বাঙালি জাতি ও ভাষার ইতিহাসে আগমনের ঘটনা খ্রিস্টীয় দশম শতকের পরবর্তী ঘটনা। কিন্তু মানুষের ইতিহাস তো আরো বহু হাজার বছরের পুরনো। তাহলে খ্রিস্টীয় দশম শতকের আগে বাঙালির বর্তমান ভূখণ্ড কি অস্তিত্বমান ছিল না? ছিল তো বটেই। এমনকি মহাভারতে বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে রচিত কালিদাসের রঘুবংশেও বঙ্গের নাম পাওয়া যায়। ‘কালিদাসের রঘুবংশে বঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রঘুর বিজয়াভিযান বর্ণনার সময় উল্লেখ করা হয় যে, সুহ্মদের পরাজিত করার পর নৌ-বিদ্যায় (নৌসাধনোদ্ধতান্) বিশেষ পারদর্শী বঙ্গীয়দেরকেও তিনি পরাজিত করেন। তিনি গঙ্গার দুই মোহনার অন্তর্বর্তী (গঙ্গাস্রোতোন্তরেষু) বদ্বীপে বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেন। এটি সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, গঙ্গার দুই প্রধান স্রোতধারা ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী ত্রিভুজাকৃতির ভূখণ্ডটিই বঙ্গ।’ (বাংলাপিডিয়া) অর্থশাস্ত্রের লেখক কৌটিল্যের রচনায়ও বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায় একটি ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে। কৌটিল্য বঙ্গে উন্নত মানের সুতিবস্ত্র উৎপাদিত হতো বলে অর্থশাস্ত্রে লিপিবদ্ধ করেছেন।
জৈন ও বৌদ্ধ সাহিত্যেও প্রাচীনকালে বঙ্গ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে প্রথম খ্রিস্টাব্দ কালে লিখিত জৈন উপাঙ্গ পন্যবণা (প্রজ্ঞাপনা)-তে কিছুটা বিস্তৃতভাবে বঙ্গ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে তাম্রলিপ্তিকে (তমলুক, মেদিনীপুর জেলা) বঙ্গের অন্তর্গত হিসেবে দেখানো হয়েছে। মহাবংশ-এর কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, অশোকের সময়ে তমলিতি থেকে সিংহলে বোধিবৃক্ষ পাঠানো হয়েছিল। এই কিংবদন্তি সত্য হলে বন্দর হিসেবে তাম্রলিপ্তির অস্তিত্ব মৌর্য যুগ থেকেই ছিল বলে মেনে নিতে হয়। সুতরাং এটি অসম্ভব নয় যে, আদি ঐতিহাসিক যুগে ভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী কিছু এলাকা বঙ্গের অন্তর্গত ছিল। অবশ্য গুপ্তপরবর্তী যুগে বর্তমান পশ্চিম বাংলার ভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে গৌড় ও রাঢ়-এর জনপ্রিয়তার কাছে বঙ্গ তার গুরুত্ব হারায়। দন্ডীর দশকুমারচরিত-এ দামলিপ্তকে (তাম্রলিপ্তির রূপভেদ) সুহ্ম-এর একটি নগর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।’ (উইকিপিডিয়া)
বাংলা— তা সে জাতি, ভাষা বা ভূখণ্ডের নাম হোক না কেন, তুর্কিদের আগমনের আগে প্রচলিত ছিল না। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের দক্ষিণ ভাগকে নির্দেশ করতে ত্রয়োদশ শতকে আরবি ও ফার্সি ভাষার লেখকরা ‘বাঙ্গালা’ শব্দটির ব্যবহার শুরু করেন। ভারতবর্ষের এই দক্ষিণ অংশটিকে নির্দেশ করতে প্রাচীন সাহিত্যে বিভিন্ন নামের ব্যবহার দেখা যায়— গৌড়, বঙ্গ, সমতট। বঙ্গ বলতে বোঝাত গাঙ্গেয় বদ্বীপের পূর্বাংশকে, যার কেন্দ্র বিক্রমপুর বা ঢাকা। একসময় গৌড় ও বঙ্গকে একসঙ্গে উচ্চারণ করা হতো। কিন্তু বাংলা নামটি এভাবে উত্পন্ন হয়নি। ত্রয়োদশ শতকে দিল্লি সালতানাতের ফার্সিভাষী দিনলিপিকাররা এ অঞ্চলকে ‘লাখনৌতি রাজত্ব’ নামে উল্লেখ করতেন, গৌড়ের প্রধান নগরের নাম ছিল লাখনৌতি। বাংলার উল্লেখ নিয়ে একটি কৌতূহলোদ্দীপক নিদর্শন দেখা যায় দক্ষিণ ভারতে। দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জোরে বৃহদেশ্বর মন্দিরে চোলা আমলের একটি খোদাই ফলকে ‘বাঙ্গালাম’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এভাবে বাংলার উল্লেখ সম্ভবত এটাই প্রথম। এ অঞ্চলে আসা প্রাথমিক কালের পর্তুগিজ বণিকরা ‘বেঙ্গালা’ নামের যে উল্লেখ করতেন, সেটা দিয়ে তারা মূলত চট্টগ্রামকে বোঝাতেন। ১২৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লিখিত হয়েছিল তবাকত-ই-নাসিরি। এতে বঙ্গদেশের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে লাখনাওতি, বিহার ও কামরূপের, কারণ এ স্থানগুলো মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। ১২৯৮ সালে মার্কো পোলো বাঙ্গলাকে দক্ষিণের একটি প্রদেশ বলে উল্লেখ করেছিলেন। উত্তর আফ্রিকার আরব পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৫ সালে বাঙ্গলা সফর করে লিখেছিলেন, ‘এটা ধানে সমৃদ্ধ একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল, ৪৩ দিন সাগর যাত্রা করে সেখানে পৌঁছানো যায়। দুনিয়াতে পণ্যের দাম এত সস্তা আমি আর কোথাও দেখিনি। তবে অঞ্চলটি কেমন আর্দ্রতা, কুয়াশায় আচ্ছন্ন। খুরসান থেকে আগতরা একে ভালো জিনিসে পূর্ণ নরক বলে আখ্যায়িত করেন।’
১৫১৬ সালে বারবোসা বাঙ্গালা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, যার ‘অনেক সমুদ্রবন্দর আছে, যেখানে রাজা মুসলিম। এখানে প্রচুর বাণিজ্য হয়, নৌ-বাণিজ্যও প্রচুর।’ আইন-ই-আকবরিতে আবুল ফজল বাংলা নামের উদ্ভব নিয়ে একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় জানিয়েছেন, “বাঙ্গলার মূল নাম ছিল বাঙ, এর সঙ্গে ‘আল’ প্রত্যয়টি যুক্ত হয়, কারণ এখানকার প্রাচীন রাজারা পাহাড়ের ঢালে নিম্নভূমিতে ১০ ফুট উঁচু ও ২০ ফুট প্রস্থ করে মাটি জমা করতেন, যাকে তারা ‘আল’ বলতেন। বাঙ-এর সঙ্গে এই ‘আল’ যুক্ত হয়ে বাঙাল সৃষ্টি হয়।”
লব্ধ ঐতিহাসিক দলিল থেকে বলা যায়, মূলবঙ্গ নামটি পূর্ব বাংলাকেই বোঝাত। ত্রয়োদশ শতকে তুর্কি-আফগান আক্রমণের আগে বাংলার পশ্চিম অংশকে গৌড় বলা হতো। সে সময় গৌড় ও বঙ্গ একসঙ্গে উচ্চারিত হতো। উনিশ শতক পর্যন্ত এ রীতি প্রচলিত ছিল। ত্রয়োদশ শতক থেকে আরব ও পারসীয় দিনলিপিকরদের কলমে ব্যবহূত বাঙ্গালা বা ভাঙ্গলা নামটি ধীরে ধীরে একসময়বাংলা হয়ে যায়। ধীরে ধীরে বিহার থেকে কামরূপ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলটি ‘বাংলা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে, ‘?বঙ্গ বাংলার একটি সুপ্রাচীন মানব-বসতির স্থান বা জনপদ, যা চৌদ্দ শতকে মুসলমান শাসনামলে পরিবর্তিত রূপে বাঙ্গালাহ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।’ চৈনিক গ্রন্থ Wei-lueh (খ্রি. তিন শতক)-তে বঙ্গ (Pan-yueh)-কে Han-yueh (Xan-gywat) বা গঙ্গার একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পর্তুগিজরা ‘বাঙ্গালা’ নামটি গ্রহণ করে। ইউরোপীয় অন্যান্য বণিকও বাঙ্গালা নামটি ব্যবহার করে এবং এভাবে ‘বেঙ্গল’ নামটি প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। এ নাম থেকেই বাংলার দক্ষিণে সাগরের নাম হয় বে অব বেঙ্গল।
এত গেল বাংলার নামকরণ নিয়ে আলাপ। এবার যাওয়া যাক বাঙালি জাতির শারীরিক গঠন বিষয়ে। নৃতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্বের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে এটা দাবি করতে যে, বাঙালিরা বিভিন্ন জাতির উপাদানে তৈরি একটি সমষ্টি। বিগত এক হাজার বছরে নানা জাতির মিশ্রণে বাঙালি জাতি তার নিজস্ব শরীর গড়ে তুলেছে। বাংলা ভাষা, উর্বর নদীমাতৃক ভূমিতে তৈরি হওয়া জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া এবং একটি সাধারণ ইতিহাস বাঙালি জাতি তৈরির উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।
বাঙালি জাতির গঠনে চারটি জাতিগত উপাদান দেখা যায়— এ বাংলার আদি অধিবাসীরা হচ্ছেন অস্ট্রিক, যারা আর্যদের আগমনের আগে থেকেই এখানে বাস করছেন। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আর্যদের আগমন ঘটে ২০০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। সেই অস্ট্রিকদের নিদর্শন হিসেবে আজো বাংলায় টিকে আছেন শবর, ডোম, চণ্ডাল, কোল, হাদিরা। আরো তিনটি জাতির অবদান রয়েছে বাঙালি জাতি গঠনে।
বাংলা বদ্বীপের উদ্ভব হয়েছে পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে আসা অসংখ্য নদীর মাধ্যমে, যেগুলো পলি বহন করে সাগরে নিয়ে যেত। এ প্রক্রিয়া কয়েক সহস্রাব্দ ধরে চলেছে, ধীরে ধীরে এ ব-দ্বীপ সাগরে মাথা তুলতে থাকে। একই সঙ্গে চলে তার দক্ষিণমুখী যাত্রা, যা এখনো অব্যাহত আছে। চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা বাংলা ‘প্রাচুর্যে ভরা’ বলে উল্লেখ করেছেন। ষোড়শ শতকে ওলন্দাজ বণিক ফন লেন্ডেন বাংলাকে ‘পুবের শস্যভাণ্ডার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বাংলাকে আক্ষরিক অর্থে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সন্তান হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। গঙ্গা রাজকীয় বেশে সেই হিমালয় থেকে উত্তর ভারত হয়ে আসে, পথিমধ্যে যমুনা ও অন্যান্য শাখা থেকে আরো পানি সংগ্রহ করে। বাংলায় প্রবেশ করে এ গঙ্গা প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং আরো অসংখ্য শাখা-প্রশাখা তৈরি করে। এসব নদ-নদী তাদের যাত্রা শেষ করে বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের (ব্রহ্মার ছেলে) জন্ম তিব্বতের দক্ষিণে। সাংপো নামে ৭০০ মাইল সফর করে এ নদ হিমালয়ের এক সংকীর্ণ খাদ দিয়ে ভারতের সমতলে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে প্রবেশ করে এ নদ সিরাজগঞ্জের কাছে গঙ্গার মূল শাখার সঙ্গে মিশে যায়। এ দুই নদ আর নদী যুক্ত হয়ে অসংখ্য শাখা-প্রশাখাসহ দক্ষিণমুখী যাত্রা করে। এর একটি হচ্ছে মেঘনা। হিমালয় থেকে বয়ে আনা পলি ভূমি তৈরি করে নদীকে অসংখ্য ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। নদীর সঙ্গে সঙ্গে এ প্রবাহ সুন্দরবনও তৈরি করেছে। এ বদ্বীপের ইতিহাস এখানকার নদী এবং তাদের শাখা-প্রশাখার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলার ইতিহাসে যেমন অনেক রাজত্ব সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়েছে, অনেক নগরের পত্তন ও বিলুপ্তি ঘটেছে, তেমনি এ নদীগুলোও তাদের গতিপথ বদলেছে।
নদীর প্রবাহ বাংলাকে চারটি বড় ভাগে বিভক্ত করেছে। মূল গঙ্গার উত্তর ভাগ এবং ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ ভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল মধ্যযুগে বরেন্দ্রভূমি নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এ অংশ থেকে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগ, পশ্চিম বাংলার জলপাইগুড়ি বিভাগ এবং আসাম ও বিহারের সীমান্তবর্তী এলাকা। এ অঞ্চলের একটি অংশ নিয়ে গঠিত ছিল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন। এর দক্ষিণ-পশ্চিম এবং ভাগীরথী ও হুগলির পশ্চিমে অবস্থিত প্রাচীন রাঢ়, এ রাঢ়েই আজকের পশ্চিম বাংলার বর্ধমান বিভাগ এবং বিহার ও ওড়িশার সীমান্ত এলাকা। এর পূর্ব দিকে ভাগীরথী, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা দিয়ে ঘেরা বাংলার মধ্যাঞ্চল, যার মধ্যে আছে পশ্চিম বাংলার প্রেসিডেন্সি বিভাগ, বাংলাদেশের খুলনা বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের কিছু অংশ। এ অংশেই আছে কালিদাসের ভঙ্গ এবং টলেমি ও প্লিনি উল্লেখিত গঙ্গারিডি। চতুর্থ ভাগটি এর পূর্ব দিকে অবস্থিত, এর মধ্যে আছে একপাশে পদ্মা ও মেঘনার মধ্যবর্তী এলাকা এবং এটা বিস্তৃত খাসি ও জৈন্তা পাহাড়, মিজোরাম ও চট্টগ্রামের পার্বত্যাঞ্চল পর্যন্ত। এ অংশে আছে আসামের কাছাড়, হালিকান্দি ও করিমগঞ্জ জেলা; বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগ; ভারতের ত্রিপুরা বিভাগ। এ অঞ্চলটি হচ্ছে প্রাচীন সমতট।
গঙ্গা বাংলায় প্রবেশ করেছে তেলিয়াগড়ি ও সাকরিগালির সরু গিরিপথ দিয়ে রাজমহলে। এ তেলিয়াগড়ি বাংলার মানুষের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যূহ। উত্তর ভারত থেকে আসা আক্রমণকারীরা এ গিরিপথেই প্রথমবারের মতো বাধার মুখে পড়তেন। বাংলার শাসকরা এ গিরিপথেই কমসংখ্যক সৈন্য নিয়ে শত্রুদের বড় বড় বাহিনীকে রুখে দিয়েছেন। শুধু ইউরোপীয় আক্রমণকারীরা এ পথে না এসে এসেছিল দক্ষিণের সাগরপথে। স্বভাবতই মধ্যযুগের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো এ গিরিপথের কাছেই গড়ে উঠেছিল, যেমন— গৌড়, লাখনৌতি, পাণ্ডুয়া, রাজমহল।
এমনকি কয়েকশ বছর আগেও গঙ্গা তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে। ষোড়শ শতকে রাজমহল দিয়ে প্রবেশ করে বর্তমানে যে অবস্থানে, আগে তার চেয়ে অনেক উত্তর দিকে ছিল। সে সময় থেকে বেশ কয়েকবার এ নদী দক্ষিণ দিকে এগিয়ে এসেছে। প্রাচীন গৌড় (আধুনিক মালদা) ছাড়িয়ে ২৫ মাইল এগিয়ে গঙ্গা দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে— ভাগীরথী (হুগলি নামে পরিচিত) এবং পদ্মা। এখান থেকে পদ্মা দক্ষিণ-পূর্বমুখী হয়ে বয়ে চলেছে। বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা প্রধান নদী হয়ে ওঠে। ১৫৩০ সালে পর্তুগিজরা বঙ্গোপসাগর থেকে প্রথমবারের মতো ভাগীরথীতে প্রবেশ করেছিল, তারা একে হুগলি নদী নামে ডাকতে শুরু করে। প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে দেখা যায়, সে সময় হুগলিই ছিল প্রধান শাখা নদী, তুলনায় পদ্মা ছিল ছোট, যা মূলত গঙ্গাকে পূর্ব বাংলার নদীজালের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। উনিশ শতকের শুরু থেকে ভাগীরথীতে পলি পড়া শুরু হয় এবং বর্ষাকাল ব্যতীত গঙ্গা থেকে এ নদীতে পানির প্রবাহ দেখা যেত না। অন্যদিকে এ সময় পদ্মা হয়ে ওঠে প্রধান শাখা নদী।
গত চার-পাঁচ শতকে পদ্মা ও হুগলি উভয়ই তাদের গতিপথ বদলেছে বেশ কয়েকবার। ষোড়শ শতকের আগে পদ্মা রাজশাহী বিভাগের চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা হয়ে ঢাকা অতিক্রম করে মেঘনার মুখে পড়ত এবং দক্ষিণে যেত চাঁদপুরে। আঠারো শতকের শুরুর দিকে পদ্মা ফরিদপুর ও বাকরগঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনার মোহনায় বিলীন হতো। উনিশ শতকের প্রথম দিকে পদ্মার গতিপথ পরিবর্তনে অনেক জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়, যার কারণে এটি কীর্তিনাশা (মানুষের সৃষ্টি ধ্বংসকারী) নাম ধারণ করে। ব্রহ্মপুত্রের মূল শাখা লালমনিরহাটে যমুনা হয়ে গেছে। ঢাকার উত্তরে সোনারগাঁয় যমুনা ও পদ্মার মিলন ঘটে। মেঘনা ও পদ্মার মিলিত স্রোত মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে মিশে যায়।
মেঘনার উত্পত্তি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জৈন্তিয়া পাহাড়ে। শুরুতে এটি সিলেটে সুরমা নাম নিয়েছে, এ নদী পানি পায় বরাক নদ থেকে। করিমগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় এ নদী কুশিয়ারা নাম নিয়েছে। চাঁদপুরের কাছে গিয়ে আবার এর নাম মেঘনা। ইউরোপীয় লেখকদের বিবরণী থেকে বোঝা যায়, চট্টগ্রামের অবস্থান একসময় আরো উত্তর দিকে ছিল, মেঘনার মোহনার কাছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন বা বাংলার বদ্বীপের দক্ষিণমুখী যাত্রা যে কারণেই হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম দক্ষিণ দিকে সরে গেছে।
গঙ্গাসাগর পর্যন্ত ভাগীরথী নদীকে হিন্দুরা যতটা পবিত্র মনে করে তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, একসময় এ নদী ছিল মূল গঙ্গা। পদ্মায় এমন কোনো পবিত্রতা আরোপ করা হয়নি। ১৫৬০ সালে ভ্যান ডন ব্রুকের আঁকা বাংলার মানচিত্র থেকে এটা পরিষ্কার যে, হুগলির কাছে ত্রিবেণীতে ভাগীরথী তিন ভাগে বিভক্ত হতো— বাম দিকে সরস্বতী প্রাচীন সপ্তগ্রাম বন্দরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে, মাঝে ভাগীরথী, যা বর্তমানে কলকাতা পর্যন্ত এসেছে এবং সবচেয়ে পূর্ব দিকে আছে যমুনা। এক শতাব্দী পর রেনেলের মানচিত্র থেকে দেখা যায়, এ তিনটি প্রবাহ সাগর দ্বীপে মিলিত হয়েছে। এ পরিবর্তনে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার মধ্যযুগের রাজধানী সাতগাঁও বন্দর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। সপ্তগ্রাম পরিত্যক্ত হলে হুগলি ও কলকাতার গুরুত্ব বেড়ে যায়। যমুনা পলি পড়ে ধু-ধু প্রান্তরে পরিণত হয়। পলিপ্রবাহ বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন পরিবর্তনে মৌলিক প্রভাব রেখেছে। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে এ সমস্যা কলকাতা বন্দরের জন্য অভিশাপের মতো কাজ করছে।
গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র হিমালয় থেকে দক্ষিণে যাত্রা করা আরো অনেক ছোট নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তিস্তা, এর মূল নাম ত্রিস্রোতা (তিন প্রবাহ)। তিস্তা তিনটি ভাগে নিজেকে বিভক্ত করে— আত্রাই, করতোয়া ও পুনর্ভবা। করতোয়া নদীর তীরে এখনো দেখা যায় বিখ্যাত নগর পুণ্ড্রবর্ধনের ধ্বংসাবশেষ। এ নগরের অস্তিত্ব ছিল মৌর্য আমলে। পুণ্ড্রবর্ধনের ধ্বংসাবশেষ এখন মহাস্থানগড় নামে পরিচিত। এর অবস্থান বাংলাদেশের বগুড়া জেলায়। পুনর্ভবা মহানন্দার সঙ্গে মিশেছে, যা আবার মালদার কাছে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তিস্তার মূল প্রবাহ প্রকৃতপক্ষে মালদা জেলায় গঙ্গায় মিশেছে। কিন্তু ১৭৮৭ সালের বন্যায় তিস্তা তার পুরনো প্রবাহ থেকে সরে এসে নতুন একটি প্রবাহ সৃষ্টি করে, যা বাংলাদেশের রংপুর জেলায় ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিশেছে। আরেকটি নদী তার গতিপথ পরিবর্তনের জন্য কুখ্যাত। এর নাম কোসি, আগে এ নদী ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিশত, তিস্তার পূর্ব দিকে যাত্রার বিপরীতে এটি যাত্রা করে পশ্চিম দিকে।
বাংলার ইতিহাস ও মানুষের জীবনের ওপর এসব নদীর প্রভাব অপরিসীম। এ নদীগুলোর কারণেই বাংলার মাটি এত উর্বর। জমিতে ধান, পাশে ফল-সবজি, পুকুর-নদীতে মাছ। এ প্রাচুর্যে বাংলার মানুষের হাতে অবসর ছিল, যা তারা শিল্প, সংগীত ও সাহিত্যচর্চার কাজে লাগিয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনপদের ওপর প্রভাব রেখেছে। এর জলজ্যান্ত একটি উদাহরণ সুন্দরবন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলে এ অঞ্চলে একসময় মনুষের সমৃদ্ধ বসতি ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তা উপকূলীয় বনে পরিণত হয়, যেখানে বাসা বাঁধে বাঘ ও কুমির। এ পরিবর্তনের কারণ পর্তুগিজ ও আরাকানিদের তাণ্ডব ও নদীর গতিপথের পরিবর্তন।
বাংলার অনেক পুরনো সমৃদ্ধ নগর হয় নদীর বানে ভেসে গেছে নয়তো পলিতে ধ্বংস হয়েছে। নতুন নগর সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে তাম্রলিপ্তির জায়গায় গড়ে উঠেছে সপ্তগ্রাম, সপ্তগ্রাম থেকে হুগলি এবং হুগলি থেকে কলকাতা। প্রচলিত আছে কোসি নদীর প্লাবনে গৌড় নগর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে পদ্মা অনেক জনপদ ধ্বংস করেছে। এ নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণেই সরকারের প্রধান কেন্দ্র গৌড় থেকে রাজমহল, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও কলকাতায় স্থানান্তর করতে হয়েছিল।
বাংলার ইতিহাস এখনো লেখা হচ্ছে। বাঙালি জাতির উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা। তবে একটি বিষয় মীমাংসিত, আর তা হলো— এ ভূখণ্ড তৈরিতে এবং বাঙালির জীবন ধারণে অগণিত নদীর ভূমিকা।
রচনাটি নীতিশ সেনগুপ্তের ল্যান্ড অব টু রিভার্স: আ হিস্টরি অব বেঙ্গল ফ্রম দ্য মহাভারত টু মুজিব অবলম্বনে রচিত





