বাংলাদেশের কিংবদন্তি সুরকার শেখ সাদী খান। ১৯৫০ সালের ৩ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিবপুরে তার জন্ম। তার সুর করা গানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। গানে সুর দেয়ার পাশাপাশি শতাধিক সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি, দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন একুশে পদক। ২০২১ সালে বাংলা একাডেমি তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। গুণী এ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর পুত্র এবং ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ভাতিজা। পরিবার, ক্যারিয়ারসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন সিল্করুটের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজাম আশ শামস
আপনাদের পরিবার সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
আমাদের পরিবার ঐতিহ্যবাহী একটি সংগীত পরিবার। বিশেষ করে উচ্চাঙ্গসংগীতের মানুষ আমরা। আমাদের পরিবারের সদস্যরা উচ্চাঙ্গসংগীত চর্চা করেছেন। সারা বিশ্বে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমার দাদার নাম সবদর হোসেন খাঁ। তাকে সবাই সদু খাঁ নামেই চিনতেন। তিনিও সংগীতের একজন অনুরাগী ছিলেন। তিনি সেতার বাজাতেন। আমাদের পরিবারে তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। তাই তিনি আপন মনেই গান-বাজনা করতেন। আমাদের জমিজমা প্রচুর ছিল। খাদ্যের কোনো সমস্যা ছিল না। কাজ করার মানুষও ছিল। শিবপুর গ্রাম থেকে মাঝে মাঝে আমার দাদা আগরতলায় চলে যেতেন। সেখানে ওস্তাদ কাসেম আলী খাঁ থেকে তিনি সংগীতের তালিম নিতেন। সেখান থেকেই আমাদের পরিবারের সদস্যদের রক্তে সংগীত প্রবাহিত হয়েছে।
আমার বড় চাচা ছমিরউদ্দিন খাঁ সংসারের দেখভাল করতেন। জমিজমা দেখাশোনা করতেন। তিনি সংগীত চর্চা করেননি। আমার চাচা সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ অল্প বয়সেই সংগীতের টানে বাড়ি ছেড়েছিলেন। তারপর সংগীতে তার বর্ণাঢ্য জীবন। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। থাকার জায়গা ছিল না। খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। শিয়ালদহ স্টেশনসহ অনেক জায়গায় তিনি রাত কাটিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি নুলো গোপালকে পেয়েছিলেন গুরু হিসেবে। তার কাছ থেকে তিনি সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। তারপর তিনি তানসেনের বংশধর ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর খোঁজ পেলেন। তার কাছে তিনি শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি মধ্য প্রদেশের মাইহার রাজ্যের রাজসভা অলংকৃত করেন। আমার বাবা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁও সংগীতের অনুরাগী ছিলেন। তাই আমার বাবাকেও তিনি মাইহারে নিয়ে গেলেন। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছ থেকে আমার বাবা তালিম নেন। আমার বাবা ও চাচাই কিন্তু আমাদের পরিবারে তানসেন ঘরানার শেকড়। আমরা ‘সেনী ঘরানা’ বলি। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ আমার বাবাকে বলেছিলেন, ‘এবার ইচ্ছা করলে তুমি দেশে ফিরে যেতে পারো। সেখানে সবার মাঝে আমাদের সেনী ঘরানার সংগীত ছড়িয়ে দাও।’ দেশে ফিরে বাবা কুমিল্লা শহরে জমি কিনে বাড়ি করলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আমরা কুমিল্লায় চলে এলাম।
আপনার বাবা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ও চাচা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে আপনার কিছু স্মৃতি শুনতে চাই।
আমার বাবা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ও চাচা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে আমি দেখেছি। সংগীতে আমার হাতেখড়ি আমার বাবার কাছে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমরা সংগীত চর্চা করতাম। বাবার কাছে আমি প্রথমে তবলায় তালিম নিয়েছিলাম। তারপর বেহালায় তালিম নিই। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে আমার দুবার দেখা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রথমবার যখন দেখা হয়, আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। আমার নামটা তিনিই রেখেছেন। আমার জন্মের সময় তিনি হজ করে ভারতে ফিরেছেন। আমার বাবা চিঠি লিখে আমার জন্মের সংবাদ তাকে দিয়েছিলেন। বাবা আমার নাম রেখেছিলেন আশিক হোসেন খান। চাচা এটি জানার পর চিঠি লিখে জানালেন, ‘দেখো আমি হজ করে ফেরার সময় একজন ফার্সি কবির মাজার জেয়ারত করতে গিয়েছিলাম। তার নাম শেখ সাদী (র.)। তোমার ছেলের নাম শেখ সাদী রাখো। উনার নামের তাছিরেও যদি তার কিছু হয়!’ ফার্সি কবির নামের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক পদবী যুক্ত হয়ে আমার নাম হলো শেখ সাদী খান।
আপনার চাচা ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ সম্পর্কে জানতে চাই।
আমার মেজ চাচা ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ ঐশ্বরিক কিছু পেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাউলমনা ছিলেন। একটি গাছের নিচে তিনি বসে থাকতেন। গান লিখতেন। গান গাইতেন। গাছটি এখনো আছে। মনমোহন দত্তের সঙ্গে তার একটি আত্মিক সম্পর্ক ছিল। মনমোহন দত্ত গান লিখতেন ও গাইতেন। কিন্তু তার সব গানে সুরারোপ করতেন আমার চাচা ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ। গানগুলো বই আকারে বেরিয়েছে। প্রচারিতও হচ্ছে। কিন্তু যেভাবে প্রচার প্রয়োজন, তা হচ্ছে না। এগুলোকে বলা হয় ‘মলআ সংগীত’। আমার বাবা ও চাচাদের কাছে আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, মনমোহন দত্তের ম, লব বাবুর ল, আফতাবউদ্দিনের আ মিলে ‘মলআ’। এটিকেই অনেকেই বানিয়ে ফেলেছে মলয়া। মানে মলয়া বাতাস। যাই হোক, এটি নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। আমরা সঠিক তথ্য জানি। যারা বাইরে থেকে খবর নিয়ে জেনেছেন, তারা এটি নিয়ে বিভ্রান্ত। তবে এটি নিয়ে আমরা কোনো কথা বলতে চাই না। ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ গানগুলো সুর করতেন। গাইতেনও। মনমোহন দত্তও গাইতেন। লব বাবু সেগুলো লিখে রাখতেন। ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁকে আমি দেখিনি। তবে শিবপুরে তার মাজার আমি তৈরি করিয়েছি। অনেক লোক তার মাজার জেয়ারত করতে যায়। প্রতি বছর মাঘ মাসের ১১ তারিখ তার ওরসের আয়োজন করা হয়।
আপনি সংগীতের দুনিয়ায় কীভাবে এলেন?
আমাদের পরিবারের সবাই যন্ত্রসংগীত শিল্পী। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয়ার পর আমি কলকাতায় মেজ ভাইয়ের কাছে চলে গেলাম। তার কাছে আমি উচ্চাঙ্গসংগীতের তালিম নেয়া শুরু করলাম। তার কাছে আমি তিন বছর ছিলাম। তারপর দেশে ফিরে আমি চট্টগ্রাম বেতারে অডিশন দিলাম। ১৯৬৫ সালে আমার চাকরি হয়ে গেল। ১৯৬৭ সালের শেষ দিকে আমি ঢাকায় এসে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বেহালাবাদক হিসেবে যোগ দিলাম। আমি উচ্চাঙ্গসংগীত শিখে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম এ ধারাতেই নিজেকে সমৃদ্ধ করব। কিন্তু তখন আমাদের দেশে উচ্চাঙ্গসংগীতের হালহকিকত দেখে আমার মনে হলো এটি দিয়ে জীবন ধারণ করা কঠিন হবে। তখন আমি সিনেমার গানে বাজানো শুরু করলাম। একপর্যায়ে আমার মনে হলো, অনেকেই তো গান সুর করে। আমার মধ্যেও তো সুর আছে। আমিও তো চেষ্টা করলে গানে সুরারোপ করতে পারব। তখন আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় সেদিকে ধাবিত হলো। আমি সুর করা শুরু করলাম। সবাই খুব পছন্দ করতে লাগল। আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমায় আমি মেজ ভাই ওস্তাদ বাহাদুর খানের সহকারী হিসেবে সংগীত পরিচালনা করেছি। আব্দুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘এখনই সময়’ সিনেমা দিয়ে আমার একক সংগীত পরিচালনা শুরু। এ দেশের সব শিল্পীর সঙ্গে তো আমি কাজ করেছিই, ভারতীয় শিল্পীদের দিয়েও আমাদের সিনেমায় কাজ করিয়েছি। প্রতিনিয়ত ভালো কাজ করার তাড়না আমার মধ্যে ছিল।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে আপনি কীভাবে যুক্ত হলেন?
১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে আমি আগরতলায় চলে গেলাম। সেখানে কয়েকজন বন্ধুও জুটে গেল। আমরা মেলাঘরে গেলাম। আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাইলাম। তখন আমার বন্ধুরা আমাকে বলল, ‘তুই না রেডিওতে চাকরি করিস? টেলিভিশনে চাকরি করিস? স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দিচ্ছে। শিল্পীদের সেখানে যেতে বলছে। তুই সেখানে চলে যা।’ তখনো আমি জানি না স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কোথায়! কেউ আমাকে জানাতে পারে না। আমাকে এতটুকু নিশ্চিত করা হয়েছিল যে আগরতলার কোথাও নেই। তবে কলকাতায় হতে পারে। আমি কলকাতায় গেলাম। সেন্ট্রাল রোডের একটি বাড়ির ঠিকানা পেলাম। হালকা গোলাপি রঙের একটি বাড়ি। দোতলায় উঠেই আপেল মাহমুদ, আবদুল জব্বার, রথীন্দ্রনাথ রায়, তাহের সুলতান, আশফাকুর রহমান খানসহ অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিলাম।
তারপর স্বাধীন বাংলাদেশে...
স্বাধীন বাংলাদেশে আমি আবার টেলিভিশনে যোগ দিলাম। এর মধ্যে খবর হয়ে গেল যে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরবেন। সে উপলক্ষে শুকতারা শিল্পগোষ্ঠীকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্য আমি একটি গান করলাম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম মৌলিক গান এবং তখনো পর্যন্ত একমাত্র গান ছিল সেটি। গানটির কথা ছিল এমন, ‘শোনো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, শোনো। সাত কোটি জনতা চেয়ে আছে আজ তোমার মুখপানে। নব অনুরাগ ঝরছে শুধু তোমার জয়গানে।’ টেলিভিশনে গানটি সারা দিন প্রচারিত হতে লাগল। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের মাটিতে নামলেন, তখনো প্রচার করা হয়েছে। আমার দুঃখটা হলো, আজকে বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক বানিয়েছে, আমার গানটা তো সেখানে থাকতে পারত। অন্তত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে সুরটা তো বাজাতে পারত। এটি নিয়ে আমার একটি চাপা কষ্ট আছে।
আপনার বাবা ও চাচাদের পরিচয়ের কারণে কি আপনি কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো সুবিধা পেয়েছেন?
ওভাবে তেমন কোনো সুযোগ আমি পাইনি। তবে বিভিন্ন জায়গায় বাবার নাম আমাকে নিতে হতো। কিন্তু আমার একটি প্রত্যয় ছিল যে আমি বাবার পরিচয়ে পরিচিত হতে চাই না। আমি আমার নাম দিয়ে আমার বাবাকে আনতে চাই। আমার নাম দিয়ে আমার বাবাকে চিনুক। সৃষ্টিকর্তার দয়ায় আমি সফল হয়েছি। আমার সাফল্য কিছুটা আমার বাবা দেখে যেতে পেরেছেন। আমার সুর করা গানও তিনি শুনে গিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘চেষ্টা করো। তুমি পারবে। তোমার মাথা ভালো।’
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আপনার অনেক প্রাপ্তি। কোনো অপূর্ণতা অনুভব করেন কি?
আমাদের দেশের সংগীতের বাজারটা ছোট। বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব নয়। তুখোড় শিল্পীরও অভাব। দেখা যায়, আমি যেটা ভাবি, শিল্পী তা ধারণ করতে পারছে না। আর বর্তমানে আমাদের দেশে সংগীতের নামে চলছে খামখেয়ালিপনা। আমাদের সময় গান-বাজনায় যে গভীরতা, সাধনা ও সৃষ্টিশীলতা ছিল, বর্তমানে তার অভাব আছে বলে আমার মনে হয়। কাজ করতে গেলে মনে হয় দুর্ভিক্ষ চলছে। রুচির দুর্ভিক্ষ, সামাজিক অবক্ষয়, চিন্তার দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি।
আপনার সুর করা গানের রয়্যালটি কি ঠিকমতো পান?
সঠিকভাবে আমরা রয়্যালটি পাই না। এখানে একধরনের বাটপারি চলছে। আমাদের দেশে কপিরাইট আইন আছে। কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ নেই। আমাদের অনুমতি না নিয়েই অনেকে আমাদের গান বিক্রি করছে। গান বিক্রি করে তারা অনেক টাকা আয় করছে। অথচ আমাদের কোনো রয়্যালটি দেয় না। তারা বলে সিনেমার গান নাকি তারা প্রযোজক থেকে নিয়েছে। কিন্তু আমরা তো প্রযোজকদের গানের স্বত্ব দিইনি। আমরা সিনেমার জন্য গানগুলো তৈরি করেছি। তারা গানগুলো বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহার করছে কেন? তাদের তো কোনো অধিকার নেই। এমনকি সুরকার, গীতিকারের নাম পর্যন্ত কোথাও উল্লেখ করে না। এসব কারণে আমাদের দেশে দিনে দিনে সংগীতের অবক্ষয় হচ্ছে।
বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
বর্তমানে ওভারসিজ কিছু কাজ আমি করছি। সিনেমার গানে আমি একদমই কাজ করছি না। এটি আমার সচেতন সিদ্ধান্ত। ভালো কোনো সিনেমা হলে আমি কাজ করতে রাজি আছি। তবে সেখানে আমার কাজ করার স্বাধীনতা থাকতে হবে।





