সাক্ষাত্কার গ্রহণ: ওলগা কার্লাইল
রূপান্তর: শওকত হোসেন
১৯৬০ সালে ‘দ্য প্যারিস রিভিউ’র পক্ষে বরিস পাস্তারনাকের সাক্ষাত্কার নেয়ার সময় মস্কোয় রুশ সাহিত্যের পুনর্জাগরণ নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল, সেটা পূরণ হয়নি— ১৯৬২ সালের শেষ দিকে মনেজ প্রদর্শনীতে ক্রুশ্চেভের আধুনিক শিল্পকলার প্রত্যাখ্যান সেই আশায় সমাপ্তি টেনে দিয়েছে। ১৯৬৫ সালে রাশিয়ার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের চলমান মেজাজ ধৈর্যহীনতা এবং অবসাদের এক ধরনের মিশেল, তার পরও সেটা এক ধরনের গোপন তীব্রতাহীন নয়। সাহিত্যিক দৃশ্যপট উপরিগত এক ধরনের প্রশান্তিতে চিহ্নিত হয়ে আছে, তার কারণ কর্তৃপক্ষের নিবর্তনমূলক কৌশল (কিন্তু দমনমূলক নয়); প্রশান্তির উপরিতলেই মেধা ও আবেগ প্রায়ই অব্যক্ত কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সবসময় অপঠিত পাণ্ডুলিপি সৃষ্টি করে চলেছে।
১৯৬৫ সালে ইয়েভতুশেনকা আমাকে বলছিলেন যে, তিনি এখনো মার্ক্সবাদ সাহিত্যিক অখণ্ডতার সঙ্গে সমন্বিত হতে পারে বলে বিশ্বাস করেন। বর্তমান ব্যবস্থা মানবজাতি ও শৈল্পিক বিকাশের সঙ্গে বেমানান নয়। মস্কোয় এটা এক ধরনের অস্বস্তিকর অবস্থান, যেখানে শ্বাসরুদ্ধকর সামাজিক বস্তুবাদই একক অনুমোদিত নন্দনতাত্ত্বিক মতবাদ। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি টিকিয়ে রাখতে এক ধরনের বিক্রমের দরকার, যা কিনা ইয়েভতুশেনকার ট্রেডমার্কে পরিণত হয়েছে। তার এ বিক্রমের দরকার আছে। কারণ ক্রুশ্চেভ পরবর্তীকালে কেবল সরকারি গোঁড়া বিশ্বাসীদেরই নয়, বরং বহু তরুণ অনুসারীকেও পেয়েছিলেন, যারা এখন মাত্র অল্প কয়েক বছর আগের এ নেতাকে যথেষ্ট বিপ্লবী না হওয়ার জন্য সমালোচনা করছেন।
১.
১৯৬০ সালের শীতে ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেনকার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। তখন মস্কোয় বহু নতুন কবির কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। স্তালিন তখনো বাতিল হয়ে যাননি। তখনো যেখানে সেখানে তার মুখোশের মতো প্রতিমার দেখা মিলছিল। অবশ্য লোকে তার পোস্টার থেকে চোখ সরিয়ে নিত, তার নাম মুখে আনাও এড়িয়ে যেত। স্তালিনবাদী সরকারের অধীনে নির্যাতন শিবিরের অস্তিত্বের কথা রুদ্ধ দুয়ারের আড়ালে ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের বলয় ছাড়া উল্লেখ করা হতো না। তবু এটা টের পাওয়া যেত যে, সবাই এক ধরনের একান্ত অনুসন্ধানে, মিথ্যাচার থেকে সত্যি খুঁজে আনার এক গোপন প্রয়াসে ব্যস্ত রয়েছে।
বুদ্ধিজীবীরা এত দীর্ঘদিন ধরে যে শূন্যতার ভেতর বাস করে আসছিলেন, সে সম্পর্কে ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছিলেন। আমার সঙ্গে সদ্য পরিচিতদের সাক্ষাতে অনেক সময় প্রথমবারের মতো তারা পুরনো ভীতি থেকে বেরিয়ে আসছেন বলে মনে হয়েছে: আগন্তুকের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার, অতীতকে জাগিয়ে তোলার, নিজের মনের কথা প্রকাশের ভীতি। সেটা ছিল এক ধরনের ভয়ঙ্কর পরিবেশ, কিন্তু এক ধরনের নিরাকার আশাবাদেও পূর্ণ ছিল তা।
