মোগল আমলের বাংলার ইতিহাস বৈচিত্র্যময়। আকবরের সময়কালে বাংলা জয় করার জন্য তিনি মোগল সেনাপতিদের অধীনে সৈন্য প্রেরণ করেন। মোটামুটি ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে আকবরের শাসনামলের বাকি সময় পর্যন্ত তিনি বাংলায় দশের অধিক সেনাপতির অধীনে সৈন্য প্রেরণ করলেও বাংলায় মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাদশাহ আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলার অধিকাংশ অঞ্চল মোগল শাসনাধীনে আসে। তবে এ সফলতার পেছনে জাহাঙ্গীরের তুলনায় বাংলার তত্কালীন সুবাদার ইসলাম খান চিশতির কৃতিত্ব অধিক। শেখ সেলিম চিশতির পৌত্র ইসলাম খানকে বাদশাহ জাহাঙ্গীর বাংলার দায়িত্ব দিয়ে পাঠাতে চাইলে তার সভাসদরা এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ বছরে ইসলাম খান বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করার মাধ্যমে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেন।
প্রায়
কোনো প্রকার রাজনৈতিক জ্ঞান, যুদ্ধকৌশল না জানা ইসলাম খানকে জাহাঙ্গীর প্রায় হঠাৎই বাংলার সুবাদার পদ দিয়েছিলেন। কুতুবউদ্দীন কোকা ও জাহাঙ্গীর কুলির পরপর মৃত্যু হলে ইসলাম খানকে বাংলার সুবাদারিতে নিযুক্ত করা হয়। বাংলার পূর্বে তিনি বিহারের সুবাদারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ইসলাম খান ঠিক কবে বাংলায় আগমন করেন তার স্পষ্ট উল্লেখ নেই। তবে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দের ৬ মে বাদশাহ জাহাঙ্গীর, জাহাঙ্গীর কুলির মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ামাত্র ইসলাম খানকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। সে হিসাবে ওইদিন থেকেই ইসলাম খান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলার সুবাদার। নিযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম খান চার হাজার পদাতিক এবং তিন হাজার ঘোড়সওয়ারের মনসব লাভ করেন।
পরের
মাসে অর্থাৎ জুন নাগাদ ইসলাম খান বাংলার তত্কালীন রাজধানী রাজমহলে আগমন করেন। ইসলাম খানের যে অলিখিত দায়িত্বটি ছিল তা হলো বাংলার অধিকাংশ বা সম্ভাব্য অঞ্চল মোগল শাসনাধীনে আনা। বাংলার ভৌগোলিক পরিবেশ, জলবায়ু এবং অন্যান্য কারণে ইসলাম খানে পূর্বসূরি সুবাদাররা বাংলায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি। এক্ষেত্রে মোগল সুবাদারদের সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা ছিল বারোভূঁইয়াখ্যাত বাংলার একদল স্বাধীন ভূস্বামী। আকবরের সময়ে টোডরমল বাংলার ভূমিব্যবস্থা নতুন করে সাজিয়েছিলেন। কিছু অংশ মোগল শাসনাধীনেও এসেছিল কিন্তু মোগল কর্মচারীদের দুর্নীতি, অদক্ষতা ও নানাবিধ কারণে এ ভূস্বামীরা ক্রমাগত বিদ্রোহ করে চলে। ইসলাম খান বুঝেছিলেন বাংলায় মোগল অধিকার দৃঢ় করতে এ ভূস্বামীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ কাজের জন্য ইসলাম খান প্রথমেই নির্দিষ্ট কিছু কর্মপরিকল্পনা করেন।
ইতিহাসবিদ
আবদুল করিম তার বাংলার
ইতিহাস:
মোগল
