এ তাবৎকালের সবচেয়ে বিতর্কিত গ্রন্থ সম্ভবত দাস ক্যাপিটাল। রিকার্ডোর ‘প্রিন্সিপ্লস’-এর চেয়েও তীব্রতর ও পর্যাপ্ততর বিতর্কিত বিষয়গুণে দাস ক্যাপিটালের ওপর বর্ষিত নিন্দা এবং প্রশংসা দুইয়েরই ব্যাপ্তি অন্য যেকোনো গ্রন্থের থেকে বেশি। ধনবিজ্ঞানের অন্যান্য তত্ত্বের চেয়ে, প্রায়শই, এর তত্ত্ব ও সিদ্ধান্তের খণ্ডন-চেষ্টা লক্ষণীয় এবং ওই চেষ্টার বিরতি কোথাও কোথাও দেখা গেলেও— যেমন, তথাকথিত বিদ্বৎ সমাজের অবজ্ঞা— আধুনিক বিশ্বের অতি বিস্তীর্ণ এলাকায় পুঁজিবাদী সমাজের প্রামাণিক ব্যাখ্যা হিসেবে এর বহুমান্য স্বীকৃতি। এমনকি উনিশ শতকের শেষ দশকে একজন সমালোচকের ভাষ্যে কথিত: ‘এক বিস্তৃত পাঠকশ্রেণী এবং বিধ দুরূহ গ্রন্থে যাদের সঙ্গত মনোযোগের অভাব, তাদের কাছেও মার্কস পূজ্য’ (ব্যোয়ম-বাওয়ের্ক)। বস্তুগত ভাবাবেগ বাদ দিয়ে তার সমালোচনায় ব্রতী বিদ্বৎ সমাজে এমন সমালোচকও আছেন, যারা মার্কসের মেধার দান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেন। যেমন, জোসেফ শুমিপটার। তার ‘অর্থবিজ্ঞান বিশ্লেষণের ইতিহাস’ নামক বৃহৎ গ্রন্থে মার্কস সম্পর্কে উক্তি: ‘মার্কসকে যারা নজরে রেখেছেন তিনি বন্ধু হোন, শত্রু হোন, তার দৃষ্টির সামগ্রিকতায়, সামগ্রিকতা অর্থে প্রতিটি খণ্ডাংশজুড়ে যে ব্যাপ্তি সেই ব্যাপ্তির প্রতি, অনবদ্য মোহের তারা নিশ্চিত শিকার’ এবং আরেক স্থানে বলেছেন: ‘দাস কাপিটালের প্রথম খণ্ড প্রকাশকালে চিন্তার উত্কর্ষে কিংবা জ্ঞানের প্রাচুর্যে জার্মানিতে মার্কসের সমকক্ষ কেউ ছিল না।’ দুটো প্রত্যয় অশেষ বিতর্কের বিষয়— যেমন, উদ্বৃত্ত মূল্যজাত আয় কিংবা শোষণকৃত পরিণাম থেকে সম্পত্তির উদ্ভব, আর বৈপ্লবিক রূপান্তরের মাধ্যমে পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক পরিণতি সমাজতন্ত্রে। প্রথমটা বলা চলে অ্যাডাম স্মিথ কথিত মুনাফার অবরৌহিক তত্ত্বের (deduction theory) সম্প্রসারণ (যেখানে এটা ভ্রূণাকারে কথিত কিংবা কেউ কেউ বলতে পারেন ইঙ্গিতমাত্র প্রকাশিত) অথবা তথাকথিত রিকার্ডীয় সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে প্রচলিত ধারণাগুলোর আরো নিখুঁত ও রীতিবন্ধ প্রকাশ। শেষ প্রত্যয়টি মার্কসের ইতিহাস-দৃষ্টির প্রয়োগ-পরিণাম এবং তৎকালীন প্রচলিত আর্থিক প্রগতি সম্পর্কিত যে ধারণা তারই বিপরীত বিন্দুতে অবস্থিত ইতিহাসের চালকশক্তি হিসেবে শ্রেণীসংঘর্ষ সম্পর্কিত মার্কসীয় ধারণার বিকাশ, যা নাকি ‘নিশ্চল (আর্থিক) ব্যবস্থার’ (stationary state) অনুকূল বলে আশঙ্কিত এবং যার মধ্যে শ্রমিকশ্রেণীর ঐতিহাসিক ভূমিকার ছায়ামাত্র নেই। অবশ্য ধনতন্ত্রবাদের প্রত্যয়গুলোর কাছে এই ভূমিকা অপ্রত্যাশিত এবং এর উদ্ভাবনায় চিরাচরিত ধারণাগুলো যেমন আঘাত পায়, তেমনি রূপান্তর হতে চলেছে।
