সুকুমার রায়ের ‘ষোল আনাই মিছে’ কবিতায় আমরা মূর্খ মাঝির কাছে নৌযাত্রী বাবুর জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা প্রশ্নের জবাব দিতে না পারা মাঝির জীবন বারো আনাই মিছে যখন প্রতিপন্ন হতে চলছিল তখন টালমাটাল ঝড়ের আগমনকালে বাবু সাঁতার জানেন কিনা মাঝির প্রশ্নের জবাবে জানা গেল সাঁতার না জানার জন্য বাবুর জীবন ষোলো আনাই মিছেতে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাসের জমিদার ও তার স্বদেশী আন্দোলনের শৌখিন বন্ধুর পরিচয় পাওয়া যায় জনমানববিচ্ছিন্ন ওপরতলার ভদ্রলোক, জমিদার পত্নীর হৃদয় হরণে মত্ত প্রেমে পাগল হিসেবে। স্বদেশী আন্দোলনের নেতা নিখিলের মুখে জনগণের জিনিসপত্রের দাম কমানোর জনহিতকর কর্মপরিকল্পনার কথার খই ফুটলেও নিজে দামি সিগারেট ছাড়া সে খেত না, ট্রেনে ফার্স্ট ক্লাস কামরা ছাড়া সে চড়ত না। কথার ফানুস উড়িয়ে বাবুর পরিচয় ছিল জনবিচ্ছিন্ন ভুয়া নেতার। শাহজাদপুরে কলকাতার পোস্টমাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে গ্রাম্য বালিকা রতনের সৌহার্দ্যের সম্পর্কের ‘প্রত্যাশাও সে কি করে হয়’ জাত-পাতের সংশয়ে সাঙ্গ হয়। এসবই ঔপনিবেশিক ভদ্রলোক বা বাবু সংস্কৃতির সারশূন্যতার পরিচায়ক।
মূলত ভদ্রলোক বা বাবুরা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতে সামাজিক বিবর্তন ধারায় নবোত্থিত ইংরেজি শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী। এ বাংলায় কলকাতায় উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ভদ্রলোক একটি সামাজিক শ্রেণী হিসেবে বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। যাদের বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্জিত অর্থবলে ভূসম্পত্তি এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরি লাভ।
ব্যঙ্গরস রচয়িতা ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৭৮৭-১৮৪৮) বিবেচনায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোয় স্থাপিত নতুন দেশীয় কেরানি, ক্ষুদ্র আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারী, নব্য ব্যবসায়ী ও নব্য জমিদার, ঠিকাদার প্রভৃতি শ্রেণীকে ব্যঙ্গ করেই সামষ্টিকভাবে ভদ্রলোক বলা হতো। ভবানী বাবুর ব্যঙ্গ রচনা ‘কলিকাতা কমলালয় (১৮২৩)’, ‘নববাবুবিলাস (১৮২৫)’, ‘নববিবিবিলাস (১৮৩১)’ প্রভৃতি গ্রন্থের বিষয় হচ্ছে নব্য ভদ্রলোক। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ও গল্পসহ জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যে বহুলভাবে এ ভদ্রলোক শ্রেণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। উনিশ শতকে কালীপ্রসন্ন সিংহ তার বিখ্যাত বই হুতোম প্যাঁচার নকশায় তৎকালীন ভদ্রলোক শ্রেণীর সর্বাধিক পরিচিত ভণ্ডামি ও সামাজিক ধারণাকে ব্যঙ্গ করেছিলেন।
এসব ‘ভদ্রলোক’ ইউরোপীয়দের সাহচর্যে এসে রাতারাতি প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হন। শ্বেতাঙ্গ প্রভুর প্রভাবে এ নব্য ভদ্রলোক শ্রেণীর তাদের পিতৃপুরুষদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বেশ অনীহা। এজন্য তারা সনাতন বনেদি সমাজের নিকট হাস্যাস্পদ ও সম্মানহীন। সম্পদশালী, সুশিক্ষিত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রভাবশালী নব্য ভদ্রলোকদের সামাজিক মর্যাদা উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ওই শতকের মধ্যভাগ থেকে নব্য ভদ্রলোক শ্রেণীকে সামাজিকভাবে সমীহের চোখে না দেখার কোনো উপায় ছিল না।
