বিশ শতকের অন্যতম জনপ্রিয় তুর্কি কবি নাজিম হিকমতের একটি কবিতার নাম ‘আমাকে ইস্তানবুলের কথা বলুন’। এখানে একগুচ্ছ ইস্তানবুল কবিতা ভাষান্তরিত হলো—
আমাকে ইস্তানবুলের কথা বলুন
থামুন, কফির পানিটা ফুটতে দিন
আমাকে ইস্তানবুলের কথা বলুন, কেমন ছিল ইস্তানবুল
আমাকে বসফরাসের কথা বলুন, কেমন ছিল বসফরাস
বৃষ্টির স্রোতধারা আর কম্পনে জুন মাসটা ভেসে গেছে
মায়ের আদর মাখানো সূর্যালোকে
এ সাত পাহাড় শুকোবে কিনা বলুন,
আমাকে বলুন মানুষ সেখানে হাসছে
ট্রেনে ফেরিতে বাসে মানুষ হাসছে
যদি মিথ্যেও হয়ে থাকে তবুও বলুন
আমি তা-ই শুনতে চাই
সব সময় যাতনা, সব সময় যাতনা, সব সময় যাতনা
অনেক হয়েছে, থামুন, চলতে থাকুক
টেলিভিশনের সুইচ অন করবেন না
আমাকে ইস্তানবুলের কথা বলুন, কেমন ছিল
বিয়োগ্লু পাহাড়ের ওপর থেকে আমার নিষিদ্ধ চোখের দিকে
তাকিয়ে সেতু সারায়াবুরনো মিনার ও অনিচ্ছুক চুম্বনের
প্রশংসা করতে পারবেন—গোপনে বলবেন হ্যালো...
আমাকে বলুন মানুষ সেখানে হাসছে
ট্রেনে ফেরিতে বাসে মানুষ হাসছে
যদি মিথ্যে হয়ে থাকে তবুও বলুন
আমি তা-ই শুনতে চাই। ...প্লিজ বলুন
আপনার ঘ্রাণ ইস্তানবুলের আপনার চোখ ইস্তানবুলের রাতের মতো
আসুন আমাকে আলিঙ্গন করুন
মেহেদি রাঙা হাতে আমাকে আকাশের নিচে
ঠিক সেখানে দুজন স্বপ্ন দেখে স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিয়ে
শুরু করা মরুভূমিতে নদীর প্রত্যাশার মতো।
আমাকে বলুন মানুষে সেখানে হাসছে
ট্রেনে ফেরিতে বাসে মানুষ হাসছে
যদি মিথ্যেও হয়ে থাকে তবুও বলুন
আমি তা-ই শুনতে চাই।
(আংশিক অনূদিত)
অন্য পাহাড়ের ওপর থেকে
ইয়াহিয়া কেমাল বেয়াত
প্রিয় ইস্তানবুল আমি অন্য একটি পাহাড়ের ওপর থেকে
তোমার দিকে তাকিয়েছি, আমি জানি তুমি আমার
হাতের উল্টো দিকটা পছন্দ করো, তোমাকে অনেক ভালোবাসি
এসো যতদিন বেঁচে থাকি আমার হূদয়ের সিংহাসনে বসো
তোমার একটি জেলাকে ভালোবাসা পুরো জীবনের কীর্তি
পৃথিবীতে অনেক সমৃদ্ধ নগরী আছে
কিন্তু একমাত্র তুমিই জাদুকরী সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারো
আমি বলি যদি কেউ তার দীর্ঘতম স্বপ্নে সুখী হয়ে
বেঁচে থাকে তাহলে তার জীবন কেটেছে তোমার সঙ্গে
মৃত্যুও তোমাতেই সমাহিত তোমারই ভেতর।
ইস্তানবুল স্বপন
মেহমেত আকিফ এরসয়
সাগরে নৌকাটা দুলছিল
স্বপ্ন আমাকে মারমারা উপসাগরের তীরে ছুড়ে ফেলত
মাত্র কয়েক মাইল দূর থেকে আমি দেখতে পাই
তোমার কানো হয়ে আসা ইস্তানবুল সুটিকের মতো স্বচ্ছ
আধেক চাঁদের মতো তার কপাল জ্বলজ্বল করে
তার হাসি দেনালির, মুগ্ধকর আর কাছে টানার
হায় এখন কী বিধ্বস্ত পরিণতি
কী ঔদ্ধত্য! কতটা বাধা
অনেক স্কুল খোলা, নারী ও পুরুষ পড়ছে
কারখানায় পূর্ণমাত্রার ধোঁয়া উড়ছে, পোশাক শিল্প এগোচ্ছে
ছাপাখানা দিনরাত কাজ করছে
মানুষের কল্যাণে নতুন কোম্পানির অভ্যুদয় ঘটছে
মানুষকে আলোকিত করতে নতুন দল হচ্ছে
অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে
তার জীবন তীরে জাহাজ থেকে মাল খালাস চলছে।
ইস্তানবুল
ওমিত ইয়াসার ওগুজক্যান
বাড়ির ভেতর একটি রুম, সেই রুমে ইস্তানবুল
রুমের ভেতর একটি আয়না, আয়নার ভেতর ইস্তানবুল
একজন সেগারেটে আগুন দিয়েছে, ইস্তানবুল ধোঁয়া ছাড়ছে
একজন নারী তার পার্স খোলেন, পার্সের ভেতর ইস্তানবুল
একটি শিশু বড়শির সুতো ছাড়ে, আমি দেখতে থাকি
সে যখন সুতো টানে তার ওপর ইস্তানবুল
এ কেমন জলধারা এ কেমন ইস্তানবুল
বোতলের ভেতর ইস্তানবুল, টেবিলের ওপর ইস্তানবুল
ইস্তানবুল আমাদের সাথে হাটে আমরা হতবাক হই
আমার নারী একদিকে আমি একদিকে ইস্তানবুল মাঝখানে
আমি বুঝতে পারি একবার যদি তুমি প্রেমে পড়ে থাকো
তুমি যেখানেও যাও তুমি দেখতে পাও ইস্তানবুল।
আমি ইস্তানবুলকে শুনছি
ওরহান জালি কানিক
আমি ইস্তানবুলকে শুনছি আমার চোখ বন্ধ আছে
সবার আগে মৃদু বাতাস
এরপর গাছের পাতারা দুলে উঠে
সেখানে অনেক দূরে
ভিস্তিওয়ালার ঘণ্টা অবিরাম বাজে
আমি ইস্তানবুলকে শুনছি আমার চোখ বন্ধ আছে
তারপর হঠাৎ পাখিরা উড়ে যায়
মাছ ধরার জন্য জাল পাতা আছে
একজন নারীর পা পানিতে ডুবতে শুরু করেছে
আমি ইস্তানবুলকে শুনছি, আমার চোখ বন্ধ আছে
এখানকার প্রচণ্ড বাজার স্নিগ্ধ ও সুন্দর
বাজারের কেন্দ্রে হই হই রই রই
মসজিদের প্রাঙ্গণ কবুতরে বোঝাই
বন্দরে হাতুড়ির আঘাত ও ঝংকার
বসন্তের বাতাসে ঘামের গন্ধ ভেসে আসে
আমি ইস্তানবুলকে শুনছি, আমার চোখ বন্ধ আছে
অতীতের উচ্ছ্বাসের এখনো মাদকতা আছে
ডিঙ্গিবাড়িসহ সাগর পারের একটি সৌধ দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছে
দক্ষিণা বাতাসের হল্লার মধ্যে বিশ্রাম নিচ্ছে
আমি ইস্তানবুলকে শুনছি, আমার চোখ বন্ধ আছে
পার্শ্বসড়ক দিয়ে একটি সুন্দর বালিকা হেঁটে যায়
চার অক্ষরের নোংরা শব্দ, শিস গান মন্তব্য ছুড়ে মারে
তার হাত থেকে একটা কিছু পড়ে যায়
আমার মনে একটি গোলাপ
তোমার কাপড় ঘিরে একটি পাখি পাখা ঝাপটায়
তোমার ভ্রুতে কি ঘাম নাকি নেই? আমি জানি।
তোমার ঠোঁট কি সিক্ত নাকি তা নয়? আমি জানি
পাইন গাছের পেছনে রুপালি রঙ চাদ উঠছে
আমি বুঝতে পারি তোমার হূদযন্ত্রের ধুকপুক শব্দে।
আমি ইস্তানবুলকে শুনছি, আমার চোখ বন্ধ আছে।
আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক





