আমরা দেখেছি, স্বয়ং সম্রাট জাহাঙ্গীর ইসলাম খান সম্বন্ধে কী উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন, বিশেষ করে তার সাহসিকতা ও বীর্যবত্তা সম্পর্কে তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। মাসির-উল-উমারায়ও তার ভূয়সী গুণগান কীর্তিত হয়েছে। যেমন এতে বলা হয়েছে:

তিনি উন্নত প্রকৃতি ও সুপ্রচুর সত্গুণের অধিকারী ছিলেন এবং বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়মহলেও ছিলেন সুবিদিত। চমকপ্রদ তাঁর ইতিহাস। তাঁর সদাচার ও মহত্ত্ব এমনই ছিল যে, সম্ভবত তিনি জীবনে কখনো মদ্যপান করেননি বা অন্য কোনো হারাম (ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ) জিনিস ছুঁয়ে দেখেননি। তাঁর হূদয়বত্তা ও বদান্যতা হাতিম (তাই) ও মা’নের কাহিনীকেও হার মানায়।

আধুনিক ঐতিহাসিক-গবেষকরাও তার সম্পর্কে উচ্চারিত এসব মন্তব্যের সঙ্গে কমবেশি ঐকমত্য পোষণ করেন। যেমন B.C. Allen লিখেছেন:

ঢাকার প্রথম নবাব ইসলাম খান ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান, ব্যক্তিগত আচার-অভ্যাস ও পোশাক-আশাকে ছিলেন সহজ-সরল, কিন্তু নবাব হিসেবে তিনি রাজকীয় শান-শওকত অনুসরণ করতেন।

সুধীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য তার ভূয়সী স্তুতিবাদ করেছেন এভাবে:

ইসলাম খান নামে পরিচিত শেখ আলাউদ্দিন, নতুন শাসনকর্তা বা সুবাদার হিসেবে যদিও তরুণ ও কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ছিলেন। তবে তাঁর চরিত্রে এমন কিছু সদাচারের সমন্বয় ঘটেছিল, যা তাঁর ঐ পদের জন্য ছিল উপযুক্ত। ব্যক্তিগতভাবে সাহসী ও মিতাচারী হলেও তন্বিষ্ঠ কর্তব্যপালনে তিনি অমিত পৌরুষ ও দৃঢ়চিত্তের পরিচয় দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য সাধনে তাঁর অবিচল মনোভাব, পক্ষপাতহীন ন্যায়বিচার ও সঙ্কটময় মুহূর্ত উত্তরণের পারঙ্গমতা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তবে তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে উল্লেখনীয় বিশেষত্ব হলো তাঁর রাজকীয় আদব-কায়দা, একনায়কতান্ত্রিক চালচলন ও উচ্চাভিলাষ।

এককথায় বললে, সুবাদার ইসলাম খান ছিলেন উন্নত চরিত্রের মানুষ। তবে প্রতিটি ভালো মানুষের চরিত্রে যেমন কিছু দোষ থাকে, তা তিনি যত মহৎ ও উদার হূদয়ের অধিকারীই হন না কেন, চিরাচরিত মানবীয় দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতা তার অজান্তে হলেও থেকে যায়, তিনিও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি তত্কালীন সুবা বাংলার প্রবল প্রতাপান্বিত সুবাদার, কেউই তার শাসনাধিকারে প্রশ্ন তোলার ছিল না, তার পরও দেখা যায় তার কোনো কোনো কাজে স্বয়ং সম্রাট জাহাঙ্গীর, যিনি বাল্য-কৈশোরে তার বন্ধু ও ক্রীড়া-কৌতুকের সহচর ছিলেন এবং দরবারের অধিকাংশ আমিরের মতামত উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সে ও অনেকটা পূর্ব-অভিজ্ঞতা ব্যতিরেকে (বিহারে কিছুদিন ছিলেন সত্য বটে, কিন্তু সে অভিজ্ঞতা তেমন ধর্তব্য নয়) বাংলার মতো একটি বৃহৎ, বহুদূরবর্তী ও প্রায় সার্বক্ষণিক গোলযোগপূর্ণ ভূভাগে সুবাদার নিযুক্ত করেছিলেন; সেই নিয়োগকর্তা জাহাঙ্গীরও ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি তার আচরণে কখনো কখনো তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।

এজন্য তাকে সতর্ক করে তিনি ফরমান পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন। এর স্রেফ অর্থ, ইসলাম খান সুবাদারের নির্ধারিত ক্ষমতার অতিরিক্ত চর্চা করেছিলেন, যা সম্রাট শাসনতান্ত্রিক কারণেই অপছন্দ করেছিলেন। না হলে আমিরদের মধ্যে সেটি বিবাদ বা সংঘর্ষ সৃষ্টি করত এবং সেই বিভেদ-বিশৃঙ্খলা পরিণামে মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তারকে নিঃসন্দেহে ক্ষতি বা বাধাগ্রস্ত করত। ইসলাম খানও পরে নিজেকে এসব ব্যাপারে সংযত করেছিলেন।

ইসলাম খানের সাধারণ শিক্ষা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে প্রসিদ্ধ সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় স্বাভাবিকভাবে ধারণা করা যায়, ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা বিশেষ করে কোরান-হাদিসের পাঠ তিনি বাল্য-কৈশোরেই পেয়ে থাকবেন। তিনি আরবি ও ফারসি ভাষা জানতেন। কেননা সেকালে প্রতিটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তানদের গৃহশিক্ষা শুরু হতো এ দুটি ভাষার নিবিড় পাঠ ও তালিম নিয়ে। তাছাড়া মনে রাখতে হবে, তিনি যেহেতু সম্রাট জাহাঙ্গীরের বাল্যবন্ধু ছিলেন অর্থাৎ অন্যকথায় শৈশব-কৈশোর থেকে একসঙ্গে তারা উঠ-বস ও খেলাধুলো করতেন, সেহেতু সাধারণ শিক্ষায় নিবেদিত না হলে সম্রাট আকবর নিশ্চয়ই স্বীয় পুত্রকে তার সঙ্গে মিশতে দিতেন না। যদিও সত্য, আকবর নিজে ছিলেন সম্পূর্ণ নিরক্ষর, কিন্তু সেটি তার ভাগ্যদোষ, তবে তিনি যে অসাধারণ স্মৃতিধর ও একনিষ্ঠ পাঠাগ্রহী ছিলেন, সে তো ইতিহাসস্বীকৃত এবং এ পর্বের ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই অবহিত। ফলে তার পুত্রের সহচর নিশ্চিত শিক্ষাব্রতী বা বিদ্যার্থী না হলে তিনি পুত্রের সঙ্গে তাকে কোনো অবস্থায়ই মিশতে দিতেন না।


