অনারেবল ইস্ট কোম্পানির কল্যাণেই ভারতবর্ষের মানুষ একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলেন, তা হলো ‘ফিশিং ফ্লিট’। ইস্ট  ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ভারতবর্ষে বাণিজ্য শুরু করল তখন এবং শেষ পর্যন্ত তা সামলেছেন ব্রিটিশ পুরুষরাই। ভারতে ব্রিটিশ নারীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। কিন্তু ঘর-সংসার তো করতে হবে, নিজেদের জাতের কৌলীন্যও বজায় রাখতে হবে! অন্যদিকে ব্রিটেনে মেয়েরা অবিবাহিত রয়ে যাচ্ছেন। কোম্পানি তো আর ব্যবসা গোটাতে পারবে না, তাই ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে তরুণীরা স্বামী খুঁজতে জাহাজে করে সাতের কম সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ভারতবর্ষে আসতে শুরু করেন। এই জাহাজের নাম ফিশিং ফ্লিট। চার মাসের সাগরযাত্রা করে ভারতে পা রাখতে শুরু করলেন
রোমাঞ্চপ্রিয়, দরিদ্র, সংসারে আগ্রহী তরুণীরা। ভারত তখন ইংরেজ তরুণদের জন্য আকর্ষণীয় চাকরিস্থল হয়ে উঠছে। ব্রিটেনের মেয়েরাও বুঝলেন ভারতে গিয়ে বিয়ে করা মানে বাংলো,
চাকর-বাকর— সব মিলিয়ে রাজার হালে থাকা যাবে। যদিও তরুণ অনেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিবাহিত জীবন কম বেতনের কারণে কঠিন হয়ে উঠত। 

ভারতে ইংরেজ শাসনে কিংবদন্তীয় নামটি লর্ড ক্লাইভ। ইতিহাসে ক্লাইভের সাফল্য ঈর্ষণীয়। এই ক্লাইভের স্ত্রী ফিশিং ফ্লিটের একজন যাত্রী ছিলেন। মার্গারেট ম্যাস্কালিনের জন্ম ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে। তিনি ছিলেন এডমন্ড ও এলিজাবেথ ম্যাস্কালিনের অনাথ সন্তান। মার্গারেটের ভাই এডমন্ড কাজ করতেন ভারতে, অনারেবল কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে। এডমন্ডের কর্মস্থল তখন মাদ্রাজ। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্লাইভকে বোনের ছবি দেখালেন। ক্লাইভ মার্গারেটের রূপে এমন মুগ্ধ হয়েছিলেন যে এডমন্ড তাকে ভারতে ডেকে পাঠালেন। জাহাজ গডলফিনে চেপে আরো অনেক তরুণীর সঙ্গে মার্গারেট ভারতে পা রাখেন। গডলফিন ৫০০ টনেরও কম ওজনের জাহাজ। মার্গারেট ভারতে পৌঁছতে পৌঁছতে ক্লাইভ একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে এই ক্লাইভের হাতেই বাংলার নবাব সিরাজ ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। ছয় মাসের মধ্যে ১৭৫৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ইংরেজদের ভবিষ্যৎ নায়ক ক্লাইভের সঙ্গে মার্গারেটের বিয়ে হয়।

উনিশ শতকের মধ্যভাগে ফিশিং ফ্লিটে শুধু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে পাঠানো মেয়েরাই নয়, সঙ্গে ব্রিটেনের সমাজের বিভিন্ন স্তরের মেয়েরা উঠতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের পরিবারগুলো তখন মেয়েদের ভালো বিয়ের জন্য মেয়েদের এই ফিশিং ফ্লিটে তুলে দিতে দ্বিধা কাটিয়ে উঠেছে। ভারতের নির্ভার নিশ্চিত সচ্ছল জীবনের আশায় অনেক সময় মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ফিশিং ফ্লিটে অনেক মেয়েকে সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়েছে।

