উইলিয়াম কেনেডি। অনুবাদ লুনা রুশদী
গত সংখ্যার পর
[‘দি আটলান্টিক’ পত্রিকায় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে সাক্ষাত্কারটি প্রকাশিত হয়েছিল]
মার্কেসের কল্পনার পৃথিবী সবসময়েই দৃঢ়ভাবে বাস্তবের ভিত্তিতে দাঁড়ানো। তবে একই সঙ্গে তা বিভ্রান্তিকর। কারণ বাস্তব মাঝে মাঝেই অলীক।
পাতার ঝড়ের বুড়ো ডাক্তার এক সাড়ম্বর বুর্জোয়া বাড়িতে রাতের খাবার খেতে বসে পরিচারিকাকে বলেন, ‘আচ্ছা মিস, পানিতে একটু ঘাস সিদ্ধ করে স্যুপ হিসেবে দেন আমাকে’, পরিচারিকা জানতে চান, ‘কী রকম ঘাস ডাক্তার সাহেব?’, ডাক্তার জবাব দেন, ‘সাধারণ ঘাস, গাধারা যা খায়।’
পরাবাস্তবিক? গার্সিয়ার কাছে নয়, তিনি বললেন, ‘এক লোক আমার বাড়িতে বলেছিল এ রকম।’
তিনি মনে করেন, এ বিষয়ে ফকনারের চেয়ে তিনি আলাদা। কেননা ফকনারের উদ্ভট রস বাস্তবের মুখোশে ঢাকা থাকে।
গার্সিয়া বললেন, ‘জীবনের অনেক কিছুই ফকনারকে বিস্মিত করত, অথচ লেখার সময় এভাবে লিখতেন যেন এসব বিস্মিত হওয়ার বিষয় নয়, বরং দৈনন্দিন ঘটনা।’
গার্সিয়ার ভেতর বিস্ময়বোধ কম। তিনি বলেন, ‘মেক্সিকোয় রাস্তায় রাস্তায় পরাবাস্তবের দেখা পাওয়া যায়। লাতিন আমেরিকার বাস্তব থেকেই পরাবাস্তব এসেছে।’
আমাদের আলাপের দুই সপ্তাহ আগে এক সাংবাদিক গার্সিয়াকে ফোন করে কলোম্বাির এক মফস্বল শহরে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন। ছোট একটা স্কুলে সকাল ১০টার দিকে দুজন লোক এসে থামল একটা ট্রাক নিয়ে, ‘আমরা আসবাব নিতে এসেছি’, জানাল তারা। তাদের বিষয়ে কেউ কিছুই জানত না, তবে স্কুলশিক্ষকের সম্মতিক্রমে তারা সব আসবাব ট্রাকে তুলে চলে গেল। আরো অনেক পরে বোঝা গেল, তারা ছিল দুই চোর।
‘স্বাভাবিক’, বললেন গার্সিয়া— ‘একবার বার্সেলোনায় আমি আর আমার স্ত্রী ঘুমাচ্ছিলাম, এমন সময় দরজায় বেল বাজল। আমি দরজা খুলে দিতেই লোকটা বলল, ‘আমি ইস্ত্রির তার ঠিক করতে এসেছি।’ আমার স্ত্রী বিছানা থেকেই বলল, ‘আমাদের ইস্ত্রিতে কোনো সমস্যা নেই।’ লোকটা প্রশ্ন করল, ‘এটা কি দুই নম্বর অ্যাপার্টমেন্ট।’ আমি বললাম, ‘না। উপরের তলায়।’ পরে আমার স্ত্রী যখন ইস্ত্রি করতে গিয়ে প্লাগ লাগাল তখন তারটা পুড়ে গেল। এখানে উল্টো ঘটনা ঘটেছিল। আমরা জানার আগেই লোকটা জেনেছিল তার সারাতে হবে, তাই সে এসেছিল। এ রকম ঘটনা তো কতই ঘটে। আমার স্ত্রী ভুলেও গেছে।’