পারিবারিক তথা পূর্বপুরুষের বংশীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ইসলাম খান নিজেও সচ্চরিত্র ও নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। তিনি দৈনন্দিন অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, বিশেষত শুক্রবার জুমার নামাজের বিশেষ পাবন্দি ছিলেন বললে ভুল হবে না। কেননা বাহারীস্তান-ই-গায়বীর সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগরে বা ঢাকায় অবস্থানকালে মির্জা নাথান তার মরহুম পিতার আত্মার মাগফিরাত কামনায় প্রতি ছয় মাস অন্তর বিশেষ খানাপিনার আয়োজন করতেন, যে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রকারের সুস্বাদু খাদ্য, পানীয় ও ফলমূল পরিবেশন করা হতো। শুধু তাই নয়, ভোজের আসরে কড়া লাল পানীয় গলাধঃকরণের ফলে অনেকেরই সংজ্ঞা লোপ পেত। একবার এ রকমেরই এক বড় ভোজসভায় মির্জা নাথান রাজ্যের সুবাদার, দিওয়ান, বখশি, কাজি, মির প্রমুখকে দাওয়াত করলে শারীরিক অসুস্থতা হেতু সুবাদার ইসলাম খান তাতে অংশগ্রহণ না করতে পারলেও (নাকি ইচ্ছে করেই তিনি এতে অনুপস্থিত ছিলেন?) সুবার ‘খান’ উপাধিধারী প্রায় সবাই সেখানে হাজির হয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে সেদিন ছিল শুক্রবার। ইসলাম খান জুমার নামাজ জামাতে পড়তে মসজিদে এসে ঘোষণা করলেন, যদি কেউ জামাতে অনুপস্থিত থাকে, তবে সংশ্লিষ্টকে জরিমানা করা হবে। ফলত ব্যক্তিগতভাবে নিজে নামাজের কঠোর পাবন্দি না হলে, অন্যদের প্রতি এরূপ হুকুম আরোপের নৈতিক শক্তি কারোর থাকার কথা নয়, তা তিনি যত বড় শাসনকর্তাই হন না কেন।

ইসলাম খানের এরূপ নির্দেশ সত্ত্বেও মির্জা নাথান যখন উপস্থিত অতিথিদের পানাহার চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে বলেছিলেন, যদি কাউকে জরিমানা করা হয়, তবে সে দায় তিনি নেবেন অর্থাৎ জরিমানার অর্থ পরিশোধ করবেন। যাই হোক, অনুষ্ঠান চলাকালে রাজকীয় ফরমান পেয়ে ইসলাম খান স্বল্প সময়ের জন্য অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে বাইরে গেলে স্বভাবতই কেউ কেউ ভোজসভায় থেকে যান এবং পানাহার অব্যাহত রাখেন। পরে ইসলাম খান যখন প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তার আগমনের সাড়া পেয়ে মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে অনুষ্ঠানস্থলে এবং অতিথিদের পোশাকে গোলাপ পানি, কমলার রস ও ফুলের সুগন্ধি এবং বাতাসে অম্বর আতর ছড়িয়ে শরাবের গন্ধ মুক্ত করা হয়েছিল। ফলত এ থেকেও বোঝা যায়, তিনি নিজে যেমন শরাব পান করতেন না, তেমনি অন্যরা তার সামনে এ-জাতীয় কিছু পান করুক, সেটি তার ঘোর অপছন্দনীয় ছিল। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে নির্ঘাত তার সুবাদারের বিরাগভাজন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল।

এখানে এটাও মনে রাখা দরকার, কেন্দ্রে স্বয়ং সম্রাট অর্থাৎ জাহাঙ্গীর নিজে ছিলেন প্রায় সর্বক্ষণ সুরামত্ত, যে কারণে তাকে শিখণ্ডী বানিয়ে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানই একটা সময়ে গোটা মোগল সাম্রাজ্য শাসন করতে শুরু করেছিলেন। কাজেই এহেন সম্রাটের কাছে সুরাপানের অভিযোগে কতটুকু শাস্তি পাওয়া যেত সে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকলেও সেটিকে স্থানীয় মোগল আধিকারিকেরা কোনোরূপ প্রশ্রয়ের স্থল বলে মনে করতে পারত না, বরং তারা সুবাদারকে যথেষ্ট সমীহ করেই চলত, মির্জা নাথানের বর্ণিত উপর্যুক্ত ঘটনাই তার প্রমাণ।

দরবারে তথা প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে ও দরবারের বাইরে সর্বত্র জাঁকজমক ও শানশওকত প্রদর্শন ইসলাম খানের অত্যন্ত পছন্দনীয় ছিল। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনাচারেও মোগল আভিজাত্য পুরোপুরি প্রতিপালনে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। তার স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, উদ্ধত স্বভাব ও স্বজনপ্রীতির কারণে আমিরদের কারো কারো সঙ্গে তার শীতল সম্পর্কও রচিত হয়েছিল। আগেই বলেছি, সম্রাট নিজেও সেজন্য তার প্রতি কিছুটা নাখোশ ছিলেন। তবে তার ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সুকৃতি ও মোগলদের প্রতি বংশপরম্পরা আনুগত্য যেমন প্রভুর সেই বিরাগকে কখনই প্রবল ক্রোধে পরিণত হতে দেয়নি, তেমনি দিল্লি-আগ্রার দরবারে ইসলাম খান কর্তৃক বাংলা থেকে সময়ে সময়ে প্রেরিত মূল্যবান উপঢৌকনসামগ্রী তা প্রশমিতকরণে, অন্য কথায় বন্ধু-সম্রাটের সন্তোষোৎপাদনে উল্লেখনীয় ভূমিকা রেখেছিল, তা অস্বীকার করা যায় না।

তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি থেকে অবগত হওয়া যায়, ইসলাম খান বিভিন্ন চালানে (মাদী-মদ্দা মিলিয়ে) ১৮৯টি হাতি (যেগুলোর মধ্যে একটির নাম ছিল ‘বংশীবাদন’), ৪০টি ‘টাঙ্গন’ বর্গীয় ঘোড়া, ৫০ জন হিজড়া, ‘কিন্নুর’ বা আজকের ভাষায় তৃতীয় লিঙ্গ (eunuch), ৫০০ ‘পারগালু নাফিস সিতারখানি/সোনারগাওনি’ (একজাতীয় ‘ঘোমটা’, মসলিন থেকে তৈরি) সম্রাটের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। বাংলা থেকে প্রেরিত এসব হাতি ও ঘোড়াগুলোর কোনো কোনোটি জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত পছন্দে তার ‘খাস’ সওয়ারি দলেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

ইসলাম খান বহির্ভ্রমণে-দাপ্তরিক সফরে বা ব্যক্তিগত প্রমোদযাত্রায় কোথাও গেলে প্রায়ই বিশেষ ঘোড়ায় সওয়ার হতেন বা আরোহণ করতেন। এর প্রমাণ বাহারীস্তান-ই গায়বীতে লভ্য। আগেই জানিয়েছি, সুবাদারির প্রাথমিক পর্বে যখন তিনি নৌবহরপ্রধান ইহতিমাম খানকে অভ্যর্থনা জানাতে এবং নওয়ারা সেনাদের বহর পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, তখন নিজের শিবির থেকে ঘোড়ায় চড়ে অকুস্থলে পৌঁছেছিলেন। এছাড়া রাজধানী ঢাকার রাজপথে রাজকীয় অভিযাত্রায় বা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণার্থ এবং বিশেষত শিকারযাত্রায় তিনি হাতির পিঠে বিশেষভাবে তৈরি ও মখমলশোভিত ‘হাওদা’য় আরোহণ করতেন।

তার নিজস্ব রাজকীয় নৌকা বা বজরার বহর ছিল। সেই বহরের প্রধান বা সেরা বজরাটিতে তিনি প্রায় আরোহণ করতেন, যেটির নাম ছিল ‘চাঁদনী’। জানা যায়, বজরা ‘চাঁদনী’র আরেক নাম ছিল ‘ফত-ই দরিয়া’। ঢাকার যে ঘাটে ‘চাঁদনী’ বা ‘ফতেহ-ই-দরিয়া’ নোঙর করা বা বাঁধা অবস্থায় থাকত এবং ইসলাম খান নৌপথে বহির্গত হওয়ার সময় যেখান থেকে বজরায় উঠতেন এবং ফিরে এসে নামতেন, স্বাভাবিকভাবে তার সে আরোহণ ও অবতরণ স্থলের নাম হয়েছিল ‘চাঁদনীঘাট’।

