সৈয়দ শামসুল হকের ‘আয়না বিবির পালা’ উপন্যাসটি মধ্যযুগীয় বাংলা লোকগাথার ঐতিহ্যকে অঙ্গীকার করেও লেখকের নিজস্ব জীবনবোধ, সমকালমনস্কতা ও নাগরিক অভিরুচির মিথস্ক্রিয়াজাত বিশিষ্ট সৃষ্টিকর্মের অসামান্য নিদর্শন হিসেবে একালের পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে। বাংলার গ্রামীণ প্রতিবেশের যে ঐতিহ্যিক অঙ্গীকার, আবহ এবং লোকজীবনের কলতানকে আমরা ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’, ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ ও ‘রংপুর গীতিকা’য় বিশিষ্ট মেজাজ ও ভঙ্গিসমেত উপস্থাপিত হতে দেখি, এর প্রতিফলন এ রচনায় বিনির্মিত অবয়বে উপস্থিত। দীনেশ চন্দ্র সেন ও ক্ষিতীশ চন্দ্র মৌলিকের সম্পাদনাগুণে এ পালা বাংলা লোকসাহিত্যের অনুরাগীমহলে বহুদিন আগেই সাদরে গৃহীত হলেও সৈয়দ শামসুল হকের সুদৃঢ় কব্জির জোরে বাংলা লোকসাহিত্য ও উপন্যাসের আন্তঃযোগের বিরল দৃষ্টান্ত এর মাধ্যমে স্থাপিত হয়েছে। উপন্যাসটির ‘সবিনয় নিবেদন’ অংশে পাঠকের জ্ঞাতার্থে লেখকের প্রেরিত বক্তব্যে রয়েছে এর সাক্ষ্য— ‘আমার এই রচনা সম্পূর্ণ নতুন, স্বাধীন ও নিজস্ব। এ যেন একটি বস্তুর দীপ্তিকে সেই বস্তু থেকে আলাদা করে নিয়েছি এবং দীপ্তিটিকেই অবলম্বন করে তার যোগ্য নতুন একটি বস্তু নির্মাণ করতে চেয়েছি।’ এর বিনির্মাণের বিষয়াদি ও কলাকৌশলগত রূপরীতি সম্পর্কে লক্ষ করলে লেখকের শিল্পীমানসে সঞ্জাত জীবনভাবনার স্বরূপসাপেক্ষে কুশীলবদের আন্তঃমানবিক সম্পর্কের বিন্যাস অনুধাবন করা সম্ভব।
অজ্ঞাতনামা লোককবির রচিত ‘আয়না বিবির পালা’র প্রতিপাদ্য আয়না বিবি ও মামুদ উজ্জ্যালের বিয়োগান্ত প্রেমকাহিনী, যা লোকসমাজে বহুকাল ধরে তো বটেই, এমনকি উপন্যাসটি প্রকাশকালেও (১৯৮৫) রেডিও-ট্রানজিস্টরে প্রচারিত হতো। বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলে এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বিশেষভাবে প্রচলিত এ লোকগাথার রচনাকাল আনুমানিক কয়েকশ বছর আগের। এর স্থানিক পটভূমিও বর্তমান ত্রিপুরার গ্রামীণ পরিমণ্ডল, এমনটিই জানিয়েছেন ক্ষিতীশ চন্দ্র মৌলিক। এ গাথার শিরোনাম ও নায়ক-নায়িকার নাম, কয়েকটি স্থানিক নাম এ উপন্যাসে অবিকলভাবে উল্লিখিত। এর উদ্দেশ্য মূল পালাটির আদলে আয়না-মামুদ দম্পতির ভাবাবহকে বর্তমানের পরিসরে পাঠকের মনোলোকে জীবন্ত করে তোলা, যেন তারা একালের নরনারী হিসেবেই বিবেচিত হয়। এক্ষেত্রে লেখক আরো কিছু কৌশলের দ্বারস্থ হয়েছেন। যেমন— মামুদের বাল্য, কৈশোর ও প্রথম জীবন, আয়নার সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাত্, আয়নার পিতার মৃত্যুর পর তাকে অন্বেষণ, এমনকি বিদেশ থেকে ফিরে এসে