রবার্ট এফ ওয়ার্থ। অনুবাদ: শওকত হোসেন

ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে এক ধোঁয়াশা দিনে ভারত সরকারের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি উদ্দাম মল্লযুদ্ধের জন্য খ্যাত নয়াদিল্লির ছাত্রাসাল স্টেডিয়ামে জমায়েত হলেন। এক ভিন্ন ধরনের প্রদর্শনীর কারণে এসেছেন তারা: ওইদিন সন্ধ্যায় একটি জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র মহাকাব্যের প্রথম পর্বটি (মোট ৫৭টির ভেতর) প্রথমবারের মতো দেখানোর কথা। অস্থায়ী মঞ্চের মাঝখানে হাসিমুখ রাজনীতিক ও মন্ত্রীদের ঘেরাওয়ের ভেতর রয়েছেন সেই মানুষটি, যার জীবন উদযাপিত হচ্ছে: জাফরান জোব্বা গায়ে ছিপছিপে গড়নের একজন মানুষ; মুখে লম্বা কালো দাড়ি, বুক পর্যন্ত লম্বা চুল খোঁপা বাঁধা। পরিচয়ের কোনো প্রয়োজন নেই তার। তিনি ভারতের অন্যতম বিখ্যাত মানুষ বাবা রামদেব।

মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ময়দানে নিখুঁত সারিতে বসে থাকা ব্রহ্মচারী নামে পরিচিত কয়েক হাজার হিন্দুধর্মীয় শিক্ষার্থীর সারিকে পরিচয় করিয়ে দিলেন রামদেব। সবাই আমার সঙ্গে বলো: ‘ভারত মাই কি জয়!’ চিত্কার করে উঠলেন তিনি। কথাগুলো উচ্চারণের সময় হাত তুলে মুঠি পাকাল জনতা— ‘আমার মাতৃভূমি ভারত মহান।’

সম্মানিত অতিথিরা একে একে রামদেবের অনন্যসাধারণ জীবনের বর্ণনা দিতে উঠে দাঁড়ালেন: কেমন করে তিনি গণযোগ শিবির এবং টেলিভিশন সাম্রাজ্যের কল্যাণে ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে শারীরিক সুস্থতার বিষয়টি পৌঁছে দিয়েছেন, কীভাবে তার ওষুধ ও ভোগপণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান পতঞ্জলি আয়ুর্বেদকে একটি মাল্টি বিলিয়ন ডলার মূল্যের মহীরুহ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ‘স্বামীজি দুনিয়ার গতি, চিন্তাধারা পাল্টে দিয়েছেন,’ ভক্তিময় খেতাব আউড়ে রামদেবের প্রসঙ্গে চড়া কণ্ঠে বললেন এক বক্তা। ‘এমনই মহান তিনি। পাশ্চাত্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল যে দেশটি, স্বামীজি সেই ভারতকে বদলে দিয়েছেন— এর পোশাক, খাদ্য এবং সংস্কৃতি এবং তিনি এর পথ যোগের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন!’

অবশেষে নীরবতা নেমে আসে। ৫০ ফুট আকারের পর্দা জীবন্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তী ১ ঘণ্টা ভারতের রাজনৈতিক অভিজাত গোষ্ঠী ভক্তিপূর্ণ নৈঃশব্দ্যে প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ থেকে শুরু করে জীবনের গোড়ার দিকে একজন চটপটে যোগী হিসেবে রামদেবের বেড়ে ওঠা (বাকি পর্বগুলোকে ট্রেলার ফর্মে সমন্বিত করা হয়েছিল) প্রত্যক্ষ করে। চলচ্চিত্র হিসেবে রামদেবকে প্রায় স্বর্গীয় দূতের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া একটা অগোছালো মেলোড্রামা। তবে ভারতীয় জনগণের অনুভূতির প্রকাশ হিসেবে খুব বেশি দূরবর্তী ছিল না এটা।

রামদেবকে বেশ কয়েকজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের পরামর্শক এবং ক্রিশ্চান রাইটকে সংগঠিতকারী দক্ষিণাঞ্চলীয় ব্যাপ্টিস্ট অনলবর্ষী বক্তা বিলি গ্রাহামের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

কিন্তু রামদেব উপকারী দেবপুরুষের চেয়ে বেশি কিছু। এমনকি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের বাইরেও রামদেব ধর্মীয় নিশ্চয়তার জন্য ক্ষুধার্ত এবং ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম নেতা জওহরলাল নেহরুর সমাজবাদী, যুক্তিবাদী উত্তরাধিকারে বীতশ্রদ্ধ উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিখুঁত বার্তাবাহক। বিদেশী কোম্পানিগুলোকে নব্য উপনিবেশিক খলনায়ক হিসেবে তুলে ধরতে রামদেব স্বদেশী বা ভারতীয় অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের জোব্বা চাপিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশাল মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রামদেব তার নিজস্ব ধরনেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারতীয় উত্তর। তার প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানোর জোর গুজব রয়েছে। ট্রাম্পের মতো এক মাল্টি বিলিয়ন ডলার সাম্রাজ্যের প্রধান তিনি এবং ট্রাম্পের মতোই একজন আতঙ্কময় টিভি-ব্যক্তিত্ব, সত্যির সঙ্গে যার সম্পর্ক স্থিতিস্থাপক; ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ ঠেকাতে পারেন না তিনি— ভারতের সর্বত্রই তার নাম এবং ছবি। মে মাসে ক্রমবর্ধমান পণ্য তালিকায়— প্যাকেজড নুডলস, হারবাল জন্মনিরোধক, গরুর মূত্র থেকে তৈরি ফ্লোর ক্লিনার— স্বদেশী সিম যোগ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ডব্লিউডব্লিউই কায়দায় প্রচারণা চালানোর গুণ রয়েছে তার: গত বছর ইউক্রেনের একজন অলিম্পিক মল্লযোদ্ধার বিরুদ্ধে টেলিভাইজড দ্বন্দ্বে বিজয়ী হন তিনি।

আপাতদৃষ্টিতে রামদেবের প্রশান্ত মেজাজ ট্রাম্পের তর্জন-গর্জন এবং নাক সিঁটকানো থেকে দুরস্ত। কিন্তু তার অস্পষ্ট কথা বলার বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করা হলে রামদেব হোয়াইট হাউজের বর্তমান বাসিন্দার মতোই সেক্যুলার অভিজাত গোষ্ঠীর ‘দূষিত’ দিকে ইঙ্গিত করেন। তাতে কাজ হয়েছে বলেই মনে হয়। গত বছর জনৈক ভারতীয় বিচারক বেরোনোর আগেই রামদেবের একটা সমালোচনামূলক জীবনী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং এর লেখকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এমনকি সোস্যাল মিডিয়ায়ও বইটি সম্পর্কে উল্লেখ নিষিদ্ধ করেন।&dquote;&dquote;

হিমালয়ের পাদদেশের কাছাকাছি, দিল্লি থেকে উত্তরপুবে আনুমানিক ৪ ঘণ্টার যাত্রাপথের দূরত্বে গঙ্গাতীরের ছোট্ট শহর হরিদ্বার রামদেবের সাম্রাজ্যের রাজধানী। হিন্দু কিংবদন্তি মতে, এটি পবিত্র স্থান। হাজার হাজার তীর্থযাত্রী রোজ এখানে নদীতীরে জমায়েত হয়ে থাকে। অনতিদূরেই রয়েছে ঋষিকেশ শহর, বিটলসরা ১৯৬০-এর দশকে মহাঋষি মহেশ যোগীকে দেখতে এখানে এসেছিল। কিন্তু রামদেবের তত্পরতা অতীতের সংযমী আশ্রম থেকে বহুদুরস্ত। পতঞ্জলির মূল অফিস কমপ্লেক্স দেখতে বিমানবন্দরের মতো, একটা অদ্ভুতদর্শন প্যাগোডার মতো গেট একে শহরের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ভেতরে সুবিশাল পার্কিং লট, কর্মচারীদের জন্য গুহার মতো বিরাট ক্যাফেটেরিয়া, লন ও ফোয়ারা। ইউনিভার্সিটি অব পতঞ্জলির ছাত্রদের গায়ের ‘যোগবিদ্যা বিভাগ’ লেখা জার্সি না থাকলে একে সিলিকন ভ্যালি ভেবে ভুল করবেন। পদ্মাসনে বসে থাকা এক হাড়সর্বস্ব শ্মশ্রুমণ্ডিত সাধুর মূর্তির দিকে তাকিয়ে আছি বলে আবিষ্কার করেছি আমি: এটা কোম্পানির স্বনামি পতঞ্জলি, আনুমানিক দুই হাজার বছর আগে আধুনিক যোগ অনুশীলনের ভিত্তি বিভিন্ন পঙিক্ত সংকলিত করেছিলেন তিনি।

কয়েক ব্লক দূরে সশস্ত্র প্রহরীদের পাহারায় থাকা আরেকটা বিশাল গেটের ওধারে থাকেন রামদেব (মোদির নির্বাচনের পর তার সরকার রামদেবকে প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস পার্টির কয়েকজন নেতার কাছ থেকে প্রত্যাহার করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা দিয়েছে)। প্রহরীরা হাত নেড়ে আমাদের ছেড়ে দিল। সহসা অনিন্দ্যসুন্দর এক উদ্যানের ছিটমহলে আবিষ্কার করলাম নিজেকে। ভারতের তাপ আর ধূলি যেন বহুদূরের বলে মনে হলো। ইট বিছানো পথ ধরে একটা ছোট বাংলোর দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। চমত্কার খোদাই করা কাঠের দোলনায় বসে একজন মেহমানের সঙ্গে হাসতে হাসতে কথা বলছিলেন রামদেব। উঠে আলিঙ্গন করে স্বাগত জানালেন আমাকে। তার নাজুক কাঠামো আমাকে চমকে দিয়েছিল; প্রান্তে পাক ধরা ঘন কালো দাড়ি তার কৃশ শরীরের চেয়ে ঢের বেশি মজবুত ঠেকেছে। অনেকটা লম্বা পথ দৌড়ে আসা কারো মতো এক ধরনের শিথিলভাবে সম্পর্কিত উষ্ণতা বিলোচ্ছিলেন তিনি। তার ফিনফিনে জাফরান জোব্বার কথা বাদ দিলে— একটা বুকে জড়ানো অন্যটা কোমরে— কেবল পাদুকাই— আঙুল আটকে রাখার জন্য ধাতব খুঁটিসহ কাঠের ঐতিহ্যবাহী খড়ম— ছিল তার পরনে।

‘এটাই আমার মূল এবং চূড়ান্ত মিশন,’ প্রবল টানযুক্ত ইংরেজিতে বলছিলেন তিনি। ‘আমি  স্বাস্থ্যবান, সমৃদ্ধ ও শান্তিময় মানুষ, সমাজ এবং জাতি চাই।’ কথা বলার সময় আমার চোখের দিতে তাকিয়ে হাত স্পর্শ করলেন তিনি। ছোটবেলার অসুখের কারণে তার মুখের বাম পাশ অসাড়, ফলে সৃষ্টি হওয়া কুঞ্চন তাকে এক ধরনের ট্যারা ভাব জুগিয়েছে। ‘যোগ ছাড়া স্বাস্থ্য ও সুখ অর্জন করতে পারবেন না আপনি,’ বলে চললেন তিনি। ‘যোগই আমার মূল কাজ।’ রামদেব প্রতিদিন শত শত ছাত্র এবং চালু ক্যামেরা নিয়ে বিশাল অডিটোরিয়ামে ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং পরে আবার (সম্ভব হলে) বিকালে ও সন্ধ্যায় ৫টা থেকে সাড়ে ৭টা অবধি যোগচর্চা করেন এবং তালিম দেন। এর মাঝে আমাকে বললেন তিনি, পতঞ্জলি এবং এর সহযোগী বিভিন্ন ট্রাস্ট ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের দেখভাল করেন। যোগ সম্পর্কে আন্তরিক আলাপের সময় আমুদে রসিকতা করে মেকি হাসিতে মাথা দোলাচ্ছিলেন। দু-একদিন তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো যাবে কিনা জানতে চাইলে আমোদিত মনে হলো তাকে। ‘আলবৎ! আমার সঙ্গে থাকতে পারেন আপনি,’ আমাদের ঠিক পেছনে একটা দালানের দিকে ইশারা করে বললেন তিনি, ওখানে মেঝেয় একটা খাটিয়ায় ঘুমোন তিনি। ‘আমি বিয়ে করিনি। তবে ভাববেন না, আমি সমকামী নই!’ হাসিতে ফেটে পড়ে আবার যোগ করলেন, ‘আমি সমকামিতার বিরুদ্ধে!’ আরো প্রবল হয়ে উঠল তার হাসি এবং হাসতে হাসতেই বললেন, ‘ঠাট্টা করছিলাম।’

মুহূর্তের জন্য বিস্ময় মানলাম আমি, পরক্ষণে নৈপুণ্যে অবাক মানলাম। হিন্দু সাধু হিসেবে রামদেব বারবার সমকামিতাকে ‘অনৈতিক ও অস্বাভাবিক’ উল্লেখ করে এর বিরোধিতার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যোগের মাধ্যমে এর প্রতিকার সম্ভব। তবে শ্রোতাদের মুগ্ধ করার রাজনীতিসুলভ গুণ রয়েছে তার। পুব-পশ্চিমের মিলিত হওয়ার এক মুহূর্তে ঐতিহ্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে আভাসে নিজের কট্টর উদারবাদী হওয়ার কথা জানালেন তিনি।

রামদেবের অনানুষ্ঠানিকতা এবং বাস্তব ঝোঁক তাকে বেশির ভাগ যোগী থেকে আলাদা করেছে। ভারতীয় ধর্মীয় সেলিব্রিটিরা সাধারণত দেবপুরুষ হিসেবে পরিচিত, তারকা পরিচিতি বোঝানোর পাশাপাশি পরিহাসের ছোঁয়াও আছে এতে। এরা বিনয়ী, ন্যাংটি পরা জ্ঞান সন্ধানীর প্রাচীন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী কিন্তু সুবিধাবাদিতাও এর সঙ্গে জুড়ে গেছে বলে মনে হয়। কিছু দেবপুরুষ ভীষণ ধনী হয়ে উঠেছেন এবং পৃথিবীময় বিস্তৃত বিভিন্ন কাল্ট গড়ে তুলেছেন। তোষামোদে ভক্তে ঘেরাও হয়ে থাকতে চান তারা এবং অনেকেই ষাটের দশকে হাওয়া থেকে ওমেগা ঘড়ি বের করে এনে কুখ্যাতি লাভ করা সত্য সাঁইবাবার মতো কেরামতি দেখানোর দাবি করে থাকেন। রামদেবই প্রথম রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেননি, ১৯৭০-এর দশকে ইন্দিরা গান্ধী প্রায়ই ‘দিল্লির রাসপুতিন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠা তার যোগগুরুর কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন। কিন্তু রামদেব বিরল ক্ষেত্রেই আলোকন এবং ধর্মের কথায় হাওয়া ভারী করেন। ‘আমার যোগ খুবই সাধারণ,’ আমাকে বলেছেন তিনি। ‘জটিল কোনো ভঙ্গি নেই। দর্শন বা আদর্শও নেই। সব যোগ অনুশীলনই স্রেফ সুবিধাভিত্তিক। ত্বরিত সুবিধা।’

রামদেবই প্রথম স্রেফ ধনী শিষ্যদের কাছ থেকে দানের টাকা হাতানোর বদলে ব্যবসায়ী হিসেবে মিলিয়ন টাকা অর্জন করেছেন। মাত্র এক দশকের ভেতর পতঞ্জলি সামান্য প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউজে পরিণত হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে এর বিক্রির পরিমাণ ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। টিভি চালু করুন কিংবা ভারতের যেকোনো জায়গার বিলবোর্ডের দিকে নজর দিন, রামদেবের কোনো না কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন। আমাদের আলাপের সময় রামদেব সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা বলে ২০২৫ সাল নাগাদ বার্ষিক ১৫ বিলিয়ন বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে পতঞ্জলির সাফল্য নিয়ে দম্ভ প্রকাশ করছিলেন। এ পরিমাণ পতঞ্জলিকে ভারতের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। তবে তিনি আবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, পতঞ্জলি আদৌ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। এটা ‘মানবজাতির সেবার জন্য, জাতির জন্য।’ তিনি বলেন, তিনি বা তার কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আচার্য বালকৃষ্ণ বেতন নেন না। রামদেব বললেন, তার এমনকি কোনো ব্যাংক হিসাবও নেই (সাধুর কৃচ্ছ্র ও সংযমের নীতি মেনে চলেন তিনি, যদিও কোম্পানি তার চাহিদার চেয়ে বেশিই যত্ন নিয়ে থাকে বলা হলো)। সমস্ত মুনাফা, বলেছেন তিনি, গবেষণা ও দানের পেছনে খরচ করা হয় এবং কোম্পানির অল্প খরচ একে প্রতিযোগীদের চেয়ে কম দামে বিক্রির সুযোগ করে দেয়। পতঞ্জলির বেশির ভাগ কর্মী অন্যত্র যে বেতন পেতেন, তার চেয়ে কম বেতন পান; বেতন বাড়ানোর দাবিকে কুসংস্কার মনে করা হয় (কোম্পানির একজন মুখপাত্র এটা অস্বীকার করেছেন)। মদপান ও আমিষজাতীয় খাবার খাওয়ার ব্যাপারে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ‘ব্যক্তিজীবনে সংযম অন্যের জন্যে সমৃদ্ধি,’ হাসিমুখে আমাকে বলেছেন রামদেব। ভারতকে ‘২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত’ করার জন্যই কট্টর পুঁজিবাদ ও সাধুসুলভ সংযমের এমন মিশেল।&dquote;&dquote;

রামদেব আমাকে সব ধর্ম ও বর্ণকে আলিঙ্গন করা জাতীয়তাবাদী দর্শনের কথা বলেছেন, কিন্তু এক ধরনের উন্মোচক শর্তের কথাও বলেছেন তিনি। ‘সবার আগে দেশ,’ বলেছেন তিনি। “এটা জরুরি। ‘আমিই সেরা, আমার জাতই সেরা নয়; বরং আমার দেশই সেরা।’ মুসলিম নেতাদের বিপরীতে— ওরা বলেন ইসলামই শ্রেষ্ঠ। আমি বলি, না: ‘জাতিই শ্রেষ্ঠ, নাগরিকই মহান’।” এবং রামদেবের ভাষায়, জাতি নিগূঢ়ভাবে স্পষ্টতই হিন্দ ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত: যোগ, আয়ুর্বেদিক ওষুধপত্র এবং প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্র যেখান থেকে এসবের উদ্ভব বলে কথিত।

গুজরাটের দাঙ্গার সময়ে মূলত গণযোগ শিবির এবং তার নিজস্ব হোম মেড ওষুধ বিক্রির জন্য ভারতময় চরকির মতো ঘুরে বেড়িয়ে সেলিব্রিটি হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করেছিলেন তিনি। ভারতের উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আধ্যাত্মিকতা ও স্বাস্থ্যের ক্ষুধাকে পুঁজি করেই দ্রুত মজাদার, সাধ্যের ভেতর এবং উপকারী স্বাস্থ্যকর ধর্মাচার ও খাবারের একটি নগদ প্যাকেজে হিন্দুত্বের প্রতীকে পরিণত হন। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আদর্শের জন্য অনুদান দিতে এবং তার সমর্থন পেতে রাজনীতিক ও সেলিব্রিটিদের জোয়ার হরিদ্বারের পথ ধরে; ভারতীয়রা যাকে ভোট ব্যাংক বলে থাকে, ঠিক সেটাই হয়ে উঠছিলেন তিনি। ২০১১ সালে ওই গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়া সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট আন্না হাজারের নেতৃত্বে পরিচালিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে আলিঙ্গন করেন তিনি। জুনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন, তার ৪০ হাজার শিষ্য দিল্লিতে তার সমর্থনে র্যালি করে। টিয়ার গ্যাস নিয়ে হাজির হয় পুলিশ এবং পরের হট্টগোলের ভেতর রামদেব মঞ্চের নিচে জাফরান জোব্বা খুলে রেখে আহত নারীর ছদ্মবেশে সটকে পড়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু দাড়ি-গোঁফসহ আটক হওয়ার পর ভিডিওতে উন্মুক্ত হয়ে পড়েন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বেশ কিছুদিন ধরে তাকে নিয়ে রসিকতা করেছে।

২০১০ সালে একটি স্বল্পায়ু রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন রামদেব। তখন থেকে নিজস্ব রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলবেন বলে গুজব ছিল। আমি প্রসঙ্গ তুললে হাসিমুখেই কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘অরাজনৈতিক ব্যক্তিতে’ পরিণত হবেন তিনি এবং বিজেপির বিজয় তার পক্ষে যেকোনো দায়িত্ব গ্রহণ অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে। ‘মোদি একজন সৎ প্রধানমন্ত্রী,’ আমাকে বলেছেন তিনি। ‘তিনি দূরদর্শী এবং মিশনারি। পরের মেয়াদেও (২০১৯) জিতবেন। ভারতের একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে দেবেন।’

যোগের রিব্র্যান্ডিং এবং হিন্দু ধর্মমতকে জনপ্রিয় করে তোলায় রামদেবের সাফল্য হয়তো বহুল উচ্চারিত তার জীবন কাহিনীর অনুপ্রাণিতকারী শক্তির কাছে ঋণী হয়ে থাকতে পারে। সম্ভবত ১৯৬৫ সালে উত্তর-মধ্য ভারতের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি (নিজের বয়স সম্পর্কে বরাবরই ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছেন তিনি), তার নাম রাখা হয়েছিল রাম কিষান যাদব। ছোটবেলায় ক্ষেতে-খামারে কাজ করেছেন, লাগাতার রোগে ভুগেছেন, দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। হরিদ্বারে তার সঙ্গে দেখা করলে তার কপালে একটা ক্ষতচিহ্ন দেখিয়েছেন তিনি, তিন কিংবা চার বছর বয়সে পড়ে যাওয়ার ফল। পরে তিনি গ্রামে এক পুকুরে পড়ে প্রায় ডুবে মরতে বসেছিলেন। মুখের বামদিক অসাড় করে দেয়া অসুখের পর অন্য ছেলেরা ট্যারা চোখের কারণে তাকে ক্ষ্যাপাত। একটা বইতে যোগের কথা পড়ে, আমাকে বললেন তিনি, দুর্বল দেহকে শক্তিশালী করে তুলতে যোগচর্চা শুরু করেন। তরুণ বয়সে একটা গুরুকুলে যোগ দিতে ঘর ছাড়েন। এর পরের বছরগুলো কৌতূহলোদ্দীপকভাবেই ফাঁকা; রামদেব এ নিয়ে খুব কমই কথা বলে থাকেন, অনেক সময় বিস্মৃত হওয়ার দাবি করেন। যে জিনিসটা পরিষ্কার সেটা হলো, ১৯৯৫ সালে সন্ন্যাসীতে পরিণত হন তিনি এবং এক উপলব্ধির পর এখনকার নাম গ্রহণ করেন, সেটা এ রকম: ‘ব্যক্তিগত কোনো পছন্দ নয়, ব্যক্তিগত কোনো ইচ্ছাও নয়, সম্পদ নয়, শ্রদ্ধা বা অশ্রদ্ধাও নয়। আমার পুরো নৈপুণ্য, গোটা অস্তিত্ব, এ সম্পূর্ণ সত্তা সবার জন্য।’

এর পর পরই যোগ শিক্ষা দিতে শুরু করেন রামদেব। এক গুরুকুলে পরিচিত হওয়া বালকৃষ্ণের সঙ্গে মিলে একটা ছোটখাটো ক্লিনিক থেকে ঘরে তৈরি হার্বাল বড়ি আর মলম বিক্রি শুরু করেন। এ ক্লিনিকই শেষ পর্যন্ত পতঞ্জলিতে পরিণত হয়েছে। ২০০২ সালে আস্থা নামে একটি ধর্মীয় টিভি চ্যানেল রামদেবের যোগ ক্লাস সম্প্রচারের প্রস্তাব করলে বেশ দ্রুতই সাফল্য দেখা দেয়। দ্রুত তারকা বনে যান তিনি, শ্রোতাদের তার চলমান ভ্রু, হাসি, তার ট্রেডমার্ক তরঙ্গায়িত পেটের পেশির খেলা (টিভি শ্রোতাদের জন্য আয়ত্ত করা এক ঐতিহ্যবাহী আসন) আমোদিত করে তোলে। তখন এমনকি লাখ লাখ আমেরিকান সূর্য তপস্যা এবং সুর করে নমস্তে উচ্চারণ করলেও অপেক্ষাকৃত কম ভারতীয়ই যোগের চর্চা করত। সাধারণ মানুষের পক্ষে অতিরিক্ত কষ্টকর এবং জটিল প্রাচীন টেক্সটের সঙ্গে সম্পর্কিত সংযমের আচার ভাবা হতো একে। তিনি একজন নিম্নবর্গের হিন্দু, যিনি আমোদিত জনমানুষের ভাষায় কথা বলেন। দমের চর্চা এবং বিভিন্ন ভঙ্গিকে সহজ করে তুলে যে কারো সাধ্যের ভেতর এনে দিয়েছেন। তবু একে পবিত্র হিন্দু টেক্সটে ধারণ করা প্রজ্ঞার উন্নত প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করে শ্রোতাদের যোগ নিয়ে অহঙ্কার ও গর্বিত হওয়ার তাগিদ দেন। &dquote;&dquote;

যোগের প্রাচীন শিকড় সম্পর্কিত এ বয়ান হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে এক স্যাক্রামেন্টে পরিণত হয়েছে, পাশ্চাত্যেও তা অনুরণন তুলছে। তবে মূলত এটা একটা মিথ, প্রাচীনতম হিন্দু শাস্ত্র গ্রন্থ দৈহিক অঙ্গভঙ্গি সম্পর্কে বলতে গেলে কোনো উল্লেখই করেনি। এমনকি যোগের তথাকথিত বাইবেল যোগসূত্রও আসন গ্রহণের অল্প কিছু আরামদায়ক ভঙ্গির পরামর্শ দিয়েছে। আজকের দিনে অনুসরণ করা বহু যোগাসন উনিশ বা বিশ শতকের গোড়ার দিকে আবির্ভূত হয়েছে বলে মনে হয়। আধুনিক অষ্টাঙ্গ যোগভঙ্গির ভেতর কয়েক ডজনই বিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশদের পরিচয় করিয়ে দেয়া জিমন্যাস্টিক রুটিনের মতো বা হুবহু একই রকম। আদিতে ড্যানিশ ফিটনেস ইনস্ট্রাক্টর নীলস বাখ এগুলোকে উন্নত করে তুলেছিলেন। পরবর্তীতে নািসপন্থী সহানুভূতির কারণে কুখ্যাতি লাভ করেন তিনি। বলা বাহুল্য, বাখকে সুবিধাজনকভাবেই ভারতীয় এবং হলিউডের যোগপ্রেমী সেলিব্রিটিরা ভুলে গেছে।

যোগ স্রেফ রামদেবের কাজের অর্ধেক। তিনি এবং বালকৃষ্ণ তাদের টেলিভিশন সাম্রাজ্যকে ভেষজ ও খনিজ দ্রব্যের কথিত নিরাময়ী শক্তিসম্পন্ন পতঞ্জলির আয়ুর্বেদিক ওষুধ এবং খাদ্যপণ্যের গুণাগুণ প্রচারের কাজেও লাগিয়েছেন। পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরা আয়ুর্বেদকে (জীবনের বিজ্ঞান) সংশয়ের চোখে দেখে থাকেন। বিভিন্ন গবেষণায় কোনো কোনো আয়ুর্বেদিক পণ্যে সাধারণত মাটি বা ছাইয়ের মিশেলে উচ্চমাত্রার ভারী ধাতব বিষ থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু ভারতে রামদেবের বিপণন প্রয়াসের কল্যাণে এটা সম্প্রসারণশীল ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বালকৃষ্ণ আমাকে মাত্র বছর খানেক আগে মোদির উদ্বোধন করা এক ঝা-চকচকে নতুন ভবনে পতঞ্জলির মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন।

রামদেব পতঞ্জলির বর্ণাঢ্য মাসকট হয়ে থাকলে বালকৃষ্ণ তার মোড়ক; উঁচু দাঁত এবং তীক্ষ, কোমল কণ্ঠস্বরের মালিক অন্তর্মুখী একজন মানুষ। আমাকে উপরতলার একটা ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গেছেন তিনি। এখানে সাদা কোট পরা টেকনিশিয়ানরা বড়ি হিসেবে প্যাকেট করার জন্য বিপুল পরিমাণ স্যাঁতসেঁতে স্পিরুলিনা শুকাচ্ছিলেন। ‘এতে প্রচুর প্রোটিন ও ভিটামিন রয়েছে,’ ওদের একজন বললেন আমাকে। অবসর সময়ে, বললেন বালকৃষ্ণ, ঔষধি গাছের খোঁজে হিমালয়ের বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান তিনি। রিসার্চ সেন্টারের পেছনে মানুষের তৈরি বিভিন্ন গুহায় বেদের বিভিন্ন দৃশ্যকে ফুটিয়ে তোলা প্রমাণ সাইজের ভাস্কর্যসহ অনেকটা ডিজনি কায়দার ধর্মীয় থিম পার্ক লাগোয়া একটা বাগানেও কিছু গাছ বেড়ে উঠতে দেখা যায়। 

আমার কাছে একে হিন্দু হেঁশেল বলে মনে হয়েছে। কিন্তু রামদেব ও বালকৃষ্ণের বেলায় এসব ভেষজ বিদ্যা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভিনদেশী প্রতিযোগীদের বিরুদ্ধে বিপণনের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের পবিত্রতাকে গদার মতো বাগিয়ে ধরেন। পতঞ্জলির একটা বিজ্ঞাপন এ রকম: ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে ২০০ বছর ধরে আমাদের দেশে লুটপাট চালিয়েছে, ঠিক তেমনি এসব বহুজাতিক কোম্পানি তাদের ক্ষতিকর এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্য বিক্রি করে আমাদের দেশকে শোষণ করছে। সাবধান!’ রামদেবের প্রতিযোগীরা বারবার পতঞ্জলির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন, কিন্তু দোষারোপ অব্যাহত রয়ে গেছে।

 [রবার্ট এফ. ওয়ার্থ ২০১১ সালের আরব বসন্ত-সংক্রান্ত গ্রন্থ ‘আ রেজ ফর অর্ডার’-এর লেখক, বইটি ২০১৭ সালের লায়নেল গেলবার প্রাইজ লাভ করে।]