আমল বইয়ে ইসলাম খানের কর্মপরিকল্পনার মূল ছয়টি বিষয় উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে জানা যায় ইসলাম খান মূলত ঘর থেকে সংস্কার শুরু করেন। তিনি তার অধীনে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব ও পদ পুনর্বিন্যাস করেন। বারোভূঁইয়াদের দমন করার জন্য স্থিরপ্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম খান বুঝেছিলেন যে নদীমাতৃক বাংলার স্থানীয় ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে মোগলদের নিজস্ব নৌবাহিনী তৈরি করতে হবে। নতুন দিওয়ান নিয়োগ, যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বন্দিদের নিয়ে করণীয় সম্পর্কে নীতিগত সিদ্ধান্তে তিনি কিছু পরিবর্তন আনেন (বর্তমান নিবন্ধের পরবর্তী পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে)। এ সম্পর্কে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে অনুমোদনের জন্য বাদশাহর কাছে পাঠানো হলে জাহাঙ্গীর তাকে লেখেন, ‘প্রদেশের
ভূতপূর্ব দিওয়ান উজীর খান, মাসুম খানের পুত্রবৃন্দ এবং লাচি খান যারা গোলযোগের কারণ, তাদের বন্দি করে দরবারে প্রেরণ করা হোক।’ বাংলায় নিজ পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করার ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরের পক্ষ থেকে ইসলাম খান সর্বাত্মক সমর্থন ও সহায়তা লাভ করেছিলেন।
বাংলায়
ইসলাম খানের সুবাদারির পুরোটা সময়ই যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে কাটে। প্রথমে তিনি বারোভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে অভিযানের চিন্তা করেন। কিন্তু ভূঁইয়াদের পাশাপাশি মোগলদের মাথাব্যথার আরেক কারণ ছিল আফগানরা। ইসলাম খান রাজমহলে থাকা অবস্থাতেই আলাপসিংহ অঞ্চলে খাজা উসমান বিদ্রোহ করে। এ বিদ্রোহ দমনে গিয়াসউদ্দীনের অধীনে সৈন্য প্রেরণ করা হলে তারা প্রাথমিক বিজয় পায়। ভূঁইয়া দমনে ইসলাম খানের অভিযান শুরু করার আগেই যশোরের ভূঁইয়া প্রতাপাদিত্য নিজ পুত্রসহ শেখ বাদী নামক দূতের মাধ্যমে উপঢৌকনসহ ইসলাম খানের কাছে পাঠান।
আকবরের
শাসনামলে উত্তর-পূর্ব ভারতের আফগানদের দমন করা হলে তারা বাংলায় এসে আশ্রয় গ্রহণের পাশাপাশি এ অঞ্চলে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করছিলেন। দাউদ খান কররানীর পতনের পর আফগানরা অনেকে উড়িষ্যায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। ভূঁইয়াদের দমনের পাশাপাশি ইসলাম খান এ সময় বীরভূম, পাচেট ও হিজলী অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। শেখ কামালের অধীনে দুই হাজার অশ্বারোহী এবং চার হাজার পদাতিক সৈন্য দিয়ে তিনি বীরভূমের বীর হাম্বীর, পাচেটের শামস খান ও হিজলীর সলীম খানের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন। বীর হাম্বীর বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন এবং ইসলাম খানের সেনাদের নিজে শামস খানের রাজ্যে নিয়ে যান। কিন্তু শামস ১৫ দিন পর্যন্ত মোগল সেনার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। শামসের পতনের হিজলীর সলীম খানের বিরুদ্ধে আগ্রসর হলে সলীম খান যুদ্ধ না করা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন। তিন ভূস্বামী ও তাদের দেয়া উপহারসহ শেখ কামাল আলাইপুরে ইসলাম খানের সঙ্গে মিলিত হন।
ইতিহাসের
আলোচনায় কোনো কোনো স্থানে ইসলাম খানকে স্বেচ্ছাচারী বলে উল্লেখ করা হয়। মূলত ইসলাম খান সন্দেহপ্রবণ এবং ক্রোধী ব্যক্তি ছিলেন। ভূষণার রাজা সত্রাজিৎ (শত্রুজিৎ বলেও পরিচিত) নিজে এসে সুবাদারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করায় তিনি সত্রাজিতের বিরুদ্ধে ইফতেখার খানকে পাঠান। সত্রাজিৎ মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেও ব্যর্থ হন। ইফতেখার খানের কাছে সত্রাজিৎ আত্মসমর্পণ করলে ইফতেখার তাকে ‘পুত্র’ বলে সম্বোধন করেন। ইসলাম খান আলাইপুর থেকে ফতেহপুরে গেলে সেখানে সত্রাজিৎ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সুবাদারকে ১৮টি হাতি উপহার দেন। ইসলাম খান সত্রাজিৎকে নিজ অঞ্চলে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেন কিন্তু শর্ত দেন যে অন্যান্য ভূস্বামীর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার সময় সুবাদারকে সৈন্য এবং উপকরণ দিয়ে সহায়তা করতে হবে।
জাহাঙ্গীরের
সভাসদরা ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অনভিজ্ঞতার প্রশ্ন তুলেছিলেন কিন্তু বাংলায় ইসলাম খান যুদ্ধ এবং রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। তার পূর্বের সুবাদাররা যুদ্ধে পরাজিত ভূস্বামীদের মুক্ত করে দিলেও ইসলাম খান এ নীতিতে সামান্য পরিবর্তন আনেন। তিনি পরাজিত বা আত্মসমর্পণকারী ভূস্বামীদের এই মর্মে শর্ত প্রদান করতেন যে অন্যান্য ক্ষেত্রে সৈন্য এবং অর্থসহায়তা প্রদান করলেই তারা কেবল ‘স্বাধীন’ থাকতে পারবেন। নিম্নবঙ্গের ভূস্বামীদের মধ্যে কখনো ততটা জোটবদ্ধতা ছিল না। কিন্তু ইসলাম খানের নীতির মাধ্যমে তাদের মধ্যে জোট গঠন করার সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়। বাংলায় একের পর বিজয় লাভ করার পেছনে একটি কারণ ছিল ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ক্রমেই আক্রান্ত হয়ে অঞ্চলের প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়া, ইসলাম খানের সুসংগঠিত নৌবহর এবং তার বিভাজনের রাজনীতি। বিভাজনের পাশাপাশি রণকৌশলে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।
ইসলাম
খান কেবল নিম্নবঙ্গ বা ভাটি জয় করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বাংলার উত্তরে (বর্তমানে এ অঞ্চল বাংলার বাইরে) কামতা, কামরূপেও নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। রাজমহল থেকে বেরিয়ে ঘোড়াঘাটে থাকাকালীন তিনি কামতার লক্ষ্মীনারায়ণ এবং কামরূপের পরীক্ষিত নারায়ণকে আনুগত্য জানাতে দূত প্রেরণ করেন। সুসঙ্গের জমিদার রঘুনাথের মাধ্যমে লক্ষীনারায়ণ আনুগত্য জানান। পরীক্ষিত আনুগত্য প্রকাশে অস্বীকার করলে আবদুল ওয়াহিদকে সেনাপতি করে পরীক্ষিতকে দমন করতে প্রেরণ করেন। কিন্তু ওয়াহিদ এ কাজে ব্যর্থ হয়ে আগ্রা পলায়ন করলে সুবাদার ইসলাম খান সম্রাটের কাছে সে খবর দেন। এরপর ভাটি অভিযানের কারণে পরীক্ষিতের দিকে তিনি আর মনোযোগ দেননি। জীবনের শেষ পর্যায়ে ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে শেষ অবধি পরীক্ষিতকে পরাজিত করেন তিনি। এর আগে ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে বায়েজিদ কররানীও পরাজয় স্বীকার করেছিল। সব মিলিয়ে সিলেট অঞ্চলের বানিয়াচং পর্যন্ত তিনি অভিযান করে সফল হয়েছিলেন। কাছাড়ও তার হস্তগত হয়েছিল। কিন্তু ইসলাম খানের অভিযান বা বিজয় অভিযানের মধ্যে রাজনীতি ও যুদ্ধনীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ বারোভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে তার অভিযান। বিশেষত প্রতাপাদিত্য ও মুসা খানের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘ অভিযান এবং সফলতা বাংলায় মোগল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল।
ইসলাম
খান বাংলায় আগমন করেই ভাটি অভিযানের সিদ্ধান্ত করেছিলেন। ঘোড়াঘাটে থাকা অবস্থায় অর্থাৎ ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। প্রথম পর্যায়ে সত্রাজিৎ আনুগত্য প্রকাশ করলে তাকে বলা হয়েছিল ফতেহাবাদ (বর্তমান ফরিদপুর) অভিযানের সময় সৈন্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে। প্রতাপাদিত্য ঘোড়াঘাটের পথে বজ্রপুরে ইসলাম খানের সঙ্গে দেখা করেন। মির্জা নাথানের বাহারীস্তান অনুসারে সুবাদার তাকে দেশে ফিরে যেতে বলেন এবং বলেন প্রতাপপুত্র সংগ্রামাদিত্যকে ৪০০ নৌকাসহ পাঠানোর আদেশ করেন। এও জানিয়ে দেন যে সংগ্রমাদিত্য মূলত মীর বহর ইহতিমাম খানের অধীনে এ নৌবহরের দায়িত্ব পালন করবে। খোদ প্রতাপকে ২০ হাজার পদাতিক, ১০০ নৌকা এবং এক মণ বারুদ নিয়ে ভাটি অভিযানে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এখানে ‘ভাটি’ বলতে মুসা খানের শাসন অঞ্চলের কথা বোঝানো হয়েছে।
মুসা
খানের উদ্দেশে ইসলাম খান যাত্রা করার সঙ্গে সঙ্গে নবগঠিত মোগল নওয়ারা তথা নৌবহরের প্রধান ইহতিমাম খানকেও অগ্রসর হওয়ার আদেশ করেন। বাহারীস্তান
বলে ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দের ঈদুল ফিতর হয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর এবং ঈদ উৎসব সুবাদার ইসলাম খান এবং ইহতিমাম খান একত্রে শাহজাদপুরে পালন করেন। অর্থাৎ মুসা খানের বিরুদ্ধে ডাকছড়া এবং যাত্রাপুরের যুদ্ধ ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। কাটাসগড় পার করে মোগল বাহিনী মুসা খানের এলাকার সীমানায় চলে আসে। এখানে যাত্রাপুরে মুসা খানের দুর্গ ছিল। মির্জা মুনিম, দরিয়া খান এবং মাধব রায়কে মুসা খান দুর্গ রক্ষার দায়িত্ব দেন। অন্যদিকে সুসঙ্গ এর জমিদার রঘু রায়ের পরামর্শে কাটাসগড় থেকে যাত্রাপুর পর্যন্ত প্রতিবন্ধক দেয়াল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর মুসা খান তার অনুসারীদের নিয়ে ইছামতি নদীতে আসেন। আবদুল করিম বলছেন, মুসা খানের সঙ্গে জালিয়া, ধুরা, সুন্দর, বজরা এবং খেলনা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের মোট ৭০০ নৌকা ছিল। রাতারাতি তিনি ডাকছড়া নামক স্থানে একটি সুউচ্চ ও দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করেন।
ডাকছড়া
দুর্গ কেন্দ্র করে ইসলাম খানের মোগল বাহিনী ও মুসা খানের বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ হয়েছিল। মির্জা নাথানের বইয়ে যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। তার বরাত দিয়ে আবদুল করিম লিখেছেন, ‘যদিও
মিরযা নাথান বলেন যে মোগল বাহিনী ভুঁঞাদের অনেক ক্ষতি করে, প্রকৃতপক্ষে কোন পক্ষের জয় হয়েছে বলে মনে হয় না। বার-ভুঁঞার ডাকছড়া দুর্গ তখনও তাদের অধিকারে ছিল, ইসলাম খান এই দুর্গ জয় করতে পারেননি, এবং মুসা খান বা বার-ভুঁঞাকে তাদের অবস্থান থেকে হটাতে পারেননি।’ আবদুল করিম যদিও একে ‘বারো ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে’ ইসলাম খানের যুদ্ধ বলছেন কিন্তু এখানে ভূঁইয়া মূলত একজনই ছিলেন, তিনি মুসা খান। বারোভূঁইয়ার অন্যান্য ভূঁইয়ার সঙ্গে পৃথকভাবে তার সংঘর্ষ হয়েছিল। যেমন মুসা খানের বিরুদ্ধে যখন ডাকছড়ায় সংঘর্ষ চলছিল একই সময় তিনি শেখ হাবীবউল্লাহর নেতৃত্বে ফতেহাবাদ পরগনার মজলিস কুতুবের বিরুদ্ধে সেনা পাঠান। এতে দুটো সুবিধা ছিল। একই সময়ে দুই অঞ্চলে যুদ্ধ হলে কোনো ভূঁইয়া একজন অন্যজনকে সহায়তা করার সুযোগ লাভ করত না। স্থানীয় জনগণ মোগল বাহিনীর আগ্রাসী মনোভাব এবং যুদ্ধংদেহী অবস্থা লক্ষ করে লড়াইয়ের জন্য মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলত।
এদিকে
মুসা খান বুঝেছিলেন যে মোগলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তিনি আত্মসমর্পণ করে চুক্তি করার চিন্তা করেন কিন্তু তার ভাইয়েরা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবু মুসা খান, ইসলাম খানের সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে একটি অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে মুসা খান ফের বিদ্রোহ করেন। এ পর্যায়ে ইসলাম খান ডাকছড়া থেকে মনোযোগ সরিয়ে যাত্রাপুরে আনেন। নৈশ আক্রমণের মাধ্যমে তিনি যাত্রাপুর দখল করেন। একই সঙ্গে এ সময় ইসলাম খানের নির্দেশে ডাকছড়া দুর্গ আক্রমণ করে মোগল সেনাপতিদের পরিশ্রমে ডাকছড়া দুর্গও দখল করা সম্ভব হয়। বাহারীস্তান
অনুসারে, ডাকছড়া আক্রমণ এবং দখলে মির্জা নাথানের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। আবদুল করিম তার গবেষণায় দেখেছেন ডাকছড়া দখল সম্পর্কে নাথানের বর্ণনা ছাড়া কোনো সূত্র নেই। তবে নাথানের কৃতিত্ব তিনি অস্বীকারও করেননি।
মুসা
খানের বিরুদ্ধে এ পর্যায়েই ইসলাম খান চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেননি। পরবর্তী সময়ে তিনি খিজিরপুর থেকে মুসা খানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ করেন। মির্জা নাথান ১৬১১ খ্রিস্টাব্দের মার্চে মুসা খানের ভাই দাউদ খানের বিরুদ্ধে জয়ী হন। এরপর নাথান সোনারগাঁ আক্রমণ করেন। এ সময়ে ফিরিঙ্গিদের হাতে দাউদ খানের মৃত্যু হলে মুসা খান ভেঙে পড়েন এবং এক সময় মোগল বশ্যতা স্বীকার করেন। মুসা খানের পতনের মধ্য দিয়ে ঢাকায় ইসলাম খানের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলাম
খান ঢাকার সুবাদার বা ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা বলে পরিচিতি হলেও বৃহত্তর বাংলায় তার সাফল্য খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে (সম্ভবত ডিসেম্বরে) তিনি প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠান। প্রতাপ যেন কোনো প্রকার সহায়তা না পায়, সে কারণে একই সময় তিনি বাকলায় রামচন্দ্র রায়কেও আক্রমণ করেন। নিম্ন বঙ্গে ইসলাম খানের এ আক্রমণের ইতিহাস বিস্তৃত। উভয় ক্ষেত্রেই ইসলাম খান জয়ী হয়েছিলেন। বাংলার স্থানীয় ভূস্বামী, জনগণের বহু ক্ষতি সাধিত হয়েছিল সন্দেহ নেই। তবে চট্টগ্রাম বাদে সারা বাংলায় মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব ইসলাম খানকে দিতেই হয়।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