লোকের কথায় আয়নাকে পরিত্যাগ করা প্রভৃতি প্রসঙ্গের অনুপুঙ্খ অনুসরণ এর সাক্ষ্যবহ। পাশাপাশি সমগ্র উপন্যাসেই লোকগাথার বিশিষ্ট আমেজকে ছড়িয়ে দিতে তিনি পরিচ্ছেদগুলোর সংখ্যাক্রমের পাশে সংযুক্ত করেছেন মূল গাথাটির উল্লেখযোগ্য কিছু পঙিক্ত। তাছাড়া কাব্যে রচিত গাথাটিকে গদ্যের কাঠামোতে ধারণের প্রয়োজনে তিনি প্রাসঙ্গিকভাবে সন্নিবিষ্ট করেছেন ভাষার আলঙ্কারিক প্রসাধন, বর্ণনার নিজস্ব ধরন ও নাট্যিক বিন্যাসরীতি। বলাবাহুল্য, মূলের সঙ্গে যোগসাজশ সত্ত্বেও এসব প্রসঙ্গে লেখক স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। শুধু তাই নয়, এ উপন্যাসে প্রতিনায়ক ও প্রতিনায়িকার রূপায়ণে লেখক অন্য দুটি লোকগাথা থেকে গ্রহণ করেছেন যথাক্রমে ‘জামাল’ ও ‘মউফল’ নাম দুটি। স্মর্তব্য, এ দুটি চরিত্র একান্তই লেখকের উদ্ভাবিত, যারা আয়না-মামুদ দম্পতির জীবনে বিবিধ প্রতিবন্ধকতার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত। এ উপন্যাসকে লোকগাথা থেকে বিনির্মাণের প্রয়োজনে লেখক কখনো কখনো অবলম্বন করেছেন এমন কিছু অতিলৌকিক ঘটনার সমাবেশ ও চরিত্রের কর্মতত্পরতাকে, যা বিশ শতকের আশির দশকের নাগরিক জীবনপ্রবাহের সমান্তরালে সঞ্চার করে কয়েকশ বছর পূর্বের নিয়তিতাড়িত গ্রামীণ লোকমানসের ভাবাবহকে; যেখানে যুক্তি-বুদ্ধি ও বিবেচনার জায়গা দখল করে অন্ধত্ব, গোঁড়ামি আর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের কালিক ব্যবধান সত্ত্বেও নরনারীর বিভেদসর্বস্ব সম্পর্কের সমীকরণে যে কোনো পালাবদলই ঘটেনি, বরং যতই সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, নারীর ওপর পুরুষতন্ত্রের বিবিধ দাপট যে আরো বেশি জেঁকে বসেছে, এ মর্মন্তুদ বাস্তবতার উন্মোচনই উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় শিল্পান্বিষ্ট।
১৫ পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত এ সংক্ষিপ্ত কলেবরের উপন্যাসটির প্রথম পরিচ্ছেদকে ‘অবতরণিকা’ বা ‘প্রারম্ভিকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা চলে, যেখানে সংক্ষেপে বিবৃত হয়েছে আয়না-মামুদের বিরহবিধুর সম্পর্কের ইঙ্গিত। লোকপালা, যাত্রা বা নাটক রঙ্গমঞ্চে অভিনয়কালে এর প্রতিপাদ্য দর্শকদের শুরুতেই জানাতে এ কৌশলের দ্বারস্থ হওয়া বেশ প্রাচীন অথচ প্রচলিত রীতি। এর পর অবশিষ্ট ১৪টি পরিচ্ছেদে উপন্যাসটির ঘটনাবৃত্ত পূর্ণতা পেয়েছে। এর প্লট সরলরৈখিক হলেও কখনো কখনো নাটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রয়োজনে এবং আখ্যানে গতিময়তা সঞ্চারের তাগিদে ফ্ল্যাশব্যাক ও স্মৃতিচারিতাকেও কৌশল হিসেবে এতে প্রযুক্ত করা হয়েছে। মূল গাথাকে লেখক অনেকাংশেই পরিবর্তন করেছেন ঘটনার বিন্যাস, কুশীলবদের পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশ ও বিবিধ কর্মকাণ্ডসমেত উপস্থাপনের আগ্রহ এবং অভীষ্ট বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠার তাগিদে। স্মর্তব্য, দীনেশ চন্দ্র সেন সম্পাদিত পুঁথিতে এ লোকগাথার মোট চরণসংখ্যা ৫১৯, যা ১১টি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত। অন্যদিকে, সতীশ চন্দ্র মৌলিক সম্পাদিত গাথায় মোট চরণসংখ্যা ৭৫২, যেখানে নতুন সংগৃহীত চরণ ২৩৩টি এবং তা ১৫টি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত। এ গাথাকে যথাযথভাবে অনুসরণ করলে দ্বিতীয়টিকেই অপেক্ষাকৃত পূর্ণাঙ্গ বিবেচনা করতে হয় এবং লেখকও একেই অবলম্বন করে উপন্যাসটি লিখেছেন, এমনটি আমাদের অনুমান।
এ উপন্যাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পরিসরজুড়ে রয়েছে চাঁদের ভিটা গ্রামের বাসিন্দা এবং মামুদের সমবয়সী-বাল্যসহচর জামালের ভাগ্যান্বেষণে সুদূর আরবে তথা ‘পয়গম্বরের দেশে’ যাওয়ার প্রসঙ্গ, যা আয়না-মামুদের দাম্পত্য সম্পর্কের গ্রন্থিচ্ছেদের প্রধান অবলম্বন। আয়নার সঙ্গে ঘটনাক্রমে মামুদের সাক্ষাত্ এবং এর পরিণতিতে অনেকটা সংস্কারবশতই ‘সাধু’ সম্বোধনের পরিণতিতে তাদের প্রণয়াসক্তির ঘটনা রূপকথা, লোকগাথার পরিচিত উপাদান হিসেবে পাঠকের বোধে ধরা দিতে পারে। কিন্তু এর গূঢ়ার্থ অনেক বেশি স্পর্শকাতর। কেননা, অপরিচিত মামুদের জন্য অসামান্যরূপসী আয়না ও তার দরিদ্র-অসহায় বৃদ্ধ বাবার আকুলতা থেকে বোঝা যায়, পারিপার্শ্বিক সমাজের ক্রুরতা ও শ্যেনদৃষ্টির কবল থেকে রক্ষা পেতে তারা মামুদকেই উপযুক্ত অবলম্বন হিসেবে নির্বাচন করেছে। অন্যদিকে ভিটেবাড়ি, জোতজমি বিক্রির অর্থে আরবে গিয়ে মরুভূমি থেকে সোনা আহরণ করে পরিবারের সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট মামুদও যে তার প্রেমে পড়ে, তা তাত্পর্যহীন কোনো ঘটনা নয়। কারণ আয়নার রূপ, গুণ আর আকর্ষক ব্যক্তিত্ব জীবনসঙ্গী হিসেবে যেকোনো পুরুষেরই পরম আকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু তাদের সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি হয় ঢাকায় নবাগত মামুদের জনৈক গ্রামসঙ্গীর প্ররোচনায় পতিতালয়ে যাওয়া ও সেখানকার বাসিন্দা মউফলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ঘটনায়। প্রতারক দালালের খপ্পরে পড়ে আরবে যাওয়ার ব্যাপারে তার স্বপ্নভঙ্গ ঘটলেও আয়নাকে নিয়ে সে নতুন জীবন শুরু করতে সমর্থ হয় ধীশক্তি ও বিচক্ষণতাগুণে। বাবার মৃত্যু ঘটায় মামাবাড়িতে আশ্রিত আয়নাকে বহুদিন পর খুঁজে পেয়ে বাড়িতে নিয়ে বিয়ের পর মায়ের তত্ত্বাবধানে মামুদ সংসার শুরু করলেও খল, শঠ জামালের চক্রান্তে আয়নার জীবন অচিরেই অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। মামুদকে কৌশলে ঢাকায় পাঠিয়ে জামালের আয়নাকে মিথ্যা সংবাদ দিয়ে অপহরণের চক্রান্ত শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেলেও এর প্রতিক্রিয়া সেই নারীর জন্য ভয়ানক হয়ে ওঠে। জামালের লোলুপতা থেকে সম্ভ্রম রক্ষায় সফল আয়না নদীতে ঝাঁপিয়ে নিজেকে বাঁচালেও দুদিন পর স্বামীর বাড়িতে হাজির হলে তাকে ‘কুলটা’ হিসেবে প্রতিবেশীরা চিহ্নিত করে। এর জের ধরে শাশুড়ির কাছেও সে আশ্রয় হারায়। উপরন্তু গ্রামে ফিরে এ বৃত্তান্ত জেনে মামুদ তাকে শারীরিক নির্যাতনের পর ঢাকার পতিতালয়ের পতিতা মউফলের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেই অর্থে সে আবার আরবে যাওয়ার চেষ্টায় বিফল হয়ে অবশেষে মউফলের নিকট নিজেকে সমর্পণ করতে চাইলেও তার ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। কারণ একদা সে মউফলকে ‘বোন’ সম্বোধন করছিল বিধায় সে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং কৌশলে আয়নার কাছে তাকে পাঠায়। যে পুরুষ স্ত্রীর চরিত্র সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে তাকে পতিতালয়ে বিক্রি করেছিল, তাকেই সে পুনরায় নির্দ্বিধায় শয্যাসঙ্গী করে, এহেন নির্মম বাস্তবতা আয়না-মামুদের দাম্পত্য সম্পর্কে যবনিকা টেনে দেয়। উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদে জানা যায়, পরস্পরের প্রতি দুর্বিষহ ঘৃণা ও ধিক্কারের অবসান ঘটাতে দুজনই আত্মহত্যা করেছে। বলাবাহুল্য, জীবনের চরম দ্বান্দ্বিকতার যে রূপরেখা এ উপন্যাসে উক্ত দম্পতির মাধ্যমে বিধৃত হয়েছে, তা একান্তই একালের নাগরিক মানুষের অনিকেত জীবনচেতনারই প্রতিধ্বনি। এ উপন্যাসে আয়না ও মামুদ লোকগাথার চরিত্রে বিচ্ছুরিত সারল্য, সহজাত উদারতা, গ্রামীণ লোকমানুষের বিশিষ্ট স্বভাবকে মুছে রূপান্তরিত হয়েছে আধুনিককালের নিঃসঙ্গ, পরস্পরবিবিক্ত মানুষের প্রতিনিধিতে, যাদের মনোলোকে অন্তিমপর্যায়ে তিরোহিত হয় সৌহার্দ্য ও সমঝোতার সমন্বয়ে অন্তর্গত সম্পর্ককে শাশ্বত মর্যাদায় উত্তরণের তাগিদ। কারণ, যে সমাজে নরনারীর আন্তঃসম্পর্ক গ্রন্থিত একের প্রতি অন্যের আনুগত্য স্বীকারজনিত অবনমনে, সেখানে আয়নার মতো নারীর উদ্বন্ধনে ঝুলতে বাধ্য হওয়ার বিকল্প পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা অলীক কল্পনামাত্র! এভাবেই সেই নারী ক্ষণিকের ভুলের দায় মেটাতে (জামালকে মামুদ ভেবে রাতের অন্ধকারে তার বুকে নিজেকে সমর্পণ) পরিবার, স্বজন এমনকি প্রিয়তমের প্রতি অভিমান আর স্বীয় নারীত্বের অপমানের অবসান ঘটায়। মামুদের বিভিন্ন কর্মোদ্যোগ থেকে প্রতীয়মান হয়, যেহেতু সে সংসারের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তাই যেকোনো উপায়ে এবং মূল্যে নিজের বাসনা বা অভিপ্রায় বাস্তবায়নে তার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বিনা প্রশ্নে এ সমাজে অনুমোদিত হয়। তাই আয়নার নিষেধ অমান্য করে উপার্জনের প্রলোভনে মামুদের আরবে যাওয়ার ভাবনা বিপজ্জনক হলেও এ প্রসঙ্গে তার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন ঘটে না। নিছক সন্দেহের বশে স্ত্রীকে সে যেভাবে লাঞ্ছিত, এমনকি আত্মহত্যায় প্রলুব্ধ করার মতো ঘোরতর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, তাতে আয়নার মৃত্যুর পর তার আত্মহনন কোনো সদর্থক বোধ বা তাত্পর্যকে বাঙ্ময় করে না। কেননা, অন্তিম পর্যায়ে শুধু তারই কারণে আয়নাকে বাধ্য হতে হয়েছে আত্মহত্যায়। এ দুই চরিত্রের মধ্য দিয়ে নরনারীর আন্তঃসম্পর্কের যে বিনির্মাণ করেছেন লেখক, তা নিঃসন্দেহে অভিনব। সচেতন পাঠকমাত্রেরই জানা আছে, পূর্বোক্ত লোকগাথাগুলোয় নারীরা ব্যক্তিত্বময়ী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমর্থ এবং প্রায়ই তাদেরকে ঘিরে গাথার কাহিনী আবর্তিত। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের পার্শ্ববর্তী পুরুষরা, এমনকি নায়কেরা পর্যন্ত বহুলাংশেই দুর্বল, ভীরু, উদ্যমহীন ও নিষ্ক্রিয় স্বভাবের। এ বক্তব্য ‘আয়না বিবির পালা’ সম্পর্কেও প্রযোজ্য। সতিনের সঙ্গে মামুদের দাম্পত্য সম্পর্ক প্রসঙ্গে অবহিত হয়ে আয়না যেভাবে মনঃপীড়ায় ভোগে, অথবা মামুদ বাণিজ্যযাত্রায় নৌকা ডুবে মৃত্যুবরণ করেছে বলে প্রচারিত হলে তা অবিশ্বাসপূর্বক সে যেভাবে তিন বছর ধরে স্বামীর খোঁজে বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ ও তাকে উদ্ধারের আগ্রহে বিবিধ কাজে লিপ্ত হয়, এসবই তার সক্রিয়তার সাক্ষর। কিন্তু আয়নার প্রতি মামুদের প্রেমানুরাগ পুরো গাথায় নিতান্তই পার্শ্বিক ও অপেক্ষাকৃত তাত্পর্যহীন ঘটনা। কেননা, প্রেমিকা-স্ত্রীর প্রতি তার হার্দিক আকুতি গাথাকারের বিবৃতি ও অন্য চরিত্রের সংলাপে যেটুকু রূপায়িত হয়েছে, তার নিজের কর্মতত্পরতায় তা প্রায় অনুপস্থিত। এই যে চরিত্রের কর্মকাণ্ড ও মনোভঙ্গিগত প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংকোচন ও সম্প্রসারণগত বিনির্মাণ, এর অন্তরালে লেখকের নিজস্ব জীবনবোধ ও সমকালীন নরনারীর সম্পর্ক-বিষয়ক ভাবনা নিঃসন্দেহে প্রযুক্ত। সে কারণেই এ উপন্যাসে আয়নার সমান্তরালে মামুদকেও যথাযথ পরিসরে বিভিন্ন ভূমিকায় সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। এভাবেই আয়না ও মামুদ চরিত্রদ্বয়ের আদ্যন্ত ফুটে ওঠে সামগ্রিকতার পরিচয়, যেখানে তার একালের রক্ত-মাংসের মানুষের যথাযোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এ উপন্যাসে লেখকের গদ্যশিল্পীসত্তা সচেতনভাবেই লোককবির কাব্যিক পরিমণ্ডলকে স্বীকরণের মধ্য দিয়ে নতুন রূপে উন্নীত হয়েছে। সে কারণেই এর ভাষা বিশেষভাবেই গীতময় এবং সাংগীতিক সুর মূর্ছনার কলতান এর প্রতিটি পরিচ্ছেদের বর্ণনায় ব্যাপ্ত হয়েছে কখনো লেখকের বিবৃতিতে, কখনো চরিত্রের সংলাপে ও প্রাসঙ্গিক বিবরণে। যেহেতু কাব্যে রচিত পালাকে বিনির্মাণ করার তাগিদ এ উপন্যাস রচনায় লেখকের মনোভূমিতে প্রবলভাবে উপস্থিত, তাই প্রাসঙ্গিক ভাষিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে তিনি বরাবর সচেতন ছিলেন। ফলে, স্থানীয় ও দেশজ, আঞ্চলিক ও কথ্য শব্দ, গ্রামীণ পরিমণ্ডলে উচ্চারিত ও নিত্যদিনের প্রয়োজনে ব্যবহূত ভাষা, কথোপকথনের বিশেষ রীতি ও দেহভঙ্গিমার সমান্তরালে বাগধারা, সুভাষিত উক্তি ও প্রবচন অকপটেই কুশীলবদের সংলাপে সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। লক্ষণীয়, উপন্যাসটির কুশীলবরা প্রমিত চলিত গদ্যকে আত্মস্থ করেছে এবং তা যথেষ্টই পরিশীলিত, যথোপযুক্ত ভাব প্রকাশের বাহন এবং পরিস্থিতিসাপেক্ষে কবিতার মতো গতিময় ভাবপ্রবাহের মাধ্যম হিসেবে উত্তীর্ণ। এক্ষেত্রে লেখক মূল পালার আমেজ ও আবহ ধারণের পাশাপাশি নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন আলঙ্কারিক বাক্য বিন্যাসে, বিশেষ কিছু লোকজ অনুষঙ্গকে কুশীলবদের আচরণে ও সংলাপে সংযুক্ত করে।
মধ্যযুগে সাধু, বণিক, ব্যবসায়ীরা ঘরের বাঁধন ছেড়ে বাণিজ্য করতে সঙ্গীদের নিয়ে নৌযাত্রাকালে আকস্মিকভাবেই কোনো অপরিচিত লোকালয়, গ্রাম, নগর বা রাজ্যে উপস্থিত হতো। সেখানকার কোনো নারীর প্রতি তাদের বিমুগ্ধতা, প্রেম-পরিণয়ের বৃত্তান্ত বাংলা সাহিত্যভুক্ত বিভিন্ন পালাগানে, মঙ্গলকাব্যে, লোকনাট্যে ও লোকসংগীতে বারবার উপজীব্য হয়েছে। এ উপন্যাসে সেই স্থান দখল করেছে আরবে গিয়ে শ্রমিক হিসেবে প্রচুর অর্থ উপার্জন ও মরুভূমির বুক থেকে আহরিত সোনার প্রতি গ্রামের সাধারণ মানুষের মরীচিকাতুল্য স্বপ্নময় বিমুগ্ধতা, যার পরিণতিতে তাদের প্রতিনিধি মামুদকে হতে হয় নিঃস্ব, হূতসর্বস্ব। এমনকি, এর পরিণতিতে প্রণয়িনী-স্ত্রী আয়নার প্রতি তার ভালোবাসা যে শেষ পর্যন্ত তিরোহিত হয়, তাও উপন্যাসটির অন্যতম উপজীব্য। লোকপালাকে অবলম্বন করে বিশ শতকের আশির দশকের সমকালীন জীবনবাস্তবতার বিনির্মাণে এ উপন্যাসের প্রচেষ্টা তাই অভিনন্দনযোগ্য, নান্দনিকতার অনবদ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে নিঃসন্দেহে বিবেচিত হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






