যখনই আপনি বাংলাদেশ বিমানে আরোহণ করলেন এটা তখন জানাই এমনকি আপনার দেশের চেয়ে দরিদ্র একটি দেশের দিকে আপনি যাত্রা করেছেন, কিন্তু পৃথিবীতে যত মানুষের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে, এখানকার মানুষ তাদের চেয়ে বেশি ধনী।
বিমানের বোয়িং ঠিক আছে; অর্ধেকের বেশি ফাঁকা— এটা আরো ভালো; শুধু নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৫ ঘণ্টা পিছিয়ে আছে। ফ্লাইট বিলম্ব অনিবার্য। কারণ তিনটি বোয়িং দিয়ে পৃথিবীজুড়ে তাদের যাত্রীর বেশির ভাগ টানতে হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ আকাশ সফরের জন্য সাতটি ফকার ফ্রেন্ডশিপ উড়োজাহাজ। তারা যে খাবার সার্ভ করেছে, তাতে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস তাদের মেন্যু নিয়ে অহংকার করতে পারে আর এটা এয়ার ইন্ডিয়ায় চা কিংবা কফির সঙ্গে যে ডাফ-বিস্কুট দেয়া হয়. তার পরিমাণ আরো কমিয়ে দিতে পিসি লালকে উত্সাহিত করবে।
কিন্তু ক্রু!
আমি এখনো এমন কোনো এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করিনি যার স্টিউয়ার্ডদের এত বেশি সৌজন্যবোধ এবং যার এয়ার হোস্টেসরা এত বেশি বন্ধুবত্সল। দায়িত্বের বাইরে অনেকটা পথ গিয়ে তারা আপনাকে অনুভব করাবে যে আপনি তাদেরই একজন।
বোম্বে থেকে ঢাকার আড়াই ঘণ্টার ফ্লাইট এবং এয়ার হোস্টেস সহেলি হাসনাত খানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপের পর এ আমার দ্রুত মন্তব্য। সহেলি ১৬ বছর বয়সে এই এয়ারলাইনে যোগ দিয়েছে, তার ইংরেজিতে বাংলা ভাষার ধ্বনি ব্যবহারের কারণে সে যাই বলে বোঝার জন্য আমাকে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে হয়। আমাকে দেখে সহেলি সিদ্ধান্ত নেয়— আমি দেখতে তার দাদার মতো, সেই বুড়োর জন্য তার বিশেষ আবেগ জড়িয়ে আছে। আট সন্তানের একটি পরিবারের মেয়ে সে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আর রমজানের উপবাস, তার যখন যার সঙ্গে তাকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেবে, সহেলি তাকেই বিয়ে করবে। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কখনো প্রেমে পড়নি?’ কুড়ি বছর বয়সী সহেলি হেসে জবাব দেয়, ‘এখনো নয়।’ তার উজ্জ্বল কমনীয় শরীর এবং দ্যুতিময় চোখ বহু বাংলাদেশী ছোকরার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার কথা।
আমরা বেলা ১টায় ঢাকায় অবতরণ করি। ভারতীয় এবং পাকিস্তানি এয়ারফোর্স এই এয়ারপোর্টটির বারোটা বাজিয়ে দেয়ায় এটা কি অবস্থায় ছিল ১৯৭১ সালে আমি তা দেখেছি— রানওয়েতে বোমা পড়ে বড় বড় খাদের সৃষ্টি হয়েছে আর এয়ারপোর্ট ভবনটির দেয়ালে গোলাগুলির ছিদ্র আর ভাঙা কাচ, প্লেট-গ্লাস একে অনেকটা জঞ্জালে পরিণত করে রেখেছিল। তিন বছর পর ১৯৭৪-এ আবার যখন যাই, দেখি মেরামত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা দুর্ঘটনার শিকারের মতো পড়ে আছে।
আর এখন চকচকে নিয়ন লাইট, নতুন গ্লাস, নতুন কংক্রিট। স্বাগত জানাতে এসেছে সরকারের আপ্যায়ন কমিটি, আর আমার প্রয়াত বন্ধুকবি জসীমউদ্দীনের জ্যেষ্ঠ পুত্র আবেগমত্ত কামাল আনোয়ার। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল— এই মাইল রাস্তার চেহারার খানিকটা উন্নয়ন করা হয়েছে। এটি দ্বিমুখী সড়ক, রাস্তায় ফেস্টুন, উজ্জ্বল আলোকিত বিলবোর্ড। সরকারের বহিঃপ্রচার বিভাগের তাজুল ইসলাম জানালেন, বর্তমান সরকারের আমলে দেড় বছরে যা করা হয়েছে বিলবোর্ডে তারই বিবরণ।
আমি বললাম, ‘আগন্তুকদের মুগ্ধ করার শোপিস, তাই না?’ তিনি এমন একটা হাসি দিলেন, যার অর্থ ‘আমার কোনো মন্তব্য নেই।’
