ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে Sufi Kathak Foundation আয়োজিত Understanding Qawwali শীর্ষক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজিউদ্দিন আকিল Hazrat Nizamuddin Auliya’s Defence of Sama and Qawwali at Sultan Ghiyasuddin Tughluq’s Court শিরোনামে বক্তৃতা করেছেন। অপ্রকাশিত এ বক্তৃতার সংক্ষেপিত ভাষান্তর এখানে প্রকাশিত হলো। লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে ভাষান্তর করেছেন শানজিদ অর্ণব। অনুবাদটি সম্পাদনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক স্বাধীন সেন

সংগীত ও নাচের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের ইতিহাস অনেকদিনের। যুগে যুগে শিল্পী ও সমঝদারদের মুখোমুখি হতে হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গণনৈতিকতার। কিন্তু এত এত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা শিল্পী কিংবা শিল্পের কোনো রূপকে চিরকাল দমিয়ে রাখতে পারেননি। এখানে আমি আলোচনা করব দিল্লির অন্যতম প্রভাবশালী সুফি হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া কাওয়ালি নিয়ে তার আগ্রহের জন্য যে বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন তা নিয়ে। তাকে হয়রানি করার পেছনে নিশ্চয়ই আরো কিছু রাজনৈতিক বিষয়াদি ছিল, কিন্তু তাকে তুঘলক সুলতানের বৈচারিক তদন্তের মুখে পড়তে হয়েছিল সংগীত নিয়ে। সুফি-সংগীত, সামা ও কাওয়ালি নিয়ে তার আগ্রহকে শরিয়াহ বা সুন্নি-হানাফি মাজহাবের ইসলামী আইনি কাঠামোর আলোকে বৈধ দেখানোর জন্য উপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল। নিজামুদ্দিনের যুক্তি জনপ্রিয় ও ভক্তিমূলক শৈল্পিক মাধ্যম হিসেবে সুফি সংগীতকে বৈধতা দিয়েছিল, যদিও অনেকে চিরকালই এ সংগীতের বিরোধিতা করে যাবেন। ইতিহাস থেকেও বলা যায়, মুসলিম সমাজে সংগীত বৈচিত্র্য ও উত্কর্ষে একটি প্রতিষ্ঠিত শিল্পচর্চা।

আমি সুলতানের দরবারে কী ঘটেছিল তার সঙ্গে বিষয়গুলোকে সম্পর্কিত করব। বৈচারিক অনুসন্ধানের জবাব দিতে নিজামুদ্দিনকে হাজির হতে হয়েছিল সুলতানের দরবারে। তিনি দোয়ার জন্য তার মায়ের সমাধিতে যেতে পারতেন, পাঞ্জাবে তার গুরু বাবা ফরিদের মাজারে যেতে পারতেন নিরাপদে থাকার জন্য। তিনি এর আগে আরো শক্তিশালী সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিকে দেখেছিলেন। ক্ষমতাধর শাসকের চাপে তিনি দিল্লি ছাড়ার মানুষ ছিলেন না। নিজামুদ্দিন দিল্লিতেই থাকলেন তার যুক্তি তুলে ধরতে। জবরদস্তি করে তাকে দরবারে বিচারের মুখোমুখি করা নিয়ে শহরের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতার সুরা পান করা স্বৈরশাসকরা এসব কিছু পাত্তা দেন না। এ শাসকরা আসেন এবং একসময় চলে যান। তুঘলক সুলতানের কবর কোথায় তা নিয়ে কেউ আজ মাথা ঘামাতে যায় না। কিন্তু নিজামুদ্দিন শহরের অভিভাবক সন্ত হয়ে আছেন।

কাওয়ালি এবং বিভিন্ন ধরনের গান ও নাচ বেশির ভাগ ভক্তিমূলক ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্রীয় বিষয়। চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দিল্লির প্রধান চিশতি সুফি নিজামুদ্দিন আউলিয়াকে শহরের ওলামাদের সঙ্গে বিতর্ক করতে হয়েছিল সংগীতের বৈধতা নিয়ে। হানাফি ধারার ধর্মতাত্ত্বিকদের বিবেচনায় সংগীত হারাম চর্চা। অন্যদিকে বেশির ভাগ সুফির মতে, সংগীত হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ ও ফানা অর্জনের কার্যকর ও বৈধ উপায়।

চিশতি সুফিদের অনেক ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অনুশীলন নিয়ে তাদের বিরোধীরা প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু সেসব পাশে রেখে কেবল তাদের সংগীতচর্চা (সামা বা কাওয়ালি) দিল্লি সালতানাতের ওলামাদের সঙ্গে চিশতি সুফিদের বড় উত্তেজনার জন্ম দিয়েছিল। চিশতিদের কাছে সংগীত ছিল আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম। অন্যদিকে হানাফি ওলামারা সুফি আধ্যাত্মিকতার চর্চা হিসেবে গান ও নাচকে হারাম বলে নিন্দা করেছেন।

চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আমির খুর্দ রচিত সিয়ার-উল-আউলিয়ার একটি অধ্যায় রচিত হয়েছে সামা বিষয়ে। বিশেষত এতে আছে সংগীতের সমর্থনে নিজামুদ্দিনের যুক্তি ও তার অভিশাপ। সুফি ঘরানার মানুষের বিশ্বাস, এ অভিশাপেই নিজামুদ্দিনকে হেনস্তাকারীরা ও দিল্লি শহর ধ্বংস হয়েছিল। একই সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে নিজামুদ্দিনের বাণীর সংকলন ফাওয়াদ-উল-ফুয়াদের পাতায় ছড়িয়ে থাকা তার বিভিন্ন মন্তব্য। এ গ্রন্থ চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সংকলন করেছিলেন আমির হাসান সিজঝি। এছাড়া ভালো সংগীত ও অশ্লীল সংগীতের মধ্যে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক টেক্সটে পার্থক্য টানা হয়েছে। এ বিষয়টিও যাচাই করা হবে একাদশ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ ইন্দো-পার্সিয়ান ক্ল্যাসিক আলি হুজায়রির কাশফ-উল-মাহজুব থেকে। নিজামুদ্দিন নিজেও তার যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের সময় এ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

সিয়ার-উল-আউলিয়ার লেখক আমির খুর্দের মতে, নিজামুদ্দিন চার ধরনের সংগীতচর্চাকে চিহ্নিত করেছিলেন: হালাল, হারাম, মাকরুহ ও মুবাহ। গায়ক যদি ঐশ্বরিক ভাবের প্রতি আকৃষ্ট হন তাহলে তার সামার অনুশীলন মুবাহ। তিনি যদি মাজাজের (দুনিয়াদারির আকর্ষণ) প্রতি বেশি আকৃষ্ট থাকেন তাহলে সেটা মাকরুহ। তিনি যদি পুরোপুরি মাজাজে নিমগ্ন হন তাহলে এটা হারাম। আর যদি তিনি পুরোপুরি ঈশ্বরে সমর্পিত হন তাহলে সামা তার জন্য হালাল। গায়ককে (সাহিব-ই-সামা) এ পার্থক্যগুলো বুঝতে হবে।

আমির খুর্দ আরো জানিয়েছেন, নিজামুদ্দিনের (ফাওয়াদ-উল-ফুয়াদ) মতে, গায়ক হতে হবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ; কোনো বালক বা নারী নয়। শ্রোতাদের হূদয়ে আল্লাহ প্রেমে পূর্ণ থাকতে হবে। গানের কথা অশ্লীল হতে পারবে না। সামা মজলিশে চাঙ কিংবা রাবাবের মতো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

নিজামুদ্দিন বলেছিলেন, ঈশ্বর প্রেম-স্মরণে মশগুল ব্যক্তির নাচ মুস্তাহাব বা বৈধ। কিন্তু যদি তা ইন্দ্রিয় সুখের সঙ্গে জড়িত হয় তাহলে হারাম। পরম ভাবে দুনিয়াদারি ভুলে কেউ যদি সামা মাহফিলে নিজের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে তাহলে সেটা তার মশগুল অবস্থার কারণে ঘটে এবং এজন্য তাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। কিন্তু কেউ যদি সে রকম মানসিক অবস্থায় না গিয়ে নিজের আধ্যাত্মিক ভাবের দেখনদারির জন্য এ রকম করে তাহলে তা হারাম।  নিজাম একবার দেখলেন অনেক সুফির মতো আমির খুসরো নাচের সময় হাত আকাশের দিকে তুলে ধরেছেন।  এটা দেখে তিনি খুসরোকে এমনটা আর কখনো করতে বারণ করেন, কারণ তার মতে এর মাধ্যমে খুসরো দুনিয়াদারির ভাবনায় আকৃষ্ট হচ্ছিলেন। এর পর থেকে খুসরো হাত মাটির দিকে মুষ্টিবদ্ধ রেখে নাচতেন যেন তার হাত বাঁধা।

গুরু ফরিদুদ্দিনের যেমন সংগীতের প্রতি ভালোবাসা ছিল, তেমনি নিজামুদ্দিনের সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা দিল্লিতে চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল। কাজী হামিদুদ্দিন নাগৌরি ছিলেন একজন সুরবর্দী সুফি এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে দিল্লির চিশতি ঘরানায় তার যাতায়াত ছিল। আরেকজন ছিলেন নিজামুদ্দিনের শিক্ষক শেখ ফরিদুদ্দিন গাঞ্জে শাকর। ওলামারা ফতোয়া, ধর্মীয় নির্দেশনা জারি করেও তাদের মেহফিল-ই-সামা আয়োজন থেকে বিরত রাখতে পারেননি। খিলজি সুলতান আলাউদ্দিন ও কুতুবুদ্দিন মুবারক শাহর আমলে এ ওলামারা নিজামুদ্দিনকে সংগীত শ্রবণ থেকে বিরত রাখতে পারেননি। তবে তারা নিজামুদ্দিনকে সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের দরবারে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন, বাধ্য করেছিলেন দরবারের সামনে নিজের সংগীতপ্রীতির সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করতে। আমির খুর্দের মতে, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ ও চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর ভাগে দিল্লি সালতানাতে সমাজের নানা স্তরের মানুষের মধ্যে নিজামুদ্দিনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ওলামা সমাজকে ঈর্ষান্বিত ও ভীত করে তোলে। নিজামুদ্দিন মুসলমানদের মধ্যে ধর্মানুরাগ বাড়াতে নতুন এক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। ফলে মুসলমানদের মধ্যে নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালনের আগ্রহ বেড়েছিল। একই সঙ্গে তিনি তার ভক্তদের হূদয়ে ঈশ্বর প্রেমের আলো জ্বালিয়েছিলেন।

গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের সালতানাতের নায়েব হাকিম ছিলেন কাজি জালালুদ্দিন লাওয়ানজি। তিনি নিজামুদ্দিনের ভক্তিবাদী ধারণার বিরোধী ছিলেন। তিনি নিজামুদ্দিনের এক অসন্তুষ্ট শিষ্য শেখজাদা হুসামুদ্দিনকে উৎসাহ জোগান গুরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তৈরির। উল্লেখ্য, সুলতানের দরবারে শেখজাদার যাতায়াত ছিল। অবশেষে সুলতানের কাছে অভিযোগ জানানো হয়, নগরের অন্যতম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নিজামুদ্দিন সংগীতে মগ্ন থাকেন, যা ইমাম আবু হানিফা প্রতিষ্ঠিত হানাফি মাজহাবে হারাম কাজ। সালতানাতের ওলামারা ছিলেন হানাফি মাজহাবের অনুসারী। সুলতানের কাছে তারা বলেছিলেন, নিজামুদ্দিনকে অনুসরণ করে হাজারো মানুষ হারাম সংগীতের প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে। আমির খুর্দ জানাচ্ছেন, হারাম বা হালাল সংগীত নিয়ে সুলতান গিয়াসুদ্দিনের কোনো ধারণা ছিল না। তাই তিনি এটা শুনে খুব অবাক হয়েছিলেন, কী করে একজন শীর্ষ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব অনৈসলামিক চর্চায় নিযুক্ত হলেন। সুলতান গিয়াসুদ্দিনকে নিজেদের পক্ষ নিতে নিজামুদ্দিনের বিরোধীরা শরিয়তে সংগীত বিষয়ে থাকা কথাবার্তা এক জায়গায় জড়ো করেন। কাজি হামিদুদ্দিন নাগৌরির বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করতেও এগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল। যা হোক, এসব দলিল সুলতানের সামনে হাজির করা হলো। সুলতান নিজেও নিজামুদ্দিনের জনপ্রিয়তা ও আচরণে অস্বস্তিতে ছিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, ধর্মীয় পণ্ডিতরা যদি সামাকে অবৈধ ঘোষণা করেন তাহলে শেখ ও শহরের অন্য বড় ওলামাদের মুখোমুখি বসিয়ে বিতর্কের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন এ বিষয়ে সত্যাসত্য নির্ণয় করা যায়। বিষয়টি সুলতানের দরবারে কর্মরত নিজামুদ্দিনের ভক্তরা তাদের পীরকে জানিয়ে দিলেন। কিন্তু এ নিয়ে নিজাম কোনো উদ্বেগ দেখাননি। সেকালের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আলেম নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ফখরুদ্দিন জারাদি ও মাওলানা ওয়াজিহুদ্দিন। তারা ধর্মীয় দলিলাদি খুঁজে খুঁজে সামার বৈধতার বিষয়ে যুক্তি খুঁজে একত্র করতে শুরু করলেন।

নির্দিষ্ট দিনে নিজামুদ্দিন দরবারে হাজির হলেন। নায়েব হাকিম কাজি জালালুদ্দিনের চেয়ে অধিক সম্মানিত ছিলেন মাওলানা ফখরুদ্দিন জারাদি। দরবারে নিজামের সঙ্গী হয়েছিলেন এই ফখরুদ্দিন ও মাওলানা মুহিউদ্দিন কাশানি। তিনিও ছিলেন তখনকার একজন খ্যাতনামা পণ্ডিত। শুরুতেই কাজি জালালুদ্দিন নিজামকে উদ্দেশ করে বললেন, তাকে নিজের জীবনাচরণ সংশোধন করতে হবে, নয়তো সংগীত আসর বসানো অব্যাহত রাখলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। আমির খুর্দ লিখেছেন, নিজামুদ্দিন সব অভিযোগ নীরবে শুনলেন। এমনকি অভিযোগকারীর ভাষা যথেষ্ট বিনয়ী না হওয়া সত্ত্বেও। কিন্তু যখনই জালালুদ্দিন শাস্তির হুমকি দিলেন অমনি শেখ ক্ষিপ্ত হলেন এবং অভিশাপ দিতে শুরু করলেন। তিনি জালালুদ্দিনকে অভিশাপ দিলেন, তার পদ যাবে শিগগিরই এবং তারপর তার মৃত্যু হবে। র্যাশনাল বলি আর ঐতিহাসিক বিবরণী—জালালুদ্দিন সত্যিই তার পদ হারিয়েছিলেন এবং সে বাহাসের কিছুদিন পরই তার মৃত্যু হয়েছিল।

আবার ফিরে যাই আমির খুর্দর প্রতিবেদনে। বিতর্ক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল নগরের শীর্ষ ওলামা ও অভিজাতদের উপস্থিতিতে। কাজি জালালুদ্দিন নীরব হয়ে গেলে মঞ্চে হাজির হলেন শেখজাদা হুসামুদ্দিন। শেখজাদা তার একদা গুরুকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি সামা মেহফিল আয়োজন করেন কিনা এবং তাতে অংশগ্রহণকারীরা নাচ, ক্রন্দন ও স্লোগান দেয়ায় লিপ্ত হন কিনা। নিজাম তার প্রাক্তন শিষ্যকে পরামর্শ দিলেন অতিরিক্ত উৎসহী না হতে এবং অপ্রয়োজনীয় কথা না বলে সামা নিয়ে তার ধারণা ব্যাখ্যা করতে। সামার ব্যাখ্যা দিতে নিজামুদ্দিনের এ দাবি তার প্রতিপক্ষের তাত্ত্বিক পাটাতনের শক্তিকে পরীক্ষার মুখে ফেলে দিল। কিন্তু হুসামুদ্দিন সংগীতের বৈধতার বিরুদ্ধে কোনো গভীর যুক্তিযুক্ত তর্ক উত্থাপন না করে বাকোয়াজে সময় পার করতে লাগলেন এবং বললেন যে তিনি সামার অর্থ জানেন না। তবে এটা জানেন যে অনেক বড় বড় ওলামা একে হারাম বলেছেন। নিজামুদ্দিন জবাব দিলেন, যদি হুসামুদ্দিন সামার অর্থ না জানেন তাহলে তিনি এ বিতর্কে অংশ নেয়ার যোগ্য নন। এভাবে প্রধান অভিযোগকারীকে বাতিল করলেন নিজাম।

আমির খুর্দ লিখেছেন, গিয়াসুদ্দিন তুঘলক বেশ মনোযোগ দিয়ে শুরু থেকে বিতর্ক শুনছিলেন। তিনিও হুসামুদ্দিনের অতিকথনে বিরক্ত হয়ে তাকে চুপ করে শেখের বক্তব্য শোনার নির্দেশ দিলেন। উপস্থিত ওলামাদের মধ্যে মাওলানা হামিদুদ্দিন ও শাহাবুদ্দিন মুলতানি নীরবতা অবলম্বন করেন, নিজামুদ্দিন অসম্মানিত হন এমন কিছু তারা বলেননি। আমির খুর্দর বিবরণী মতে, হামিদুদ্দিন উল্টো বলেছেন, নিজামুদ্দিনের মজলিসের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিপক্ষরা যা বলছেন তা সত্য নয় এবং তিনি সেখানকার শেখ ও দরবেশসহ অন্যান্য অংশগ্রহণকারীকে কাছে থেকেই দেখেছেন। আলোচনার এক পর্যায়ে আরেকজন দাপ্তরিক আলেম কাজি কামালুদ্দিন ভিন্ন মত ছুড়ে দিলেন। বললেন, তিনি একটি দলিল দেখেছেন যেখানে ইমাম আবু হানিফাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে সামা হারাম। কিন্তু নিজামুদ্দিন স্পষ্ট ভাষায় জানালেন সামায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

এ রকম তর্ক-বিতর্ক চলার এক পর্যায়ে দরবারে উপস্থিত হলেন মাওলানা ইলমুদ্দিন। তিনি ছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুলতানের সুরবর্দী সুফি শিক্ষক বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার পৌত্র। সুলতান এবার ইলমুদ্দিনকে পণ্ডিত ও পরিব্রাজক আখ্যা দিয়ে তার কাছে সামা বিষয়ে মতামত জানতে চাইলেন। ইলমুদ্দিন জানালেন, এ বিষয়ে তিনি একটি আলোচনা লিখেছেন, যেখানে সংগীতের পক্ষে-বিপক্ষের বিভিন্ন যুক্তিগুলো একত্র করেছেন। তার সিদ্ধান্ত ছিল এমন—সামা অনুমোদিত (মুবাহ), যদি তা হূদয়সঞ্জাত হয়। কিন্তু যদি কেউ নফসকে সন্তুষ্ট করতে সংগীতচর্চায় লিপ্ত হয় তাহলে তা হারাম। এরপর সুলতান ইলমুদ্দিনকে আরো জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি যে বাগদাদ, দামাস্কাস ও রুম সফর করেছেন সেখানে সুফিদের সংগীত শুনতে দেখেছেন কিনা এবং এ কাজে তাদের কেউ বাধা দেয় কিনা। ইলমুদ্দিন জানালেন, হ্যাঁ, তিনি এসব শহরে সুফিদের সংগীত শ্রবণ করতে দেখেছেন এবং গানের সঙ্গে কিছু বাদ্যযন্ত্র যেমন ডাফ ও শাবাবার ব্যবহারও সেখানে দেখা যায়। কিন্তু কেউ তাদের এ চর্চায় বাধা দেয় না এবং এটা তারা প্রাথমিক কালের সুফি শিক্ষক শেখ জুনায়েদ ও শিবলির আমল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। ইলমুদ্দিনের কথা শুনে সুলতান চুপ হয়ে গেলেন। কিন্তু এবার নায়েব হাকিম বলে উঠলেন, সুলতানের উচিত ইমাম আবু হানিফার মতামত আমলে নিয়ে সংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা। কিন্তু সুলতান শেষমেশ শেখ নিজামুদ্দিনের অনুরোধই শুনলেন এবং এ বিষয়ে কোনো আদেশ জারি করলেন না। তিক্ত বিতর্ক নিজামুদ্দিনের হাসিতেই শেষ হলো। এ বিতর্ক চলেছিল পুরো অর্ধবেলা—চাশত থেকে জোহরের নামাজ পর্যন্ত।

সুলতানের নিজামুদ্দিনের পক্ষ নেয়া এবং কোনো আদেশ জারি না করার বিষয়ে নিজামুদ্দিনের অনুরোধ মেনে নেয়ার উপরোক্ত যে বিবরণী আমির খুর্দর সৌজন্যে পাওয়া যায়, তা তৈরি হয়েছে ফখরুদ্দিন জারাদির প্রতিবেদন থেকে। এই ফখরুদ্দিন বিতর্কস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং বিতর্কের খুঁটিনাটি নিজে লিপিবদ্ধ করেন। আমির খুর্দ আরো জানিয়েছেন, আরেকটি অপেক্ষাকৃত কম নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুসারে, সুলতান আদেশ দিয়েছিলেন যে নিজামুদ্দিন তার সামার আয়োজন অব্যাহত রাখতে পারবেন এবং কেউ তাকে বাধা দিতে পারবেন না। কিন্তু কালান্দার ও হায়দারিদের মতো যারা বিনোদনের জন্য সংগীত শোনেন তাদের এ চর্চা বন্ধ করতে হবে। আরেকটি প্রতিবেদনমতে, শাফিই মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফি সামাকে কেবল ভক্তিসংগীত হিসেবে অনুমোদনই করেননি, সঙ্গে কিছু বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারও বৈধ ঘোষণা করেছেন।

জিয়াউদ্দিন বারানির হাসরাতনামা থেকেও রেফারেন্স দিয়েছেন আমির খুর্দ। জিয়াউদ্দিন বারানি ছিলেন আমির খুসরোর মতোই দরবারের কর্মকর্তা ও নিজামুদ্দিনের শিষ্য। যা হোক, বারানিকে উদ্ধৃত করে আমির খুর্দ জানিয়েছেন, জোহরের নামাজের সময় সুলতানের দরবার থেকে ফিরে নিজামুদ্দিন ডাকলেন মাওলানা মুহিউদ্দিন কাশানি ও আমির খুসরোকে এবং খুলে বললেন ওলামাদের বাজে আচরণ সম্পর্কে।

আমির খুর্দ উপসংহার টেনে বলেছেন, সেই বিতর্কে নিজামুদ্দিনের বিরোধীপক্ষের সব ওলামা চার বছরের মধ্যে দেওগিরিতে অভিবাসী হতে বাধ্য হন এবং বেশির ভাগ সেখানেই মারা যান। এমনটা ঘটেছিল পরবর্তী সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের আদেশে। এ তুঘলক নিজামুদ্দিনকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। শহরে দেখা দিয়েছিল দুর্ভিক্ষ ও মহামারী। নিজামের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল। তার বিভিন্ন চর্চা কেবল সুলতান নয়, ঐশ্বরিক নিদর্শনের অনুমোদন পেয়ে গিয়েছিল। দিল্লির বাইরে নিজের শিবিরে রহস্যময় মৃত্যু হয়েছিল সুলতান গিয়াসুদ্দিনের। এটা ঘটেছিল যখন তিনি শেখকে শহর ছাড়ার আদেশ দিয়েছিলেন এবং তখন নিজামুদ্দিন তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন, দিল্লি দূর অস্ত।

ঘটনাগুলোর নিখুঁত ঐতিহাসিক বিবরণী এবং সেগুলো নিজামুদ্দিনের অভিশাপ, না রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত—সেসব পাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, নিজামুদ্দিন তার আধ্যাত্মিক চর্চার জন্য বিরোধীদের নানা ধরনের আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন। ফাওয়াদ-উল-ফুয়াদ সংকলন করেছিলেন আমির হাসান সিজঝি, গিয়াসুদ্দিনের দরবারে সেই ঐতিহাসিক বিতর্ক চলাকালেই। ফাওয়াদে দেখা যায়, শেখ তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন কাউকে অভিশাপ না দিয়ে, নিতান্ত একজন বিচারকের ভাষায়। দলিলে আছে বিতর্কে উপস্থিত একজন জানাচ্ছেন যে সুলতান ঘোষণা করেন শেখ সংগীত শুনতে পারবেন এবং এটা তার জন্য হালাল। তখন নিজামুদ্দিন জবাব দিয়েছিলেন, কারো হুকুম জারি করার মাধ্যমে কোনো হালাল বিষয় হারাম হয়ে যায় না, উল্টোটাও হওয়া সম্ভব নয়। নিজামুদ্দিন যোগ করেন, সামা নিয়ে বর্তমান বিতর্কের মতো কোনো বিষয়ে যেখানে ইমাম শাফি সামাকে ডাফ ও চাঙের মতো বাদ্যযন্ত্রসহকারে পরিবেশনের অনুমোদন দিয়েছেন তা হানাফি মতে গ্রহণযোগ্য নয়—এ রকম ক্ষেত্রে শাসকের উচিত তার বিচক্ষণতা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া। গিয়াসুদ্দিন এক্ষেত্রে শাফিই মত গ্রহণ করেছেন। সুফিদের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক সত্ত্বেও তিনি নিজামুদ্দিনকে তার চর্চা অব্যাহত রাখার অনুমোদন দিয়েছেন।

সংগীতের বৈধতার পক্ষে সওয়াল করলেও নিজামুদ্দিন জোর দিয়ে বলেছেন, চাঙ ও রাবাবের মতো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হবে। যখন শোনা গেল কয়েকজন দরবেশ বাদ্যযন্ত্রসহাকারে পরিবেশিত সংগীতের সঙ্গে নেচেছেন তখন নিজামুদ্দিন বলেছিলেন এগুলো ঠিক নয়। নিজামুদ্দিনকে জানানো হয়, এ বিষয়ে দরবেশদের জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন, তারা ঈশ্বরের প্রেমে এমন মগ্ন ছিলেন যে বাদ্যযন্ত্রের বিষয়টা খেয়াল করতে পারেননি। নিজামুদ্দিন এ যুক্তি মানতে নারাজ ছিলেন। তার মতে এমন যুক্তি যেকোনো গুনাহ ঢাকতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সুফি সংগীতের পক্ষে নিজামুদ্দিনের ভূমিকা এবং তার প্রতিপক্ষকে হারানোর ঘটনা সুফিদের স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।

রাজিউদ্দিন আকিল: শিক্ষক, ইতিহাস বিভাগ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়