অনুবাদ: এম এ মোমেন
গত অর্ধশতকের স্মার্টেস্ট ইংলিশ ফিকশন লেখক ভিএস নাইপল; ব্রিটেনে জন্ম সাদা লেখকদেরই এ স্বীকৃতি। পিতৃপুরুষের আদিবাস ভারতে, তার জন্ম ত্রিনিদাদে ১৯৩২ সালে। ২০০১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। দুই বছর আগে ঢাকার সাহিত্য অঙ্গনকেও নাড়া দিয়ে গেছেন নাইপল। ১২ আগস্ট ২০১৮ নাইপল ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে সালমান রুশদির তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া: রাজনীতি নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে সারা জীবন আমাদের মতানৈক্য ছিল, তার মৃত্যুতে আমি বড় ভাই হারানোর ব্যথা অনুভব করছি।
নাইপল বৈরিতা সৃষ্টি করতে পছন্দ করতেন, কেবল তা-ই নয়। তিনি মনে করতেন লেখক যদি বৈরিতা সৃষ্টি করতে না পারেন, তাহলে তিনি মৃত।
বৈরিতা সৃষ্টিকারী তার রচনার সমালোচনা করতে গিয়ে একজন ভারতীয় লেখক বলেছেন, লেখালেখি ছেড়ে নাইপলের সসেজ বিক্রিতে নেমে পড়া উচিত।
নাইপলের কয়েকটি সাক্ষাত্কার থেকে নির্বাচিত অংশ তুলে ধরছি। ২০১২ সালে দ্য নিউ রিপাবলিকের জন্য নেয়া আইজাক শটিনারের সাক্ষাত্কার থেকে: তখন তার বয়স ৮০ বছর।
নাইপল: বয়স যখন ৮০, তখন আর খুব বেশি কিছু করার থাকে না। আপনি ৮০ বছর বয়সী কোনো লেখককে চেনেন?
প্রশ্ন: ভাবছি, মনে পড়ছে না।
নাইপল: ঠিক তা-ই হওয়ার কথা। এমন কাউকে পাবেন কেমন করে? কোনো লেখক যদি ৩০ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন, তার বয়স ৫০ বা ৬০ হতে হতে তার কাজের বড় অংশ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। আর বয়স আশিতে পৌঁছতে তার আর কিছুই থাকার কথা নয়।
প্রশ্ন: যদিও আপনি ৬০ পেরিয়ে অনেকগুলো বই লিখেছেন?
নাইপল: হ্যাঁ, আমাকে লিখতে হয়েছে, কারণ বলার মতো আমার কিছু কথা ছিল।
প্রশ্ন: আরব বসন্ত নিয়ে আপনি ভাবছেন? আপনি কি একে অনিবার্য একটি প্রতিক্রিয়াশীল ও অনুদার আন্দোলন মনে করছেন, নাকি আরব বসন্ত নিয়ে আশাবাদী?
নাইপল: মোটেও আশাবাদী নই। আমি একে কিছুই মনে করি না। দেখলেন তো লিবিয়ায় বসন্ত কেমন করে মিলিয়ে গেল? শেষ পর্যন্ত সবকিছুই গুলিয়ে ফেলল। অন্য জায়গাতেও একই ঘটনা ঘটবে।
প্রশ্ন: আপনি বলছেন আরব বসন্তের কোনো আশা নেই?
নাইপল: আমি সে কথা বলিনি। আপনি জানতে চেয়েছিলেন— আমি একে বিরাট কিছু মনে করি কিনা। আমি মনে করি এটা কিছুই নয়। এ রকম আসবে আর যাবে, আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানে আবার ফিরে আসব।
প্রশ্ন: আমরা কোথা থেকে শুরু করেছিলাম?
নাইপল: গোলযোগ, এক ব্যক্তির শাসিত মুসলিম বিশ্ব, শেষ পর্যন্ত আবার এখানেই ফিরে আসে।
প্রশ্ন: মুসলিম বিশ্বে এমন কোনো স্থান কি রয়েছে, যার সম্পর্কে আপনি আশাবাদী?