মধ্যরাত থেকে ঢাকায় কারফিউ। রাস্তাঘাট জনশূন্য। আমার সেই নারীদের জন্য দুঃখ হয়, যারা রাতের এই সময়টা জীবিকার প্রয়োজনে কাজ করত— তাদের দালাল এবং চোরদের জন্যও। ঢাকায় অপরাধের হার এখন সবচেয়ে কম।
পরদিন সকালে আমি হোটেলের লবিতে ঝরনার পাশে বসে হা করে পর্যটকদের দেখছি, এরা প্রধানত আমেরিকান কিংবা জাপানি। সিমেন্সের জি রত্নাম এসে আমার সঙ্গে যোগ দিলেন। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের (ভারতীয়) ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বাজে সব মালামাল সরবরাহ করে আমাদের ওপর তাদের বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে।’ সকালের খবরের কাগজও ভারতের ব্যবসা পদ্ধতির সমালোচনা করেছে। আমার তরুণ সঙ্গী হেমায়েত ঢাকা-দর্শন সফরে আমাকে নিয়ে বেরোবে বলে এসে হাজির হয়েছে। রাস্তাঘাট ও পার্ক বেশ পরিষ্কার। খোলা জায়গায় কেউ মূত্র ও মলত্যাগ করে না— করলে নিতান্ত বেতের বাড়ি খাবে এবং ৫০ টাকা জরিমানাও গুনবে। আমি বুঝি এই গণমলত্যাগ বন্ধের একমাত্র উপায় ডাণ্ডা মারা। ইউনিভার্সিটির কাছে এসে গাড়ির ক্লাচে সমস্যা দেখা দেয় এবং আমাদের যাত্রাও বাতিল করতে হয়।
আমরা হেঁটে হেঁটে ঢাকা ক্লাব পর্যন্ত গিয়ে সরকারের বহিঃপ্রচার বিভাগের প্রধান এনামুল হকের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। ক্লাবের টেনিস ফাইনাল চলছে। ক্লাবের সদস্যরা রোদ নিবারক রঙিন ছাতার নিচে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, খেলা দেখছেন, গপ্পো করছেন। খুব আকর্ষণীয় উত্তেজক টেনিস নয়, পরিবেশটা আমাকে জিমখানা ক্লাবের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ১ ঘণ্টা পর এনামুল হক, সঙ্গে কিছু সাংবাদিক, এদের মধ্যে কয়েকজন সম্পাদকও রয়েছেন। বাংলাদেশে তিনটি ইংরেজি ও নয়টি বাংলা পত্রিকা। বাংলা দৈনিক ইত্তেফাকের প্রচার সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি।
আমরা দুটো জাপানি টয়োটাতে চড়ি। আমি আগে যেমনটি দেখেছি এখন রাস্তাঘাট ও ভবন স্পষ্টতই তার চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। গ্রামের দিকটা উজ্জ্বল সবুজ এবং বেশ সমৃদ্ধির সাক্ষ্য দেয়। হক আমাকে জানান, পরপর কয়েক বছর ভালো ফসল ফলেছে। ‘আমরা ১৩ মিলিয়ন টন শস্য ফলাই, আমাদের দরকার ১৬ মিলিয়ন টন।’ এখন যে নতুন ধরনের চাল বাংলাদেশে উত্পাদিত হচ্ছে, এতে সার ও কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে পারলে উত্পাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের আট কোটি জনসংখ্যা প্রতি বছর শতকরা ৩ হারে বেড়ে চলেছে। দারিদ্র্য ঘোচানো বরং একটি দূরের স্বপ্ন হিসেবে থেকে যাবে (পৃথিবীর কোনো দেশে এত ভিক্ষুক নেই)।
আমরা একটি সরু বাঁধের রাস্তার ওপর দিয়ে বিচ্ছিন্ন গ্রাম ও ধানের সবুজ সমুদ্র অতিক্রান্ত করতে থাকি। আমরা বাবুরহাটের মাধবদী (খুশবন্ত সিং সব জায়গাতেই লিখেছেন মাধবী) পৌঁছি, আমাকে বারবার বলা হয় এটা বাংলাদেশের ম্যানচেস্টার। তাঁতে বোনা কাপড়ের এটাই প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র। আমি সব জায়গাতেই দেখতে পাই, সদ্য রঙ করা সুতা শুকানোর জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
মাধবদী নতুন একটি প্রকল্পের কারণে খবরে উঠে এসেছে— কেবল স্বেচ্ছাশ্রমে তারা পাঁচ মাইল একটি মাটির রাস্তা তৈরি করেছে। আশপাশের গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবী গ্রামবাসী ও স্থানীয় কলেজের ছাত্রদের উদ্যোগে দুই মাসে কাজটি শেষ করেছে। ৫০ বছর বয়সী কদম আলী সুতা ও কাপড় রঙ করার কাজ করেন। তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি থামলাম। তাকে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের আহার ও কাপড় জোগাতে হয়। মাসে ২০০ টাকা (ভারতীয় ১০০ রুপি) কামাই করেন। চাল, ডাল, মাংস, চিনি এবং রান্নার তেলের দাম ভারত ও বাংলাদেশে একই। মাছ কেবল সস্তা। তার যে মাসিক কামাই, কদম আলী কিছুই সঞ্চয় করতে পারেন না। তাছাড়া তার সন্তান জন্মদানের কর্মটি তো এখনো শেষ হয়নি।