মার্কস যেমনভাবে ধনবিজ্ঞানকে দেখেছেন, তার বস্তুগত চৌহদ্দির যথোচিত উপলব্ধি থেকেই এসব প্রত্যয়ের অর্থ পরিষ্কার হবে। উনিশ শতকের শেষ চতুর্থাংশ থেকে সাম্প্রতিক অর্থনীতির ঝোঁক মোটামুটিভাবে বিনিময়-পদ্ধতির আলোচনায়, অর্থাৎ বিভিন্ন অনুমানসিদ্ধ অবস্থা-সাপেক্ষে বাজারের পর্যালোচনা কিংবা বাজারের স্থিতিশীলতা (market equilibrium) সম্পর্কে। সূত্র রচনায় ভ্রম-প্রমাদ এড়ানোর কারণে উপরোক্ত বিশ্লেষণ আপন পরিধি ও পরিসর ক্রমেই সংকুচিত করে এনেছে। উৎপাদনের শর্তাবলি সংকোচ করে উৎপাদনের বিচ্ছিন্ন কারণগুলোর (disembodied productive forces) প্রদত্ত জোগানের অনুমানে নামিয়ে আনা হয়েছে কিংবা প্রাযুক্তিক গুণাঙ্ক (technical coefficient) বা তথাকথিত উৎপাদন অপেক্ষক (production function)-এর সংকীর্ণ ধারণায় পৌঁছাতে হয়েছে। এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে যে উৎপাদনক্রিয়ার সৃষ্টি, তা হয়েছে মূলত উৎপাদন-উপকরণগুলোর সরল রৈখিক গতির দরুন ভোগ্য পণ্যোৎপাদনক্রিয়া। সম্পত্তির স্বত্ব স্বামিত্বের সমস্যা কিংবা বিত্তবান ও বিত্তহীন মানুষদের তুলনার কথা ধনবিজ্ঞানের এখতিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিছক সামাজিক বা সরল সামাজবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং যেটা ধনবিজ্ঞানের কোনো তাত্ত্বিক কাঠামোকে আমলে আনে না।
যেমন যেকোনো একটা তাত্ত্বিক ছক, তা যেসব বিষয় বা ঘটনার নির্বাচনে রচিত, তা যুক্তিগতভাবে যতই চমৎকার বা নির্দোষ হোক না কেন— মোটামুটিভাবে তা পক্ষপাতদুষ্টও হতে পারে, যা আমাদের জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত না করে বিকৃত করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক ধনবিজ্ঞানতত্ত্বের ঝোঁক স্থিতিশীল বাজারের বিশ্লেষণ-বিচারকে পরিমাণগত এমন এক কাঠামোয় এনে রাখছে, যেখানে তার গুণগত জাতিবৈশিষ্ট্য (differentia) স্বীকৃতি পাচ্ছে না, বিশেষ করে সামাজিক আর্থনীতিক পরিবেশে যে সম্ভাব্য জাতিবিচার তার সুযোগই নেই। মার্কস যাকে বলেছেন ‘পণ্যরতি’ (fetishism of commodities), অস্বাভাবিকভাবে এই তাত্ত্বিক প্রকরণের পেছনে তা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটা আশ্চর্যের হবে না যে, এ পরিস্থিতিতে ‘শোষণের তত্ত্ব’ কিংবা উদ্বৃত্ত হিসেবে আয়ের চরিত্রায়ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে। ফলে কোনো আগ্রহী সমালোচকও উদ্বৃত্ত মূল্য বা শোষণের তত্ত্বকে ধনবিজ্ঞানের এখতিয়ারে অনুপ্রবেশকারী নৈতিক মূল্যায়ন বলে মনে করেছেন।
বিপরীতভাবে মার্কস আবার ধনবিজ্ঞানের এলাকাকে আরো সম্প্রসারিত করে দেখছেন। প্রসঙ্গত, মার্কস উৎপাদনের সমাজ সম্পর্কের সঙ্গে উৎপাদনীশক্তি ও বিনিময়ের শর্তকেও একইভাবে বিচার করছেন। ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বিশ্লেষণ, সমকালীন সমাজের ভিত্তিস্বরূপ উৎপাদন প্রথার ইতিহাসবিচারের প্রসঙ্গ থেকে এর উদ্ভাবনা, পক্ষান্তরে যা ইতিহাসের জন্মদাতাও বটে, আবার ক্রীড়াস্থলও বটে। মূল্যমানের (value) পরিমাণগাত প্রশ্নের সমাধান এবং মূল্যমান থেকে বাজারদরের উদ্ভাবনা— এই দুইয়ের সঙ্গে একই গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে আর্থনীতিক চরিত্রবিচার।
যদি ‘শোষণ’ বা ‘অবৈতনিক শ্রম’ (unpaid labour) এ শব্দ দুটিকে সামাজিক-আর্থনীতিক সম্পর্কের অঙ্গীকৃত করি, তাহলে এদের সত্যিকারের তাত্পর্য বিতর্কের বিষয় হয় না, কেউই প্রশ্ন তুলবেন না যে জমিদারগোষ্ঠীর আয় অন্যের উৎপাদন আত্মসাৎ করেই সংগৃহীত হয় না— ঐতিহাসিক মার্ক ব্লকের ভাষায় যা হলো ‘অধীনস্থ চাষীর’ উৎপাদন। অবশ্যই এ বক্তব্য অস্বীকৃত হলে বুঝতে হবে, সামন্ততান্ত্রিক দাস ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির মৌলকাঠামোর বিকৃতি সাধন করা হচ্ছে কিংবা লুকানো হচ্ছে। ধনতান্ত্রিক সমাজের সদৃশ চরিত্রায়ণ থেকে পূর্বেকার শ্রেণী ব্যবস্থা-সমন্বিত সমাজের সঙ্গে এই সমাজে সাদৃশ্য দেখানো যায় এবং এছাড়া দেখানো যায় যে সব রকম আর্থনীতিক সম্পর্ক বাজার প্রভাবিত এক ধরনের চুক্তিমাত্র। অন্যভাবে বলা চলে, বর্তমানেও পুঁজির মালিক অন্যের শ্রমে নির্ভরশীল, যদিও প্রভু-ভৃত্যের মধ্যে আইনগত বাধ্যবাধকতার বদলে এখন বিত্তহীনতার সুযোগে আর্থিক বাধ্যবাধকতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের উৎপাদনী তত্ত্বের আড়াল দিয়ে কথার ভেলকি চালিয়ে ওই সব ধনবিজ্ঞানীরা যন্ত্রের কার্যকারিতা বা জমির রাসায়নিক গুণের কথা বলে প্রসঙ্গ এড়াতে দক্ষ। ভুল করে কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, শ্রমমূল্যের তত্ত্বজাত উদ্বৃত্ত মূল্যই মুনাফা। আসলে এক নৈয়ায়িক প্রতিজ্ঞা ও সিদ্ধান্তের যা সম্পর্ক মুনাফা ও উদ্বৃত্ত মূল্যের সম্পর্কও তাই। দুটো তত্ত্বই লকের স্বাভাবিক অধিকারগত ধারণা থেকে উপজাত— সে তত্ত্ব হলো অন্যের শ্রমের ফলভোগ করার অধিকার। অবশ্য আমি মনে করি এ ব্যাখ্যা ভ্রান্ত। বরং এটা উদ্বৃত্ত মূল্যের বাস্তবতার সঙ্গে ক্ল্যাসিকাল যুগের ধারণার সমন্বয় সাধনের ব্যাপার— যে ধারণায় বলা হয় অবাধ বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতার রাজত্বে মূল্যের মাধ্যমে পণ্যের বিনিময়— এই সমন্বয়-চেষ্টার মধ্যে মার্কস তত্ত্বগতভাবে শ্রমিকের থেকে শ্রম বিচ্যুত করে দেখাতে পেরেছেন পণ্যের মতোই যে শ্রমের একটা বাজারদর আছে এবং ওই শ্রমের বিনিময়-মূল্যের উপরেই শ্রমিকের জীবিকা নির্ভর। [সংক্ষেপিত]
অনুবাদ : মুরারি ঘোষ