গার্সিয়া পরাবাস্তবের তত্ত্ব পছন্দ করলেও পরাবাস্তববাদীদের পছন্দ করেন না। কবিদের চেয়ে আঁকিয়েদের তার বেশি পছন্দ, যদিও নিজেকে এদের কোনো দলেই ফেলেন না। তার লেখা মূলত কাহিনীভিত্তিক অথচ পরাবাস্তববাদীদের কাছে প্রতীকী এবং এলোমেলো ঘটনাপ্রবাহ অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। এও সত্যি, তার লেখায় তিনি বোধগম্য হতে চান, দুর্বোধ্যতা চান না। তবুও তার কাজের মধ্যে একটা পরাবাস্তব ধরন রয়েছে, যেখানে অসম্ভব অথবা অভাবনীয়কে বাস্তবের ভঙ্গিতে তর্জমা করা হয়। আর তার পাতার ঝড় বইয়ের ঈষৎ পরাবাস্তব ঘাস খাওয়ার ঘটনার পরে এ ভঙ্গির গুরুত্ব বেড়েছে তার কাছে। একশ বছরের নির্জনতা উপন্যাসে এসেছে মাটি খাওয়া, অনিদ্রার সংক্রমণ, বুড়ো হতে থাকা ভূত, এক তরুণী, যে সশরীরে বেহেশতে পৌঁছে যাওয়ার সময় দুটো বিছানার চাদরও নিয়ে যায় সঙ্গে করে। তার অভাবনীয়তা প্রতিদিনের বাস্তবতায় সম্প্রসারিত হয়। একশ বছরের নির্জনতায় যেমন রয়েছে উরসুলার ছেলে হোসে-আরকাদিও তার শোওয়ার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে, তার পরই পিস্তলের গুলির শব্দ শোনা যায়, আর তারপর—
‘রক্তের একটা ধারা বেরিয়ে এল দরজার নিচ থেকে, বসার ঘর পার হলো, রাস্তায় বের হয়ে চলতে লাগল সরল রেখায়, অসমান চত্বর পেরিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে, পাথর ডিঙিয়ে, তুর্কিদের রাস্তাটা পার হয়ে ডানদিকে একটা মোড় ঘুরল, তারপর বাঁদিকে, ডান কোণ ঘেঁষে ঢুকল বুয়েন্দিয়াদের বাড়িতে, বন্ধ দরজার নিচ দিয়ে ঢুকে বৈঠকখানা পার হলো দেয়ালঘেঁষে, যাতে কার্পেটে রক্তের দাগ না লাগে, অন্য বসার ঘরটায় গেল, বেঁকে গিয়ে খাবারঘরের টেবিলটা এড়াল, উঠানের বেগোনিয়া ফুলের চারা পার হয়ে কেউ দেখে ফেলার আগেই ঢুকে পড়ল আমারান্তার চেয়ারের নিচে, তখন আমারান্তার কাছে অংক শিখছিল অরেলিয়ানো-হোসে, তারপর ভাঁড়ার ঘর পেরিয়ে রান্নাঘরে পৌঁছল, যেখানে উরসুলা ৩৬টা ডিম ভেঙে রুটি তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
‘হায় আল্লাহ!’ চিত্কার করে উঠল উরসুলা।
সেই রক্তের সুতার পথ ধরে চলতে শুরু করল সে, কোথা থেকে আসছে খুঁজতে খুঁজতে ভাঁড়ার ঘর পার হলো, উঠানের বেগোনিয়ার চারাগুলো পার হলো। অরেলিয়ানো-হোসে সেখানে নামতা পড়ছিল তিন দ্বিগুণে ছয়, তিন তিনে নয়, সে খাবারঘর আর তারপর বৈঠকখানাগুলো পেরিয়ে সোজা রাস্তায় নামল, প্রথমে ডানে মোড় নিয়ে তারপর বাঁয়ে ঘুরে তুর্কিদের রাস্তাটায় পৌঁছল, মনেই রইল না যে তখনও তার পরনে রান্নাঘরের অ্যাপ্রন আর পায়ে ঘরের স্যান্ডেল। রাস্তা পার হয়ে এমন এক বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল, যেখানে আগে কখনো আসেনি, যখন শোবার ঘরের দরজাটা ঠেলে খুলল, তখন বারুদের গন্ধে দমবন্ধ লাগছিল, সে দেখল কিছুক্ষণ আগেই মাটির ওপর ছিঁড়ে ফেলা লেগিংসের উপরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে হোসে-আরকাদিও, তার ডান কান থেকেই বের হচ্ছিল রক্তের ধারাটা, এতক্ষণে তা শেষ হয়ে গেছে।’
এ অনুচ্ছেদটা নিয়ে আমি কথা তুলেছিলাম তার বইয়ে পরাবাস্তব ঘটনার উদাহরণ হিসেবে। তবে গার্সিয়া এর অসম্ভাব্যতার সম্ভাবনা প্রায় খারিজ করে দিলেন। এ সম্পর্কে তিনি শুধু বললেন, ‘এ হলো নাড়ির টান।’ তারপর আমরা অন্য বিষয়ে কথাবার্তা বললাম।
পাতার ঝড় লেখার পরে কিছু হঠকারী প্রভাবের ফলে তার গল্প লেখার ধরন বদলে গিয়ে প্রায় সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী রূপ নিয়েছিল। বোগোতার বামপন্থীদের কাছে তার কদর বেড়েছিল লিফ স্টর্ম প্রকাশিত হওয়ার পর। তবে তারা তার চিন্তাভাবনা পছন্দ করলেও তার লেখার ধরন বাতিল করেছিল কঠোর সামাজিক বাস্তবতা প্রকাশের ক্ষেত্রে খুব বেশি শৈল্পিক বলে। এ সম্পর্কে মারিও ভারগাস লিখেছেন, ‘তার লেখার ধরন সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদিতার অমসৃণ রীতিতে কখনই ফেলা যায় না, তবু কয়েক মাস পরে নিজের লেখায় বর্ণনার ভাষা বিষয়ে গার্সিয়া মার্কেস প্রায় একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন দ্বিতীয় উপন্যাসের শুরুতে।’ রচনাশৈলীর এ পরিবর্তনকে খারাপ বলা যায় না, এ নতুন ধরনেই গার্সিয়া তিনটা খুব ভালো লেখা লিখেছিলেন। তবে তিনি নিজে সন্তুষ্ট ছিলেন না, এ ভঙ্গিতে লেখার ফলে তার কল্পনা সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বোগোতায় দলীয় জঙ্গিবাদের একটা দমক পার করেছিলেন, কিন্তু খুব জলদিই তা কেটে গিয়েছিল এবং তার পরেই এল-এসপেকতাদরের সাংবাদিক হিসেবে ইউরোপ চলে গেলেন। দেখা গেল, রোমে বারোতম পোপ পায়াসের খুঁটিনাটি অসুখবিসুখের খবর ছেপে তাকে সময় কাটাতে হচ্ছে। সে সময়েই ‘সেন্ত্রো স্পেরিমেন্তালে সিনেমাতোগ্রাফিয়া’য় (সেন্টার ফর এক্সপেরিমেন্টার সিনেমাটোগ্রাফি) ভর্তি হলেন তার উপন্যাস পাতার ঝড় নিয়ে ছবি বানানোর উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে প্যারিস গেলেন কয়েক মাস পরে এবং জানতে পারলেন রোজার স্বৈরতন্ত্র তাদের পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে এবং তার কোনো চাকরি নেই।
প্যারিসেই থেকে গেলেন, একটা ছোটগল্প লিখতে শুরু করলেন ছোটবেলায় দেখা সহিংসতা বিষয়ে। নতুন গল্পে স্থানিক পরিবর্তন ঘটালেন, মাকোন্দোর বদলে নতুন শহর এল-পুয়েব্লোর সৃষ্টি হলো। এ পরিবর্তন পরবর্তীতে অনেক পাঠককেই বিভ্রান্ত করেছে। এ গল্পে ভাষাও আলাদা আগের লেখাগুলোর চেয়ে— ছাড়া ছাড়া, সংলাপের গুরুত্ব বেশি। ছোটগল্প হিসেবে যে লেখা শুরু হয়েছিল, তা খুব জলদি বাড়তে বাড়তে প্রথমে একটা এবং তারপর দুটো উপন্যাসে রূপ নিল। শেষ অংশটুকুই প্রথমে শেষ করলেন এবং উপন্যাসের নাম হলো এল করোনেল নো তিয়েনে কুইয়েন লে এসক্রিবা (নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল/ কর্নেলের কাছে কেউ লেখে না), একজন বৃদ্ধ যোদ্ধার গল্প, যার কথা সবাই ভুলে গেছে, সরকারেরও মনে নেই সেই যুদ্ধ অথবা তাকে, অথচ তিনি বিরামহীনভাবে পেনশনের প্রতীক্ষা করেন।
