অনুবাদ: তাসনীম আলম

আমরা নাকি সন্ত্রাসী

১.

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা রক্ষা করতে চাই গোলাপ, নারী

ক্ষুরধার কবিতা আর আকাশের নীলকে।

এ এমন এক উপনিবেশ যেখানে কিছুই নেই

নেই পানি, নেই বাতাস

নেই তাঁবু, নেই উট

এমনকি আরবীয় কালো কফিও মেলে না এখানে!!

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা সাহসিকতার সাথে রক্ষা করতে যাই

বিলকিসের চুল

মায়সুনের ঠোঁট

যদি আমরা রক্ষা করি হিন্দকে, দা’দকে

লুবনা গাছ আর রাবাবকে

আর সুরমার প্রবাহকে

ঐশীবাণীর মতো যা চোখের পাতায় নাযিল হয়।

তোমরা আমার কাছে পাবে না

একটি গোপন কবিতা

বা কোনো গোপন ভাষা

অথবা লুকানো কোনো বই

আমার কাছে এমন কোনো কাসিদাও নেই

যা হিযাব জড়িয়ে রাস্তায় বের হয়।

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা একটি দেশের ধ্বংসাবশেষের কথা লিখি

বিচ্ছিন্ন ক্ষয়িষ্ণু একটি দেশ

ভাঙনের শব্দ শোনা যায় যেখানে ক্রমাগত

এমন এক দেশ যে ঠিকানা খুঁজছে

এমন এক জাতি যাদের মাথার ওপর আকাশ নেই

মর্যাদাপূর্ণ কোনো কবিতা আর অবশিষ্ট নেই সে দেশের

আছে শুধু বিলাপ আর মার্সিয়া

এ দেশের দিগন্তে নেই কোনো

বর্ণিল স্বাধীনত, লাল

বা নীল বা হলুদ

এমন এক দেশ যেখানে আমরা বাধাপ্রাপ্ত হই

পত্রপত্রিকা কিনতে

খবর শুনতে

এমন এক দেশ

এখানে সব পাখির

গান গাওয়া মানা

এমন এক দেশ

যেখানে লেখকরা অতি আতঙ্কে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে

শূন্যে লেখালেখি করার!!

এ দেশের কবিতা আমাদের মতোই

এর বাক্য অসার, ছন্দহীন, রফতানিমুখী

অনারব চেহারার আর ভাষার ন্যায়

এর যেমন শুরু নেই

নেই তেমন সমাপ্তি

এর কোনো সংস্রব নেই মানুষের সাথে

বা দেশের সাথে।

মানুষের দুরবস্থার সাথেও নেই সংশ্লিষ্টতা

এমন এক দেশ

যে দেশ শান্তি সম্মেলনে অংশ নিতে যায়

অসম্মানের সাথে আর নগ্ন পায়ে!!

যে দেশের পুরুষরা কাপড় ভিজিয়ে ফেলে

ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে

নারী ছাড়া কেউ নেই সেখানে

লবণাক্ত আমাদের চোখ

লবণাক্ত আমাদের মুখ

লবণাক্ত আমাদের কথা।

আমাদের অন্তরও কি অনুর্বর হয়ে পড়েছে

এই অনুর্বরতা কি সুপ্রাচীন যুগ থেকেই বিদ্যমান

আমাদের উম্মতে আজ মুয়াবিয়া বা আবু সুফিয়ানও নেই

‘না’ বলার মতো নেই কেউ

নেই কেউ উচ্ছেদকারীদের মুখোমুখি দাঁড়াবার

ওরা ছিনিয়ে নিয়েছে আমাদের ঘর, খাবার, যায়তুন

ওরা আমাদের গৌরবান্বিত ইতিহাসকে পণ্য করেছে

আমাদের নেই কোনো নিষ্কলুষ কাব্য

বাদশাহর হারেমে সতিত্ব হারিয়েছে সব কবিতা

মনুষত্যের কী আর অবশিষ্ট থাকে

যখন মানুষ লাঞ্ছনায় বাচে??

ইতিহাসে খুঁজি উসামা বিন মুনকিয

উকবা বিন নাফে, উমর, হামযা

আর খালিদকে, শামদেশ জয় করতে যারা ছুটে এসেছিলেন

আমি চাই একজন মু’তাসিম বিল্লাহকে

যিনি নারীদের রক্ষা করতে পারবেন পাশবিক নির্যাতন থেকে

আগুনের লেলিহান থেকে

অথচ এখনকার মানুষদের দেখি

সন্ত্রস্ত বিড়ালের মতো নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত

ইঁদুরের সাম্রাজ্যে।

আমরা কি গণঅন্ধত্বে আক্রান্ত?

নাকি আমরা বর্ণ অন্ধ?