ফিশিং ফ্লিট যখন নিয়মিত মেয়েদের নিয়ে ভারতে যাতায়াত করছে তখন ব্রিটিশদের শাসনের সূর্য দুনিয়ায় অস্ত যায় না। উপনিবেশগুলোয় তখন বিপুলসংখ্যক ব্রিটিশ পুরুষ কাজ করছে। ফলে ইংল্যান্ডে বিবাহযোগ্য কন্যার তুলনায় পাত্রের সংখ্যা কম ছিল। বংশগৌরব, অর্থ, সৌন্দর্যহীন মেয়েদের বিয়ে হওয়া তখন কঠিন হয়ে পড়ছে। কিন্তু ভারতে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। অসংখ্য বিবাহযোগ্য পুরুষ, কিন্তু উপযুক্ত স্বদেশী ইংরেজ পাত্রী দুর্লভ। ফলে কোনো ইংরেজ মেয়ে ভারতের মাটিতে পা রাখলে বিয়ের প্রস্তাবে ভেসে যেত সে। এক রকম সামান্য পরিচয়েই বিয়ে হয়ে যেত, সহজেই। তবে এদের মধ্যে কেউই বোধহয় লেফটেন্যান্ট মাইকেল এডওয়ার্ড স্মিথের চেয়ে দ্রুত বিয়ে সারেননি। ১৮৪৭ সালের আগস্টে স্মিথ ছুটি কাটাতে নীলগিরি পাহাড়ে গিয়েছিলেন। সেখানে এক রোববার গির্জায় এক মেয়েকে দেখে তার খুব পছন্দ হয়ে যায়। প্রথম দেখাতেই তিনি মেয়েটিকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। দুই সপ্তাহের মাঝে এক নাচের অনুষ্ঠানে স্মিথ সেই মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মেয়েটি তার এক বোনের সঙ্গে সেখানে থাকত, বোনের স্বামী এক সেনা কর্মকর্তা। যাহোক, নাচের অনুষ্ঠানেই স্মিথ বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, প্রস্তাব গৃহীত হলো এবং ৮ সেপ্টেম্বর তাদের বিয়ে হয়ে গেল। অর্থাৎ স্মিথ মাত্র তিন সপ্তাহের ছুটিতে কন্যা পছন্দ ও বিয়ে সম্পন্ন করে ফেললেন। ছুটি শেষ করে স্মিথ বীরদর্পে সস্ত্রীক রেজিমেন্টে ফেরেন।

সিপাহি বিদ্রোহের পর কোম্পানির শাসনের স্থলে ভারতবর্ষে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের রাজ প্রতিষ্ঠা হলো। প্রতিষ্ঠিত হলো ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস। এতে অনেক ব্রিটিশ তরুণ ভারতে এলেন। ব্রিটিশ সরকার তার সেনাবাহিনীর অনেক রেজিমেন্ট ভারতে পাঠাল। অর্থাৎ ব্রিটিশরাজের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভারতে আসা অবিবাহিত ব্রিটিশ পুরুষদের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়ে গেল। ১৮৬৯ সালের নভেম্বরে সুয়েজ খাল উন্মুক্ত হয়। লন্ডন থেকে বোম্বাই আসার জাহাজপথ মাস থেকে কমে এল সপ্তাহে। ভারতের দ্বার আরো উন্মুক্ত হয়ে গেল। ফিশিং ফ্লিটে করে ব্রিটিশ মেয়েদের ঢল নামল ভারতে।

একসময় বিয়ের জন্য ভারতে ব্রিটিশ মেয়েদের চাহিদা কমে এলেও ফিশিং ফ্লিট নামটি মুছে যায়নি। ফিশিং ফ্লিট তখন ব্রিটিশ সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অবস্থানকে স্পষ্ট করে। নারীরা তখনো অনেকাংশে বিয়ের ওপর নির্ভরশীল, মানে বিয়ে ছাড়া সে সামাজিকভাবে দুর্বল, অসুখী। ধনী নারীদের ক্ষেত্রেও এ পরিস্থিতি বদলায় না। বিয়ে, সন্তান, ঘরদোর সামলানো— এই তখন ব্রিটেনের মেয়েদের জীবন। অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের পদচারণা সেভাবে না থাকায় অর্থনৈতিকভাবেও তারা পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

ব্রিটিশ বা তার আগে কোম্পানির শাসনামলে ব্রিটিশ নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ভারতবর্ষ হয়ে উঠেছিল একটা লক্ষ্যের মতো। পুরুষ হলে মিলত আকর্ষণীয় চাকরি, সুযোগ-সুবিধা। আর এই পুরুষদের বিয়ে করতে পারলে নিশ্চিন্ত জীবন, তাই ইংল্যান্ড থেকে মেয়েরা ছুটে আসত ভারতে। এভাবে তৈরি হয় পরিবার এবং অনেক পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাস করতে থাকে। এসব পরিবারের মেয়েরা আবার ইংল্যান্ডে গিয়ে শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে, আদব-কায়দা শিখে পুনরায় ভারতে ফিরে আসত কাঙ্ক্ষিত স্বামী খুঁজতে।

ব্রিটিশরাজের সময় ভারতে শ্বেতাঙ্গদের বিয়ের বিষয়টি তাদের নিজ দেশের মতো ছিল না। কিপলিং উল্লেখ করেছেন, ‘ভারতে বিয়ের ক্ষেত্রে চিন্তা পাত্র নিয়ে নয়, বরং পাত্র কোন সরকারের চাকরি করে, সেটাই বিবেচনার বিষয়।’ এমনকি মেয়েদের বিয়ের দিনও তাদের প্রত্যাশা থেকে ভিন্ন হতো। ১৯০৪ সালে ফিশিং ফ্লিটে এক বছরের জন্য ভারতে এসেছিলেন লুসি হার্ডি। এখানে তার সঙ্গে বাগদান হয় রয়াল আর্টিলারির সেনা হ্যারি গ্রান্টের। লুসির বিয়ের অভিজ্ঞতা যে ভয়ানক ছিল, তা হয়তো কোনো মেয়েই প্রত্যাশা করবে না। তার বিয়ে হয়েছিল বিচ্ছিন্ন এক স্থানে, সেখানে রাতে ছিল ডাকাতের ভয়, সেখানে ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে ঘাড় ভাঙার আশঙ্কাও ছিল।

গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু, পরিপার্শ্ব, সমাজে বিস্তর ব্যবধানের পাশাপাশি রাজের বিয়েতে কিছু অদ্ভুত ধরনের সামাজিক ও মানসিক বিষয় লক্ষ করা যেত। এসবের অনেক নিয়ম ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে চাকরি করার জন্য বাধ্যতামূলক। ইংল্যান্ডে একজন পুরুষ যিনি স্ত্রী ও পরিবারের ভরণপোষণ করতে সক্ষম, তিনি যেকোনো সময় চাইলে বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু রাজের অধীনস্থ কর্মচারী ও বিভিন্ন প্লান্টেশনে কাজ করা কর্মীরা তাদের কর্মজীবনের প্রথম বছরে বিয়ে করতে পারতেন না। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে ব্রিটিশরা যোগ দিত বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার এক বা কয়েক বছর পর, অর্থাৎ সে হিসাবে বিয়ে করতে তাদের বয়স ৩০ হয়ে যেত। তাই বিয়ে করতে হয় সিভিল সার্ভিস ছাড়তে হবে, নয়তো অনেক টাকা জরিমানা গুনতে হবে। সেক্ষেত্রেও অনুমতি পেতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হবে। সাধারণ সৈনিকদের অবস্থা ছিল আরো খারাপ, তাদের ক্ষেত্রে অলিখিত নিয়ম ছিল ‘সাবঅল্টার্নরা বিয়ে করতে পারে না। ক্যাপ্টেনরা হয়তো করতে পারে, মেজরদের বিয়ে করা উচিত আর কর্নেলদের অবশ্যই বিয়ে করতে হবে।’ এমনকি এসবের পর কেউ বিয়ে করতে চাইলে তার কমান্ডিং অফিসারের অনুমতি দরকার হতো। ক্যাপ্টেনের নিচে যেকোনো র্যাংকের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমহীনভাবে অনুমতি মিলত না। সেক্ষেত্রে উপায় ছিল দুটো— হয় একাকী থাকো, নয়তো রেজিমেন্ট ত্যাগ করো।

হেনরি ও মার্গারি হল বিয়ে করেন ১৯৩০-এর দশকে। হেনরি ছিলেন বিদেশ ও রাজনৈতিক বিভাগের চাকুরে। বিয়ের জন্য তাকে ভাইসরয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়েছিল। তবে বিয়ের জন্য কোনো ভাতা পাননি, যদিও সেটা দেয়ার নিয়ম ছিল। হেনরির বেতন-ভাতায় হলকে সংসার চালাতে হয়েছে একেবারে গরিবি চেহারায়। পুরো মাসে দুজন এক বোতল হুইস্কি ভাগাভাগি করে খেতেন। ব্রিটিশরাজের শাসনের শেষদিকে বিয়ের জন্য ৩০ বছরের বিধি শিথিল হয়ে আসে। তবে বেতন দিয়ে অনেক তরুণ চাকুরে সংসার করতে গিয়ে হিমশিম খেতেন। এই তরুণের লেখায় পাওয়া যায়, ‘একজন তরুণ কর্মকর্তাকে বিয়ের পর তার ঘর সাজাতেই হিমশিম খেতে হতো। গণপূর্ত বিভাগ থেকে আসবাবসহ একটি বাসা পেতে যথেষ্ট সিনিয়র হতে হতো। আমার স্ত্রী একটা প্যাকিং বাক্সকে ড্রেসিং টেবিল হিসেবে ব্যবহার করত। ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত তার ঝোলানো ছিল, সেটাই ওয়ার্ডরোব। আমাদের ছিল ক্যাম্প বেড এবং ছোট একটি মশারি। জেলা কারাগার থেকে চমত্কার সব আসবাব কেনা যেত। সেগুলো দীর্ঘদিনের জন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা তৈরি করত। কিন্তু সেগুলো কেনার আগে আমাকে মাসের খরচের হিসাবটা খুব সতর্কভাবে করে নিতে হতো।’

ব্রিটিশরাজ পুরোপুরি পুরুষ কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। ভারতে ব্রিটিশ পরিবারগুলোয় পুরুষদের আধিপত্য থাকত ব্রিটেনের চেয়ে বেশি। এখানে ত্রিশের কোটায় পৌঁছে রাজের কর্মচারীরা ফিশিং ফ্লিটের যে মেয়েদের বিয়ে করতেন, তাদের বয়স অবশ্যই তাদের চেয়ে বেশ কম হতো। ব্রিটিশরাজে তাই বিয়ের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল স্ত্রীরা দারুণভাবে স্বামীদের অধীন থাকতেন। এটা ব্রিটেনের চেয়ে অনেক বেশি হতো। এতে স্ত্রীরা তার স্বামীর কর্মস্থলের পদমর্যাদার ভিত্তিতে সামাজিক মর্যাদা পেতেন। তবে তারা অন্য ক্ষমতাশালী পুরুষদের সঙ্গে সুসম্পর্ক করে স্বামীর পদমর্যাদা বাড়াতে পারতেন না। এমন একটি উদাহরণ দেখা যায় লেডি লন্ডনডেরির ক্ষেত্রে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনো কাজে আসেনি। উপায় একটিই, উচ্চপদের কাউকে স্বামী হিসেবে বিয়ে করতে হবে, তাহলেই কেবল বাড়তি মর্যাদা জুটবে। অন্যদিকে স্ত্রীর কোনো কেলেঙ্কারি স্বামীর ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিতে পারত।

ব্রিটিশরাজ ব্রিটেনের চেয়ে অনেক বেশি পুরুষ শাসিত ছিল। এর কারণ শুধু ভারতে পুরুষদের তুলনায় ইংরেজ নারীদের সংখ্যা অনেক কম তা নয়। বরং সব ক্ষেত্রেই পুরুষদের একটি আধিপত্য বিরাজমান ছিল। ভারতে ব্রিটিশরা এমন সব খেলাধুলা বেশি করত, যেগুলো মূলত পুরুষদের। যদিও ব্রিটেনে তারা এসব খেলা এত খেলত না। তখন বিয়েই ছিল ভারতে ব্রিটিশ পুরুষ ও নারীদের যৌনতার একমাত্র উপায়। খুব সামান্য ব্যতিক্রম বাদে বিয়ের আগে ফিশিং ফ্লিটের বেশির ভাগ মেয়ে কুমারীই থাকতেন। কারণ বিয়ের আগে কোনো সন্তানের জন্ম দিলে সেই নারীর ভালো পাত্রের সঙ্গে বিয়ের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যেত। এমনকি তার আর বিয়েই হতো না। আর সে আমলে গর্ভনিরোধের উপায়গুলো নিয়ে তাদের তেমন ধারণা ছিল না। যৌনতা তখন গোপন বিষয় হয়েই ছিল। পারিবারিক পরিসরে যৌনতা নিয়ে আলাপ এক রকম নিষিদ্ধ ছিল। ম্যাগডা ম্যাকডাওয়েলের বিয়ের সময় বয়স ছিল ২৩। বিয়ে নিয়ে তিনি কতটা অজ্ঞ ছিলেন, তার নিদর্শন পাওয়া যাবে বাসর রাতের কাহিনী শুনলেই। ম্যাগডার বিয়ে হয়েছিল রালফ হ্যামারস্লে স্মিথের সঙ্গে। বিয়ের দিন নিজের শয়নকক্ষে ম্যাগডা তার বিয়ের পোশাক আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তার এক আত্মীয় তখন সেখানে এসে ম্যাগডাকে বলেছিলেন, ‘রালফ আজ রাতে তোমার সঙ্গে যা-ই করবে না কেন মনে রাখবে সেগুলো সবই বৈধ।’ এটুকুই ছিল বিবাহিত জীবনের জন্য ম্যাগডার জানাশোনা। তিনি আত্মীয়ের কথা বুঝতে গলদ্ঘর্ম হচ্ছিলেন। রাজ প্রশাসনের অলিখিত তত্ত্ব ছিল যৌন চাহিদাকে শিকার, ব্যায়াম আর খেলাধুলার মাধ্যমে চেপে রাখতে হবে। ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ফ্রন্টিয়ারে তখন শিয়াল শিকার করা হতো। অবিবাহিত কর্মকর্তারা ছুটিতে শিকার ও মাছ ধরতে যেতেন। এভাবে বিয়ের পরও এই শিকার রাজের কর্মকর্তাদের জীবনের অংশ হয়ে থাকত। বিয়ের পর ফিশিং ফ্লিটের মেয়েরা বুঝতেন এ শিকার অভিযান তাদেরও জীবনের অংশ হয়ে গেছে। পোলো ছিল ব্রিটিশদের মধ্যে খুব জনপ্রিয়। এ খেলার উদ্ভব ভারতেই, ব্রিটিশরা তাদের শাসনের শুরুর বছরগুলোয় একে খুব করে গ্রহণ করেছিল। সে সময় বিভিন্ন স্থানেই পোলো টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হতো। রেজিমেন্টের পোলো টিমে জায়গা করে নেয়া ছিল যেকোনো কর্মকর্তার স্বপ্ন। ১৯২২ সালের এক পোলো হ্যান্ডবুকে একজন ল্যান্সার কর্নেল লিখেছেন, ‘পোলোর ফ্রন্টে যে যে প্রেরণা একজন কর্মকর্তাকে নিয়ে আসত, তা কাউকে দলের নেতা হিসেবেও গড়ে তুলত।’ তখনকার বেশির ভাগ আইসিএস কর্মকর্তার জন্য ঘোড়ায় চড়তে জানা বাধ্যতামূলক ছিল।

নারীরাও ঘোড়ায় চড়তেন, পোলো খেলতেন; এছাড়া টেনিস, বাইসাইকেল, পোলোও খুব জনপ্রিয় ছিল। ইতিহাসবিদ মার্গারেট ম্যাকমিলান লিখেছেন, ‘প্রচুর স্মৃতিকথায় সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কর্মকর্তারা তাদের প্রিয় ঘোড়া, কুকুরের যত বর্ণনা দিয়েছেন, তার ছিটেফোঁটাও স্ত্রীদের নিয়ে লেখেননি।’ জেনারেল গ্রিভস শিকার, মাছ ধরা, ঘোড়া, কুকুরের প্রচুর বর্ণনা দিয়েছেন তার স্মৃতিকথায় আর নিজের স্ত্রীর কথা বলেছেন কেবল একবার।

বিশ শতকের শুরুর দিকের ফিশিং ফ্লিটের বধূদের জন্য রচিত হয়েছিল দ্য কমপ্লিট ইন্ডিয়ান হাউজকিপার অ্যান্ড কুক। এ গ্রন্থে রান্নাঘরের জোগাড়যন্ত্র থেকে ঘোড়ার যত্ন, কুকুর, মুরগি পালন, খাবারের রেসিপি, জরুরি ওষুধ ঘরে রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকে বিভিন্ন চাকরের দায়িত্ব সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এ বই ছিল মেমসাহেবদের জন্য একটি পকেট বাইবেল। কাপড় পরার ব্যাপারেও এ বইয়ে নির্দেশনা দেয়া ছিল।

বিকালে মেমসাহেবরা ঘোড়া নিয়ে বের হতেন, নয়তো মাঠে যেতেন স্বামীদের পোলো খেলা দেখত। খেলা শেষ হলে সবাই মিলে ক্লাবে যেতেন। এসব ক্লাবই ছিল অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের সামাজিক কেন্দ্র। এখানেই সবাই জমায়েত হতেন।

ইংল্যান্ডের দরিদ্র জীবন থেকে মুক্তির আশায় ফিশিং ফ্লিটে চেপে ইংরেজ তরুণীর ভারতবর্ষে পা দিয়ে স্বপ্ন ফিকে হওয়ার ঘটনাই বেশি। তবে কোনো পদাধিকারের গলায় মালা পরাতে পারলে জীবন ভালোই প্রাচুর্যময় হতো, নিজস্ব বিশাল আবাস, স্থানীয় চাকরবাকর, আয়া, খানসামা— কোনো কিছুরই অভাব ছিল না।

তবে জাহাজের বহরে চেপে ভারত থেকে অনেক তরুণীই বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গেছেন। বর জোটাতে না পারার ব্যর্থতা তাকে স্বদেশে ফিরে বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে।