রামনাথ বিশ্বাসের অন্ধকারের আফ্রিকা গ্রন্থের একটি অধ্যায় টাংগার পথে। পাঠকদের জন্য অধ্যায়টি এখানে উপস্থাপন করা হলো—

ব্রিটিশপূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া প্রদেশটা যথাসম্ভব ভ্রমণ করে কেনিয়ারই সবচেয়ে বড় বন্দর মোম্বাসাতে এসে বিশ্রাম করছিলাম। ভ্রমণের গ্লানি দু-তিনদিনের মধ্যেই কমেছিল। পুনরায় পথের ডাক আমার হূদয়তন্ত্রীতে বেজে উঠেছিল, কিন্তু মোম্বাসা ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছিল না। মন চাইছিল আরো কয়েক দিন শহরে থেকে আমার পূর্বপরিচিত নিগ্রো সাথীটিকে খুঁজে বের করে তাকে সঙ্গে নিয়ে আবার রওনা হই। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা হতো না। শুয়ে থাকতেই ভালোবাসতাম।

সপ্তাহ অতিবাহিত হয়নি, হঠাত্ একদিন বিকালবেলা আমার পূর্বপরিচিত সাথী তারু এসে হাজির। তারু আমার সঙ্গে কেনিয়ার অনেক স্থান ভ্রমণ করেছিল। আমি তাকে কেনিয়া ভ্রমণের মধ্যপথে বিদায় দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম সে যেন আমার জন্য মোম্বাসায় অপেক্ষা করে। কেনিয়া ভ্রমণ সমাপ্ত করে মোম্বাসার কোথায় এসে থাকব, তাও তাকে বলেছিলাম। তিন মাস আগে তাকে বিদায় দিয়েছিলাম। এ তিন মাসের মধ্যেই তার শরীরে যৌবন এসে দেখা দিয়েছিল।

পেটেল সমাজের ধরমশালায় এসেই সে আমার রুমে প্রবেশ করে কাছে বসল। তারপর মুখের এমনই একটা ভঙ্গি করল, যা দেখে মনে হলো, সে আমার কাছ থেকে একটু আদর-যত্ন চায়। আমি তাকে কাছে বসিয়ে নানা কথা বলে সান্ত্বনা দিলাম। তারপর বললাম, ‘শরীর একটু ভালো হলেই এবার টাংগার (ঞধহমধ) দিকে রওনা হব।’

তারু আমার আরো একটু কাছে এসে আমার হাত-পা ভালো করে পরীক্ষা করে ক’টা ডুডু পোকা বের করে ফেলল এবং সিগারেট প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে বাইরে চলে গেল। সে যখন বাইরে যাচ্ছিল তখন তার দিকে আমি চেয়ে বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছিলাম— এবার ছেলেটার অশান্ত মন শান্ত হয়েছে। সে গিয়েছিল পাকঘরে। পাকঘরে সে আমার জন্য গরম জল করে বাথরুমে রেখে কাছে এসে বলল, ‘বানা, স্নান করে এসো, আমি কতক্ষণ পর তোমার জন্য পাক করব।’ আমি যখন স্নান করতে গিয়েছিলাম তখন আমার মানিব্যাগ বিছানার ওপরই রেখে গিয়েছিলাম। স্নান করে ফিরে এসে দেখি, তারু আমার মানিব্যাগ খুলে টাকা গুনছে। আমাকে দেখেই বলল, ‘বানা, এবার অনেক পাউন্ড তোমার কাছে আছে, এবার আরো চারটা সাথী নেব, কেমন রাজি আছ তো?’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম এবং তাকে একটি শিলিং দিয়ে বাজারে বিদায় করে দিলাম।

তারু খাবার নিয়ে এল। বেশ মোটাসোটা পুড মাছ ভাজা আর ভাত। তা-ই খেলাম। এরূপ খাবার কিন্তু আমার সহ্য হতো না, তাই ফের দুধ নিয়ে আসতে পাঠালাম। পরদিন থেকে তারু আমার গৃহকাজের সব ভারই নিয়েছিল আর আমি মুক্ত মনে নতুন পথের সন্ধান নিতে লাগলাম।

মোম্বাসা থেকে টাংগায় প্রায় ভারতবাসীই জাহাজে করে যায়। সেজন্য স্থলপথের সংবাদ কেউ বেশি রাখে না; যারা সে সংবাদ রাখে, তারা নিতান্ত দরিদ্র লোক এবং অল্পবয়সী। তাদের কাছ থেকেই সংবাদ সংগ্রহ করতে লাগলাম। একটি ছেলে আমাকে বলেছিল, অনেক মাইল যাওয়ার পর একখানা গ্রাম পাওয়া যাবে এবং সে গ্রাম থেকে দরকারি জিনিস কেনার সুবিধা হবে। এরপর পথে এমন কোনো গ্রাম পাওয়া যাবে না, যা থেকে কিছু কিনতে সক্ষম হব। এই যুবক যা বলেছিল, তার অনেকটা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। আর যারা যা কিছু বলেছিল, তা একদম বাজে কথা।

মিথ্যা কথা বলে বাহাদুরি অর্জন করা— এটা যেন একটা ফ্যাশন। আফ্রিকা সম্পর্কে আফ্রিকাতেই আমাদের লোকের কাছ থেকে এত বাজে কথা শুনেছিলাম, যা না শোনাই আমার কর্তব্য ছিল। আমি হয়তো একদম চুপ করে বসে আছি, এমন সময় একজন গণমান্য ভদ্রলোক এসে উপদেশ দেয়ার ভান করে নিগ্রোদের বিরুদ্ধে এমন কিছু বলতে আরম্ভ করলেন যে, নিগ্রোরা যেন মানুষই নয়। অথচ তারু আমার কাছেই বসে আমার সাহায্য করছে দেখতে পেয়েও তাদের মন উঠছিল না। মোম্বাসা থেকে টাংগা মাত্র ৫৮ মাইল, অথচ সেই পথটাকে কেউ ১০০, কেউ ২০০-তে পরিণত করেছিলেন।

মোম্বাসা থেকে বিদায় নিতে আমার মোট ১০ দিন লেগেছিল। এই ১০ দিন শুধু বসেই কাটিয়ে ছিলাম। বিদায় নেয়ার দুদিন আগে একজন যুবক আমার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে এবং সে আমার সঙ্গে যাবে বলে বেশ লম্ফঝম্প করে। কিন্তু যেদিন আমি শহর ছেড়ে চলে যাই, সেদিন কোথায় ডুব দিয়েছিল, তার সন্ধান করে উঠতে পারিনি।

আমার প্রচলিত নিয়মমতে ঘুম থেকে খুব সকালে উঠলাম। দরকারি জিনিস সাইকেলের পেছনে বাঁধলাম। তারপর তারু এবং তার সাথী তিনজনকে পেছনে রেখে রওনা হলাম। আমাদের পথ সমুদ্রতীর দিয়ে গেছে। সমুদ্রতীর আমাদের দেশের মতো নয়। হঠাত্ যেন একখণ্ড ভূমি সমুদ্র ভেদ করে উঠেই আকাশ ছুঁতে চলেছে। এতে আমাদের অসুবিধা মোটেই হলো না। সমুদ্রের বাতাস এসে আমাদের শরীর শীতল করতে লাগল। এদিকটা ভয়ানক গরম, সমুদ্রের বাতাস না পেলেও চলতাম নিশ্চয়ই। তবে অসুবিধা হতো খুব বেশি। আমরা যে পথে চলছিলাম, তাকে মোটরপথ বলা যেতে পারে না। কারণ অনেক স্থানেই পথ ভাঙা এবং বড় বড় পাথর পাহাড়ের গা থেকে খসে পথের ওপর পড়ে ছিল। মাইল দুই চলার পর আর সাইকেলে বসতে পারলাম না। পায়ে হেঁটেই চলতে লাগলাম। ঠিক করেছিলাম, সকালে ৩ ঘণ্টা আর বিকালে ৩ ঘণ্টা চলে যতটুকু পথ চলা যায় ততটুকুই চলব। সুখের বিষয়, প্রথম দিনই সন্ধ্যার সময় আমরা একটি নিগ্রো গ্রামে পৌঁছেছিলাম।

নিগ্রো গ্রাম যদিও ছোট, তবু তাতে লোক ছিল। লোক শিক্ষিত এবং সভ্য। মামুলি একটি খাবারের দোকান ছিল। খাবারের দোকানে ভারতীয় ধরনে মুরগির তরকারি আর ভাত বিক্রি হচ্ছিল। থাকারও ছোট ছোট ঘর ছিল। আমরা সবাই একখানা ঘরই ভাড়া করে ফেললাম। তারু তাদের জন্য মিলি-মিলি সিদ্ধ করে নিয়েছিল। মুরগির তরকারিও তারা একটু একটু খেয়েছিল। নিকটস্থ নালায় স্নান করে এসে আমি নিগ্রো চা খেয়ে বিশ্রাম করতে বসলাম এবং ম্যাপখানা ভালো করে দেখে নিয়ে পায়চারি করতে লাগলাম। এত পরিশ্রম করার পরও তারু এবং তার সাথীরা এক প্রৌঢ় স্ত্রীলোকের সঙ্গে নানা কথা বলে বেশ আমোদ করছিল। শুধু তারাই আমোদ করছিল তা নয়, অন্য যারা গ্রামের খাবারের দোকানে উপস্থিত ছিল, তারাও নানা কথা বলে বেশ আনন্দ উপভোগ করছিল। এখানে দুটি সভ্যতার সংমিশ্রণ হয়েছে দেখতে পেলাম— আরব সভ্যতা ও ইউরোপীয় সভ্যতা। আরব সভ্যতা মতে স্ত্রীলোককে কোণঠাসা করা আর ইউরোপীয় সভ্যতা মতে স্ত্রীলোকদের ক্ষমতা দেয়া। এখানে স্ত্রীলোকরা কোণঠাসা হয়নি, তবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। স্ত্রীলোকের স্বাধীনতা আছে। তবে পুরুষের একসঙ্গে নয়, পৃথকভাবে।

এ অঞ্চলের লোকের ভাষা সোহেলি। সোহেলি ভাষায় এতই আরবি শব্দ রয়েছে যে, যারা আরবি ভাষা অবগত আছে, তারা অতিসহজে সোহেলি ভাষা বুঝতে পারে। সোহেলি ভাষা সর্বত্র সমানভাবে প্রচলিত নয়। কোথাও নিগ্রো শব্দ কম কোথাও নিগ্রো শব্দ বেশি, এই যা পার্থক্য। বাস্তুদের কাছে শুনেছিলাম, বর্তমানে সোহেলি ভাষার রকম বদলে গেছে। নতুন ছাঁচে ভাষার গড়ন হচ্ছে। দৈনন্দিন কাজ চলার জন্য যেসব শব্দের দরকার, সে শব্দগুলো সোহেলি ভাষাতেই রয়েছে। সেই শব্দগুলোকেই শিক্ষিত নিগ্রোরা তাদের নিজের ভাষায় ব্যবহার করছে। এ বিষয়ে পুরাতন মতাবলম্বীরা অনেকেই বাদ সাধছে কিন্তু আফ্রিকার পুরাতন অন্য ধরনের। বেঁচে থাকার অধিকার তাদের নেই। এতে কাজের অনেক সুবিধা হয়েছে।

সোহেলি ভাষার একটি বাহদুরি আছে, সেই বাহাদুরিটা হলো, কেপ টাউন থেকে কায়রো পর্যন্ত গ্রাম্য ভাষার ধাতু একই ধরনের। বিদেশী ভাষা নিগ্রোদের শুধু বিচ্ছিন্ন করেছে। আফ্রিকায় মিশনারিরা সেই বিচ্ছিন্ন অংশটাকেই ‘ভাষায় অনেক প্রভেদ’ দেখিয়ে দিয়ে অনেক ছোটখাটো ভাষার সৃষ্টি করেছেন।

তাদের এ বাহাদুরি কিন্তু চলবে না। কারণ বর্তমান সময়ের নিগ্রোরা পৃথক হয়ে প্রাদেশিকতা করতে রাজি নয়। চাকরির মোহ তাদের অতি অল্পই দেখতে পাওয়া যায়। চাকরির মোহই প্রভেদের মূল কারণ।

রাতে শোয়ার সময় আমি মশারি খাটালাম। তারু এবং তার সাথী তিনজন বাইরেই শুয়ে থাকল। আমি ভাবছিলাম গভীর রাত্রে হয়তো বন্য জীব এসে উত্পাত করবে। কিন্তু এদিকে বন্য জীবের কোনো উপদ্রব নেই। অথচ আমাদের দেশের লোক অনেকেই বলেছিলেন, এদিকে এত বন্য জীব রয়েছে যে, দিনের বেলায়ই সিংহ মানুষকে আক্রমণ করে। নেকড়ে বাঘ এদিকে অনেক দেখতে পাওয়া যায়। এসব নেকড়ে মানুষকে বেশ ভয় করে। ঘুম থেকে উঠে মনে পড়ল বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রথম ভাগের কথা। তিনি এক স্থানে লিখেছিলেন, ‘যত কয় তত নয়।’

আনুমানিক ১৫ মাইল পথ আগের দিন আমরা চলেছিলাম। আজ যাতে কুড়ি মাইল পথ চলতে পারি সেজন্য সকালবেলায়ই কিছু পাক করে নিয়ে পথে বের হলাম। এদিকের পথটা যেন একটু ভালো বলেই মনে হতে লাগল। একসঙ্গে পাঁচ-ছয় মাইল পথ চলে আমি পথের কাছে বিশ্রাম করতাম, তারপর তারু এবং তার সাথীরা অনেকক্ষণ পর যখন আসত তখন তারাও কতক্ষণ বিশ্রাম করত, তারপর আবার আমরা পথে বের হতাম। এমনি করে আমরা বিকাল ৪টা পর্যন্ত পথ চলে একটা শুষ্ক নদীতীরে রাত কাটানোর জন্য মশারি খাটালাম।

নদী সর্বত্র শুকিয়ে যায়নি। আমরা যে স্থানে মশারি খাটিয়ে ছিলাম, তার অল্প দূরে জল আটকে রয়েছিল। জল বড়ই পরিষ্কার ও ঠাণ্ডা। শীতল জলে স্নান করে নেয়ার পর তারু একটা প্রকাণ্ড হাঁড়িতে ভাত বসাল। ভাত হয়ে গেলে নুন ও সামান্য তরকারির সংযোগে খাওয়া হলো। খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম করেই আমি নিকটস্থ জঙ্গল দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। জঙ্গল মারাত্মক ছিল না। এরূপ জঙ্গল আমাদের দেশেও অনেক আছে। সন্ধ্যার আগে তারু আমাকে জানিয়ে দিল, এ নদীটাই হলো কেনিয়ার সীমান্ত। একটু রাত থাকতে এখান থেকে উঠে জংলি পথ ধরে যেতে হবে নতুবা পথের পাশের কাস্টম অফিসার তাদের ধরবে এবং হয়তো ট্যাক্সও আদায় করতে পারে। এরূপ ঝঞ্ঝাট এড়ানোর জন্যই জংলি পথ ধরতে হবে। আমি তাকে সম্মতি জানিয়ে মশারির ভেতর গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

রাত বোধ হয় ১০টা হবে। হঠাত্ আকাশ মেঘে ভর্তি হয়ে গেল। একটু একটু বাতাসও বইতে আরম্ব করল। তারু উঠে বসল এবং মশারিটা উঠিয়ে বেঁধে ফেলল। আমাদের সব জিনিস যখন বাঁধা হয়ে গেল তখন প্রবল বেগে বৃষ্টি আরম্ভ হলো। আমরা নদীতীরে মশারি খাটায়নি, নদীর মধ্যেই মশারি খাটিয়েছিলাম। দেখতে দেখতে নদীতে জল বইতে আরম্ভ করল। জল গভীর হলো। জলে নানা বৃক্ষশাখা ভেসে চলতে লাগল। তারপর আর বৃক্ষশাখা নয়, মোটা মোটা গাছই ভেসে যেতে লাগল। গাছে নানা জাতীয় বন্য জীব আশ্রয় নিয়েছিল। তারাও ভেসে যেতে লাগল। তার মাঝে নানা জাতীয় সাপই বেশি। রাত অন্ধকার ছিল না বলেই এসব আমাদের দেখার সুবিধা হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে টিপ বাতি থাকায় দূরের জিনিস দেখার পক্ষে আরো সুবিধা হয়েছিল।

অনেকক্ষণ সেই দৃশ্য দেখে আমরা পথ ধরলাম এবং বন্য পথে চলে সকালবেলায়ই টাংগা নামক শহরে এসে একটি ধরমশালার বারান্দায় আশ্রয় নিলাম। তখনো লোক বেশ আরাম করে ঘুমাচ্ছিল। আমার ইচ্ছা ছিল না কাউকে এ সময়ে ডেকে তুলি। তারুর বন্ধুরা ধরমশালার বারান্দায় আমাদের বসিয়ে রেখেই গ্রামের দিকে চলে গিয়েছিল এবং বলে গিয়েছিল বিকালবেলা এসে দেখা করবে। সকালবেলায় যখন অনেকেরই ঘুম ভাঙল তখন আমি ধরমশালার সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করলাম এবং থাকার বন্দোবস্তও করলাম। সেক্রেটারি মহাশয় আমাকে একখানা রুম ছেড়ে দিলেন। আমি রুমখানা পরিষ্কার করিয়ে শোয়ার বন্দোবস্ত করেই শহরটা বেড়াতে বেরোলাম। শহরে বেশিক্ষণ থাকলাম না। কারণ তখনো যেন ঘুমে চোখ ভেঙে আসছিল।

ধরমশালায় গিয়েই বিছানা পেতে শুয়ে পড়লাম। কোনো কিছু ভাবার পূর্বেই গাঢ় নিদ্রা আমাকে আলিঙ্গন করল। বিকালবেলা যখন ঘুম ভাঙল তখন কয়েকজন স্বদেশবাসী আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘নিগ্রোও কি তোমার সঙ্গ নিয়েছে?’ আমি তাদের বললাম, ‘নিগ্রোরা আমার সঙ্গ নেয়নি, আমি তাদের আমার সঙ্গে এনেছি।’ নিগ্রোদের সঙ্গে নেয়াটা যে মহাখারাপ কাজ, সে কথাটাই তারা আমাকে ভালো করে বোঝাতে চেষ্টা করল। আমি কারো কথায় জবাব না দিয়ে নিগ্রো পাড়ায় গিয়ে তারু এবং তার তিন বন্ধুকে খুঁজতে লাগলাম। এদের খুঁজে বের করতে না পেরে নিকটস্থ হোটেলে গিয়ে খেয়ে ফের ধরমশালায় এসে এদের অপেক্ষায় বসে থাকলাম।

সন্ধ্যা হয় হয়। তখনো পথে ঘাটে বিজলি বাতি জ্বলে ওঠেনি। তখন তারু অতিসন্তর্পণে আমার কাছে এসে বসল এবং আমার নিজের রুমে যেতে বলল। দিনটা ছিল ভয়ানক গরম, বাইরে বসে থাকতেই ইচ্ছা হচ্ছিল। তাকে অভয় দিয়ে বললাম, ‘এখানে তোমার ভয়ের কোনো কারণ নেই, বলো তো তোমার কী হয়েছে?’ তারু বলল, ‘এ যে বিদেশ বানা, এখানকার পুলিশ আমাদের পরিচয় পেলেই পোলট্যাক্স চার্জ করবে।’ নিগ্রোদের মাথাপিছু ১০ শিলিং করে পোলট্যাক্স দিতে হয় প্রত্যেক বছর। যাদের বাড়িঘর আছে তাদের প্রত্যেক ঘরের জন্যও ১০ শিলিং করে দিতে হয়, যদি সেই ঘর কোনো মিউনিসিপ্যালিটির অন্তর্গত থাকে। আমি তারুর হাতে দুই পাউন্ড দিয়ে বললাম, ‘এখন আর ভয় নাই তো?’ তারু দুই পাউন্ড পেয়ে এক দৌড়ে তার বন্ধুদের ডেকে নিয়ে এল। তারা প্রত্যেকেই বুঝল, এখন আর তাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমিও অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম।

সেদিন আর কোথাও গেলাম না। তারু আমার জন্য ধরমশালাতেই পাক করল এবং আমার রুমেতেই তারা শুয়ে থাকল। আমার শরীরে বেশ ব্যথা হয়ে ছিল, তাই গরম জল দিয়ে স্নান করে আমি শুয়েছিলাম। রাত তখন বোধ হয় ২টা হবে। দুজন ভারতবাসী আমাকে ডেকে তুলে বললেন, যদি আমি নিগ্রো সঙ্গ পরিত্যাগ না করি, তবে যেন সকাল হওয়ার আগেই ধরমশালা ত্যাগ করি। অর্থাত্ এখনই যেন বেরিয়ে যাই। আমি সে আদেশের প্রতীক্ষায় ছিলাম। গভীর রাতেই আমি একটি আম্রবৃক্ষের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করলাম। রাত কাটল বেশ ভালোই।

আমি তখনো গভীর নিদ্রায় মগ্ন ছিলাম। সূর্যালোক গাছের পাতা ভেদ করে আমার মুখের ওপর পড়ছিল দেখে তারু একখানা কাপড় আমার চোখে বিছিয়ে দিয়েছিল। চারদিকে মাছি ভন ভন করছিল দেখে অন্য তিনজন লোক গাছের ছোট ডাল দিয়ে মাছিগুলোকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল। এ দৃশ্যটা অনেকের চোখেই পড়ছিল। দুজন গ্রিক এসে আমার কাছে দাঁড়ালে তারু তাদের কাছে গতরাতের কথা বলল। গ্রিকরা হেসে বলল, ‘এক ঘৃণিত অন্য ঘৃণিতকে ঘৃণা করে।’ এবং সে কথাটা বারবার যখন ইন্ডিয়ানদের সামনেই গ্রিকরা বলল, তখন একজন স্কুলমাস্টার আমাকে জাগিয়ে ধরমশালায় যেতে বললেন। আমি গত রাত্রের কথা তাকে বলায় তিনি আমার হাত ধরে একরূপ টেনেই ধরমশালায় নিয়ে গেলেন। ধরমশালায় গিয়ে আমি ফের ঘুমিয়ে পড়লাম। তারু পাক বসাল, অন্য তিনজন আমার কাপড় পরিষ্কার করতে লাগল।

সেদিনই বেলা ২টার সময় একটি বিদ্যালয়ে লেকচার দিলাম। বিদ্যালয়ে শুধু ভারতবাসীরাই প্রবেশ করতে পারত। ইউরোপীয়রা ঘৃণা করে সেই বিদ্যালয়ে যেত না। আর নিগ্রোদের বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হতো না। শিক্ষক মহাশয়কে আমি সবিনয়ে বললাম, ‘যেসব নিগ্রো ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদেরও বসতে দেয়া হোক।’ শিক্ষক মহাশয় আমার কথায় রাজি হলেন এবং নিগ্রোদের বসতে বললেন। হিন্দুস্তানিতেই আমার বক্তব্য বিষয় বলেছিলাম। দেখলাম অনেক নিগ্রো হিন্দুস্তানি বেশ বোঝে। লেকচারের শেষে একজন নিগ্রোকে ডেকে এনে আমার কাছে দাঁড় করালাম। এবং বললাম, ‘আমি যা বলেছি তা-ই তুমি সোহেলিতে তোমার জাত ভাইদের কাছে বলে ফেলো।’ এতে লোকটি রাজি হলো এবং আমি যা বলেছিলাম তা-ই প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী বলল। তার দোভাষীর কাজ দেখে আমার বেশ আনন্দ হয়েছিল। লেকচার দেয়া হয়ে গেলে আমার মজুরি গ্রহণ করলাম এবং ফের ধরমশালায় চলে এলাম।

সেদিনই বিকালবেলা একজন ভাটিয়ার সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়।

ভাটিয়া মহাশয় অনেক দিন কলকাতায় ছিলেন এবং তার প্রথম পক্ষের স্ত্রীও বাঙালি থাকায় তার সহূদয়তা আমার প্রতি আপনি এসে পড়েছিল। তিনি বাংলা বেশ ভালোই জানতেন এবং আফ্রিকায় গিয়েও সাপ্তাহিক হিতবাদীর গ্রাহক ছিলেন। তিনি কয়েক সংখ্যা হিতবাদী আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। এতে আমার ভ্রমণ কাহিনীর সমালোচনা ছিল।

ভাটিয়া ভদ্রলোক কচ্ছের অধিবাসী। ঐতিহাসিক সংবাদ ও স্থানীয় সংবাদ তার কাছ থেকে প্রচুর পেয়েছিলাম। পাঁচশ বছর আগেও যে এদিকে ভারতবাসীর চলাচল ছিল, তার অনেক নিদর্শনও আমাকে দেখিয়েছিলেন। গোয়ার ভারতবাসীরা কোনো এক সময়ে পর্তুগিজ অধিকারের আফ্রিকা দখল করে বসেছিল, তাও তারই কাছ থেকে শুনেছিলাম। ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে আমি বেশি মাথা ঘামাই না দেখে ভাটিয়া ভদ্রলোক একটু দুঃখিত হলেন বটে; কিন্তু যখন তিনি শুনলেন, আমি নিগ্রো ও ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করতে পক্ষপাতী, তখন তার আর আনন্দের সীমা রইল না। পরের দিন তার বাড়িতে আমাকে খাবার নিমন্ত্রণ করে আপ্যায়িত করলেন। সেদিন সন্ধ্যার পূর্বে সমুদ্রতীরে বেড়াতে যাই। যেদিকে নিগ্রোরা থাকে, সেদিকে চলেছি দেখে সঙ্গের ভারতীয়রা আমার সঙ্গ পরিত্যাগ করল। আমি আমার নিগ্রো সাথীদের সঙ্গে নিয়ে সেদিকেই চললাম। পথের দুদিকে সারি দিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘর। নিগ্রো জেলেরাই সেখানে থাকে। আমরা যখন চলছিলাম তখন আমাদের ডান দিকে একটি নিগ্রো ‘উদয়-শংকরী’ নৃত্য করছিল। আমাকে দেখেই লোকটা আমার কাছে দৌড়ে এসে বলল, ‘তুমি এদিকে কেন? তুমি যাবে সেদিকে, যেদিকে ইউরোপীয়রা তোমাদের পদাঘাত করে, এদিকের সাগরজলে ভয়ানক লবণ, সাগরতীর দুর্গন্ধযুক্ত, এদিকে এসো না, তোমাদের এতে ক্ষতি হবে।’ আমার সাথীদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এগুলো বোধ হয় তোমার কেনা গোলাম, নিশ্চয়ই কেনা গোলাম।’ এই বলেই লোকটা ফের নাচতে লাগল। তারু আমাকে বলল, ‘বানা, লোকটা পুলিশের চোখে ধুলো দিচ্ছে। এখানে ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে কথা বলে নিগ্রোদের খেপিয়ে তোলাই এর কাজ। এর কাছ থেকে দূরে থাকাই তোমার উচিত।’ কথা না বাড়িয়ে সাগরতীরের দিকে এগিয়ে গিয়ে জলের কাছে বসে সূর্যের শেষ কিরণটুকু সাগরজলে কেমন করে প্রতিবিম্বিত হয়, তা-ই দেখে ফের ধরমশালায় ফিরে এলাম।

রাত্রে কয়েকজন বিশিষ্ট লোক আমার সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে এলেন। তারা এসেছিলেন আমাকে উপদেশ দিতে। নীলপদ্মের জন্মভূমি কুলমানজার অর্থাত্ মান্দার পর্বত দেখতে আমাকে অনুরোধ করলেন। কুলমানজার পর্যন্ত একটা রেলপথ এখান থেকে চলে গেছে। চিন্তা করে দেখলাম, স্থানটা দেখলে মন্দ হবে না; হয়তো ভালোই হতে পারে। তাই স্থানীয় লোকের উপদেশমতো শুধু তারুকে নিয়ে কুলমানজারের দিকে চতুর্থ দিন রওনা হই। এদিকে নিগ্রোদের জন্য তৃতীয় শ্রেণীর এক প্রকার কম্পার্টমেন্ট থাকে, যাতে বসার জন্য শুধু চাটাই বিছিয়ে দেয়া হয়। আমাদের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণীর কম্পার্টমেন্ট থাকে। সেই কম্পার্টমেন্টে ইউরোপীয়রা ভুলেও আসে না। আমি তারুকে নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর কম্পার্টমেন্টেই উঠলাম। তার জন্যও দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিটই কিনেছিলাম।

গাড়িতে ওঠার পর তারুকে নিয়ে মহাবিপদে পড়লাম। ভারতীয় চেকার তারুকে কোনোমতেই দ্বিতীয় শ্রেণীতে বসতে দেবে না। শেষটায় আমিও স্বরূপ ধরলাম। ‘তোমার আইন তোমার কাছে রাখো, নতুবা মেরে হাড় ভেঙে দেব’— যখন বললাম তখন লোকটার চৈতন্য হলো। চেকার আমাকে কংগ্রেসী বলে গালি দিয়ে গাড়ি ত্যাগ করল।