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা মরতে অস্বীকার করি

ইসরায়েলি বুলডোজারে পিষে মরতে

ছিন্নভিন্ন করে আমাদের দেশ

আমাদের ইতিহাস

আমাদের বাইবেল

আমাদের কুরআন

আমাদের নবীদের কবরস্থান

যদি এটাই আমাদের পাপ হয়

তবে কত সুন্দর এই সন্ত্রাসবাদ!!

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা নিশ্চিহ্ন হতে না চাই

মোঙ্গল, ইয়াহুদি আর বর্বরদের হাতে

যদি আমরা একটা ঢিল ছুড়ি

নিরাপত্তা পরিষদের জানালায়

মহান অধিপতিরা যা দখল করে আছে।

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা নেকড়ের সাথে আলোচনায় না বসি

আর বারবনিতার হাতে হাত না মিলাই!!

ওরা শিল্প-সংস্কৃতির বিপক্ষে

কারণ ওদের এর অভাব আছে

ওরা সভ্যতা শিষ্টতার বিরোধী

কারণ এগুলো নেই ওদের মধ্যে।

ওরা এক বিশাল অট্টালিকা

অথচ দেয়ালবিহীন।

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা এই শতাব্দীকে প্রত্যাখ্যান করি

ওরা পরিণত হয়েছে

উদ্ধত, শক্তিশালী আর ধনী রাষ্ট্রে

আর ওরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হিব্রু পরিবেশক।

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা একটা গোলাপ ছুড়ে দিই

জেরুজালেমের দিকে

খালিলের দিকে

গাজার দিকে

নাসেরার দিকে

যদি আমরা খাদ্য-পানীয় বয়ে নিয়ে যাই

অবরুদ্ধ নগরীর দিকে।

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা বিরোধিতা করি

আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে

যারা নিজেদের লক্ষ্য স্থির করেছে

একতা ছেড়ে দালালির দিকে।

যদি আমরা বিদ্রোহ করি মহান অধিপতির আদেশের বিরুদ্ধে

তার গদির বিরুদ্ধে

যদি আমরা আইন ও রাজনীতি অধ্যয়ন করি

যদি আমরা মহান আল্লাহকে স্মরণ করি

যদি আমরা সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করি

যদি আমরা জুমাবারে খুতবা শুনি

তবে আমরা সন্ত্রাসের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত।

ওরা আমাদের সন্ত্রাসী বলে

যদি আমরা লড়াই করি দেশের পক্ষে

মাটির সম্মানে

যদি আমরা বিদ্রোহ করি জাতির ধর্ষণ ঠেকাতে

আমাদের ধর্ষণ ঠেকাতে

যদি আমরা রক্ষা করি আমাদের মরুভূমির শেষ খেজুর বৃক্ষটা

আকাশের শেষ তারাটা

আমাদের নামের শেষ অক্ষরটা

আমাদের মায়ের দুধের শেষ ফোঁটাটা

যদি এটাই আমাদের পাপ হয়

তবে কত সুন্দর এই সন্ত্রাসবাদ

আমি এই সন্ত্রাসের সঙ্গেই আছি

যদি এটা সক্ষম হয় আমাকে বাঁচাতে

রাশিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি আর পোল্যান্ডের অভিবাসীদের কাছ থেকে।

তারা ফিলিস্তিনে বসতি গেড়েছে

আমাদের কাঁধে পা রেখে

ওরা চুরি করতে চায় আমাদের কুদসের মিনার

আকসার দরজা আর

কারুকার্যময় গম্বুজসমূহ।

আমি এই সন্ত্রাসেরই সমর্থক

যদি তা এই জাতিকে অত্যাচারীর হাত থেকে স্বাধীনতা দিতে পারে

মানুষকে যদি রক্ষা করতে পারে মানুষেরই হিংস্রতা থেকে

ফিরিয়ে দিতে পারে কমলা আর যায়তুনের বাগান

স্বর্ণালি ফিঞ্চ পাখি, যাযাবরের হাসি

তবে আমি সন্ত্রাসের সাথেই আছি

যা উদ্ধার করবে ইয়াহুদি আগ্রাসন থেকে।

আমি ততদিনই সন্ত্রাসের সঙ্গী যতদিন

আমেরিকা আর ইসরায়েলের মধ্যে বণ্টনকৃত এই বিশ্ব স্বাধীন না হয়।

২.

ওদেরকে আমি তোমার খবর জানাইনি

তবু ওরা তোমাকে সাঁতরাতে দেখেছে আমার চোখের গভীরে

ওদেরকে আমি তোমার কথা বলিনি

কিন্তু ওরা তোমাকে পড়েছে আমার কবিতায়

ভালোবাসার কে কবে পেরেছে লুকাতে।

৩.

তোমার চোখ দুটো, বৃষ্টিমুখর রাতের মতো

ওই চোখে আমার নৌকো ডুবে যায়

আমার কবিতা মুছে যায় ওই চোখের দৃষ্টিতে

আসলে আয়নার কোনো স্মৃতি থাকে না।