অনেক কিছুর মতো চায়ের আবিষ্কার চীন দেশেই হয়েছিল। চায়ের ব্যবহার সন্দেহাতীতভাবে চীনেই প্রথম শুরু হয়েছিল। চা গাছটি চীন ও জাপানে জন্মাত। ঐতিহাসিক আমল থেকেই ভারতে চা গাছ ছিল। কিন্তু এ গাছের গুণাগুণ সম্পর্কে ভারতীয়রা অজ্ঞ ছিল, গাছটি বুনো হিসেবেই সবার চোখের আড়ালে রয়ে যায়। চীনে চায়ের ব্যবহার আবিষ্কার হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। সে সময় চীনের একজন শাসক ছিলেন শেন নঙ। কিংবদন্তি অনুসারে, কোনো এক গ্রীষ্মের বিকালে খাবার তৈরির জন্য শেন নঙের ভৃত্যরা পানি গরম করছিল। আর তিনি একটি গাছের তলায় বসেছিলেন। হঠাত্ কয়েকটা পাতা এসে পড়ে সেই গরম পানির মধ্যে। মুহূর্তেই পানির রঙ বাদামি হয়ে যায়। সম্রাট পানির রঙ বদলে আকৃষ্ট হয়ে তা পান করেন। সেই পানি পান করার পর তিনি শারীরিকভাবে বেশ চনমনে, সতেজ অনুভব করেন। আর এভাবেই চায়ের জন্ম হয়। ইংরেজি ‘টি’ শব্দটির উত্স চীনা ভাষা। চীনা ভাষায় তেতো গুল্মকে বলা হতো ‘টেয়’, এ শব্দটি থেকেই ইংরেজি শব্দের উদ্ভব। আর জাপানিরা বলত ‘চিয়া’; যা থেকে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহূত ‘চা’ শব্দের উদ্ভব হয়েছে।

চায়ের ব্যবহার নিয়ে প্রথম গ্রন্থ ‘দুয়াকু’ লিখিত হয় ৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। চায়ের ভেষজ গুণাগুণ ও ব্যবহারবিধি নিয়ে চতুর্থ শতকে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন কিয়েন লুঙ। ট্যাঙ রাজত্বে (৬১৮-৯০৭ খ্রিস্টাব্দ) চা চীনের জনপ্রিয় পানীয় হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ আমলে লু ইয়ু চীনের চায়ের ইতিহাস, প্রস্তুতপ্রণালি, ব্যবহার নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি চায়ের গুণাবলি নিয়ে লিখেছিলেন, ‘এটা মেজাজ ঠাণ্ডা রাখে, মনের অস্থিরতা দূর করে, শরীরের অবসাদ-শ্রান্তি দূর করে। ঘুমঘুম কিংবা ঝিমুনিভাব চলে যায়, শরীরকে সতেজ ও কর্মক্ষম রাখে।’

চতুর্দশ শতকে একজন বিশিষ্ট বৌদ্ধ দেঙয়ো দাইশাই প্রথমবারের মতো চা চীন থেকে জাপানে পরিচিত করেন। তিনিই জাপানিদের চায়ের ব্যবহার শেখান। এর বহু আগে থেকেই অবশ্য চীনাদের মধ্যে পানীয় হিসেবে চায়ের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে চা গাছ ছিল, তাই এটা ধারণা করা হয় যে চা গাছ আগে থেকেই জাপানে জন্মাত এবং দাইশাই সেখানে গিয়ে তাদের চায়ের ব্যবহার শিখিয়েছিলেন।

ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপ্যানশন বোর্ডের তথ্যমতে, ভারতে প্রথম চা উত্পাদিত হয়েছিল ১৮৩৯ সালে। বাংলাদেশ তথা তত্কালীন পূর্ববঙ্গে প্রথম চা উত্পাদিত হয়েছিল ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া টি এস্টেটে। কিন্তু উনিশ শতকে এই চা উত্পাদন কেবল ব্রিটিশদের নিজেদের ব্যবহার ও বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ সময়কালে চা ভারতীয়দের মধ্যে যথেষ্ট পরিচিত ছিল না। মূলত বিংশ শতকের শুরু থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে চা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। ভারতীয়দের মধ্যে চা’কে জনপ্রিয় করার পেছনে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইন্ডিয়ান টি চেজ কমিটি। এ কমিটির অর্থ আসত ভারতের চা রফতানির ওপর আদায়কৃত কর থেকে। এ কমিটির প্রধান কাজ ছিল চা পানের সুফল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে প্রচারণা চালানো। এ জন্য তারা গ্রামোফোনের রেকর্ডও তৈরি করেছিল। টি চেজ কমিটির কমিশনার ঘোষণা করেছিলেন— ‘ভারতীয়রা যদি চা পানের অভ্যাস গড়ে তোলে তাহলে তাদের অসুখ-বিসুখ এবং মৃত্যুহার হ্রাস পাবে। জনগণের কর্মশক্তি ও উদ্যম বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া মদ্যপান বর্জন করা শ্রমিকরা দৃঢ়ভাবে দাবি করেছেন যে, চা তাদের মদের নেশা থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করেছে।’ তাছাড়া আরো বলা হতো যে, চায়ের জন্য পানি ফোটানোর ফলে তা জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়।

যতই আপনি মানুষকে বোঝান যে চা আপনার জন্য বিভিন্নভাবে উপকারী, যতক্ষণ না চা তাদের হাতের নাগালে আসছে, ততক্ষণ কিন্তু চায়ের ব্যবসায়ীদের কোনো লাভ নেই। এ পরিস্থিতিতে ভারতজুড়ে বড় বড় শহরে চায়ের দোকান স্থাপন শুরু হয়। শুরুতে বিভিন্ন আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থার মাধ্যমে চায়ের দোকানে খদ্দেরদের আকর্ষণ করা হতো, যার মধ্যে ছিল সিনেমা, ভারতীয় অর্কেস্ট্রা, গান, ঘরোয়া খেলাধুলা, গ্রামোফোন ও আকর্ষণীয় ডেকোরেশন। টি চেজ কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চায়ের দোকানগুলোকে জনপ্রিয় করার জন্য ভারতজুড়ে তারা ৭০০ গ্রামোফোন, স্থানীয় ভাষার আট হাজার রেকর্ড, ২০০ হারমোনিয়াম ও ঘরোয়া খেলাধুলার জন্য অসংখ্য টেবিল ব্যবহার করেছে।

কলকারখানা, খনি, সেনাবাহিনী— সবখানেই চায়ের পর্যাপ্ত সরবরাহ শুরু হয়। কলকাতার বিভিন্ন পাটকলে রাতে কাজ চললে সারা রাত চায়ের দোকান খোলা থাকত। কারখানা অঞ্চলের একটি চায়ের দোকানে সেই আমলেও মাসে প্রায় ১ হাজার টাকা উপার্জন করত! ১৯২০-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯২১ সালের মার্চ সমকালে ভারত ভ্রমণ করেন মার্ক থর্নহিল। তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে কল-কারখানা পরিদর্শন করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন ‘হন্টস অ্যান্ড হবিজ অব অ্যান ইন্ডিয়ান অফিসিয়াল’। এ গ্রন্থে তিনি বর্ণনা করেছেন, ‘চা পান ভারতীয় শ্রমিকদের মধ্যে একটি নতুন রীতি। কিন্তু নতুন হলেও শ্রমিকদের মধ্যে এ সংস্কৃতি অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে। কারখানাগুলোয় চায়ের দোকান বেশ জনপ্রিয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ দোকানগুলো সারা দিন খোলা থাকে এবং শ্রমিকরা তাদের ইচ্ছামতো এসব দোকানে চা পান করতে আসেন। আবার কিছু কারখানায় চায়ের দোকানে আসার সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। অনেক কারখানায় চা পানের জন্য দুটি আলাদা কক্ষ থাকে— একটি হিন্দুদের, অন্যটি মুসলমানদের জন্য। অবশ্য রান্নাঘর একটিই থাকত, কিন্তু রান্নাঘরে আবার চা বানানোর জন্য একজন উচ্চবর্ণের হিন্দু ও একজন মুসলমান থাকতেন। সাধারণত পিতলের গ্লাসে দুধ ছাড়া শুধু চিনি দিয়ে এ চা পরিবেশন করা হতো।’ চা পানে অবশ্য শুধু ধর্ম নয়, লিঙ্গ প্রশ্নটিও চলে আসত। নারী শ্রমিকরা চা পানে এসব দোকানে ঢুকতে পারতেন না। তারা বাইরে বসে চা পান করতেন।