আরো কয়েক মাইল দক্ষিণে মেঘনা নদীর পাড়ে নরসিংদী। এখানে তিনটি পাটকল, পাঁচ হাজার শ্রমিক কর্মরত। (শেখ মুজিব পাট ও বস্ত্রশিল্প জাতীয়করণ করেছেন।) ওখানে ন্যূনতম মজুরি ১৫০ টাকা, আবাসনে ভর্তুকি দেয়া হয়, চিকিত্সা বিনামূল্যে। আমরা পাটকলের রেস্ট হাউজে বিশ্রাম নিই, আমার সাংবাদিক ভাইয়েরা (তারা সবাই মুসলমান) স্কচ এবং শীতল বিয়ার নিয়ে বসে যান। ছোট এক ক্যান বিয়ারের দাম ৩০ টাকা (ভারতীয় ১৫ রুপি)। এখানে স্কচের দাম ভারতের তুলনায় কম কিন্তু সোডা বাংলাদেশের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমরা গলদা চিংড়ি ও সাধারণ চিংড়ি এবং রুই মাছের ভোজে বসে যাই। রুই সকালেই ধরা হয়েছে। স্কচ ও বিয়ার আমার বঙ্গের বন্ধুদের ক্ষুধা ভীষণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তারা তাদের থালার ওপর ভাতের ডিবি আর মেঘনার মাছ গোগ্রাসে গিলে চলেছেন।
আমাদের ফেরার পথে আবার বাবুরহাটে থামি এবং পঞ্চাশতম বারের জন্য আমাকে বলা হলো, এটাকে বাংলাদেশের ম্যানচেস্টার বলা হয়ে থাকে। বাবুরহাট হচ্ছে তাঁতবস্ত্রের পাইকারি বাজার। অধিকাংশ দেশের মতোই খাল গ্রামগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, রাস্তা ও গ্রামের সংযোগ কেবল নড়বড়ে কাঠের সেতুর মাধ্যমে।
রাস্তার দুদিকেই দাড়িওয়ালা মাওলানারা সামনে থালাভর্তি খুচরো পয়সা নিয়ে মাইকে কোরআনের আয়াত সুর করে পাঠ করে যাচ্ছেন। এ পবিত্র ভিক্ষাবৃত্তি বাংলাদেশের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
আমরা বাড়ির পথে যাত্রা করি। শীতলক্ষ্যা নদীর সেতুর খিলানের ওপর দিয়ে আকাশে মেঘ জমেছে, টিপটিপ বৃষ্টি বাতাসে শীতলতা এনে দিয়েছে। এনামুল হক বললেন, ‘যখন দিনটা গরম থাকে উত্তর-পশ্চিমা ঝড় নিশ্চিত। আমরা ঢাকা পৌঁছতে পৌঁছতে আকাশ অন্ধকার হয়ে এলো।
গুলশান পার্কে আমি ভারতীয় হাইকমিশনার কেপিএস মেননের বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করি। সশস্ত্র পুলিশ বাড়িটা পাহারা দিচ্ছে, বাড়ির চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া এবং উচ্চক্ষমতার বাল্ব লাগানো হয়েছে (মেননের পূর্বসূরি সমর সেনকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল)।
আকর্ষণীয় এবং মন-কাড়ানিয়া যুবতী মিসেস মেনন আমাকে বললেন, ঢাকায় থাকতে তার খুব ভালো লাগে। এখানে অনেক কিছু করার আছে, তবে তার আক্ষেপ তার বাংলাজ্ঞান ঢাকার নিত্যকার সাংস্কৃতিক জীবনের নাটক ও আবৃত্তি উপভোগ করার মতো যথেষ্ট নয়। তার স্বামী মেনন হুবহু তার স্বনামধন্য শ্বশুরের মতো দেখতে; কণ্ঠস্বরে এবং কূটনেতিক সৌজন্যে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেন তিক্ত হচ্ছে তার কারণ তিনি স্পষ্টই জানেন—ফারাক্কা সমস্যার কিছু সাময়িক সমাধান দেয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে পানিবণ্টনে দুুপক্ষের সদিচ্ছা ও সমঝোতার প্রয়োজন হবে। দুই দেশের সংলগ্ন সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মতো একটি কণ্টকাকীর্ণ বিষয় অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। সামরিক সরকারের যারা বিরোধিতা করছেন, ভারত তাদের আতিথ্য প্রদান করছে। এতে সরকার অসন্তুষ্ট।
অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী






