১. মোর পানিতে ঘর, বন্দরে আসি তোর লাইগ্যা...
জাহাজে করে বিলেত থেকে কয়লা যেত দূর দেশে, যেত কারখানাজাত পণ্য, যেত চিঠি, ফেরার সময় জাহাজবোঝাই রেশম আসত, আসত তুলা, পাট, নীল, হাতির দাঁত, মসলা, মূল্যবান মণিরত্ন, এমনকি ক্রান্তীয় অরণ্যের প্রাণী (বাঁদর, নেউল, টিয়া, ময়না, ময়ূর)। জাহাজে করে একদিন চালান হতে শুরু করল বিলেতের বিবাহযোগ্য কিশোরী ও যুবতীর দল। সে জাহাজের নাম রঙ্গ করে রাখা হলো ‘জেলেবহর’, জাল ফেলে বিবাহযোগ্য পুরুষ মানুষ শিকার করবে এই মেয়েরা। (এই পুরুষদের চলতি নাম ‘গ্রিফিন’ মানে যারা বেশি দিন হয় ভারতবর্ষে আসেনি, অবিবাহিত অবস্থায় এই যুবা পুরুষরা ভারতে আসত (ইংরেজিতে আছে, ‘হি ট্র্যাভেলস দ্য ফাস্টেস্ট হু ট্র্যাভেলস অ্যালোন’), ভাগ্যান্নেষণে বিশাল এই ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় যেতে পিছপা হতো না, কোম্পানি আমলে ঘুষ খেয়ে ফুলেফেঁপে উঠছিল তারা, হয়ে উঠেছিল একেকটি ‘নবাব’, চাকরির বছর পাঁচেকের ভেতর তারা সচরাচর বিয়ে করত না। তবে এরপর ভিন দেশের অন্তহীন নিঃসঙ্গতা থেকে পরিত্রাণ ও বিনোদন ছিল বিয়ে। জলদস্যুদের হাত থেকে এই বিলেতি হবু পত্নীর দলকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য জেলেবহরে আগ্নেয়াস্ত্রও থাকত, থাকত ভারতবর্ষ বা চীন দেশে নিজ ভূমে ফেরত যাওয়া নাবিকরা, থাকত দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় খাওয়ার মতো জ্যান্ত পশু-পাখি। একদিন এমনই একটি জাহাজ ‘গডলফিন’-এ করে ভেসে এসেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রবার্ট ক্লাইভের হবু পত্নী মার্গারেট ম্যাস্কালিন। ক্লাইভের সঙ্গে মাদ্রাজে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। এই ‘জেলেবহর’-এর চলাচল শুরু হয় কোম্পানি আমলে, পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসাররাই শুধু নয়, অন্য শ্বেতাঙ্গদের পরিবারও বিবাহযোগ্য নারীদের পাঠাতে লাগল ভারতবর্ষে।
প্রথম দিকে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে মাস পাঁচেক দরিয়ায় ভেসে, কেবিনে সমুদ্রবমনে আধমরা হয়ে, আন্ত্রিকে ভুগে আর ডেকে শুয়ে শীতে পর্যুদস্ত হয়ে আসত তারা স্বামী সন্ধানে। এসে নামত মানুষ পিলপিল করা ডকে, কলম্বোয় কিংবা মাদ্রাজে, কলকাতা বা বম্বেতে। লাল-গোলাপি-পান্না সবুজ সব শাড়িমোড়া কালো কালো মেয়েরা হেঁটে বেড়াচ্ছে, ফেরিওয়ালা চিত্কার করে ডাকছে সওদা কেনার জন্য, ঘাটের ভাত-তরকারির দোকান আর মিষ্টান্নভাণ্ডার থেকে হাঁক পাড়ছে দোকানি। সবকিছু ছাপিয়ে অসহ্য গরম যেন হল্কার মতো এসে বিঁধছে গায়ে, যেন কেউ অনবধানে খুলে দিয়েছে চুল্লির দরজা, সেই গরমে ফ্লানেলের অন্তর্বাস আর করসেট সেঁটে বসে মেমসাহেবদের নরম গোলাপি চামড়ায় পা জ্বলছে মোজার খাপের ভেতরে। শীতকালে দিব্যি আরাম, বিশেষত শৈলাবাসগুলোয়, গরমকাল তেমনি অসহনীয়। কিন্তু এসব কোনো কিছুই স্বামীসন্ধানীদের প্রতিহত করতে পারত না। সমুদ্রে ভেসে এলেই জুটত স্বামী, জুটত অঢেল প্রাচুর্যে ও বিলাসিতায় ভরা জীবন, স্বামীর মৃত্যু হলেও অবিলম্বে জুটে যেত দ্বিতীয় স্বামী।
কেউ কেউ আসত প্রেমসংকুল উপমহাদেশে প্রেমের খোঁজে, যে প্রেম গার্হপত্যে গিয়ে পরিপ্লুতি পায়, স্বামী যে গৃহে সহায়, ভরণপোষণের দায় থেকে যে কন্যার পিতাকে মুক্তি দেবে। স্কুলের মেয়েরা আসত, শারীরিকভাবে অপ্রস্তুত, মানসিকভাবে অনগ্রসর, বিলেতে লেখাপড়া কিছুটা শেষ করে ভারতবর্ষে তাদের পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতে, বাকি অনাথাদের সংসারের তাগিদে স্বামী জোটাতে সাতসমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে এখানে আসতে হতো। ভিক্টোরিয়ান রুটে ভারতবর্ষে আসতে চার মাস লাগত, সমুদ্রপথে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে, জিব্রাল্টার ছুঁয়ে, মরিশাস হয়ে ভারত মহাসাগরে আসা যেত। উনিশ শতকের মাঝামাঝি অবধি জাহাজগুলো ভূমধ্যসাগর দিয়ে জিব্রাল্টার আর মাল্টা হয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছত। সেখান থেকে ট্রেনে করে কায়রো। সুয়েজে এসে আরেকখানা জলযানে চেপে লোহিত সাগর হয়ে এডেন আসা যেত। পরে মহারানী ভিক্টোরিয়া ভারত অধিগ্রহণ করার ১০ বছর পর সুয়েজ খাল ১৮৬৯-এ খুলে দেয়ার পর একখানা জাহাজে করে তিন সপ্তাহে বম্বে আসা যেত। রিচার্ড হোমস ও ডেভিড গিলমোর জানাচ্ছেন যে, গভর্নর অব বম্বের স্ত্রী লেডি ফকল্যান্ড ১৮৫০-এ লিখেছেন, “জাহাজ ভরে ভরে প্রতি শীতকালে বিবাহযোগ্য স্ত্রীলোক ইংল্যান্ড থেকে ভারতে আসছে, যা অবিবাহিত ইংরেজ যুবকদের আলোড়িত করছে, এই কার্গো অব ইয়ং ড্যামসেলকে ডাকা হচ্ছে ‘মাছধরা জাহাজ’।” উত্তমাশা অন্তরীপ ছুঁয়ে ভারতবর্ষে আসার দিন ফুরাল, সুয়েজ খাল খুলে গেল, এবার স্রোতের মতো আসতে শুরু করল ব্রিটিশ নারীকুল।
১৮৫১ থেকে ১৮৬১-এর ভেতর বিলেতে অবিবাহিত-অরক্ষণীয় নারীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ভারতবর্ষীয় জরত্কুমারীদের মতোই ভিক্টোরিয়ান চিরকুমারীরা ছিল পরনির্ভরশীলতা ও বিষাদময়তার প্রতিচ্ছবি, যেন তারা জীবনের উদ্দেশ্যসাধনেই অসফল হয়েছে। বাগদত্তা হতে না পারলে ‘কুড়িতে বুড়ি’ সত্যিই ভাবা হতো তাদের। সেই সঙ্গে অকেজো, অপাঙেক্তয়, পরাঙ্মুখ... কত কী ভাবা হতো। সেকালের ব্যক্তিগত কলাম বা ‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপনে সেসব ধূসর মুখ ভেসে ওঠে বারবার। এ মেয়েদের প্রতিপালন করা হতো জীবন ও জগতের সব নাজুক সুকোমল বস্তুর জন্য, শারীরিক শ্রমের কাজ তারা করতে পারত না, এদের ভেতর শিক্ষিতের সংখ্যাও ছিল কম, সাহস ও বলিষ্ঠতার অভাবে এরা ভেসেও যেতে পারত না অন্যান্য উপনিবেশে খেটে খাওয়ার জন্য। তার ভোটাধিকার নেই, মামলা করার অধিকার নেই, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার নেই, কাজকর্মেও তার সক্ষমতা বা সাবলীলতা দেখানোর স্থান অসংকুলান। সে গাইতে জানে, অরগানে টুকটুকে আঙুল চেপে সুর তুলতে জানে, নাচতে জানে, একটু-আধটু ছবি আঁকতে জানে... এসব সুকুমারবৃত্তির আওতার বাইরে গেলে ল্যাভেন্ডার তুলতে যাওয়ার পরিশ্রমেই সে মূর্ছা যায়, লডান্যাম গিলে স্নায়বিক অশান্তি ভোলে, আর সে সিধে হয়ে বসতে জানে, জানে অন্তহীন সেলাই-ফোঁড়াই। নিজের শরীর ও শারীরিক চাহিদার বিষয়ে ভাবনাটুকু অবধি তার কাছে অশ্লীল, স্বামী হিসেবে যে জুটবে তার যৌন চাহিদাকে সে সাগ্রহে নয় নিমরাজি হয়ে মেটাবে, বেশির ভাগ সময় মাথা ধরার অজুহাত দেবে, কেননা শারীরিক মিলন অশালীন, সাগ্রহ সঙ্গম ঠিক ভদ্রজনোচিত নয়। যা কিছু জীবনে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য একান্ত জরুরি, তার শিক্ষা থেকে এবং তা আহরণ করার প্রক্রিয়া থেকে সে বঞ্চিত অথবা স্বেচ্ছাবঞ্চিত। পুরুষ তাকে ঘর দেবে, আসবাব দেবে, দাস-দাসী, চাকরবাকর দেবে, কোল ভরে ভরে স্বাস্থ্য ভাংচুর করে অজস্র সন্তান দেবে। পুরুষ যথেষ্ট রোজগেরে না হলে বিয়ে করতে পারত না, নারী যথেষ্ট পছন্দসই না হলে বিয়ে করতে পারত না, এসব অপারগতার ফোকর গলে বেশ্যাবৃত্তির সুসার হতো কেবল। ১৮৪১-এর লন্ডনের পথে, শুঁড়িখানায় প্রমোদ উদ্যানে কিংবা রঙ্গমঞ্চে মোট বারবনিতার সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার (শহরের জনসংখ্যা তখন ২০ লাখ), প্রতি ১২ জন সক্ষম সমর্থ পুরুষের জন্য একজন বেশ্যা। এমন সামাজিক দশায় ক্রমাগত নিষ্পেষিত হতে হতে যাদের সামর্থ্য ছিল, তারা স্বামী সংগ্রহের আশায় জলে ভেসে গেল, দূর কোনো পরবাসে। ভারতবর্ষে এলেই সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র, নারীর সংখ্যানুপাতে চতুর্গুণ অবিবাহিত পুরুষ। যে মেয়ে নিজভূমে রীতিমতো ‘প্লেইন জেইন’, সাদামাটা গেরস্ত ঘরের মেয়ে, সেই মেয়েটিই ভারতে এলে হয়ে উঠত পরম অন্বিষ্ট, তাকে ঘিরে উত্সুক পুরুষদের ঝাঁক, তাদের কাউকে বিয়ে করতে পারলেই বাকি জীবন দাস-দাসী-ভৃত্য-খানসামায় রমরমে অট্টালিকায় বা বাংলোয় নিশ্চিত সুখের আবাস। এমন একটি সুখাবাস, এমন একটি জীবনের মান, যা আপন দেশে তাদের দুজনের জন্যই অকল্পনীয় ছিল।
এ মাছধরা জাহাজ ভেড়ামাত্র মেয়েদের মনোযোগ ছিনিয়ে নিতে শ্বেতাঙ্গ পুরুষরা ছিল সদাতত্পর। এরপর ছিল রোববারের গির্জার সমাবেশ, তারপর পোলো আর রেস খেলা, চাঁদনি রাতের পিকনিক, ড্রামা সোসাইটির আড্ডা, টেনিস পার্টি, ককটেল পার্টি— এসব হুল্লোড়ে জমে যেত তারা। তাদের ঘিরে সুসজ্জিত-সুবেশ-স্বাস্থ্যবান ও উদ্গ্রীব পুরুষদের মেখলা। যাচাই-বাছাইয়ে কেটে যেত কয়েকটা দিন। আমোদ-ফূর্তির রাত কেটে যেতে দিগন্তের নীলে জাগত দূর গ্রামের চিমনি থেকে উদ্গত ধূমপাহাড়। বিবাহ-পরবর্তী জীবনের অভ্রান্ত গন্তব্য অবশ্য স্বামীর দাসত্ব, স্বামীও যেমন ব্রিটিশরাজের দাস, গৃহশাসনের পুরুষতান্ত্রিক শেকলের ভারে নুইয়ে বাকি জীবন কাটানোটাই এ নাটকের অন্তিম দৃশ্য। জনাচল্লিশেক চাকরবাকর-কোচম্যান-আয়া-খানসামা- ভিস্তিওয়ালা-মালি-মেথরের তত্ত্বাবধান করে কেটে যেত মেমসাহেবের রুটিন বাঁধা জীবন। পাচক ও খানসামা মুসলমান হওয়া চাই, কিংবা গোয়ান পর্তুগিজ। মালি-দর্জি-নাপিত-সহিস এরা জাতে হিন্দু, মেথর-ভিস্তিরা হবে নীচকুলোদ্ভব। মেমসাহেবরা নব্য খ্রিস্টানদের চেয়ে হিন্দু-মুসলিমকে বিশ্বাস করত বেশি। সারা দিন কাটত নানা চেঁচামেচিতে, অবশ্য সাহেব-মেমরা ক্ষেত্রবিশেষে এই চাকরবাকরদের প্রতি ও তাদের সন্তানসন্ততির প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহারও করত। শিশুদের থাকার নার্সারি, আয়ার পরিচ্ছন্নতা, পাচক ও রান্নাঘর সাফসুতরো হলো কিনা, দুধ আর জল ফোটানো হলো কিনা, পারম্যাঙ্গানেটে সবজি পরিষ্কার করা হলো কিনা, বাজার সরকার হাটে গিয়ে টাকা মারল কিনা— এসবের দেখভাল করে দিন কাটত মেমসাহেবের। পাহাড়ে না হয় আপেল-নাশপাতি মেলে, বুনো হাঁস শিকার করে দুদিন ঝুলিয়ে রেখে খাওয়া যায়... গরমে সমতলে সাহেব-মেমদের বড় সমস্যা হতো। আম আর লিচু ছাড়া তেমন কিছু নেই, ডিমের স্বাদ ভালো নয়, মুরগিগুলো জিরজিরে, মাটন ভীষণ শক্ত; বাজে আটা, ইস্ট, টকে যাওয়া মাখন ইত্যাদির কারণে ভালো রুটি খাওয়াও ভাগ্যে নেই। এরা দ্রুত চাপাতি ও নানরুটির স্বাদ ভালোবেসে ফেলল, যস্মিন দেশে যদাচার। ক্রিসমাসে অবশ্য মাতৃভূমির স্মরণে আসল ‘প্লাম পুডিং’ তৈরি করা সম্ভবপর হলো। এমনিতে মেমসাহেবরা ভালোবেসে কুকুর আর ঘোড়াই শুধু পুষত না, রাখত পাখিশালা, টিয়া-মুনিয়ার ঝাঁক, হরিণ কি বাঁদর পালত অনেকে, সজারু কিংবা কাঠবিড়ালি। এসব পশু-পাখি ভরিয়ে তুলত তাদের নির্বান্ধব, উৎপাটিত জীবনের নিঃসঙ্গতা।
স্বামীর প্রশাসনিক পদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠত স্ত্রীর মর্যাদার সৌধ, স্বামীর পদাধিকারবলে পার্টিতে আলাদা সোফায় বসার ও খানাপিনার পর প্রথম টয়লেটে যাওয়ার এখতিয়ার। যেসব পুরুষ উজ্জ্বলতার কেন্দ্রের এ শহরগুলোয় থাকত না, স্ত্রী বাছাই পর্বে তারা তেমন উন্নাসিকতা দেখাত না, যা জুটবে তা-ই সই, এমন মনোভাব ছিল তাদের। কারণ বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী রওনা হবে দুর্গম বনাঞ্চলে, পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা এমন কোথাও, যেখানে সামাজিক জীবন বলে কিছু থাকবে না। জুতো পরার সময় না ঝাড়লে ভেতরে বিছে মিলতে পারে, স্নানঘরের পিপের ছায়ায় মিলতে পারে গোখরো সাপ, মদের গেলাসে বিড়বিড় করে এসে কার্তিকের দেয়ালি পোকার পাল, উইপোকা এসে ধসিয়ে দিতে পারে ঘরের ভিত, মারীবীজে ঠাসা ক্রান্তীয় বাতাস... ম্যালেরিয়ায় মরতে সময় লাগে না। আর্দ্রতায় পচে ওঠে কাপড়চোপড় এমনকি বইয়ের পাতা, ঘামাচির অন্ত নেই। চারপাশে অবিশ্বাসের আবহ, নার্স-আয়া-খানসামা সক্কলে তক্কে তক্কে থাকে, কেমন করে ঠকিয়ে খাওয়া যায়, শিশুর বরাদ্দ কাস্টার্ডে ডিমের বদলে আটা গুলে দিতে তাদের বাধে না। কালো ধাত্রীদের স্তন্যপান করে শ্বেতাঙ্গ শিশুরা হূষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে বটে, মেমসাহেবরা সারাক্ষণ ভোগে সন্দেহে, এই বুঝি নেটিভ ভাষা শিখে ফেলল শিশুরা, এই বুঝি নেটিভদের অদ্ভুত সব টোটেম দেখে ভিরমি খেল। এই সন্দেহ, এই সংশয়ের আবহাওয়া ধীরে ধীরে আরো অনেক কিছুর দানাদার রূপ দেয়। অস্বীকার করার উপায় নেই, এই অবিশ্বাসের দোলা, এই নির্বিচার ঘৃণার আবহ তৈরিতে মেমসাহেবদের বিপুল ভূমিকা ছিল, তারা যে সর্বত্র পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক, একই সঙ্গে নিষ্পেষিত ও গ্রাহক। ভারতবর্ষ— যা গভীর মমতার আবার দারুণ নিষ্ঠুরতার, যা গাঢ় রঙের (শাড়ি-চুড়ি-ঘুড়ি) আর অজস্র শব্দের (ঝিঁঝি-ব্যাঙ-শেয়াল-গোবাঘা-কর্তাল-খোল-পাখোয়াজ-ঢোল-উলু-শিলারীর উলঙ্গ নৃত্য আর শিঙা ফোঁকা) আর তীব্র গন্ধের (চাকরমহল থেকে ভেসে আসা ছোলাভাজার ঘ্রাণ, প্রথম মৌসুমি বায়ুতাড়িত বৃষ্টিতে ভিজে মাটির ঘ্রাণ, বাজারের পাঁচমিশালি ঘ্রাণ আর খোলা নালার পচা গন্ধ), তার সবই চড়া সুরে বাঁধা— তার গণমানুষের অপত্যস্নেহ— তার মানুষের রক্তপিপাসা। এই ভারতকে মেমসাহেবরা বিদ্বেষের দৃষ্টিতেই দেখেছে, জাহাজ ভেড়ামাত্র যে কালচারাল শক পেয়েছে তারা, সেটা শ্বেতাঙ্গ নারীদের কাটতে দেরিই হয়েছে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কখনো কাটেনি। কোম্পানি আমলে ভারতীয়দের সঙ্গে জন সাহেবদের যথেষ্ট মাখামাখি ছিল। বিয়ে ছিল। প্রণয় ছিল। এমনকি বর্ণশঙ্কর সন্তানজন্ম উপলক্ষে কোম্পানি অর্থ-উপহারও দিত। সাহেবরা হুঁকাবর্দারদের সেজে দেয়া হুঁকা নিয়েছিল, নাচঘরের বিলাস নিয়েছিল, নিয়েছিল বহুগমন ও জেনানা, উল্কি নিয়েছিল, ভাষা নিয়েছিল, রেজিমেন্টের নানা খেলাধুলায় তারা নেটিভ সেপাইদের সঙ্গে যোগ দিত, তাদের নিয়ে তারা দুর্গম জঙ্গলে শিকারে যেত। বৃষ্টির সময় নেটিভ সৈন্যরা তাদের সাহেবের তাঁবুতে ঢুকে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়ত। এই মেলাবে-মিলিবে বন্ধ হওয়ার মূলে ছিলেন মেমসাহেবরা (ক্ষীর-ননি-চিনি আর ভালো যা দুনিয়ায়, তাই দিয়ে মেয়েগুলো তৈরি), সুয়েজ বেয়ে তারা যখন আসতে শুরু করল, সঙ্গে এল বিলাতিদের একান্ত কুটির শিল্প, যার নাম ‘জাতিভেদ’, সঙ্গে এল দুয়ার এঁটে দেয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা এবং নেটিভ নারী ও তার গর্ভজাত সন্তানদের প্রতি ঘৃণা। ১৮৫০-এর মধ্যে এ ঘৃণার সর্বগ্রাসী রূপ স্বয়ম্প্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়।
এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু আর শূকরের চর্বি মেশানোর গুজবে সেপাইদের ভেতর দারুণ অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে— সংনমিত বায়ুতে ফুলকি জ্বেলে দিলে যা হয়, সিপাহী বিপ্লব শুরু হয়। বিটিভিতে আমরা নাটক দেখতাম সিপাহী বিপ্লবের ওপরে— সেপাইরা দিল্লির সম্রাটকে ভারতেশ্বর ধরে নিয়ে শুকনো রুটির ওপর খোদাই করছে তাদের ইশতোহার— ‘হাল্কে খুদা/ মুলকে বাদশাহ/ হুকুমতে সিপাহী...’, এর পরে নিজেকে ধূলিতস্য ধূলি ভেবে অশ্রুপাত করে করে বাহাদুরশাহ জাফরের নির্বাসন, দিল্লির প্রবেশমুখে তার বংশধরদের হত্যা। ভিক্টোরিয়া পার্কের গাছে গাছে ঝুলিয়ে রাখা সেপাইদের মরদেহ। লালবাগ কেল্লার পুকুরে সেপাইদের দেহ ফেলে দেয়া। মনে আছে, এসব পড়তে পড়তে শৈশবে আমাদের গলা রোষে-নোনাজলে ফুলে উঠত, ব্যথাব্যথা করত। শুধু একটি কার্তুজসংক্রান্ত গুজব থেকে এতখানি রক্তপাত ঘটেছে ভাবার অবকাশ নেই আসলে। কোম্পানি আমলে এ অঞ্চলের মানুষ একে একে দেখতে থাকে সহমরণ ও অনুমরণ রদ— বিধবাবিবাহ আইনসিদ্ধ করা— ঠগিদের নরবলি বন্ধ করা— অপুত্রকের পোষ্য সন্তানের অধিকার বাতিল— এমনকি তার বস্ফািরিত চক্ষুর সামনে চিরপূজ্য ব্রাহ্মণকেও ফাঁসি দেয়া গেল সর্বসমক্ষে (মহারাজা নন্দকুমার)। যা কিছু তাদের চির আপনার, যা কিছু তাদের জন্মজন্মান্তরের, তার সবকিছুর সঙ্গে প্রতীচ্যের ভাবাদর্শের এক অভূতপূর্ব সংঘাত শুরু হয়। এসব শুদ্ধি অভিযান ভারতবর্ষের মানুষকে বিচলিত করেছে— তাদের যা নিজস্ব, তা পরস্য পর এসে বদলে দেবে একের পর এক, এটা সাধারণ লোকের সয়নি। সিপাহী বিপ্লব সেই অসহিষ্ণুতার চরম প্রকাশ। ১৮৫৭-এর সিপাহী বিপ্লবের পর ভারতবর্ষে কোম্পানির উপনিবেশ রানী ভিক্টোরিয়ার শাসনাধীন হয়, প্রথম ভাইসরয়ের পৌরহিত্যে এলাহাবাদের দরবারে ব্রিটিশরাজের সূচনা হয়। ইস্ট ইন্ডিয়ার অধীন ইন্ডিয়ান রেজিমেন্ট, ইন্ডিয়া-সিলোন ও বার্মার প্লান্টার ও ব্যবসায়ীরা একযোগে রানীর শাসন মেনে নেয়।
আগেই বলেছি, ১৮৫৭-এর সিপাহী বিপ্লব দ্বিপক্ষীয় ঘৃণার ও অসহিষ্ণুতার ফলাফল। কানপুরে বিবিগড়ের হত্যাকাণ্ড তার স্থায়ী ক্ষত। নেটিভরা আর যা-ই হোক ‘বাবালোগ’ মানে বাচ্চাদের মারবে না, স্ত্রীকুলের গায়ে হাত তুলবে না, এ প্রত্যয় চিরতরে হারিয়েছিল ব্রিটিশরা। অথচ বিপদের দিনে শ্বেতাঙ্গ শিশুদের গায়ে কাদা গুলে হিন্দুস্তানি চাকররা তাদের লুকিয়ে রেখেছিল। যা-ই হোক, এরপর ব্রিটিশরাজ কোনোদিন তাদের জাতের গুমোর ভোলেনি, ভুলতেও দেয়নি, প্রতিশোধ নেয়ার স্পৃহাকেও চিরজাগরূক রেখেছে, শাসকের রুদ্ররূপ বহাল রেখেছে বরাবর (‘রেমেমবার কানপুর!’ হয়ে উঠেছিল তাদের যুদ্ধের হাঁক, ঘৃণার যুদ্ধ)।
‘জেলেবহর’-এর গল্পে ফেরত আসি। ‘রিটার্নড এম্পটিজ’ ছিল অনেক কুমারী যুবতী, যে মাঠে ফসল নেই, সেই মাঠের শিয়রে চুপে দাঁড়ানো চাঁদ ফিরতি জাহাজের ডেকে তার সঙ্গী হতো হয়তো। ভারতবর্ষ ও ভারতবর্ষীয় কোনো কিছুই সহ্য করতে না পেরে ও স্বামী সংগ্রহে বিফল হয়ে ফিরে যেত তারা। ‘রিটার্নড এম্পটি’ শব্দটার ভেতরের ব্যঞ্জনাটুকু হূদয়বিদারী। স্বামীর প্রতিপত্তি ও বিয়ের জীবন বীমা না থাকলে যে ‘অতি বড় সুন্দরী’ বা ‘অতি বড় ঘরনি’র জীবন একটি ঊনজীবন বা প্রায় জীবনে পর্যবসিত হতো, তার ইঙ্গিত এতে এত স্পষ্ট এবং এত রাখঢাকহীনভাবে অশ্লীল (অবশ্য একালের নিরিখে) যে, চমকে উঠতে হয়। অথচ কী কষ্ট স্বীকার করেই না এসেছিল তারা এ ভূভারতে, নিজের দেশকে চোখের জলে বিদায় জানিয়ে। গাদাগাদি করা কেবিন, সকাল সাড়ে ৫টায় বিউগলের শব্দে শয্যাত্যাগ, সাড়ে ৭টায় প্রাতরাশ-চা-কফি-ব্রেডরোল-ঠাণ্ডা মাংস, ডাক্তারি পরীক্ষা সকাল ৯টায়, দুপুর ১২টায় দুপুরের খাবার রুটি-মাখন-পনির আর প্রচুর মদ্য, বিকাল ৪টায় চা ও জলযোগ, রাত ৮টার ভেতরে অবশ্যকরণীয়ভাবে কেবিনে ফেরত যাওয়া, তীব্র গরমে আর সমুদ্রবমনে ক্লান্ত হয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে শীতে হিহি করে নিজের শাল মুড়ি দিয়ে ডেকে শুয়ে থাকা... কত নারী ও শিশু এ কষ্ট সইতে না পেরে বা রোগের সংক্রমণে মৃত্যুবরণ করত। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অবশ্য এ জলযাত্রা প্রমোদভ্রমণের রূপ পরিগ্রহ করে। মেয়েরা ডেকে ছোটাছুটি করে চামচ দৌড় খেলে, কে কত দ্রুত টাই বাঁধতে পারে বা সিগ্রেটে অগ্নিসংযোগ করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, এমনকি মোরগ লড়াই, বস্তা দৌড়, ডেক টেনিস বা ক্রিকেটও খেলা হয় জাহাজগুলোয় বিপুল অবসরে, রাতে ডেকে বিজলি বাতির আলোয় হয় হরেক উৎসব, জিমখানা থাকে সরগরম, উত্তপ্ত থাকে হাউজি খেলার আসর। ভিক্টোরিয়ান আমলের মতো জ্যান্ত গবাদিপশু নিয়ে জাহাজগুলো আর পাড়ি দেয় না, কিন্তু সেভেন কোর্সের ডিনার বহাল থাকে। সমুদ্রে বমি পেলে আগে সহায় ছিল শ্যাম্পেন, পরে ক্লোরোফর্ম গোলা জল। যাক, জীবন বদলাতে মানুষ কী না করে!
২. ‘কোথায় এলো নৌকোখানা, তারার ঝড়ে হই রে কানা’
জাহাজ বোঝাই করে যারা আসত, তারা কি সবাই শ্বেতাঙ্গ বিয়ে করত? জাহাজে করে যারা বৃহত্তর জীবনের আহ্বানে কালাপানি পাড়ি দিত, তারাই কি বজায় রাখতে পারত জাতের অভিমান?
‘ধবলাঙ্গী ধূম্রকেশী বিড়াললোচনা,
বিবাহ করিব সুখে ইংরাজ-ললনা’
শিবনাথ শাস্ত্রী লিখে গেছেন, যখন তিনি বিলেতফেরতা নন, বিলেতযাত্রার প্রাক্কালে এই ছত্র লেখা। রবীন্দ্রনাথ ইউরোপযাত্রীর ডায়েরিতে মেমদের নিয়ে লিখেছেন, নবনীর মতো সুকোমল শুভ্র রঙের উপরে একখানি পাতলা ঠোঁট, সুগঠিত নাসিকা এবং দীর্ঘ পল্লববিশিষ্ট নির্মল নীলনেত্র- বোলতার মতো এরা ক্ষীণমধ্যা... দেখে পথকষ্ট দূর হয়ে যায়। গিরিশচন্দ্র বসুও প্রতিধ্বনি করেছেন, এরা যেন নবমল্লিকার ঝাঁক, “শরীরের উপরার্ধ সুব্যক্ত ও ফুটন্ত করিয়া দেখানোই তাঁহাদের চির অভিলাষ। শরীরের যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি যেমনভাবে আছে, কাপড় দিয়া ঢাকিলেও সেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি যেন ঠিক সেই রকম দেখা যায়, ইহাই বুঝি ইংরাজ মহিলার পোষাক নীতি।” নব্য বিলেতযাত্রী বাঙালি আগন্তুকরা বিলেত পদার্পণ করেই বাড়িওয়ালির যুবতী কন্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করে নিতেন, যদৃচ্ছ মিছে কথা বলতেন, নিজেদের পরিচয় দিতেন বাঘশিকারী বলে, কেউ কবুল করতেন না যে তারা বিবাহিত, এসব মিথ্যায় মজে গিয়ে কোনো মেম তাদের দিকে ঝুঁকে পড়লেই স্ত্রীকে চিঠি লেখা বন্ধ করতেন তারা। গল্পগুচ্ছের সেই স্বামীটিকে মনে আছে তো, স্ত্রীর অলঙ্কার আত্মসাৎ করে কালাপানি পাড়ি দিয়ে পড়তে গেলেন, বিলেতফেরতা স্বামীটিকে হিন্দু সমাজে জাতে ওঠানোর চেষ্টা চলছে যখন, যখন স্ত্রীটি স্বামীর হঠকারিতা ভুলে গিয়ে হূদয়াবেগে-প্রসন্নতায় আর প্রেমের গর্বে জ্বলজ্বল করছে সেই সভায়, সেখানে উপস্থিত হলেন স্বামীর বিলাতি স্ত্রী, শ্বেতাঙ্গিনী এক যুবতী এবং স্বামীকে সর্বসমক্ষে চুম্বন করলেন। আনন্দসভায় নেমে এল শ্রাদ্ধের নীরবতা।
‘ডমরু-চরিতে’র লেখক ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছিলেন যে, ভারতবর্ষের সভ্যতা যদি আরেকটু উন্নত হতো এবং ভারতের ইউরোপীয়রা যদি জাতিবিদ্বেষ ও বর্ণবিদ্বেষে এমন আকণ্ঠ নিমজ্জিত না থাকত, তবে তিনি ভারতীয় যুবকদের বিলাতি বিবি সংগ্রহ করতেই পরামর্শ দিতেন। তা প্রায় অকল্পনীয় ছিল, একে শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গকে কুলি ছাড়া কিছু ভাবতে পারত না, চাবুক হাতে পথে বের হয়ে নির্বিচারে নেটিভ পিটিয়ে হাতে সুখ করে নেয়া শ্বেতাঙ্গ কিংবা বুটের আঘাতে স্বীয় অধীনস্থ কর্মচারীর প্লীহা ফাটিয়ে ফেলা শ্বেতাঙ্গ স্বকপোলকল্পিত কেউ ছিল না, সেকালে এইই ছিল সত্য। উল্টো দিকে শ্বেতাঙ্গদের প্রতি কৃষ্ণাঙ্গদের ঘৃণা ও অবিশ্বাস ছিল ষোলআনা, তাদের বিয়ে ইতর প্রাণীর ইন্দ্রিয়লীলা, তাদের শিশুরা অধিকাংশ জারজ ইত্যাদি।
এমন এক কাল ছিল, যখন কালো নেটিভদের সঙ্গে মাখামাখিতে সাহেবদের জাত যেত না, যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্বয়ং খেতে-মাখতে এবং নেটিভ নারী বিয়ে করতে প্ররোচিত করত সাহেবদের। দেশী মেয়ে বিয়ে করে পয়সাও পেত তারা। শ্রীপান্থ সে সময়ের কথা লিখতে গিয়ে শ্লেষ করেছেন, “মনে মনে তাঁদেরও (শ্বেতাঙ্গদের) স্লোগান— ‘অসবর্ণে আপত্তি নাই’।” সেকালের ইংরেজি পদ্যে ছিল, ‘যে ওষ্ঠাধর আমাদের প্রিয়, তার থেকে দূরে গেলে, মেতে উঠব সেইসব অধর নিয়ে যারা সন্নিকটে।’ উনিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশরা এ দেশে প্রচুর বিয়ে করত এবং রক্ষিতা রাখত। কথিত আছে, কর্নেল স্কিনার, যিনি ইন্ডিয়ান আর্মিতে প্রথম ক্যাভালরি রেজিমেন্ট ‘স্কিনার্স হর্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা, তার স্ত্রীর সংখ্যা ছিল ১৪ ও সন্তানসন্ততি ৮০ জন। পুরপরিখার পাশ দিয়ে এই স্ত্রীদের হাতির হাওদায় বসিয়ে তিনি বিকালের হাওয়া খেতে বেরোতেন। পুনে ও হায়দরাবাদের বাসিন্দা শ্বেতাঙ্গরা উচ্চবংশীয় মুসলমান স্ত্রীলোকদের বিয়ে করতেন (জেমস কার্কপ্যাট্রিক যেমন)। ১৮৪০-এর বরোদায় এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, রেজিমেন্টের প্রত্যেক অফিসারের একটি করে দেশী রক্ষিতা ছিল, রান্নাবান্না-ঘরকন্না ও কামকলায় অতিশয় পটু। সিপাহী বিপ্লবের পর বার্মা ছাড়া সর্বত্র এই ‘মেলাবে-মিলিবে’ বন্ধ হয়ে যায়। একে তো পর্দা প্রথাহীন-জাতিভেদের দায়মুক্ত রেঙ্গুনের নারীর শোভা অসামান্য, তো বর্মি আবহাওয়ায় শ্বেতাঙ্গিনীরা বেশি দিন বাঁচতেন না।
ভারতীয় রাজপুরুষদেরও তখন মেম বউয়ের বড় শখ ছিল। “শুধু ইন্দোরের তুকাজিরাও হোলকার আর কাপুরথালার মহারাজা জগজিৎ সিং নন, পুতুকোটার মার্তণ্ড তণ্ডিমান বাহাদুর, পোরবন্দরের নটবর সিং, পালামপুরের নবাব তালে মোহম্মদ খান, পান্নার মহিন্দ্র যাদবেন্দ্র সিং— অনেক অনেক নরপতিই সেদিন হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়ার মতো প্রাসাদে অথবা বাগানবাড়িতে পুষছেন পশ্চিমি সুন্দরী... প্রতি রাজবাড়িতে যেন মেমব্যামো... মরশুমে ভারতীয় রাজাদের হাট জমে যেত বৃটেন, ফ্রান্স ও ইতালির সমুদ্রসৈকতে, হোটেলে, নৈশক্লাবে। ওঁরা দু’হাতে বিদেশে টাকা ওড়াতেন। টাকা বলা ভুল হবে, দু’হাতে বিলাতেন মুক্তোর মালা, হীরার অঙ্গুরীয়।” পাতিয়ালার মহারাজার লেডি কার্জনের সঙ্গে আশনাই ঠেকাতে লর্ড কার্জন ঘোষণা দিয়ে গ্রীষ্মকালে সিমলায় রাজাদের মেম শিকার নিষিদ্ধ করেছিলেন। মেম স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান উত্তরাধিকারী হতে পারবে না, এমন ঘোষণাও তিনিই দিয়েছিলেন, যেন এ ‘অসবর্ণ’ বিয়ে কমে আসে। কার্জন বার্মার রেজিন্যাল্ড ক্যাসল ও এডা ক্যাসল দম্পতিকে এক চিঠিতে জানান, এ শংকর সম্পর্কগুলোয় ব্রিটিশদের সম্মানহানির আশঙ্কা করেন তিনি, অফিসারদের বর্মি স্ত্রী গ্রহণে নিরস্ত করতে তিনি তত্পর হন।
এসব লিখতে লিখতে আমার মনে পড়ে গেল অন্নদাশংকর রায়ের বিদেশিনী স্ত্রী লীলা রায়ের কথা। প্রেমে পড়ে তিনি বিয়ে করে ভারতবর্ষে রয়ে গেলেন, অন্নদাশংকর অমর করে রাখলেন তার স্ত্রীকে নিজের ছদ্মনামে, ‘লীলাময় রায়’। লীলা রায় খুব বুঝেছিলেন, ভারতীয়কে বিয়ে করলে বিয়ে করতে হয় পুরো ভারতকে। জোব চার্নক, যিনি কলকাতা, গোবিন্দপুর, সুতানুটি ক্রয় করে শহর কলকাতার পত্তন করলেন, তিনি যে নারীকে সতীদাহ থেকে বাঁচিয়েছিলেন, তার নামও কি ছিল লীলা? ওয়ারেন হেস্টিংসের বন্ধু পোলিয়ের, যিনি এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, তিনি স্বভাবে ছিলেন দেশী নবাব, তার প্রাসাদে অজস্র সংস্কৃত ও ফার্সি পুঁথির সংগ্রহ ছিল। লোকে তাকে বলত লক্ষৌয়ের শ্বেতাঙ্গ নবাব। ওই যে বললাম, কেউ কেউ ভারতবর্ষের সঙ্গেই অছেদ্য বাঁধনে জড়িয়েছিলেন।
যতদিনে ব্রিটিশরাজের সমাপ্তি ঘটেছে, ততদিনে কয়েক প্রজন্মের শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ এই ভারতবর্ষে জীবন কাটিয়ে গেছে, এখানকার জীবনযাত্রাকেই একমেব যাত্রা ধরে নিয়ে। যদিও ভিক্টোরিয়ানরা ভারতবর্ষে কর্মসূত্রে এসেছে বলে মনে করত, আফ্রিকা-কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় তারা যেমন বসবাস করতে গিয়েছিল, তেমনটি ধরে নিত না, ব্রিটিশরা ‘ব্রিটিশ’ই থাকতে চেয়েছে বরাবর, আঠারো শতকের ব্রিটিশদের মতো করে নয়, গোঁয়ার পর্তুগিজদের মতো করেও নয়। এক রকমের শিকড়হীনতার বোধ, এক রকমের বিস্ফোরণোন্মুখ চুল্লির ওপর বসে থাকার অনুভূতি সবসময় তাড়া করত তাদের ও তাদের স্ত্রীদের। ফেলে আসা পিতৃভূমির নস্টালজিয়া, বিরূপ আবহাওয়া ও মরণব্যাধির প্রকোপ— এসব মিলিয়ে মানসিকভাবে ধসেও পড়ত অনেকে। যে দেশকে দোহন করে তাবৎ বিলাসব্যসন জুটত তাদের, সেই দেশের রীতি-ভঙ্গি-উচ্চারণ-গ্রীষ্মপ্রধান দেশে দ্রুত রিপুতাড়না গজিয়ে ওঠার সম্ভাবনা ইত্যাদির সংক্রমণ থেকে সন্তানদের রক্ষা করতে সাহেব-মেমরা তাদের কচি বয়সেই পাঠিয়ে দিত বিলেতে, পাখি-পশু-অবাধ সূর্যালোক আর চাকরবাকরের বিলাস থেকে উিক্ষপ্ত হয়ে সাত বছরের শিশুরা চলে আসত ধূসর শীতের দেশে, অচেনা আত্মীয়দের পরিমণ্ডলে। বিলাতি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তারা আবার ফিরে আসত অভিভাবকদের কাছে, ভারতে। বিবাহার্থে আসা মেমদের ‘জেলেবহর’-এর আগে-পরে এমন বহু কিছু ঘটে গেছে, যা একটি সত্যকেই তুলে ধরে, সেটি হচ্ছে মানুষে মানুষে জাতের দেয়াল বারবার ভেঙে পড়ে। স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে, দেশান্তরের সঙ্গে সঙ্গে, ইচ্ছাকৃতভাবে বা গভীর অনিচ্ছায়ও মানুষের গোত্রান্তর ঘটে যায়। এ অলক্ষ্যের খেলা।






