ভূমিকা ও অনুবাদ: কামরুল হাসান

 

ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেনকা জন্মেছিলেন ১৯৩২ সালে রাশিয়ার সাইরেরিয়ায় ছোট্ট শহর জিমা জংশনে। সাত বছর বয়সে বাবার সঙ্গে মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তিনি মায়ের কাছেই বড় হন, যদিও শৈশবেই বাবার সঙ্গে বেড়িয়ে এসেছেন অনেক অঞ্চল। প্রথম কবিতার বই ছাপা হয় যখন তার বয়স মাত্র ১৯। বসবাসের জন্য বেছে নেন মস্কোকে, সেখানে গোর্কি সাহিত্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন সাহিত্য পড়ার জন্য, কিন্তু অনেক প্রতিভাবান লেখকের মতোই শেষ করেননি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর তখনকার সোভিয়েত জমানায় তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন একনায়কবাদী লৌহ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা লিখে। পশ্চিমা দুনিয়ায় তার সমাদর কবির চেয়েও বেশি ওই প্রতিবাদী ভূমিকার কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে জার্মান সৈন্যবাহিনী ৩৪ হাজার ইহুদিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে লেখা ইয়েভতুশেনকার কবিতা ‘বাবী ইয়ার’ তুমুল আলোড়ন তোলে। সম্ভবত এটাই তার সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা। দারুণ অঙ্গভঙ্গি করে নাটুকে স্বরে কবিতা পাঠ করতেন। নায়কোচিত চেহারার সঙ্গে ব্যক্তিত্বের কারিশমা মিলে দারুণ উপভোগ্য হতো সে পাঠ। ফলে গ্যালারি উপচে পড়ত শ্রোতায়। বস্তুত তার মতো পাঠকপ্রিয় ও প্রভাবসঞ্চারী কবি ষাটের দশকে রাশিয়ায় বিরল। একটি গোটা প্রজন্মকেই তিনি আন্দোলিত করে গেছেন। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, চিত্রনাট্য, গান লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন কবিতার সংকলন, চলচ্চিত্র বানিয়েছেন, এমনকি অভিনয় করেছেন রুপালি পর্দায়। ব্যক্তিগত জীবনও অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ছিল এ কবির। অসংখ্যবার প্রেমে পড়েছেন, বিয়েই করেছেন চারবার। যদিও সোভিয়েত আমলের নির্যাতন, নিষ্পেষণ ও বাক-স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে স্টালিনের নির্মমতার বিরুদ্ধে কলম ধরে তার বিপুল খ্যাতি এসেছে। তবে এ নিয়েও বিতর্ক আছে যে ইয়েভতুশেনকা দুদিকেই ভারসাম্য রক্ষা করে লিখেছেন। জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন, ১৯৬৩ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। শেষ জীবনে তিনি আমেরিকার ওকলাহামা রাজ্যের তুলসা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়ার কবিতা ও ইউরোপের চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়াতেন। সেখানেই শেষ স্ত্রী, সন্তান ও পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে ৮৪ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বিদেহী আত্মার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা। এ

 

হারিয়ে যেও না

 

 

হারিয়ে যেও না... আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেলে

নিজের কাছ থেকেই হারিয়ে যাবে তুমি,

চিরকালের জন্য নিজসত্তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা

আর তা হবে খুব প্রচণ্ড রকমের অসততা।

 

হারিয়ে যেও না... হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ।

একের পক্ষে অন্যকে পুনরুজ্জীবিত করা অসম্ভবপ্রায়,

কেননা খুব গভীরে টেনে নিয়ে যায় মৃত্যু।

এমনকি এক মুহূর্তের মৃত্যুও দীর্ঘ অতিশয়।

 

হারিয়ে যেও না... ভুলে যাও তৃতীয় ছায়াটিকে।

ভালোবাসায় কেবলই দুজন। কোনো তৃতীয় ছায়া নেই।

শেষ বিচারের দিনে আমরা দুজনেই পবিত্র হয়ে উঠব,

যখন আমাদের জবাবদিহি করার বিউগল বেজে উঠবে।

 

হারিয়ে যেও না...  আমরা প্রায়শ্চিত্ত করেছি পাপের।

আইনের চোখে আমরা নিরাপরাধ, আমরা পাপহীন

আমরা অবশ্যই সেইসব মানুষের ক্ষমা পাবার যোগ্য

যাদের আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট দিয়েছি।

 

হারিয়ে যেও না... এক লহমায় হারিয়ে যাওয়া সম্ভব।

কিন্তু কীভাবে আমরা আবার মিলিত হব সামনের শতকে?

এই পৃথিবীতে তোমার কোনো দ্বৈত সত্তা থাকা কি সম্ভব,

কিংবা আমার? হতে পারে তারা আছে আমাদের সন্তানে।

 

হারিয়ে যেও না... আমার হাতে রাখো হাত।

তার ওপর আমি লিখব সেটাই— যা আমি বিশ্বাস করি।

জীবনের শেষ প্রেমকে কী এত ভয়ানক করে তোলে

সেটা প্রেম নয়, সেটা কেবলই হারিয়ে ফেলার ভয়।

 

 

আমেরিকার এক লেখকের সাথে কথোপকথন

 

 

তারা আমাকে বলে, ‘তোমার সাহস আছে বটে।’

এটা সত্য নয়। আমি কখনো সাহসী ছিলাম না।

আমি কেবল অনুভব করেছি, এটা সহ্য করা কঠিন

আমার সাথীদের কাপুরুষতার দিকে ঝুঁকে থাকা দেখা।

 

কোনো আসন বা রাজ্যপাট আমি টলাতে পারিনি।

আমি কেবল শঠতা আর চাটুকারিতাকে বিঁধেছি বিদ্রূপে।

প্রবন্ধ লিখেছি। কোনো অস্বীকার বা চিত্কার লিপিবদ্ধ করিনি।

চেয়েছি বলতে কেবল আমার হূদয়ের খাঁটি কথা। 

এটা সত্যি, আমি রুখে দাঁড়িয়েছি প্রতিভাবানদের বাঁচাতে,

বাঁচাতে উঠতি লেখকদের আর চিহ্নিত করেছি শঠদের।

কিন্তু এটা তো আমাদের সকলের সবসময়ই করা উচিত;

তবু তারা বারংবার জোর দিয়ে বলছিল আমার সাহসের কথা।

হায়, আমাদের বংশধরেরা তীব্র লজ্জায় অধোবদন হবে

এ কথা স্মরণ করে যখন তারা দুষ্কর্মের শাস্তি দেবে,

ভাববে সবচেয়ে অদ্ভুত সেই সময়ের কথা, যখন

সরল সততাকেই বলা হতো ‘সাহস’...