জানা যায়, মোগল বাদশাহি আদলে তৈরি নিজস্ব ‘গোসলখানা’য় ইসলাম খান গোলাব পানিতে গোসল করতেন এবং ব্যক্তিগত আহার-বিহারে বা খানাপিনায় (এখানে ‘পিনা বলতে সুরাজাতীয় তরল নয়, বরং ধর্মানুমোদিত নির্দোষ পানীয় বোঝানো হচ্ছে) যেমন বিলাস ও প্রাচুর্য পছন্দ করতেন, তেমনি সেই বিলাসী আহার্য দ্রব্য অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে আহার করাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ বা পছন্দ করতেন বললে ভুল হবে না। এজন্য খাদ্যদ্রব্য উদ্বৃত্ত-উচ্ছিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না, যেটি সচরাচর রাজকীয় ঘরানায় প্রায়ই হয়। পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি খুব শুচিবাইগ্রস্ত ছিলেন, তেমন নয়, তবে দু একটি অঙ্গবস্ত্র, যেমন কোটি বা জামা ও পাগড়ি পরিধানে শৌখিন ছিলেন এবং সেগুলো তার নিজস্ব রুচি ও পছন্দ মতেই তৈরি হতো, তেমন অনুমান করতেও দোষ নেই। শিকারের প্রবল নেশার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে হাতির লড়াই উপভোগ ছিল তার চিত্তবিনোদনের অন্যতম উপায়। এ সম্পর্কে মাসির-উল-উমারায় লভ্য:

তিনি হাতির লড়াইও উপভোগ করতেন। পোশাকের ব্যাপারে তার নির্দিষ্ট কোনো বাছবিচার ছিল না, তবে পাগড়ির নিচে মাথার উপরে আঁটো টুপি (তাকিয়া) পরতেন। ভারী বহির্বাস বা জ্যাকেটের নিচে জামা পরতেন। অন্যদিকে তার টেবিলে যে খানা পরিবেশিত হতো, তা থেকে এক হাজার দরিদ্র লোক তৃপ্তিসহকারে খেত, তবে তার আগে পরিবেশকেরা ভুট্টার (জোয়ার ও বাজরা) তৈরি রুটি, সব্জি (শাক) ও ‘সাথি’ নামীয় কড়কড়ে ভাত তার সামনে সাজাত।

ইসলাম খানের নিজস্ব সামরিক অভিবাদক বা অভিবাদন দল ছিল, যেটির গঠনও ছিল যথেষ্ট বৈচিত্র্যময় ও কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি দান-খয়রাতও করতেন খুব উদারচিত্তে। পার্শ্বে ধন-সম্পদ-রত্নে পরিপূর্ণ বারকোশ হাতে দণ্ডায়মান থাকত রাজকীয় নফরেরা আর তিনি দুই হাতে বিলাতেন সেসব। মাসির-উল-উমারাসূত্রে জানা যাক সেটি:

তথাপি এ সত্ত্বেও বাংলা সুবার সকল সামরিক অভিবাদক দল যেটি গড়ে উঠেছিল লুলি, কুরকানি, কাঞ্চনী (নর্তকী-বালিকা) ও ডোমনী (জিপসী) সমস্বয়ে, এরা ছিল তাঁর সেবক এবং এরা মাসে ৮০ হাজার বা বছরে নয় লক্ষ ষাট হাজার তনখা পেত। মণিমুক্তা ও রেশমের দ্রব্যসামগ্রী সংবলিত বারকোশ (ট্রে) নিয়ে লোকজন দাঁড়িয়ে থাকত আর তিনি সেসব উপহার স্বরূপ তাদের মধ্যে বিতরণ করতেন। আমিরী রীতি-রেওয়াজকে (তুজুক-ই-অমারাত) তিনি এমন স্তরে নিয়ে যান যে, ‘ঝরোকা’ (জাফরি বা কাচ-বসানো জানালা) থেকে আপামর জনসাধারণকে দর্শন দিতেন এবং তাঁর যে গোসলখানা বা স্নানাগার ছিল সেটি শুধু রাজাদেরই মানাতো।