ঠিক সন্ধ্যার সময় গাড়ি সিসেল বাগিচার ভেতর দিয়ে কুলমানজার স্টেশনে গিয়ে পৌঁছল। তখন বৃষ্টি পড়ছিল প্রবল বেগে। তারু আমাকে স্টেশনে বসিয়ে স্থানীয় ধরমশালায় গিয়ে স্থান করে এল। আমি যথাসময়ে পৌঁছে ধরমশালায় উপস্থিত হলাম। তারু আমার সুখ-সুবিধার ত্রুটি করল না। পরের দিন সকালবেলা আমরা গ্রামে বেড়াতে বের হলাম। গ্রামে প্রায় দোকানদারই ভারতীয় আগাখানি মুসলমান। তারা হিন্দুদের মতোই নানা অন্ধ ধারণা পোষণ করে, সেজন্যই অনেকে নীলপদ্ম সম্পর্কে নানা গল্প বলতে লাগল। কেউ বলে, পাহাড়ের ওপর থেকে নীলপদ্ম বাতাসে ছিঁড়ে নিয়ে আসে। আর কেউ বলে, নীলপদ্ম কুলমানজার পর্বতের উপরে একটি সরোবরে জন্মে; যারা পুণ্যাত্মা তারাই নীলপদ্ম দেখতে পায়, অন্য কেউ দেখতে পায় না। আমি নীলপদ্ম দেখার আর চেষ্টা করলাম না।

এখানকার প্রায় লোকই সামনের দাঁতগুলোকে বিড়ালের দাঁতের মতো ধারালো করে। এদের দাঁত দেখেই অনেকে রামায়ণ সৃষ্টি করে ফেলে। সংবাদ নিয়ে জানলাম, এটা এদের একটা ফ্যাশন মাত্র। এখানকার লোক নরমাংস কখনো খেয়েছে বলে আজ পর্যন্ত কেউ শোনেনি।

ক্রমাগত বৃষ্টি হওয়ার জন্য পাহাড়ে ওঠা অসম্ভব হয়েছিল। সাড়ে সাত হাজার ফুট একদম খাড়া পাহাড়টি ওঠা বড় সোজা কথা নয়। পাহাড়ের অগ্রভাগ তখনো বরফে ঢাকা ছিল। অথচ পাহাড়ের নিচে অনবরত ট্রপিক্যাল বৃষ্টি হচ্ছিল। জন কয়েক জার্মান সিসেল ক্ষেত্রের মালিকের সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়। তারাও ব্রিটিশ প্রথামতে ভারতবাসীকে কেরানি, অ্যাকাউন্ট্যান্ট এসব কাজে নিযুক্ত করেই সুখী রাখে, মন খুলে কথা বলতেও ঘৃণা বোধ করে। তাই যে কয়জন জার্মানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তারা নীলপদ্মের কথা আমার কাছে বলা দূরে থাক, তাদের বাংলো থেকে যাতে আমি চলে যাই, সেজন্য সামান্য দু-এক কথা বলেই বিদায় দিয়েছিল। লজ্জায় ও ঘৃণায় আমার মন এত দুর্বল হয়েছিল যে, নীলপদ্মের কথা ভুলে গিয়ে ফেরত গাড়িতে সেদিনই টাংগায় ফিরে এসেছিলাম। তবে নীলপদ্ম বলে এক রকমের পদ্ম আছে— এ কথা অতি সত্য। টাংগানিয়াকায় যখন ভ্রমণ করছিলাম তখন কয়েকজন গরিব জার্মান এবং একজন জার্মান ডাক্তার আমাকে নীলপদ্ম দেখিয়েছিলেন। পদ্মগুলোর পাপড়ি গাঢ় নীল এবং সহজে শুকিয়ে যায় না। ১০০ শিলিংয়ে তারা একটি পদ্ম বিক্রি করতে রাজি হয়েছিলেন। আমি কিন্তু ৬৫ টাকা সেজন্য খরচ করতে রাজি ছিলাম না।