হাফিজের গজল

ভোরবেলায় দেখি আমি বাগানে ডুবে গেছি

বুক ভরে নিই সুবাসের নিঃশ্বাস

যেন আমার সকল ব্যাধি সারিয়ে নিতে পারি

আমি একটি গোলাপের সৌন্দর্য পরীক্ষা করি

অন্ধকারে আলোর রশ্মির মতো দাঁড়িয়ে থাকে

নিজের যৌবন ও সৌন্দর্য দিয়ে এমনই অহংকার

এমনকি হূদয়-ভাঙা বুলবুল পাখা ঝাঁপটে সরে যায়

যে নার্সিসাস ফুটতে যাচ্ছে করে অশ্রুপাত

টিউলিপ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়

লিলির কঠিন জিহ্বা তেতে ওঠে

পাপির মুখে প্রতিবাদের ভাষা

খেলাচ্ছলে যে সুবাসিত মদ্যের পূজা করে

আঙুর বনের ফলন যে প্রশংসা করে

সে জানে সুখ, আনন্দ আর যৌবন চলে যায়

হাফিজের মতো জ্ঞানীরাও একই কথা বলেন।

 

শেখ সাদির গুলিস্তাঁ থেকে

তোমার কাছে গোলাপদানের কী দরকার

আমার গোলাপ বাগান থেকে একটি

           পাতা তুলে নাও

একটি ফুল পাঁচ ছদিন টিকে থাকে

কিন্তু এই গোলাপ বাগান তো আজীবন

                                আনন্দ সৌরভ।

 

 

 

জালালউদ্দীন রুমীর সুবাস

তুমি এই পৃথিবীতে কস্তুরীর সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছ

শূন্যতা ভরেছে সুঘ্রাণে

এই সুবাস তুলেছে শত সহস্র মর্মর ধ্বনি

মাথা তুলেছে পৃথিবীতে ও বায়ুমণ্ডলে

 

এই আলোর রশ্মি থেকে

তুমি দেহে ও আত্মায় আগুন ধরিয়েছ

জ্ঞানের মণিমাণিক্য থেকে

মরুভূমি ও মহাসাগরে বিপ্লব ঘটে গেছে

রুমীর শত সহস্র আত্মা

বয়ে গেছে মূর্খ ও আহাম্মক মানুষের

স্রোতের ভেতর দিয়ে

তুমি ভাবনার হাতিয়ার তুলে দিয়েছ আর

নমনীয় ময়দার তাল, তাদের রক্ত মধুর

হয়ে গেছে, জ্ঞানের হূদপিণ্ডের দরজা খুলে গেছে

রক্ষা পেয়েছে হূদয়-ভাঙা মানুষ

শামস-ই-তাবরিজি তোমার দয়া থেকে

একটি একটি আলোকরশ্মি

         সকল প্রেমিকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

 

শেখ সাদির কোলিয়াত থেকে

একদিন স্নানের ঘরে এক প্রিয়তম হাত থেকে

আমার হাতে আসে সুবাসিত এক টুকরো মাটি

আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি কি কস্তুরীমৃগ,

          তুমি কি ভাসমান আতর?

তোমার মিষ্টি ঘ্রাণ আমাকে দিওয়ানা করেছে

আমি বললাম, আমি দিলাম অকাজের মাটির দলা

কিন্তু যখন গোলাপে সান্নিধ্যে ছিলাম

আমার সঙ্গীর সৌরভ আমার গায়েও লেগেছে

এবং রয়ে গেছে, নতুবা আমি সেই মাটির দলা

          যেখান থেকে আমি উঠে এসেছি।

 

পাবলো নেরুদার ভালোবাসা

তোমার কারণে ফুলফোটা বাগানে

আমি বসন্তের সৌরভের জন্য কাতর থাকি

আমি ভুলে গেছি তোমার অবয়ব, তোমার

আমার আর মনে পড়ে না, কেমন ছিল

তোমার ওষ্ঠের অনুভব আমার উপর!

 

তোমার কারণে আমি সাদা মূর্তি ভালোবাসি

পার্কে ঝিমোয়, সে সাদা মূর্তির

কোনো স্বর নেই, দৃষ্টি নেই।

 

আমি তোমার স্বর ভুলে গেছি, তোমার সুখী স্বর

আমি তোমার চোখ কেমন ভুলে গেছি।

 

নিজের সৌরভের কাছে যেমন ফুল, আমিও তেমনি

আমার অস্পষ্ট স্মৃতির কাছে ধরা পড়ে আছি

ক্ষতের মতো তা ধারণ করে আমি যন্ত্রণা নিয়ে

বেঁচে আছি, তুমি যদি আমাকে স্পর্শ করো

এমন ক্ষতি করবে আমার যা পূরণ হবার নয়।

 

তোমার আলিঙ্গনে আমাকে জড়িয়ে ধরে

বিষণ্ন দেয়ালে আঙুর লতার আরোহণের মতো।

 

আমি তোমার ভালোবাসা ভুলে গেছি, তবু

মনে হয় আমি তোমার মুখ দেখি সব জানালায়।

 

তোমার কারণে গ্রীষ্মের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া

সৌরভ আমাকে যন্ত্রণা দেয়; তোমার কারণে

আমি সেই সব অবলম্বন খুঁজি, যা থিতিয়ে দেয়া বাসনা

উল্কার পতন, পতনশীল বস্তুসামগ্রী।