‘ছোটখাটো একটা মাস্টারপিস লিখে ফেলেছেন তিনি’, ভারগাস লিখেছেন, ‘তবে সে সম্পর্কে তার কোনো অবগতি যে ছিল না শুধু তা-ই নয়, পাতার ঝড় লেখার পরে যে রকম বিফলতার বোধ তাকে পেয়ে বসেছিল, এ বইটা লেখার পরেও সে রকমই হলো।’
এর পরে তিনি সহিংসতা সম্পর্কে উপন্যাসটা শেষ করেন। এ উপন্যাসের পটভূমিতেও একই ছোট শহর। এখানে হিংস্রতা ছড়ায় কিছু বেনামি চিহ্ন, যা রহস্যজনকভাবে শহরের বিভিন্ন প্রকাশ্য জায়গার দেয়ালে ফুটে উঠতে থাকে। এ বইটার নাম লা মালা হোরা (দি ইভিল আওয়ার/অশুভ সময়)।
এ বইগুলো লেখার সময় প্যারিসে গার্সিয়ার জীবন স্মরণীয় হলেও আনন্দময় ছিল না। তার বেঁচে থাকাটাই অলৌকিক লাগত নিজের কাছে। সে দেশের নাগরিক না হওয়ায় চাকরি করার অধিকার ছিল না, ভাষাও জানতেন না ভালো করে, দিন কেটেছে ভয়াবহ দারিদ্র্যে, একটা সময় টাকা জোগাড় করেছেন ফেলে দেয়া খালি বোতল দোকানে ফেরত দেয়ার বিনিময়ে। যখন কপর্দকশূন্য হলেন, বাড়ির মালিক চিলেকোঠার একটা ঘরে তাকে থাকতে দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি লিখতেন অবিচলিতভাবে। পরে যখন ১৯৬৮ সালে সাফল্য অর্জনের পর আবার প্যারিসে ফিরেছেন, সেই দারিদ্র্যের সময়ের তিন বছরের কথা মনে করে উপলব্ধি করেছিলেন, ‘যদি ওই তিনটা বছর আমার জীবনে না আসত, হয়তো লেখক হতাম না। এখানেই আমি শিখেছিলাম কেউ ক্ষুধায় মারা যায় না, আর সত্যি সত্যি ব্রিজের নিচে কেউ ঘুমাতে পারে না।’
বার্সেলোনা যাওয়ার আগে আমার স্ত্রী আর আমি প্যারিস ঘুরে গিয়েছিলাম। আমরা তাকে জানালাম শহরটায় আমাদের অসাধারণ কয়েকটা দিনের কথা।
‘যখন আবার সেখানে গেলাম, আমার কাছে টাকা ছিল’ জানালেন গার্সিয়া— ‘আগেরবার টাকার অভাবে যা পারিনি সব করতে চাইছিলাম, যেসব খাবার অথবা পানীয় কেনার সামর্থ্য ছিল না, সব কিনলাম। তবে কিছুই ভালো লাগেনি। প্যারিস খুব বাজে লাগে আমার।’
১৯৫৭ সালে তিনি প্রস্তাব করেন বোগোতা আর কারাকাসের কিছু সংবাদপত্রের জন্য লোহার পর্দার অন্য পাশের দেশগুলোকে (সোভিয়েত ইউনিয়ন) কেন্দ্র করে একটা ১০ পর্বের নিবন্ধ লিখবেন। এ লেখাগুলোর মাধ্যমেই তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়। সেই সফরের সঙ্গী সাংবাদিক পিলিনো-আপুলেয়ো-মেন্দোজা পরবর্তীতে কারাকাসের পত্রিকা মোমেন্তোর সম্পাদক হয়েছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই গার্সিয়াকে চাকরি দিয়েছিলেন। কারাকাসে তিনি তার গল্পের দুনিয়ার মুখোমুখি হতে পারতেন শুধু ছুটির দিনগুলোয় আর কাজের দিনে পেরেজ-জিমেনেজ স্বৈরতন্ত্রের শেষ দিনগুলো নিয়ে প্রতিবেদন লিখতে হতো। এ সময় নতুন কিছু গল্প লিখেছিলেন। মেক্সিকোয় ১৯৬২ সালে গল্পগুলো বই আকারে প্রকাশ করার সময় বইটার নাম দিয়েছিলেন লস ফুনেরালেস দে লা মামা গ্রান্দে (‘বিগ মামা’স ফিউনেরাল)। এ বইয়ের গল্পগুলোয়ও ছাড়া ছাড়া বয়ানভঙ্গি, শুধু শিরোনাম গল্পটা বাদে। এ গল্পের ভাষা গাঢ় আর কলোম্বিয়ার পত্রিকাগুলোর রাজনৈতিক আর সম্পাদকীয় পাতার লেখার ভঙ্গির প্রতি বিদ্রূপ আছে গল্পটায়। পাঠকের কিছুটা বিভ্রান্তি ঘটতে পারে, কেননা শুধু এ গল্পটাই লেখা হয়েছে মাকোন্দোর পটভূমিতে, বইয়ের বাকি গল্পগুলোর পটভূমি এল্-পুয়েব্লো, সেগুলোর কোনোটাতেই মাকোন্দোর উল্লেখ নেই।
গার্সিয়ার অনেক অনিয়মিত পাঠকের ধারণা হলো, তার সব লেখাই মাকোন্দোর পটভূমিতে। কিন্তু যখন তিনি পাতার ঝড় উপন্যাসের সরস ভঙ্গি বাদ দিয়ে বামপন্থী বাস্তববাদী ঢঙে লিখতে আরম্ভ করলেন, তখন শুধু যে একটা হেমিংওয়ে ধাঁচের বাস্তববাদিতা ধারণ করলেন তা-ই নয়, তার গল্পের আদি শহরও ছেড়ে দিলেন। শিরোনাম গল্পটার মধ্য দিয়ে তিনি তার স্বাভাবিক লেখার ভঙ্গিতে ফিরে গেছেন, উচ্চাভিলাষী অথচ আরোপিত নয়, একই সঙ্গে ফিরেছেন মাকোন্দোতেও।
গার্সিয়া বলেন, তার পাঠকদের অনেকেই এল-পুয়েব্লো শহরটাকে মেনে নিতে চান না। ‘পাতার ঝড় আর একশ বছরের নির্জনতা লেখা হয়েছে মাকোন্দোর পটভূমিতে, এর বেশি কিছু না’, তার বই সম্পর্কে জোর দিয়ে বলেন তিনি, ‘বাকি তিনটা (নো ওয়ান রাইট?স টু দ্য কর্নেল, বিগ মামা’স ফিউনেরাল ও দি ইভিল আওয়ার) এল-পুয়েব্লোর গল্প।’ তারপর কর্নেলের বইটার মার্কিন সংস্করণের ৪২ পৃষ্ঠা খুলে প্রমাণ দিলেন কর্নেল মাকোন্দোর কথা স্মরণ করছেন, যে শহর তিনি শারীরিকভাবে ছেড়ে গিয়েছিলেন ১৯০৬ সালে।
‘কিন্তু কেউ কেউ প্রমাণ মানতে রাজি না’, তিনি জানান— ‘তখন তাদেরকে তাদের মতোন ছেড়ে দিই, যাতে এ বিষয়ে আমাকে আর তর্ক করতে না হয়।’
আরেকটা গুজব রটেছে যে তিনি আর মাকোন্দোর পটভূমিতে কিছু লিখবেন না। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বললেন, ‘মিথ্যা কথা। আমি ভবিষ্যতের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি না।’ বরং গত এক বছরে তিনি একটা ছোট উপন্যাস লিখে শেষ করেছেন, যেখানে একশ বছরের নির্জনতা উপন্যাসের কিছু চরিত্রের জীবনের কথা আছে। বইটার নাম দি ইনক্রেডিবল অ্যান্ড স্যাড টেইল অব ইনোসেন্ট ইরেন্দিরা অ্যান্ড হার হার্টলেস গ্র্যান্ডমাদার (নিষ্পাপ ইরেন্দিরা এবং তার হূদয়হীনা দাদিমার বিস্ময়কর ও দুঃখজনক কাহিনী)। গ্রেগরি রাবাসা বইটার ইংরেজি অনুবাদ করছেন। তিনি পাতার ঝড় ওএকশ বছরের নির্জনতা উপন্যাসেরও অনুবাদক।
[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]