প্রাথমিক সময়ে ভারতে বর্ণপ্রথার কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চা নিয়ে কিছু কুসংস্কার ছিল। হিন্দুদের বাদে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে চা দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে হিন্দুরাও একসময় ব্যাপকভাবে চা পান শুরু করেন। ভারতে চায়ে দুধ মিশিয়ে পান করার রীতি মূলত হিন্দুদের হাতেই জনপ্রিয় হয়েছিল। গত শতকের শুরুর দিকে চা নিয়ে ধর্মীয় কুসংস্কার কিংবা সামাজিক ট্যাবু ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং চায়ের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

রেলওয়ে স্টেশনগুলোয় যাত্রীদের জন্য চায়ের দোকান গড়ে ওঠে। রেলস্টেশনগুলো চায়ের সংস্কৃতি বিকাশে ভালো ভূমিকা রেখেছিল। ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপ্যানশন বোর্ড ও টি চিজ কমিটি চা কোম্পানিগুলোকে রেলস্টেশনে চায়ের ক্যান্টিন স্থাপনের পরামর্শ দেয়। এসব ক্যান্টিনে বিনামূল্যে চা পান করানো হতো। এসব রেলস্টেশনে টানানো বিজ্ঞাপনে কলকাতায় অবস্থিত সেন্ট্রাল টি বোর্ডের ঠিকানা দেয়া থাকত। এ টি বোর্ডে অনুরোধ করলে চা প্রস্তুতপ্রণালি নিয়ে প্রকাশিত নির্দেশিকা বিনামূল্যে দেয়া হতো। শুধু কলকাতা শহরে চায়ের দোকানের সংখ্যার হিসাবটা দেখলেই অনেক কিছু পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে। ১৯১৫ সালে কলকাতায় চায়ের দোকানের সংখ্যা ছিল ৪৪৪টি, পরের বছরের শেষ নাগাদ দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১ হাজার ১২৪টি। এর পর ১৯১৭ সালের শেষে চায়ের দোকানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪২০টি। ভারতের অন্যান্য বড় শহরের চিত্রটাও এমন ছিল। চায়ের দোকানগুলো বেসরকারি উদ্যোগে চললেও সেখানে টি চেজ কমিটির তত্ত্বাবধায়ন থাকত, যতক্ষণ না দোকানগুলো তাদের কাজে দক্ষতা দেখাচ্ছে এবং জনগণকে ভালো এক কাপ চা উপহার দিচ্ছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে চা ব্যবসায় কিছু সমস্য তৈরি হয়। জাহাজের সংকট এবং যুদ্ধসংশ্লিষ্ট আরো কিছু সমস্যায় ভারতে উত্পাদিত চা রফতানি ব্যাহত হয়। সিদ্ধান্ত হয় এই চা ছোট ছোট প্যাকেটে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হবে। সে সময়ের জন্য এটা ছিল এক ধরনের অসম্ভব প্রকল্প। কারণ চা রাখতে হয় বাতাস থেকে দূরে আর কাগজের ব্যাগ দিয়ে সেটা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে প্যাকেট করার জন্য এত শ্রমিকের বেতনই বা কে দেবে। কিন্তু টি চেজ কমিটি এসব সমস্যার সমাধান বের করে ফেলে। তারা এনভেলপের মতো কাগজের প্যাকেট তৈরি করেন, যাতে ছয় কাপ চা রাখা যেত। আগ্রহী খুচরা চা বিক্রেতাদের এ প্যাকেট সরবরাহ করা হতো। ক্রেতারা দোকানে চা কিনতে এলে দোকানি তার টিন অথবা বাক্সে সুরক্ষিত চা বের করে এনভেলপে ভরে বিক্রি করতেন। এনভেলপের ওপর চারটি ভাষায় নিচের নির্দেশনাটি ছাপা থাকত—

‘ছয় কাপ চায়ের জন্য প্যাকেটের মধ্যে থাকা চা ফুটন্ত পানিতে ঢালুন। স্বাদের জন্য দুধ এবং চিনি যোগ করুন।’

এভাবে সরাসরি চায়ের পাতা বিক্রির পদ্ধতি বা ব্যবসা ১৯১৮ সালের শুরু নাগাদ জনপ্রিয় হয়ে যায়। এভাবে ১৯২০ সালের জুলাই নাগাদ ভারতজুড়ে সাড়ে সাত হাজার দোকানে প্যাকেটে চা বিক্রি শুরু হয়। একই সময়ে টি চেজ কমিটি ৭০ লাখ এনভেলপ প্যাকেট সরবরাহ করে। এ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কীভাবে চা ভারতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। কলকাতার কর্নওয়ালিস কিংবা হ্যারিসন রোডে হাঁটলে বা মফস্বলের বাজারে গেলে চায়ের রমরমা অবস্থার দেখা পাওয়া যেত।

পালোয়ান রামসুক তেওয়ারী বাংলায় এসেছিলেন ভাগ্য বদলাতে। ভাগ্য বদলাতে না পারলেও শিগগিরই হয়ে গেলেন চায়ে আসক্ত। চায়ের প্রভাবে তিনি বদহজমজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হলেন এবং তার ওজন হ্রাস পেতে থাকল। শিশুদের জন্য লেখা এক কবিতায় ১৯৩০-এর দশকের কবি কুমদরঞ্জন মল্লিক রামসুকের পরিণতি বর্ণনা করেছিলেন— ‘অবশেষে অসুখের সংবাদ পাইয়া

দেশ থেকে ধেয়ে এলো দেশওয়ালী ভাইয়া

করে দিল প্রথমেই চা খাওয়া-টা বন্ধ

বে-ভাষায় বললো সে কতো কী যে মন্দ’

গ্রামের সেই আত্মীয়ের পরামর্শ মেনে রামসুক তার হারানো স্বাস্থ্য ফিরে পায়।

ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র মনে করেন, ‘চা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছিল। চা তাদের ক্ষমতা, আধিপত্য ও সংস্কৃতিক প্রভুত্বকে প্রকাশ করত।’ উনিশ শতকজুড়ে চায়ের প্রধান ক্রেতা ছিল ব্রিটিশরা। তখন বিখ্যাত দার্জিলিং তাদের কাছে ছিল ‘ডারলিঙটন টি’ আর আসামের কাছাড় টি হয়ে গিয়েছিল ‘ক্যাচার টি’। ব্রিটিশদের কাছে ভারত এবং তার পণ্য ছিল তাদের সম্পদ ও ক্ষমতার অনুষঙ্গ।

১৯২২ সালে লিপটন চা কোম্পানির প্রকাশিত ক্যালেন্ডারে ডিউক অব কনাটের একটি রঙিন ছবি ছিল, ছবিতে ডিউককে যুদ্ধসাজে ঘোড়ার পিঠে দেখা যায়। ছবিটি যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়েছে, সে কথা আর বলে দিতে হয় না। কিন্তু এ উপস্থাপন কিন্তু লিপটন কোম্পানির শুরু থেকে ছিল না। গৌতম ভদ্র চায়ের সঙ্গে সাম্রাজ্যের ক্ষমতার সম্পর্ককে দেখাতে গিয়ে এ ছবিটির উদাহরণ টেনেছেন। এর পর ভদ্র আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আরেকটি বিজ্ঞাপনের দিকে। বিজ্ঞাপনটি উনিশ শতকে কলকাতার বিশিষ্ট স্পেনসে’স হোটেলে টানানো ছিল। এ বিজ্ঞাপনে কোম্পানির নামে এবং চা নিয়ে একজন পাদ্রির মন্তব্যে রাজকীয় ছাপ থাকলেও মূল ছবি বলে ভিন্ন কথা। ছবিতে দেখা যায়, একজন ঘুম থেকে জাগা বাঙালি বাবু হাই তুলছেন আর তার সামনের টেবিলে এক কাপ চা থেকে ধোঁয়া উঠছে। যুদ্ধসাজে ডিউকের ছবির বিপরীতে একেবারে ভিন্ন মেজাজের বিজ্ঞাপন।

এ সময় বাংলার ধনীদের মধ্যে গড়ে ওঠে চায়ের সংস্কৃতি। টেবিল, চেয়ার, চা পরিবেশনের জন্য দামি কাপ-পিরিচ আর চা পানের অভ্যাসে নব্য বাবুরা ইংরেজদের মতো হতে চাইলেন। ঔপনিবেশিক আমলে চা সংস্কৃতির পরিমার্জন এবং সামাজিক গতিশীলতার একটি প্রতীক হয়ে ওঠে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ২০ বছর টি চেজ কমিটি চা নিয়ে মানুষকে আগ্রহী করতে ব্যাপক প্রপাগান্ডা চালায়। চা তৈরির পদ্ধতি প্রদর্শন এবং বিনামূল্যে চা বিতরণ ছিল এই কার্যক্রমের অংশ। পুরুষ ও নারীরা মেলা কিংবা রেলস্টেশনে চায়ের ব্যবহারবিধি প্রদর্শন করতেন। এমনকি ঘরে ঘরে গিয়েও এ প্রচারণা চালানো হতো। রেলস্টেশন ও দোকানে স্থানীয় ভাষায় চা প্রস্তুতের সচিত্র নির্দেশনাযুক্ত সাইনবোর্ড শোভা পেতে থাকে।

প্রাইভেট কোম্পানিগুলো পেছনে পড়ে থাকেনি। ১৯২০-এর দশকে লিপটনের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রুক বন্ড বাজারে আসে টিনের কৌটায় নিয়ে। তারা প্রচারণা চালায় যে, তাদের এ টিনের কৌটাই চা সংরক্ষণের শ্রেষ্ঠ উপায়। লিপটনের ব্যবসায় ব্রুক বন্ড যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করে। এক পর্যায়ে ব্রুক বন্ডকে মোকাবেলা করতে লিপটন বিজ্ঞাপন দেয়, ‘আমরা চায়ের বিজ্ঞাপন দিই, টিনের পাত্রের নয়।’ বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি এবং দুই কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চা সারা ভারতে পরিচিত হয়ে ওঠে। কোম্পানির পাশাপাশি ব্যক্তি-উদ্যোগেও অনেকে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। গত শতকের একেবারে শুরুর দিকে গিরিশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘চা প্রস্তুত শিক্ষাপ্রণালি’ শিরোনামে বাংলা ভাষায় একটি নির্দেশিকা রচনা করেন। বাবু সংস্কৃতির ভদ্দরলোকদের আকর্ষণ করতে লিপটন ‘ছোট্ট প্রাতঃরাশ’ শিরোনামে রঙিন বিজ্ঞাপন দিত।

চা নিয়ে এই প্রচারণার সমান্তরালে দেখা গেছে চা-বিরোধী ব্যক্তি ও সামাজিক প্রতিরোধ। ১৮৮০-এর দশকে চা বাগানে শ্রমিকদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল। বিশিষ্ট চিকিত্সক সুন্দরী মোহন দাস (১৮৫৭-১৯৫০) ও জাতীয়তাবাদী নেতা কৃষ্ণ কুমার মিত্র (১৮৫২-১৯৩৬) প্রতিবাদ জানিয়ে চা পান ত্যাগ করেন। ১৯৩০-এর দশকে তামিলদের বিশুদ্ধতাবাদী আন্দোলন তাদের স্থানীয় পানীয়ের পরিবর্তে চা পানের ব্যাপারে আপত্তি এবং বিতর্ক শুরু করে। স্বাস্থ্যগত ও নৈতিকতার মানদণ্ডে বাংলায় বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও স্বদেশী আন্দোলনের উদ্যোক্তা প্রফুল্ল চন্দ্র রায় চা পানের ঘোরতর বিরোধিতা করেন। তার কথা ছিল, চা মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষতিসাধন করে এবং ক্ষুধা নষ্ট করে। এছাড়া তার মনে আশঙ্কা ছিল, ঘরের গৃহিণীরা চায়ের প্রতি নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে তা অন্তঃপুরের পরিবেশ নষ্ট করবে। নিজের ধারণার সপক্ষে তিনি একটি ব্যঙ্গচিত্রও আঁকেন। এই ব্যঙ্গচিত্রে দেখা যায়, একজন ‘পাক্কা চা-খোর’র করুণ চিত্র। এই পাক্কা চা-খোরের টেবিলে একটি বড় চায়ের পাত্র আর তার হাতে এক কাপ চা। তার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পায়ের ছিন্ন জুতা, ছেঁড়াখোড়া পোশাক, আর চারদিকে ছড়ানো অসংখ্য সিগারেটের খোসা। সব মিলিয়ে চায়ের নেশায় অকেজো এক মানুষের প্রতিচ্ছবি।

কিন্তু বিরোধী প্রচারণা হালে পানি পায়নি, চায়ের জয়যাত্রা অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলল। চায়ের গুণকীর্তনভরা পোস্টার বিভিন্ন স্থানে শোভা পেতে থাকল। স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এই চায়ের ব্যবসায় নাম লেখাতে শুরু করলেন। চা বিক্রি ও উত্পাদনের জন্য ১ লাখ রুপি মূলধন পরিশোধ করে অনেকে কোম্পানি খুললেন। তত্কালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকা বিভাগের মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর টি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি লিমিটেড ছিল এমনই একটি সফল উদ্যোগ। তামিলনাড়ুতে ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে চায়ের পরিবর্তে কফিকে আপন করে নিলেন। চা শ্রমজীবী ও অব্রাহ্মণদের পানীয় বলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তবে পূর্ব ভারতে জমিদার ও মধ্যবিত্ত উভয়ই ব্যয়বহুল এবং ক্ষতিকর মদের পরিবর্তে চাকে গ্রহণ করেছিলেন।

চায়ের প্রচারণায় ধর্ম ও সামাজিক শ্রেণীকেও মাথায় রাখা হতো। মুসলিমদের নির্দিষ্ট করে প্রচারণা হয়েছে। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, চাকে সমাজের অভিজাতদের হাতে দেখানো হতো। প্রচারকরা চাকে মান-মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী ছিলেন বলেই মনে হয়। একই সঙ্গে চাকে বিলাস নয়, বরং ডাল-রুটির মতো নিত্যপণ্য হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছিল। অ্যানামেল বোর্ডের ওপর এ রকম একটি ছবি দেখা যায়। ছবিতে দেখা যায়, দামি কাপড় ও ফেজ টুপি পরিহিত একজন মুসলিম অভিজাত চা পান করছেন। অন্যদিকে ছবির ক্যাপশনের কথায় চাকে ডাল-রুটির মতো নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ১৯১০ ও ’২০-এর দশকে বাংলার অভিজাত পরিবারগুলোয় চা তৈরি ছিল প্রায় এক উত্সব। যতীন্দ্র মোহন চা তৈরির প্রক্রিয়ার বিশদ বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি এমনকি চায়ের পানি ফোটানোর সময় পরিমাপের জন্য বালুঘড়ি ব্যবহারের পারমর্শ দেন।

একটা ব্যাপার সাদা চোখেই দেখা যায় যে, ভারতের সব স্থানে চায়ের ব্যবহার একই মাত্রায় শুরু বা বিকশিত হয়নি। ১৯২০-এর দশকের শেষ দিকে বেথুন কলেজের হোস্টেলে সকালের নাশতায় নিয়মিতভাবে চা থাকত। অন্যদিকে বিশিষ্ট সাহিত্যিক সুকুমার সেন (১৯০০-১৯৯২) স্মৃতিচারণ করেছেন যে, বর্ধমানে নিজের বাসায় তিনি নিয়মিত চা পান করতেন কিন্তু যখন কলকাতায় পড়তে এলেন তখন দেখলেন, সেখানে তার মামার বাসায় চায়ের কোনো চল নেই। চা পান করতে তাকে কলেজ স্ট্রিটে চায়ের দোকান, না হয় বন্ধুদের বাসায় যেতে হতো। গ্রামীণ বাংলায় ১৯৩০-এর দশকের শেষভাগেও গরিব চাষীদের কাছে চা ছিল বিলাসী ও শখের পানীয়। বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এমনটাই জানিয়েছেন।

১৯৪০-এর দশকের শুরু থেকেই সবাই বুঝতে পারছিলেন ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা আর খুব দূরে নয়। চায়ের বিজ্ঞাপন, প্রচারণাতেও এর ছাপ পড়ে। প্রচারণায় ব্রিটিশ থিমের বদলে ভারতীয় ধারণা প্রাধান্য পেতে শুরু করে। ব্রিটিশদের করা আদমশুমারির তথ্যকে ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের সংস্কৃতি এবং ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যার হিসাব মাথায় রেখে বিজ্ঞাপনের ভাষা ও থিম নির্ধারণ শুরু হয়। ১৯৪০-এর দশকে এই পরিবর্তন ভারতের বিজ্ঞাপন শিল্পেও এক ধরনের গতিশীলতা আনে। ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপ্যানশন বোর্ডের প্রচারণায় অনেক প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ভারতের বাণিজ্যিক শিল্প নির্দেশনার অন্যতম পথিকৃত আনন্দ মুনশী (১৯০৫-১৯৮৫ খ্রি.) তার তুলির এক ছোঁয়ায় চায়ের বিজ্ঞাপনচিত্রে ব্রিটিশ আখ্যানকে সরিয়ে সেখানে বসিয়ে দিলেন চরকা এবং এক ভারতীয় গৃহবধূর হাতে এক কাপ চা। হয়ে গেল একশ ভাগ স্বদেশী চায়ের বিজ্ঞাপন। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় মোহাম্মদী পত্রিকার ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ ক্রোড়পত্রে কয়েক পাতাজুড়ে ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপ্যানশন বোর্ড কর্তৃক চায়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল। কোনো নির্দিষ্ট শব্দ উচ্চারণ না করেও বিজ্ঞাপনটিতে চাকে উত্সবের অনুষঙ্গ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ১৯৪৪ সালের ১০ এপ্রিল আরেকটি পত্রিকায় টি মার্কেট এক্সপ্যানশন বোর্ড আরেকটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে, যেখানে চাকে ভারতের জাতীয় সম্পদের একটি দৈত্যাকার উত্স হিসেবে দেখানো হয়। বিজ্ঞাপনে ভারতীয় চায়ের উত্পাদন বৃদ্ধির একটি পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, চা ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।

বেসরকারি কোম্পানিগুলোও তাদের বিজ্ঞাপনে নতুন নতুন ধারণা যোগ করতে থাকে। শারদীয় শুভেচ্ছা থেকে দশোহরা কিংবা দীপাবলির শুভেচ্ছাসমৃদ্ধ বিজ্ঞাপন নিয়ে আসে লিপটন ও ভ্যালি ভিউ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের কিছুদিন আগে ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপ্যানশন বোর্ড চাকে ‘ভারতের সত্যিকার প্রতিনিধি’ হিসেবে আখ্যা দেয়। অর্থাত্ চা এবার ভারতের জাতীয় এক পানীয় এবং অর্থনীতির উপাদান হয়ে উঠল।

বিজ্ঞাপনের বাইরে রাজনীতিবিদরাও চায়ের সংস্কৃতি জনপ্রিয় করায় ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৩৪ সালে বোম্বাইয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে চা বিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। চা বিরতির খবরটি বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষ এই নতুন প্রথাকে বেশ উত্সাহভরে গ্রহণ করেছিল। কংগ্রেসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদ চায়ের খুব প্রশংসা করতেন। তিনি কংগ্রেসের পুনে সম্মেলনে চা চক্রের আয়োজন করেছিলেন। ভারতের চা কোম্পানিগুলো খবরটি ব্যাপকভাবে প্রচার করেছিল।

বিংশ শতকের শুরু থেকে ভারত তথা বাংলায় চায়ের সংস্কৃতির দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভের বিষয়টি বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের দৃষ্টি এড়ায়নি। সরকার তার ১৯১১ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ইকোনমিকস অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’য় লিখেছেন— ‘সবখানেই ভারতীয়রা ভালো ভালো ঘরবাড়ি বানাচ্ছে। বাঙলার কৃষকরা এমনকি কোট পরিধান শুরু করেছে। শহরের অনেক চাকর এবং ছোটখাটো কারিগররা বরফ ব্যবহার করছে। চা-পানের অভ্যাস খুব দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতি পাঁচ বছরে চা পানকারীদের সংখ্যা দ্বিগুণ হচ্ছে।’

সূত্র: গৌতম ভদ্রের ‘ফ্রম অ্যান ইম্পেরিয়াল প্রডাক্ট টু আ ন্যাশনাল ড্রিংক: দ্য কালচার অব টি কনজাম্পশন ইন মডার্ন ইন্ডিয়া’ এবং গুরুঙ রোশানের প্রবন্ধ ‘ফরমেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব টি কালচার ইন ইন্ডিয়া উইদ আ স্পেশাল রেফারেন্স টু বেঙ্গল’ অবলম্বনে রচিত।