নাইপল: আমি আশাবাদ কিংবা হতাশাবাদের আলোকে দেখতে চাই না— যেখানে যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থাতেই দেখি। আমি যখন ইন্দোনেশিয়া গিয়েছিলাম (১৯৮০ সালে), দেশটাকে খুব পছন্দ করেছিলাম। খুবই আকর্ষণীয় সভ্যতা, যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাদের সঙ্গে সুন্দর সময় কেটেছে। আমার সেই সফরের পর তারা অনেক ধার্মিক হয়ে গেছে। ইসলাম নিয়ে তাদের উদ্বেগ ছেড়েছে, এতে তারা পিছিয়ে পড়েছে।
প্রশ্ন: এমন কোনো ইংলিশ বা ব্রিটিশ লেখক কি আছেন, যার কাছে আপনি বারবার ফিরে যান?
নাইপল: না
প্রশ্ন: জর্জ এলিয়টের লেখা?
নাইপল: চাইন্ডহুড, দ্য মিল অন দ্য ফ্লস থেকে কিছুটা আমাকে পড়ে শোনানো হয়েছে। তখন তার দরকার ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাদ ও প্রয়োজন বদলায়। তাকে কিংবা বড় অন্য কোনো ইংলিশ লেখককে এখন আর ভালো লাগে না। আমি ডিকেন্সকেও পছন্দ করি না।
প্রশ্ন: আপনি জেন অস্টিনকেও পছন্দ করেন না; কেন, তা কি ব্যাখ্যা করবেন? আপনি মনে করেন তিনি একেবারেই তুচ্ছ।
নাইপল: হ্যাঁ, তার খুব তুচ্ছ একটা রোমান্টিক গল্প (প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস)। এতে আমার কিছু এসে যায় না।
নিচের সাক্ষাত্কারটি অনূদিত হয়েছে মেশ গুমোর নেয়া সাক্ষাত্কার থেকে :
প্রশ্ন: সম্পাদকের কী ভূমিকা হওয়া উচিত?
নাইপল: আমি মনে করি, একজন লেখকের লেখালেখিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত না। আমি চাই মানুষ তার নিজের মতো করে যতিচিহ্ন ব্যবহার করুক। জোসেফ কনরাডের যতিচিহ্ন ব্যবহার সবচেয়ে অদ্ভুত, জেমস জয়েস সারাক্ষণই তার যতিচিহ্নের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। অ্যান্থনি পাওয়েল বলেছেন, কমারও বৈচিত্র্য রয়েছে। যারা আমার লেখায় হাত বসিয়েছে, আমি তাদের ক্ষমা করিনি। ১৯৫৫ সালে লেখা মিগুয়েল স্ট্রিট উপন্যাসে ফিরে যেতে চাই। যিনি আমাকে দিয়ে একটি প্যারাগ্রাফ বাদ দিতে বাধ্য করেছেন, আমি তা আবার পুনরুদ্ধার করতে চাই। আমিই ঠিক ছিলাম, ভুল করেছেন আমার উপদেষ্টা।
প্রশ্ন: সে সময় তো পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করার মতো যথেষ্ট শক্ত আপনি ছিলেন না?
নাইপল: খুবই বিপন্ন দশায় ছিলাম। লেখার যদি কোনো গ্রাহক না থাকে, লেখা সম্পন্ন হয় না। এখন আমি সতর্ক, আমি চাই না আমার পাণ্ডুলিপি বেশি মানুষের কাছে থাক।
প্রশ্ন: আপনার স্ত্রীই তো এখন আগে পড়ে?
নাইপল: হ্যাঁ, সেটা জরুরি। যেমন লেখা হয়, তেমন অবস্থাতেই সে পড়ে। সম্পাদক হচ্ছেন তিনি, যিনি উৎসাহ দেন কিংবা যিনি সাড়া দেন, লেখকের প্রথম দিকে এর প্রয়োজন হয়।
এ অংশ তেহেলকা ডটকম থেকে—
২০০১ সালে তেহেলকা ডটকমকে দেয়া সাক্ষাত্কারে নাইপল বলেন, ভারতীয় লেখকরা জানেন না— কেন তাদের দেশের এই লেজে গোবরে অবস্থা।
নিজের ব্যাপক পরিচিতি, স্বীকৃতি ও সম্মান লাভের পরও তিনি এক কথায় সব অর্জনকে উড়িয়ে দিচ্ছেন বলেন: আই হ্যাড নো সাক্সেস— আমার কোনো সাফল্য নেই।
ভারতের তিনটি ধর্ম (হিন্দু, ইসলাম, শিখ) নিয়ে কেবল জঞ্জাল লেখা হয়েছে। ইএম ফস্টারের মতো মানুষ তিন ধর্মের কবিতা বানানোর ভান করছেন। এটা ভুয়া, এসব পুরোই জঞ্জাল।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন না— ইএম ফস্টার ভারতকে কিছু দিয়েছেন?
নাইপল: তিনি মানুষকে মিথ্যে বলতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি এমন একজন, যিনি ভারতের মানুষকে চিনতেন না। তিনি চিনতেন রাজসভা, কিছু মধ্যবিত্ত ভারতীয় এবং ভারতীয় বাগান বালক, যাদের তিনি মোহিত করতে চাইতেন! (নাইপল ফস্টারের সমকামী প্রবণতাকে কটাক্ষ করেন)।
কিছু লেখককে নাইপল সরকারি লেখক বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, সরকারি লেখক তারাই, যারা প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং সব ধরনের কর্তৃপক্ষের কোনো ক্ষতি করেন না। আমি লাতিন আমেরিকার কথা ভাবছিলাম। সেখানে সব লেখকই সরকারি লেখক হতে চেষ্টা করেছেন। তাদের কাছে যা চাওয়া হচ্ছে, তারা তা-ই লিখছেন। তাদের কাছে যা প্রত্যাশিত, কেবল তা-ই লিখছেন। তারা লাতিন আমেরিকাকে অনন্ত জঞ্জালের মধ্যে ফেলে রাখছেন। কারণ তারা কাউকে অসন্তুষ্ট করতে চান না। সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ায় লেজে-গোবরে অবস্থা বেড়েই চলেছে।
প্রখ্যাত লেখক জেমস জয়েস সম্পর্কে তার মন্তব্য: আমি তার লেখা পড়তে পারি না। তিনি অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন, অন্ধ লেখকের কাজ আমি বুঝতে পারি না। তিনি কোথায় বাস করতেন? ত্রিস্তে শহরে। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের শেষ সময় তখন। কিন্তু তিনি পৃথিবী নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি ডাবলিন নিয়ে লিখেছেন, এটাই তার কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকার জায়গা। তার ছিল ক্যাথলিক অপরাধবোধ— পৃথিবী নিয়ে তার আগ্রহ নেই।
প্রশ্ন: লেখককে কী করতে হবে?
নাইপল: মানুষের জন্য কোনো কিছুর ওপর আলোকপাত করতে হবে। দেখুন, আমি কোত্থেকে এসেছি। আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানকার ইতিহাস সম্পর্কে লিখতে হয়েছে— বিস্মৃত মানুষ সম্পর্কে। আমাকে ভারত সম্পর্কে লিখতে হয়েছে; আমার নিজস্ব ভঙ্গিতে আমি দেখতে চেয়েছি। এজন্য অনেক শ্রম দিতে হয়েছে।
নাইপল উপন্যাস নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন; সবাই উপন্যাস লেখেন— সবই নকল। তার আগ্রহ মূল লেখা— অরিজিনাল লেখায়।
প্রশ্ন: কাদের আপনি অরিজিনাল মনে করেন?
নাইপল: ফ্লবেয়র, গোগোল, বালজাক— আমি গদ্যের কথা বলছি। মোপাসা মৌলিক। আর কিপলিংয়ের ভারতীয় গল্প মৌলিক।
প্রশ্ন: আর ডিকেন্স?
নাইপল: ডিকেন্সের প্রথম দিককার লেখা। একটা সময়ের পর নিজেকে নিয়ে মশকরা ডিকেন্সকে পেয়ে বসে।
প্রশ্ন: তিনি নিজেকে অনুকরণ করতেন?
নাইপল: নিজেকে নিয়ে মশকরায় তার মৃত্যু ঘটে।
প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত সাক্ষাত্কারের অংশবিশেষ:
প্রশ্ন: আপনি কি একটি বৃহত্তর পৃথিবীর ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠেছেন— বিশ্ব শব্দটি যে ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে?
নাইপল: আমি সবসময়ই জানতাম, বাইরে একটি পৃথিবী আছে। আমি যে কৃষিভিত্তিক ঔপনিবেশিক সমাজে বেড়ে উঠেছি, আমি তা মেনে নিতে পারিনি। অন্য কোনো কিছু এর চেয়ে বেশি বিষণ্ন ও সীমিত করতে পারে না।
প্রশ্ন: আপনি অক্সফোর্ডে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ১৯৫০ সালে ত্রিনিদাদ ছেড়ে যান— উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সমুদ্র পেরিয়ে নির্বান্ধব দেশে। আপনি আসলে কী চাচ্ছিলেন?
নাইপল: আমি খুব বিখ্যাত হতে চেয়েছিলাম। আমি একজন লেখকও হতে চেয়েছি— লেখার জন্য বিখ্যাত। আমার উচ্চাশার অবাস্তব দিকটি হচ্ছে, আমি কী লিখতে যাচ্ছি— সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। বাস্তবে আমার অনেক আগেই আকাঙ্ক্ষাটি চলে আসে। চলচ্চিত্র নির্মাতা শ্যাম বেনেগাল আমাকে বলেছেন, ছয় বছর বয়স থেকেই তিনি জানতেন— তিনি সিনেমা বানাবেন। আমি তার মতো এতটা আগে থেকে সচেতন হইনি। দশ বছর বয়স থেকে জানি আমি লেখক হতে যাচ্ছি।
আমি ঔপনিবেশিক সরকারের বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ডে যাই; এতে নিশ্চয়তা ছিল— আমি যেকোনো পেশা বেছে নিতে পারি। আমি ডাক্তার, প্রকৌশলী হতে পারতাম। কিন্তু অক্সফোর্ডে কেবল ইংলিশ পড়তে চেয়েছি। তার কারণ এই নয় যে, বিষয়টি ইংলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি অক্সফোর্ড; একমাত্র কারণ ত্রিনিদাদ থেকে অনেক দূরে। আমি ভেবেছি তিন-চার বছর বাইরে থাকব। আমি নিজের সম্পর্কে শিখতে পারব। ভেবেছি আমার রসদ আমি পেয়ে যাব এবং বিস্ময়করভাবে লেখক হয়ে উঠলাম। একটি পেশা শিক্ষার বদলে গতানুগতিক অর্থহীন একটি ডিগ্রি বেছে নিলাম, এর আদৌ কোনো মূল্য নেই।
আমি ত্রিনিদাদ থেকে পালাতে চেয়েছিলাম। ঔপনিবেশিক জীবনের ক্ষুদ্রতা আমাকে পিষে মারছিল, যার (বিশেষ করে আমার ভারতীয় হিন্দু পারিবারিক প্রেক্ষাপটের কারণে) তীব্র পারিবারিক বিরোধ, যেখানে নৈতিক যুক্তিতে মানুষের বিচার হতো এবং তাকে নিন্দিত হতে হতো— আমাকে যাতনা দিচ্ছিল। এটা কোনো উদার সমাজ ছিল না— ঔপনিবেশিক বিশ্বটিও নয়, হিন্দু বিশ্বও নয়। আমি ভাবতাম বৃহত্তর পৃথিবীতে মানুষ যে রকম, সেভাবেই তার মূল্যায়ন হবে। সেভাবেই মানুষকে আকর্ষণীয় মনে হবে।
ভাবতাম সারাক্ষণ এ নৈতিক বিচারের পাত্র হয়ে থাকতে আমি রাজি না। আপনি যা বলছেন, মানুষ হয়েতো তার প্রতি আগ্রহী হবে, অথবা আগ্রহ দেখাবে না। এটাই ইংল্যান্ডে ঘটেছে, সেখানে মানুষকে দেখার একটি উদার পন্থার সন্ধান পাই, এ সমাজ আমার কাছে আরো উদার মনে হয়।
প্রশ্ন: আপনি কি অক্সফোর্ড উপভোগ করেছেন?
নাইপল: আসলে আমি অক্সফোর্ডকে ঘৃণা করতাম, ওইসব ডিগ্রি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওইসব ধারণার প্রতি আমার ঘেন্না জন্মেছিল। আমার প্রস্তুতি তার চেয়ে বেশি ছিল। আমার কলেজ কিংবা কোর্সে যারা সহপাঠী ছিল, আমি তাদের অধিকাংশের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান ছিলাম। আমি গর্ব করছি না— সময়ই সব প্রমাণ করে দিয়েছে। এক অর্থে আমি বহির্বিশ্বের জন্য নিজেকে বড় বেশি প্রস্তুত করেছি। অক্সফোর্ডে এক ধরনের নির্জনতা ও হতাশা ছিল। আমি চাইব না কেউ এর মধ্য দিয়ে যাক।
প্রশ্ন: কখনো কি ভেবেছেন ত্রিনিদাদে থাকলে আপনি কী হতেন?
নাইপল: আমি হয়তো নিজেকে হত্যা করতাম। পীড়ন থেকে আমার এক বন্ধু তা-ই করেছে। সে মিশ্র প্রজাতির একটি বালক। চমত্কার, উজ্জ্বল একটি বালক। এটা খুব বড় অপচয়।
প্রশ্ন: আপনি কেমন করে লেখেন?
নাইপল: খুব ধীরে ধীরে।
প্রশ্ন: সবসময়ই?
নাইপল: আমার বয়স যখন সত্যিই কম ছিল, আমি বেশ দ্রুত লিখতাম— দিনে প্রায় এক হাজার শব্দ। এখন তা করতে পারি না। এখন যে দিনটা ভালো যায়, প্রায় তিনশ শব্দ লিখি— কমই।
প্রশ্ন: একদম লেখেননি, এমন হয়েছে?
নাইপল: প্রায়ই হচ্ছে। অধিকাংশ দিনেই।
প্রশ্ন: যেদিন হেমিংওয়ে লিখতে পারতেন না, সেদিনটা তার জন্য মৃত্যুর প্রায় তুল্য, তিনি বলেছেন।
নাইপল: আমি সে রকম রোমান্টিক নই। আমি তখন বরং বিরক্ত বোধ করি। কিন্তু জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে এখন বেশ বুঝতে পারি, এটা ঠিক হয়ে যাবে। এটা যদি আমার মাথায় থাকে, একসময় তা বেরিয়ে আসবে। এটা কেবল সঠিক পথটা খুঁজছে।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন ভাষার কাজ শুধু সংযোগ সাধন করা— জন আপডাইক যেমন বলেছেন নাচা, ঝলসে দেয়া তেমন নয়?
নাইপল: মানুষে যা করতে চায় তা-ই করবে। আমি চাই আমার গদ্য স্বচ্ছ হোক। আমি চাই না আমার লেখা পড়তে গিয়ে কেউ হোঁচট খেয়ে পড়ুক। যা বলছি, যা বর্ণনা করছি, আমি চাই পাঠক তার ভেতর দিয়ে দেখুক। আমি চাই না তিনি কখনো বলুন, ওহ গুডনেস, কী চমত্কারভাবে লিখেছে? সেটা বরং ব্যর্থতা।
আরো কিছু নাইপলীয় বিষয়
ইংল্যান্ডের উইন্টশায়ারে তার সাক্ষাত্কার নিতে আসা বিবিসির একজন নারী রিপোর্টার সম্পর্কে বললেন ‘মেয়েটি এত অল্প শিক্ষিত। আমাকে বলল, ‘আপনি কি বইটি দেখাতে পারেন? তাহলে বইটি হাতে ধরুন’— এটা অসহ্য।
গান্ধিয়ান হিপোক্রেসি: সবকিছুর জন্য গান্ধীজি ব্যবস্থাপত্র দিয়ে রেখেছেন, এমনটা মনে করা উচিত নয়। তিনি অশিক্ষিত ছিলেন এবং কখনো তিনি চিন্তাবিদ ছিলেন না। তিনি একজন ঐতিহাসিক চরিত্র। একটি বিশেষ সময়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি তার সব ঘাটতিকে ধর্মে পরিণত করেছেন। তিনি ধর্ম দিয়ে দেশকে এমনভাবে জাগিয়েছেন, যা কোনো শিক্ষিত নেতা করতেন না। একালের জন্য তার কোনো বার্তা নেই। মানুষ গান্ধী সম্পর্কে বড্ড বেশি বকবক করে, কিন্তু তাকে কম পাঠ করে। তার প্রথম বই ‘হিন্দু স্বরাজ’ ১৯০৯ সালে শ্বেত-উষ্ণতায় এমন অর্বাচীনের মতো লেখা যে, এমনকি তার একনিষ্ঠ ভক্তেরও চুল বাঁকা হয়ে যাবে। সত্যিই গান্ধী পড়েছেন, এমন কোনো ভারতীয়র সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তারা গান্ধীর কাছ থেকে পবিত্র ত্রাণকর্তার একটি অস্পষ্ট ধারণা গ্রহণ করে, কিন্তু গান্ধীর যে ব্যবহারিক দিক— নোংরা ও জনব্যবহার্য স্থানে মলত্যাগ ঘৃণা করতেন, তা এড়িয়ে যায়।
নেহরু-গান্ধী রাজতন্ত্র— এ নিয়ে আপনি কী মনে করেন?
নাইপল: এ নিয়ে কথা বলে অবশ্যই আমাদের সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। ১৮১০ সালে স্প্যানিশরা নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলে স্প্যানিশ দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলোর যে অবস্থা হয়েছিল, ১৯৪৭-পরবর্তী ভারতের অবস্থা মোটামুটি সে রকমই। সে সময় সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি উত্থাপন হতো তা গণযুদ্ধ নিয়ে। এখন যে বড় প্রশ্নটি আসে, তা হচ্ছে ‘স্থানীয়দের মধ্যে কে আমাদের শাসন করবে। নেহরু পরিবার অনেক বছর ধরে এ নিশ্চয়তা দিয়েছে, ভারত তাদের পেয়ে ভাগ্যবান; কিন্তু ভারতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এখন যেহেতু গড়ে উঠেছে, তাদের আর প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন: ভারতে গণতন্ত্র ঝুঁকির মুখে নয়, কিন্তু পাকিস্তান কেন সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের দিকে বারবার পিছলে যাচ্ছে?
নাইপল: বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তান শিক্ষিত ছিল না। এখানে বলতে গেলে কোনো রাজনৈতিক চিন্তাবিদও নেই। এখানে ছিল প্রায় ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসন ও প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান নাকচ করে দেয়া সহজ ছিল। জিন্নাহ আকর্ষণীয়, ধর্ম-নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কিন্তু ইরানে ইসলামিক আন্দোলনের যে ফাঁদ; তিনি পাকিস্তানে তা-ই সৃষ্টি করেছিলেন। মনে করা হলো, যথার্থ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে এ সরোবর থেকেই সবকিছু প্রবাহিত হবে: ভালো প্রতিষ্ঠান, ভালো আইন, আদর্শ নাগরিক। এর বাইরে চিন্তা করার কোনো দরকার ছিল না; বিশ্বাসের সঙ্গে সবকিছু চলে আসবে। তারাও ছিল ধর্মান্তরিত এবং সে কারণে ধর্মোন্মাদ। আরবদের মধ্যে সিরিয়ার কবি আদুনিস রয়েছেন, যার কাছে ইসলাম তার ভূমধ্যসাগরীয় পরিচিতির একটি দিক মাত্র। কিন্তু ধর্মান্তরিতদের সে ধরনের নিরাপত্তা থাকে না। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ যেমন, ইসলামিক সমাজ তেমন নয়। তারা নবীজির সৃষ্ট রাষ্ট্রের প্রতিস্থাপনের কথা বিস্ময়কর মাত্রায় স্মরণ করে। ইসলামিক সমাজের চাই কোরআন, আইন এবং কঠোর শাসক।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন ভারত ভেঙে ছোট জোন ব্যবস্থাপনা সহজ ইউনিটে পরিণত হলে ভারত ভালো করবে?
নাইপল: এটা বড় বোকামি হবে। এখানকার মানুষ স্বাধীন হয়েছে খুব বেশি আগে নয়। বিভিন্ন ধরনের লোকরঞ্জনবাদী ধারণায় তারা প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু বড় সংগঠন নিজেদের হাত থেকে এর পরস্পরকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। বিহার ও তামিলনাড়ুর মানুষকে সারাক্ষণই পরস্পরের হাত থেকে রক্ষা পেতে হয়। আরো বিস্তারিত পর্যালোচনায় এটা বলা যায়, বিপ্লবের দু-তিন বছরের মধ্যে ইরান নিজেদের রক্ষা করার একটি প্রক্রিয়া আবিষ্কার করতে পেরেছে।
প্রশ্ন: ভারতীয়রা দেশের ভেতর মধ্যম মানের, কিন্তু বিদেশে গেলে এত ভালো করে কেমন করে?
নাইপল: ইউরোপে ও যুক্তরাষ্ট্রে তারা ভালো করে, কারণ সমাজ, সমাজের উত্কর্ষ প্রয়োজন। ভারতে উত্কর্ষের প্রয়োজন নেই, ফলে মানুষ সংকুচিত হয়ে যায়।
সালমান রুশদি বলেছেন, নাইপল ফ্যাসিবাদের সহযাত্রীর মতো আচরণ করছেন, তিনি নোবেল পুরস্কারকে কলঙ্কিত করেছেন।
নাইপলের ভারত-ঘৃণা, ইসলাম-আতঙ্ক, সহলেখকদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য, স্ত্রী প্যাট্রিশিয়ার সঙ্গে দানবীয় আচরণ— সবকিছু ছাপিয়ে তিনি বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন। ফিকশন ও নন-ফিকশন দুটোতেই সমান পারঙ্গম দ্বিতীয় কোনো কথাসাহিত্যিকের দেখা গত অর্ধশতকে মেলেনি।