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত সমাজে ভদ্রলোক শ্রেণী হিসেবে স্বীকৃত ছিল হিন্দু অভিজাত শ্রেণী। কেননা বেশির ভাগ জমিদার ও শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী ছিল হিন্দু। অভিজাত মুসলমান পরিবার নিজেদের আশরাফ হিসেবে পরিচয় দিত। তবে পুরনো হিন্দু অভিজাত শ্রেণী নব্য ভদ্রলোকদের স্বীকৃতি দিয়ে নিজেরাও ভদ্রলোকে পরিণত হলেও মুসলমান আশরাফ শ্রেণী ‘ভদ্রলোক’ বা বাবু শব্দটির পক্ষপাতী ছিল না। কারণ তারা তাদের বংশমর্যাদা নিয়ে ছিল গর্বিত।
বাবু শব্দের অর্থ একজন ব্যক্তির পদমর্যাদা ও সম্মান। এটা অত্যন্ত সাধারণভাবে এক ভদ্রজনকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এটা এমন কোনো এক ব্যক্তিকে বোঝানো হতো, যিনি সরাসরি সামাজিক বৃত্তে তার কর্তৃত্বের অবস্থান উপভোগ করেন। ভারতের একজন জমিদার এবং উচ্চতর সরকারি কর্মী সদস্যকে বাবু হিসেবে উল্লেখ করা হতো। আগেকার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি অর্থাৎ বাংলা ও বিহারে ভূস্বামীদের মধ্যে একজন বাবু ছিলেন সাধারণভাবে ঠাকুর বা মির্জার সমপর্যায়ভুক্ত ও অত্যন্ত সম্পদশালী জমিদার এবং একজন রাজার নিচে তার অবস্থান ছিল। বাবু শব্দটা ঐতিহাসিকভাবে শাসকশ্রেণী সমেত ভারতীয় সমাজের উচ্চবর্গে থাকা ব্যক্তিদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।
ভদ্রলোক গড়ে ওঠার দুটো বড় কারণই ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গঙ্গা অববাহিকায় বাণিজ্য ও পশ্চিমা ধারার শিক্ষার সাহচর্যে (ঔপনিবেশিক শাসক ও মিশনারিদের হাত ধরে) অনেক বাণিজ্য সংস্থার ব্যাপক ভাগ্য ফেরা এবং উত্থান। কলকাতায় ভূসম্পত্তির দামের তীব্র বৃদ্ধির ফলে এ অঞ্চলে কিছু সামান্য জমিদার রাতারাতি সম্পদশালী হয়ে ওঠেন।
ভদ্রলোক শ্রেণীর সদস্যরা সবাই না হলেও বেশির ভাগই উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ, কায়স্থ। উনিশ শতকে অনেক ভদ্রলোক সুবিধাভোগী ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত সম্প্রদায় কিংবা মধ্যবর্তী বণিক শ্রেণী থেকে এসেছিলেন। যে কেউ যথাযথ পরিমাণে সম্পদ দেখাতে এবং সমাজে দাঁড়াতে পারে সে রকম মানুষ ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের সদস্য ছিল। মোটের ওপর উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীগুলোর মধ্যে একজন জমিদার অথবা ভূস্বামী যারা সাধারণভাবে নামের শুরুতে বাবু ধারণ করতেন তাদের ভদ্রলোক হিসেবে মনে করা হতো। রাজা অথবা মহারাজা উপাধিধারী একজন জমিদারকে মধ্যবিত্তের তুলনায় উচ্চতর হিসেবে মনে করা হতো। সব পেশাদার শ্রেণীর সদস্য, অর্থাৎ যারা নতুনভাবে উদীয়মান পেশায় যুক্ত, যেমন ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং উচ্চতর সরকারি কর্মচারী ছিলেন তারা ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের সদস্য।
সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে ধর্মনিরপেক্ষ, শিক্ষিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিশেষ ভূমিকার জন্য বাঙালি সমাজ কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তিত সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসে কেবল হিন্দু বাবুরা ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত হতেন। তারা ছিলেন শিক্ষিত, সম্পদশালী, দানশীল ও শ্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠীর প্রশাসনিক কাজে জড়িত। ‘বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত বাঙালি ভদ্রলোক বাংলার প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং সে সুবাদে তারা অর্জন করেন সামাজিক স্বীকৃতি’। (সিরাজুল ইসলাম, ‘ভদ্রলোক’, বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)। বিশ শতকের প্রথম দুই দশকের রাজনীতি ছিল ভদ্রলোক শ্রেণীর দখলে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন (১৯০৫), বিপ্লবী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন প্রভৃতি ঘটনায় ভদ্রলোক শ্রেণীর ভূমিকা ছিল একচেটিয়া।
ঔপনিবেশিক যুগ (১৭৫৭—১৯৪৭) বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদ আহরণের উদ্দেশ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ দেশে এসে বাণিজ্য বসতি স্থাপন করে। আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে কোম্পানি বঙ্গের সর্বময় কর্তায় পরিণত হয়। বাণিজ্যের পাশাপাশি রাজ্য স্থাপন ছিল সমকালীন ইউরোপীয় বেনেবাদ নীতির পরিপন্থী। উল্লেখ্য যে সমকালীন ইউরোপীয়রা সাগরের ওপারে গিয়ে জনমানবশূন্য বা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা দখল করে নিজ নিজ জাতির পক্ষে উপনিবেশ স্থাপন করলেও বাংলাদেশই প্রথম সভ্য দেশ যেখানে একটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঘটেছে পর্যায়ক্রমে এবং নানা অনভিপ্রেত ঘটনাপ্রবাহের ফলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দলিলে দেখা যায় যে কোর্ট অব ডাইরেক্টরস কোম্পানির বেঙ্গল কাউন্সিলকে সবসময়ই এখানে রাজ্য স্থাপনের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করলেও কালে কোম্পানির বঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বাণিজ্যের সুবিধার্থে কোম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজ্য স্থাপনের অভিলাষ ক্রমেই দানা বেঁধে উঠেছিল আঠারো শতকের প্রথম দশক থেকেই।
দেওয়ানী নামে বাংলায় কোম্পানি শোষণ ও উৎপীড়নের রাজ্য কায়েম হলে ১৭৬৯-৭০ সালের মহাদুর্ভিক্ষ ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করল কোম্পানির বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ করার জন্য। ১৭৭২ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্টের মাধ্যমে পার্লামেন্ট কোম্পানির বঙ্গরাজ্য বিষয়ে প্রথম হস্তক্ষেপ করে। মার্কিন বিপ্লবের পর আমেরিকা থেকে বিতাড়িত হয়ে ব্রিটিশ সরকার বিকল্প কলোনি হিসেবে দৃষ্টিপাত করল ভারতের ওপর। পাস করল পিট এর ভারত আইন (১৭৮৪), যার মাধ্যমে কোম্পানির বঙ্গরাজ্যের ওপর ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্ব আরো সুদৃঢ় করা হয়, লর্ড কর্নওয়ালিসকে পার্লামেন্ট গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত করে এ নির্দেশ দেয় যে তিনি একটি স্থায়ী ভূমি ব্যবস্থা ও দক্ষ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গরাজ্যকে একটি শক্তিশালী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে পরিণত করবেন।
নির্দেশানুসারে কর্নওয়ালিস ত্বরিত গতিতে ভূমি ব্যবস্থা ও প্রশাসনে অনেক সংস্কার আনয়ন করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে তিনি একটি জমিদার শ্রেণী সৃষ্টি করেন। ভূমির একচ্ছত্র মালিক করা হয় জমিদারকে। জমিদারের ওপর সরকারের রাজস্ব দাবি চিরকালের জন্য স্থির করে দেয়া হয়। এ ব্যবস্থার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে সমর্থন করে এমন একটি প্রভাবশালী অনুগত শ্রেণী সৃষ্টি করা। এর অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ভূমি নিয়ন্ত্রণে স্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে জমিদার শ্রেণীর উদ্যোগে দেশের কৃষি অর্থনীতিকে গতিশীল করে তোলা। প্রশাসন, বিচার ও পুলিশ বিভাগকে ঢেলে সাজিয়ে কর্নওয়ালিস ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ভিত মজবুত করে স্থাপন করেন। একটি উচ্চ বেতনভোগী পেশাগত আমলাতন্ত্র স্থাপন করে কর্নওয়ালিস ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন।
ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাত পলাশীর পর পর্যায়ক্রমে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা বাংলায় তথা ভারতে দুটি সংস্কৃতির সম্মিলন সূচনা করল। বিগত পাঁচশ বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির সংমিশ্রণে নির্মিত পারস্পরিক সহাবস্থানভিত্তিক বঙ্গ সংস্কৃতির সঙ্গে এখন যুক্ত হলো ইউরোপীয় সংস্কৃতি। কিন্তু আগেকার মতো এবার স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিদেশী সংস্কৃতির মিশ্রণ লক্ষণীয়ভাবে ঘটেনি। শাসক ইংরেজ জাতি প্রথম থেকে দেশে ইউরোপীয় শাসন ও বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করল। ভূমি প্রশাসনেও ইউরোপীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রশাসনও প্রবর্তিত হয় ইউরোপীয় আদলে। শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি এবং বিষয়ও ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক। অতএব ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসে যা সব সনাতন প্রথা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাকে অবক্ষয়িত করে তোলে।
ঔপনিবেশিক শাসনের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে পাশ্চাত্যমুখী করা। পূর্ববর্তী কোনো শাসকগোষ্ঠী এমনতর কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথা প্রতিষ্ঠানে কখনো হস্তক্ষেপ করার প্রয়াস পায়নি। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার প্রায় সব ব্যাপারে পাশ্চাত্য সভ্যতার অভিঘাত সৃষ্টি করে। নেটিভ ভারতীয়দের ‘সভ্য’ করা ছিল ব্রিটিশদের একটি মিশন। ওই লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার শিক্ষা ব্যবস্থা ও নানা সংস্কার আইন প্রবর্তন করেছে।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা-উত্তরকালে পশ্চিমবঙ্গ অঙ্গরাজের অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের জন্যে বাবু বা ভদ্রলোকেরা দায়ী। ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জির ভাষায় ‘ব্যাপারটা এ রকম যে বঙ্গদেশ ভাগ তাদের হতাশ করেছিল, যেসব গোষ্ঠীগুলো তাদের পরিকল্পনা এবং উদ্দেশ্য অনুযায়ী এটা দাবি করে। কী কারণে তাদের কৌশল এ রকম সর্বনাশাভাবে বিফল হয়েছে যা নিঃসন্দেহে এর প্রভাবের শেষ কণাগুলি মুছে যাওয়ার অনেক পর থেকেই বঙ্গ ভদ্রলোক দ্বারা বিতর্ক তৈরি করবে। এর মধ্যেই বহু অজুহাত খাড়া করা হয়েছে। ব্যাখ্যাটা ছিল সম্ভবত এ রকম—তাদের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বে নিজেদের আত্মবিশ্বাস এবং রাজনীতির জন্যে তাদের অনুমিত প্রতিভায় বাংলার ভদ্রলোক নেতারা বেঘোরে বিষয়গুলোর ভুল বিচার করেছিলেন। কারণ সত্যি বলতে কি, তারা একটা রাজনৈতিক শ্রেণী হিসেবে গভীরভাবে অনভিজ্ঞ ছিলেন।’ একমত হওয়া যায় যে তারা উচ্চশিক্ষিত এবং কোনোক্রমে বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন হলেও তারা বাংলার রাজনীতি কিংবা এখানকার অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেয়ার মতো অবস্থান কখনই দখল পাননি। জয়ার আরো তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, ‘সবার ওপর, জনগণের শাসন ও কর নেয়ার সূক্ষ্ম পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না বা কম ছিল। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক পিছনে তাকানো অতীত আঁকড়ে থাকা গোষ্ঠী, পুরনো অনুমানের চক্করে আটকা পড়েছিল। এজন্য তারা একক মনোভাবে নিজের সংকীর্ণ উদ্দেশ্যে মন দিয়েছিল যে বৃহত্তর ছবি এবং তাদের চারপাশে যে পরিবর্তনগুলো ঘটেছিল তাতে তারা অন্ধ ছিল।’
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান









