে সাহিত্য জগতে তার দক্ষতা বেশি দেখা যায় প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে। কেবল সাহিত্যমূলক প্রবন্ধই নয় তার ভাষার প্রাঞ্জলতার দরুন তার লেখা ইতিহাস, শিল্পকলা ইত্যাদির মতো জটিল ও গভীর বিষয় সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে উঠেছে।

নলিনীকান্ত প্রবল আত্মসম্মানজ্ঞানবিশিষ্ট মানুষ ছিলেন। আত্মসম্মানে একটু আঘাত লাগলে তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গ ত্যাগ করতে দ্বিধা করতেন না। নিজের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য অনেক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত পদ ছেড়ে চলে এসেছেন। বাংলার ইতিহাস রচনার পরিকল্পনায় দ্বিতীয় খণ্ডের সম্পাদক নিযুক্ত না করায় তিনি ১৯৩৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই পরিকল্পনার সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন।

নলিনীকান্তের কিছু কিছু রচনা সমসময়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সাহেব ঢাকার ‘প্রতিভা’ পত্রিকা মারফত নলিনীকান্ত সম্পাদিত ‘ময়নামতির গান’ এবং ‘মীনচেতন’ পুঁথির কয়েকটি ভ্রম ও ত্রুটি দেখিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। তার মত ‘ভট্টশালী প্রদত্ত পাঠ অনেক স্থলেই ঠিক নহে।’ তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলি সম্পর্কে আরো অনেকে বিতর্কের অবতারণা করেছেন। এছাড়া তার সম্পাদিত তাম্রশাসনের পাঠ নিয়েও বিতর্কের জন্ম হয়। তবে নলিনীকান্ত তার মতামত সম্পর্কিত সৃষ্ট বিতর্কের অনেকবারই যুক্তিসহ জবাব দিয়েছেন।

সারা জীবন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিষ্ঠাসহ অধ্যবসায়ের জন্য তিনি যে অবদান আমাদের ঐতিহ্যচর্চার ইতিহাসে রেখে গেছেন, তা আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য গৌরবের বিষয় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নলিনীকান্ত ভট্টশালীর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করে। সেই অনুষ্ঠানে জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক ড. এনামুল হক ভট্টাশালীর সারা জীবনের সাধনার যে মূল্যায়ন করেছেন, তার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ বাংলার ইতিহাসচর্চায় ভট্টশালীর বিশাল অবদানকে বুঝতে সহায়ক হবে। ড. হক তার স্বাগত ভাষণে যা বলেছিলেন, তা আজো প্রাসঙ্গিক এবং প্রণিধানযোগ্য।

‘বাংলাদেশের বিশিষ্ট কৃতীসন্তান ঢাকা জাদুঘরের প্রথম ৩৩ বছরের অধ্যক্ষ নলিনীকান্ত ভট্টশালী জাদুঘরের সংগঠক, প্রত্নতত্ত্ববিদ, সাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক, পাণ্ডুলিপিবিশারদ ও সর্বভারতের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ছিলেন। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এবং তার সামাজিক সাংস্কৃতিক ও লিপিকলা, কৃষ্টি, মুদ্রা ও শিলালেখ ইতিহাস রচনায় অসাধারণ কৃতিত্ব গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণীয়। একজন ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক উদার প্রগতিশীল মনমানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। বাংলাদেশের জাদুঘর আন্দোলন ও পুরাতাত্ত্বিক সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তিনি অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে গেছেন, যা জাতি আজ কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করে।’

নলিনীকান্তের সেই নিমতলী জাদুঘর তার যোগ্য উত্তরসূরি সাবেক মহাপরিচালক ড. এনামুল হকের পরিশ্রম ও সংগঠন দক্ষতায় এখন তৃতীয় বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘর।

 

তথ্যসূত্র:

১। পুরাবৃত্ত ১, প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহশালা অধিকার পশ্চিমবঙ্গ সরকার, কলকাতা

২। নলিনীকান্ত ভট্টশালী কোমেমোরেটিভ ভল্যুম, সম্পাদক এবিএম হাবিবুল্লা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৬

৩। নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৮৮৯-১৯৪৭, সাইফুদ্দিন চৌধুরী, বাংলা একাডেমি

৪। ইতিহাসের মানুষ নলিনীকান্ত ভট্টশালী— মো. সিরাজুল ইসলাম