জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ

অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চ প্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
 

দ্বিতীয় অধ্যায়

অনুবাদক ও জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ

(পঞ্চমাংশ)

মাত্র কিছুদিন হলো— অনুবাদক উইলিয়াম টিনডেলকে ‘অন্যায্য উপেক্ষা’ থেকে রক্ষা করে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের কুলপতি হিসেবে সংবর্ধিত করা হয়েছে। জীবনভর ধর্মতত্ত্ব নিয়ে উত্সাহী, ডেভিড ড্যানিয়েল নামের এক শেক্সপিয়ার বিশেষজ্ঞ এ পুনর্বাসন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রথমে তিনি টিনডেলের ‘ওল্ড’ ও ‘নিউ টেস্টামেন্ট’-এর অনুবাদ আধুনিক বানানশোভিত করে পুনরুদ্ধার করেন, তার পর প্রায় ৬০ বছরের চেষ্টায় তাঁর প্রথম এবং পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনী রচনা করেন। অনুবাদক হিসেবে টিনডেলের আলঙ্কারিক দক্ষতার একটি সার্বিক ও আবেগমথিত গবেষণায় ড্যানিয়েল দেখিয়েছেন নিউটন পদার্থবিদ্যার জন্য যা করেছেন, টিনডেল ইংরেজি ভাষার জন্য কীভাবে ঠিক তাই করেছেন।

ক্যাক্সটন ও লন্ডনের অন্যান্য মুদ্রক ইংরেজিতে যেসব বই ছেপেছিলেন, সেগুলোর সঙ্গে টিনডেল নিঃসন্দেহে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তারপরও যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বা দাপ্তরিক টেক্সটের বেলায় লাতিনই ছিল একমাত্র ভাষা। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের ছয় হাজার বইয়ের মধ্যে মাত্র ৩০টি ছিল ইংরেজিতে লেখা। এবং ইংরেজিতে লেখার জন্য টিনডেল স্পষ্টতই ললার্ড আন্দোলন ও লুথারের উদাহরণের মধ্যে তাঁর অনুপ্রেরণার উত্স খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর সময়ের অক্সফোর্ডে সে সময় সবেমাত্র দানা বাঁধতে থাকা একটি ‘আলঙ্কারিক জাতীয়তাবাদ’ থেকেও তিনি অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন। টিনডেল বিশ্বাস করতেন, লাতিনের চেয়ে গ্রিক এবং হিব্রু থেকে ইংরেজিতে অনেক সহজে অনুবাদ করা যায়, এবং ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এ শৈলীর যে বিস্তৃত বর্ণালি রয়েছে, তা ইংরেজি ভাষা লাতিনের চেয়ে ‘এক হাজার গুণ’ বেশি ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে পারে (ড্যানিয়েল ১৯৯৪: ২৯০)।

টিনডেলের ভাষা গড়ে দিয়েছিল তাঁর জন্মস্থান গ্লস্টারশায়ারের ধ্বনি, পদান্বয় (syntax), এবং শব্দভাণ্ডার, কিন্তু তারপরও তিনি এমন একটি শৈলীতে লেখার চেষ্টা করেছিলেন, যার বৃহত্তর আবেদন রয়েছে। তাঁর জন্মস্থানের বস্ত্র-বয়ন শিল্পের বিশিষ্ট বাচনভঙ্গি বা রূপও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল; সে অঞ্চলের লোকজ্ঞানকে ছন্দ ও প্রায় অন্ত্যমিলের সাহায্যে চমত্কারভাবে তৈরি করা প্রবচনগুলোর মাধ্যমে চালিয়ে দেয়া হতো। এসব প্রবচনকে— যেগুলো ধর্মপ্রচারের সময় ও অলঙ্কারবিদ্যায় ব্যবহূত হতো, এবং ইরাসমাসের প্রভাবে যেগুলোকে বিদ্যালয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল— টিনডেলের এ-ধরনের প্রায় প্রবাদপ্রতিম সৃষ্টির মধ্যে ধরে রাখা হয়েছে: “seek and ye shal find” (ড্যানিয়েল ১৯৯৪: ১৬-১৮)।

টিনডেল ছিলেন এক অসাধারণ পণ্ডিত ও ভাষাতাত্ত্বিক, এবং প্রাঞ্জলতাই ছিল তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। অক্সফোর্ডে তিনি হেতুবিদ্যা (logic) ও অলঙ্কারশাস্ত্র-বিষয়ক যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন, গ্রিক ও হিব্রুসহ তাঁর আটটি ভাষার জ্ঞান, যা তাঁর কালের একজন মানুষের জন্য ব্যতিক্রমী একটি ব্যাপার ছিল, ধর্ম প্রচারক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং লিখনের স্বদেশী ইংরেজি ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর সচেতনতা, এসবের সুবাদেই তিনি তাঁর দক্ষতা রপ্ত করেছিলেন। টিনডেল সে ভাষাতেই অনুবাদ করেছিলেন, যে ভাষায় লোকে কথা বলত; পণ্ডিতরা যে ভাষায় লিখতেন, সে ভাষায় নয়। ইংরেজি যখন এমন একটা রূপ খুঁজে পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে, যা লাতিনও নয় ফরাসিও নয়, সেই সময় টিনডেল তাঁর জাতিকে এমন একটা বাইবেল পাঠযোগ্য ভাষা উপহার দিলেন, যেটা শব্দ, শব্দক্রম, এবং ছন্দোময় প্রবাহের দিক থেকে ইংরেজি। ড্যানিয়েল বলছেন, টিনডেল ইংল্যান্ডের জন্য একটি ভাষা প্রস্তুত করলেন, ঠিক যেমন লুথার জার্মানির জন্য (জার্মান ভাষা তৈরি) করেছিলেন।

টিনডেল সহজ-সরল, এক সিলেবলভিত্তিক ইংরেজি শব্দভাণ্ডার তৈরি করেছিলেন, এবং এখন ভাষাটির অঙ্গীভূত হয়ে গেছে এমন অনেক শব্দ তৈরি করেছিলেন: ‘Passover’, ‘scapegoat’, এবং এমনকি খোদ ‘Jehovah’ শব্দটি পর্যন্ত। সম্ভবত সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, তিনি এমন কিছু শব্দবন্ধ (phrase) নির্মাণ করেছিলেন, যা ইংরেজ চৈতন্যের গহিন অভ্যন্তরে পথ কেটেছিল। সেসবের কিছু কিছু এত পরিচিত যে, সেগুলোকে প্রবাদ বলে মনে হয়, বা বহু ব্যবহারে জীর্ণ বলে শোনায়: ‘eat, drink, and be merry’; ‘the powers that be’; ‘the salt of the earth’; ‘the spirit is willing but the flesh is weak’।

কিন্তু টিনডেল কেবল শব্দ আর শব্দবন্ধের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাক্যের গঠন, ছন্দ, এবং ধ্বনির উত্থান-পতন পর্যন্ত তাঁর দক্ষতা সম্প্রসারিত হয়েছিল। সহজ-সরল, সোজাসাপ্টা ইংরেজি পদান্বয় (syntax) ব্যবহার করে তিনি ‘উড়নচণ্ডী পুত্র’-সংক্রান্ত নীতিকথামূলক গল্প বা রূপকের (প্যারাবল) সেই প্যাসেজের স্মরণীয় লাইনগুলো রচনা করেছেন: ‘this thy brother was dead, and is alive again; and was lost, and is found’।

ইউরোপীয় মূল ভূখণ্ডে প্রণীত ঢাউস আকারের বাইবেলগুলোর তুলনায়, টিনডেলের বাইবেলগুলো ছিল ছোট, পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর উপযোগী। সেসবের মধ্যে ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে বের হওয়া পূর্ণাঙ্গ ‘নিউ টেস্টামেন্ট’-এর একমাত্র যে কপিটি এখনো বর্তমান, সেটি টিনডেলের জন্মের ৫০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯৯৪ সালে ব্রিটিশ গ্রন্থাগারে প্রদর্শিত হয়েছিল। খুদে একটা বই সেটা, ১৫৩৪ সালের টিনডেলের ‘নিউ টেস্টামেন্ট’ যেমন ছিল, ‘ছোট্ট, ৪০০ পৃষ্ঠার একটা মোটাসোটা বই; চমত্কারভাবে হাতে এঁটে যায়’ (ড্যানিয়েল, ১৯৮৯: xiv)। ব্যাপারটার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপযোগিতা ছিল: বাইবেলটা খুব সহজেই পাচার করে দেয়া যেত (উল্লেখ্য, ইংলিশ চার্চ তখনো স্বদেশী ভাষায় বাইবেল পাঠের বিরুদ্ধে ছিল), এবং সাধারণ পাঠক অনায়াসে সেটা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে বা পড়ে টড়ে দেখতে পারতেন।

সে সময়ের ধর্মীয় বিতর্কগুলোয় তাঁর অন্যতম একজন প্রতিপক্ষ, একজন বিদ্বান লোককে টিনডেল একবার বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাহলে আমি সে ব্যবস্থা করব, যাতে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ছোট্ট একটা ছেলে, যে লাঙল ঠেলে, সে বাইবেল সম্পর্কে তোমার চাইতে অনেক বেশি জানবে’ (ড্যানিয়েল, ১৯৮৯: viii)। এবং, তিনি যে কাজে নেমেছিলেন, সেটা যে তিনি সুসম্পন্ন করেছিলেন, সেটা লন্ডনের এক খবরের কাগজের কলাম লেখকের নিম্নোক্ত মন্তব্যে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে:

‘সব লেখক তাঁদের পূর্বসূরিদের কাঁধের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ান, ভাষাটি তাঁরা সেই পূর্বসূরিদের কাছ থেকে যেমনটি পেয়েছেন, সেটা ব্যবহার করে এবং তার আরো বিকাশ বা উন্নতি সাধনের মাধ্যমে। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের পিরামিডের পাদদেশে উইলিয়াম টিনডেল একটি অপচ্ছায়া বা ভূত। তিনি সেই বৈপ্লবিক মতের প্রবক্তা— রাস্তার মানুষটি যে সাধারণ ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন, সেটি গভীর বা কাব্যিক কোনো চিন্তা প্রকাশের জন্য ব্যবহূত লাতিন বা ফরাসি কিংবা অন্য যেকোনো ‘পাণ্ডিত্যপূর্ণ’ ভাষার মতোই ভালো বা উপযুক্ত। তিনি এমন একজন জ্বালাময়ী ইংলিশ ভাষাবিদ পণ্ডিত ছিলেন, যিনি সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে সংস্পর্শ বজায় রেখেছেন এবং যূপকাষ্ঠে প্রাণ দিয়েছেন। চলতি বছর আমরা তাঁর জন্মের ৫০০ বছর পূর্তি যথাযোগ্যভাবে উদযাপন করব। কিন্তু সেই অদৃশ্য মানবের প্রকৃত স্মৃতিস্তম্ভটি ব্রিটিশ গ্রন্থাগারে বা এ উদযাপনের ভেতরে নেই, রয়েছে নিজের সব গৌরব নিয়ে বর্তমান সেই ভাষাটির মধ্যে।’

ইংরেজি ভাষার ওপর টিনডেলের প্রভাব তাঁর ব্যক্তিগত খ্যাতি বা মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না (যা আলফ্রেড, চসার বা ক্যাক্সটনের ক্ষেত্রে ছিল)। কারণ তিনি ক্ষমতাসীনদের উল্টো দিকে ছিলেন। বরং তাঁর সেই প্রভাব সম্পৃক্ত ছিল উত্স টেক্সট বাইবেলের সঙ্গে, এবং রিফর্মেশনের কালে ও তার পরে ধর্মতাত্ত্বিক, আদর্শগত আর রাজনৈতিক যেসব যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে, সেসবের কাছে সেই বাইবেলের যে প্রবল গুরুত্ব ছিল সেটার সঙ্গে। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত ‘অথোরাইজড’ বা অনুমোদিত বাইবেল, যেটার ৮০ শতাংশ টিনডেলের কাজ বা অনুবাদ থেকে এসেছে, সেটা ছিল ইংরেজি ভাষাকে আকৃতি দানের প্রচেষ্টার চূড়ান্ত পরিণতি: ‘(এটা) ইংরেজি ভাষার শক্তি আর মনোহারিত্বের অন্যতম মহত্ টোটেমের একটিতে পরিণত হয়। ইংরেজি ভাষায় যেহেতু ঈশ্বরের কথা এমন পরিপূর্ণ অভিব্যক্তি লাভ করল, কাজেই এর পর আর এটা বিশ্বাস করার কারণ রইল না যে, ইংরেজিতে সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব নয় {ব্লেক ১৯৯৬: ১৮৬ (আরো দেখুন, ষষ্ঠ অধ্যায়)}।

পরবর্তী পর্ব: ‘ফরাসি ভাষার বন্ধনমুক্তি’।