সুবাদার হিসেবে ইসলাম খান একদিকে যেমন ছিলেন সুচতুর ও বিচক্ষণ, তেমনি ছিলেন অত্যন্ত কূটকৌশলী ও নিরাপস মনোভাবাপন্ন; সর্বতোভাবে যুদ্ধজয় ও মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তারই ছিল তার মৌল চিন্তাভাবনার বিষয়। তিনি স্থানীয় আফগান নেতা, বারোভূঁইয়া জমিদার প্রভৃতিকে মোগলদের বশে আনতে চাতুর্যপূর্ণ নীতিকৌশল অবলম্বনের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বহুলকথিত ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ (Divide and Rule Policy)-র চমত্কার প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। তার এ নীতির কথা বলতে গিয়ে অতুলচন্দ্র রায় লিখেছেন:

ইসলাম খানের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি সাম্রাজ্যবিস্তারকারীদের ভালোই সুফল দিয়েছিল। ছোট-বড় সব জমিদারকেই তিনি রাজকীয় আনুকূল্য এবং পুরস্কারস্বরূপ অঞ্চলাধিকারী করার প্রলোভন দেখিয়ে একজনকে অন্যজনের বিরুদ্ধে কাজে লাগিয়েছিলেন। যাতে তারা না ফের যূথবদ্ধ ও সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে বরং উল্টো, আখেরে স্বাধীনতা খুইয়ে নিজেরাই বশীভূত গোলামে পরিণত হয়।

যাই হোক, সুবাদার পদে নিয়োগ লাভের পর, বিশেষ করে আকবরনগর বা রাজমহাল পরিত্যাগ করে ইসলাম খান যখন বাংলা সুবামুখী হয়েছিলেন এবং তার সুবাদারিত্বে অসংখ্য ছোট-বড় যুদ্ধ করে তার অধীন সেনাপতিরা যখন একের পর এক যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে বাংলায় মোগল সাম্রাজ্য ক্রমেই বিস্তৃত করে চলেছিল, তখন সেই ফিরিস্তি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, তিনি নিজে একটি যুদ্ধেও ব্যক্তিগতভাবে অংশগ্রহণ করেননি। তবে তার অর্থ এ নয় যে সামরিক জ্ঞান ও যুদ্ধকৌশল তার অপরিজ্ঞাত ছিল। বরং ব্যাপার ছিল পুরোটাই ভিন্ন। কার্যত সাধারণ ঘরানার শিক্ষা লাভ আলাউদ্দিন ইসলাম খানের যে পর্যন্তই হোক না কেন, তিনি যে প্রয়োজনীয় সামরিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, তা অস্বীকার করা যায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ, অপেক্ষাকৃত তরুণ ও প্রায় অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও সুবাদার পদে তার নিয়োগ এবং বাংলার মতো একটি অনিশ্চিত, স্থানীয়ভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করে বহু রাজন্যবর্গ-জমিদার শাসিত এবং একই কারণে প্রায় সার্বক্ষণিক যুদ্ধ ডামাডোলপূর্ণ সুবায় তার পদায়ন। আবদুল করিম যথার্থই লিখেছেন:

শিক্ষিত না হলে এবং সামরিক প্রশিক্ষণ না থাকলে তিনি সুবাদারের মতো উচ্চপদ লাভ করতেন না। বাংলায় তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি শুধু শিক্ষিতই ছিলেন না, রণকৌশলেও পারদর্শী ছিলেন।

সুবার সর্বাধিনায়ক হিসেবে তার যুদ্ধ পরিচালনার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য বা কৌশল ছিল, তিনি একযোগে সমুদয় সৈন্য কোনো যুদ্ধে নিয়োজিত করতেন না বা করতে দিতেন না। বরং যুদ্ধের মাঝপথে তথা সৈন্যরা যখন কিছুটা ক্লান্ত ও হতোদ্যম হয়ে পড়ত, তখন নতুন সেনাদল যুদ্ধের ময়দানে পাঠাতেন। এতে দুটি ব্যাপার ঘটত। এক. সপক্ষীয় সৈন্যরা ক্লান্ত, হতোদ্যম অবস্থায় নতুন সৈন্যদলের উপস্থিতি দেখে ও তাদের সাহচর্য পেয়ে নবীন প্রেরণায় ও শক্তিতে উজ্জীবিত হতো, এবং দুই. বিপক্ষীয় বা শত্রুপক্ষ তাদের সম্মুখে যুদ্ধরত বাহিনীর পশ্চাতে হঠাৎ নতুন সৈন্যদলের আবির্ভাবে ও ত্বরিত সঞ্চালনে যুগপৎ বিভ্রান্ত ও হতবল হতো। কেননা তারা মনে করত, মোগল সৈন্যবাহিনী বুঝি অফুরন্ত বা অনিঃশেষ, একটার পর একটা নতুন পল্টন তাতে যুক্ত হচ্ছে। আবদুল করিম লিখেছেন:

বাংলার কোনো যুদ্ধে ইসলাম খান সরাসরি নেতৃত্ব দেননি, সুতরাং সামরিক শিক্ষায় বা সৈন্য বা সেনাপতি হিসেবে তার কতটুকু দক্ষতা ছিল তা পরিমাপ করা যায় না।

তবে বাংলায় তার যুদ্ধ, যুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, পরিচালনা ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ড পরীক্ষা করলে তার মধ্যে দুটি গুণের সমাবেশ বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়, প্রথমত পরিকল্পনা এবং দ্বিতীয়ত সংগঠন শক্তি। ইসলাম খান রাজমহলে এসেই বাংলার ভৌগোলিক অবস্থা, নদ-নদীর গতিপ্রকৃতি, বাংলার আবহাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানের সামরিক গুরুত্ব সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করেন। বাংলার সামরিক ভূগোল সম্পর্কে তিনি নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করেন। বারোভূঁইয়া, আফগান শক্তি ও অন্য জমিদারদের অবস্থান এবং সামরিক শক্তি সম্পর্কেও তিনি সম্যক অবগত হন।

প্রোক্ত এসবই একজন অত্যন্ত উঁচুমানের সমরনায়কের সহজাত গুণ, যা ইসলাম খানের মধ্যে পুরোপুরিই ছিল। তিনি এসব গুণ অর্জন করেছিলেন এবং এর সুফলও জীবদ্দশায় পেয়েছিলেন বাংলায় তার পাঁচ বছরের শাসনকালে প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন যে যা তার পূর্বসূরি, তাবড় তাবড় মোগল সুবাদার করতে শোচনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তাতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন।

এখানে ইসলাম খানের যুদ্ধনীতি ও সুবাদারি কৌশল, যেটি এরই আগে আমরা আবদুল করিমের বরাতে উল্লেখ করেছি। সেটি আরেকটু বিশ্লেষণ করা যায়। বস্তুত তার নীতি ছিল, স্থানীয় তথা বাংলার বারোভূঁইয়া জমিদার-রাজন্যবর্গকে মোগল সেনাবাহিনীতে সাময়িক সম্পৃক্তকরণ এবং এদের একজনকে অন্যজনের বিরুদ্ধে ব্যবহার বা যুদ্ধাভিযানে শরিক করে সম্মিলিত আক্রমণে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত ও ঘায়েল করা। যার প্রমাণ লভ্য প্রতাপাদিত্য, তার সন্তান, সত্রাজিৎ, মুসা খানের জ্ঞাতি প্রমুখকে বিভিন্ন সময়ে মোগল সেনাপতিদের অধীন সেনাদলের সমান্তরালে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা। তার এ পদক্ষেপ বা নীতিকৌশল যে কার্যকর ও সময়োপযোগী ছিল এবং এতে তার বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়, তা না বললেও চলে। আগের সুবাদারদের আমলে যখন কোনো জমিদার ভূস্বামী মোগলদের সঙ্গে লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে বা অবস্থা বেগতিক দেখে নিজেরাই যেচে এসে বা পয়গাম পাঠিয়ে মোগল বশ্যতা স্বীকার করত, তখন তারা মৌখিকভাবে মোগল আনুগত্য মেনে নিলে এবং তাত্ক্ষণিক কিছু ‘পেশকাশ’ বা নজরানা দিলেই মুক্তি পেত। তখন তাদের হূত রাজ্যও সাধারণত ফিরিয়ে দেয়া হতো। অথচ সময়ে তারা মোগল সুবাদারদের সেই বদান্যতা বেমালুম হয়ে আখেরে শুধু চূড়ান্ত অকৃতজ্ঞতারই পরিচয় দিত না, বরং সুযোগ পেলেই এককভাবে বা সদলবলে পুনরায় মোগলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত করত। কিন্তু ইসলাম খানের সময়ে সেই সুযোগ না থাকায় বা তারা তা না পাওয়ায় সেটি আর ঘটেনি। তার কারণ দূরদর্শী ও বিচক্ষণ ইসলাম খান তার যুগে স্থানীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে কেউ মুসলিম হোক কি হিন্দু—বিজিত হওয়া মাত্রই তাদের পরবর্তী কোনো যুদ্ধাভিযানে রাজকীয় বাহিনীর সমান্তরালে বা কাতারে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে বাধ্য করতেন। ফলে তারা শুধু নিজেরাই পুনঃসংগঠিত হওয়ার সময় ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়নি, পরন্তু স্বজাতি বা স্বদেশীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে একে-অন্যের স্থায়ী শত্রুতেই বরং পরিণত হতেন, হয়েছিলেন।

পরিশেষে দুজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদের পর পর দুটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করে সামগ্রিক আলোচনার ইতি টানব আমরা।

প্রথমটি রমেশচন্দ্র মজুমদারের; তিনি লিখেছেন:

মাত্র পাঁচ বৎসরের মধ্যে ইসলাম খান সমগ্র বাংলা দেশে মুঘল রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি-শৃঙ্খলা ও সুশাসনের প্রবর্তন করিয়া অদ্ভুত দক্ষতা, সাহস ও রাজনীতি জ্ঞানের পরিচয় দিয়াছিলেন। আকবরের সময়ে মুঘলেরা বাংলাদেশ জয় করিয়াছিল বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাংলা জয়ের গৌরব ইসলাম খানেরই প্রাপ্য এবং তিনিই বাংলাদেশের মুঘল সুবাদারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হইবার যোগ্য।

সুধীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যও প্রায় অনুরূপ উচ্চারণই করেছেন। তার ভাষায়:

প্রকৃতার্থে ইসলাম খানই বাংলা জয়, একটি ঐক্যবদ্ধ প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংগঠিত এবং দেশে মোগল শান্তি স্থাপিত করেছিলেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, তাঁকে মোগল সাম্রাজ্য গঠনের রূপকারদের একজন এবং বাংলা সুবার শ্রেষ্ঠ (মোগল) প্রতিনিধি বা সুবাদার বলে গণ্য করতে হবে।

 

[দিব্যপ্রকাশ প্রকাশিত, লেখক রচিত রাজধানী ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা: সুবাদার ইসলাম খান চিশতি (২০২২) গ্রন্থের অষ্টম অধ্যায়টি লেখক ও প্রকাশকের অনুমতিক্রমে এখানে সংকলিত হয়েছে। ব্যবহূত উদ্ধৃতিগুলোর অনুবাদ লেখকের]

কাবেদুল ইসলাম: লেখক ও গবেষক