সে সময় ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেনকা মস্কোর সাহিত্যবলয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছেন, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পাশ্চাত্যের লাখ লাখ লোকের কাছে তার চেহারা ও ব্যক্তিত্ব তখনো পরিচিত হয়ে ওঠেনি। আমার সফরের অল্প আগে বিভিন্ন সোভিয়েত সাহিত্য সাময়িকীতে তার কয়েকটি কবিতা পড়েছিলাম। স্পষ্টভাষী ছিল সেসব, তারুণ্যের বিশেষ আভা বিলিয়েছে— সোভিয়েত জীবনধারা নিয়ে প্রচল ক্লিশে বুলি থেকে প্রায় মুক্ত এক ধরনের দোলায়মান, প্রফুল্ল কাব্যিক সাংবাদিকতা।
মস্কোয় পৌঁছানোর অল্প পরেই আমার বাবার সঙ্গে কবির পরিচয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ফোন করলাম তাকে। কোনো এক বিকালে আমার সঙ্গে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালাম, বাবা তার কবিতার স্বাক্ষরিত একটা বই চেয়েছেন বলেও উল্লেখ করলাম। ইয়েভতুশেনকা আমার দাওয়াত গ্রহণ করলেন, টেলিফোনে খুবই আন্তরিক ছিলেন তিনি। কিন্তু আমার মনে হলো, বাবার অনুরোধের কথাটা আনাড়ি ঠেকেছে তার কাছে। ‘ওলগা ভাদিমোভনা,’ বললেন তিনি, ‘বোঝাই যাচ্ছে মস্কোতে নবাগত তুমি। আমাদের দেশে কবিতা ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যায়। আমার অতি সাম্প্রতিক কালের বইয়ের ২০ হাজার কপি দুদিনেই উধাও হয়ে গেছে। একটাও বাকি নেই। কিন্তু আমার কয়েকটা নতুন পঙিক্ত আবৃত্তি করে শোনাব তোমাকে,’ আন্তরিকতার সঙ্গেই যোগ করলেন তিনি।
আমি তখন মোটামুটি পুরু তুষারের নিচে চাপা পড়া মস্কোর কেন্দ্রে নিরানন্দ, বিশাল হোটেল মেট্রোপোলে ভিক্টোরিয়ান কেতায় আসবাবে সাজানো একটা স্যুট দখল করে থাকছি। মেট্রোপোলে হোটেলের কর্মচারীদের নজরদারি এবং এমনকি সম্ভবত গোয়েন্দাগিরি করা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিনের খ্যাতি ও সুনামের সঙ্গে মানানসই কায়দায় প্যানেলিং আর পর্দা ছিল সেখানে। তবে ইয়েভতুশেনকার আগমনের শেষ বিকালটিতে তিনি পৌঁছানো মাত্রই ওভারকোট খুলে ধূসর আস্ত্রাখান ফার হ্যাট থেকে তুষার ঝেড়ে হটহাউজ লাইলাকের একটা বড় সড় তোড়া উপহার দিলেন আমাকে, আমার ঈষত্ অন্ধকার স্যুট লক্ষণীয়ভাবে ঝলমল করে উঠল।
দীর্ঘ অ্যাথলিটসুলভ শরীরের ওপর ছোটখাটো মাথাঅলা বেশ লম্বা, অ্যাশ-ব্লন্ড তরুণ ইয়েভতুশেনকা, মলিন নীলচে কৌতুকভরা দুচোখ, গোলপনা মুখে টিকালো নাক এবং সেই সময়ের মস্কোয় বিস্ময়কর এক ধরনের খোলামেলা ভাব। চারপাশের কষ্টকর পরিবেশের প্রতি নির্লিপ্ত থেকেই বসলেন তিনি, বিনা ভূমিকায় রাশিয়ান কবিতা নিয়ে কথা বলতে লাগলেন। নিজের, বিশের দশকের মহান কবি মায়কোভস্কি এবং সবিস্তারে বললেন সমসাময়িক সোভিয়েত কবিতার কথা। সতীর্থ কবিদের প্রতি তার উদারতা নিমেষে নজর কেড়েছিল আমার। কবিতার তারিফ করে তাদের অনেকের নামই উল্লেখ করেছেন, কোনোটার পুরো স্তবকই আবৃত্তি করেছেন: ‘ফযনেসেনস্কি ও আখমাদুলিনা সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল কবি,’ বলেছেন তিনি। ‘আখমাদুলিনা রাশিয়ার নারী কবি আখমতোভা ও সভেতেভার মহান ঐতিহ্য বহন করছেন। উঁচু মাপের অটল লিরিসিজমের ঐতিহ্য এটা। তিনি আমার স্ত্রী,’ হেসে বললেন তিনি, ‘তোমাকে অবশ্যই তার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। হায়, আমি আবার কম মহান কাব্যিক ঐতিহ্যের কাতারে পড়েছি। আমার পঙিক্তগুলো সাধারণত সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ, আকস্মিক আবেগে তাড়িত কিন্তু আমার মেধার এটাই চারিত্র্য... আমি গভীরভাবে তাড়িত থাকলে নিমেষে আমার অনুভূতিগুলো পঙিক্ততে উগড়ে দিতে চালিত হই।’ কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন ইয়েভতুশেনকা, কামরাময় পায়চারি করলেন, পালা করে বাড়তি আর্মচেয়ারগুলোয় বসলেন, শেষ পর্যন্ত গাঢ় নীল রঙের সেটটিতে থিতু হলেন। দীর্ঘ পা-জোড়া একটার ওপর তুলে দিয়ে কামরার বেশ ভেতরের দিকে মেলে দিলেন। কিন্তু খানিক বাদেই স্বরচিত কবিতা পড়বেন বলে উঠে পড়লেন আবার, মায়কোভস্কিকে উত্সর্গ করা অনেক কবিতার একটি।
হোয়াট ইজ ইট ডেস্ট্রয়েড মায়কোভস্কি;
পুট আ রিভলভার ইন হিজ হ্যান্ড?
টু হিম উইদ হিজ গ্রেট ভয়েস, হিজ নোবিলিটি.
ইফ ওনলি দেয়ার হ্যাড বিন অফারড সাম টেন্ডারনেস.
—লিভিং পিপল আর সাচ আ নুইসেন্স
টেন্ডারনেস ইজ ফর দোজ সেফলি ডেড।
একটি মাত্র ডেস্ক ল্যাম্পে আলোকিত সুপরিসর সিটিং রুমে এক অদ্ভুত উপস্থিতি ছিল তার, প্রতিটি নড়াচড়া দেয়ালের গায়ে বিরাট সব ছায়ার খেলায় প্রসারিত হয়ে উঠছিল। আবৃত্তি করে চললেন তিনি, গোলাকার চেহারা আর উঁচু হনুর সঙ্গে নিদারুণ বেমানান তার সূচালো প্রোফাইল; মাঝে মধ্যে হাতজোড়া প্রসারিত ভঙ্গিমায় বিভিন্ন পঙিক্ততে যতি টানছিল। নাটকীয় ভঙ্গিতে আবৃত্তি করছিলেন তিনি, তার জোরালো কণ্ঠস্বর আবেগের তরঙ্গের আড়ালে ক্ষণিকের তরলতাকে আড়াল করে কবিতায় প্রাণ জোগাচ্ছিল। আমার ভেতর কোনো বিশাল অডিটোরিয়ামে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতার অসংখ্য সারির মাঝে থাকার অনুভূতি জুগিয়ে মাথার ওপর দিয়ে কাল্পনিক দূরত্বে তাকিয়ে থাকার সময় গোটা কামরাকে ভরিয়ে তুলছিল তার কণ্ঠস্বর।
স্মৃতি থেকে তার বিশেষ পছন্দের একটি কবিতা প্রবীণ কবি যাবোরোতস্কি রচিত ‘অ্যান আগলি গার্ল,’ থেকে দীর্ঘ একটা অংশ আবৃত্তি করলেন তিনি। মায়কোভস্কির উদ্দেশে রচিত তার নিজের কবিতার মতো এটাও প্রতিদিনের জীবনে আরো বেশি করুণার আকুতি। বসলেন ইয়েভতুশেনকা, নীরবতা বজায় রইল, তারপর আবার আবেগময় বিবৃতির অবিরল ধারায় কথা বলতে শুরু করলেন: ‘মানুষের জীবনে উষ্ণতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা আমাদের সবচেয়ে দরকারি কাজ। কেবল এটাই আমাদের রক্ষা করতে পারে, গোটা গ্রহকে বাঁচাতে পারে। এবং রাশিয়ান জনগণ দীর্ঘদিন ভোগান্তির শিকার হয়েছে। এ ব্যাপারে একটা কিছু করা এখন আমাদের ওপর নির্ভর করছে। করুণাময় একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা, মানুষকে আবারো উন্মুক্ত হয়ে বিকশিত হতে দেয়া। এখনই শুরু না করলে আমরা কীভাবে অবিচার, নির্বুদ্ধিতা ও রক্তপাতের প্রতিকার করব? আমাদের কমিউনিস্ট সমাজে এ বিকাশকে ঠেকানোর মতো কিছুই নেই, বরং উল্টো; কিন্তু সবার আগে আমাদের অবশ্যই নিজেদের মনের ভয়কে জয় করতে হবে...। অনেক কবিই এটা করেছেন, তাদের অনুপ্রেরণাকে রুদ্ধ করার মতো কিছু নেই: আমাদের কালের সব মহান ভাবনা তাদেরই। গদ্য রচয়িতাদের পক্ষে কিছুটা কঠিন সময় যাচ্ছে। রাশিয়ান গদ্য বহু বছরের শ্বাসরুদ্ধকর সেন্সরশিপের শিকার হয়েছে। অনায়াসে মুখে মুখে প্রচারিত হওয়ায় কবিতা সেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অবশ্য আমার প্রজন্মে বেশ কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল গদ্য লেখক আছেন: দুদিনতেভের নিউ ইয়ার টেল স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, নট বাই ব্রেড অ্যালোনের সময় থেকে উন্নতি করেছেন তিনি। তারপর আছেন ইয়ুরি কাযাকভ, শিগগিরই তার লেখা পড়া উচিত তোমার: আমার মতে, তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে সেরা গদ্য লেখক তিনি। আন্তন চেখভের ধারায় এক ধরনের নবায়িত কিন্তু গভীরভাবে রাশিয়ান ঐতিহ্যে লেখেন তিনি: সমবেদনাই তার মূলভাব...।’
বিস্তারিত ব্যাখ্যা অগ্রাহ্য করে ইয়েভতুশেনকা চেয়েছেন আমি যেন বুঝতে পারি, হয়তো প্রাচীন উপমায় ভরা নিজের বাক্যগুলোয় তুলে ধরা তার ধারণাটুকুর ভাগীদার হই। তার সব আলঙ্কারিক কথাবার্তা সত্ত্বেও আলাপের সুযোগ নিয়ে সময় নষ্ট করেননি। যেন সত্যি কথা বলতে এক ধরনের আবেগে আচ্ছন্ন ছিলেন, নিউইয়র্ক বিটনিকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে আমাকে। ‘আমরা এক নতুন জগতে পা দিয়েছি। কমিউনিজমের নামে আমরা সত্যির খোঁজ করছি— আমাদের ভেতর, অন্যদের ভেতর। প্রায়ই একে সাধারণ লোকজনের ভেতরই পাই আমরা,’ প্রচলিত রাশিয়ান বিশ্বাসকে ভাষা দিয়েই যোগ করলেন তিনি। ‘সত্যি একাধারে জটিল এবং কোমল একটা গাছ। নিষ্ঠুর শীত কাটিয়ে এখন বেড়ে উঠবে।’
ইয়েভতুশেনকা প্রাচীন রাশিয়ান বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী, বিশেষ করে এর সর্বজনীনতার চেতনায় মুগ্ধ ছিলেন। ‘পৃথিবী যদি টিকে থাকতে চায়, এ চেতনাকেই নতুন করে অধিকার করতে হবে,’ বলেছেন তিনি। সোভিয়েত ইউনিয়নে নতুন বুদ্ধিজীবী সমাজের জন্ম নেয়ার কথা বললেন তিনি। ‘এটা অনেকটা তোমার হাতের তালুতে জলের ধারাকে আটকে রাখার মতো,’ বললেন তিনি। ‘বেশির ভাগই ঝরে পড়বে, কিন্তু হাতের পেয়ালায় কিছুটা রয়ে যায়। এখন সেটাই ঘটছে। আমরা এবং আমাদের সন্তানরা শেষ পর্যন্ত মূলধারার বিপরীতে এই অল্প পরিমাণ পানিই ধরে রাখব, কিন্তু অবশ্যই ক্রমবর্ধমান মূলধারাই আমাদের প্রথম উদ্বেগের বিষয়। সত্যি কথা হলো, সোভিয়েত সরকার সাধারণের সামনে ভালো বইপত্রের জগত্ উন্মোচন করতে পেরেছে, আমাদের যা রাশিয়ার ভবিষ্যতের ওপর ভরসা জোগায়...’
পুরো কথোপকথনের সময়টুকুতে— একসময় যেটাকে নৈতিকতার প্রদর্শন মনে হয়েছে— গতিময় ও পরিশুদ্ধ সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা বলছিলেন ইয়েভতুশেনকা এবং আমি পাশ্চাত্যের ভূমিকা পালন করেছি, বারবার রাশিয়া ও বাকি বিশ্বের জন্য সুখ-শান্তি নিশ্চিত করবে এমন ঐক্যবদ্ধকারী ধারণা খুঁজে পাওয়ার সমস্যার প্রসঙ্গ তুলছিলেন তিনি। আমার মনে হয়েছে, যেন আমার মাধ্যমে তিনি পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দিতে চাইছেন। পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের জীবনযাত্রা, চিত্রকলা ও লেখালেখির জগতে সর্বাধুনিক প্রবণতা সম্পর্কে বেশ কৌতূহলী ছিলেন তিনি। বিট কবি ও নিউইয়র্ক অ্যাকশন পেইন্টারদের সম্পর্কে জানতে চাইলেন আমার কাছে।
চা এল। আমাদের আলাপচারিতা বর্তমান কালের রাশিয়ায় কবিতার বিশেষ ভূমিকা প্রসঙ্গে বাঁক নিল। তরুণ কবিদের কবিতার মন্ত্রমুগ্ধ বিপুল জনতা, একদিনেই তাদের রচনার ছাপানো ৫০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যাওয়া (চাহিদার চেয়ে বরং পরিকল্পনার আগে পুনর্মুদ্রণ করা যাবে না) নিয়ে কথা বললেন ইয়েভতুশেনকা। তার প্রথম চা পান সাক্ষাতের মতো এ ব্যাপারে আর এতটা বাঙ্ময় দেখব না। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার মুহূর্তে স্বয়ং কবিতার শক্তি পরিমাপ করছিলেন তিনি— অনেক বেশি করে তার নিজের কবিতা এবং নিজের ব্যক্তিত্বের। জনতার দীর্ঘদিনের চাপা আবেগ প্রকাশ করা পঙিক্তর শক্তি তখন তার পক্ষে অপেক্ষাকৃত নতুন ধারণা ছিল। সে সময় তার ক্রমে বেড়ে ওঠা, তার ও অন্য কবিদের পাবলিক রিডিংয়ের ভেতর দিয়ে কবিতা সবে সারা রাশিয়ায় সততার প্রতিশ্রুতি বয়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছিল: স্টেরিওটাইপ ধ্যান-ধারণা ও প্রতিক্রিয়ার একরৈখিক ব্যবস্থায় প্রথম প্রতিবন্ধক ছিল এটা।
জাতীয় প্রতীকে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলেন ইয়েভতুশেনকা: কবিতার স্তরে স্তালিনবাদের প্রত্যাখ্যান সূচিত হতে যাচ্ছিল। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ শেষে বুঝতে পারছিলাম জনগণের একজন নাছোড় কণ্ঠস্বর শুনেছি, গোটা প্রজন্মের মুখপাত্র। জীবনের চেয়েও বিশাল ও উজ্জ্বল কেউ ছিলেন তিনি, আবার প্রচলিত ধারার রোমান্টিক হিরোও: ইয়েভতুশেনকা মায়কোভস্কিকে কিংবা মায়কোভস্কির তৈরি একটা ইমেজকে অনুকরণ করেছেন— বিপ্লবের প্রফুল্ল, প্রলেতারিয়েন তরুণ কবি। তার গোটা কৌশলের জোরালো প্রত্যক্ষ রূপ তার সব কথাকেই অনেক ওজনদার করে তুলছিল। এমনকি প্রফুল্লতা এক ধরনের ভাব হয়ে থাকলেও তা এক ধরনের ইচ্ছাকৃত খেলা। কারণ ইয়েভতুশেনকার তার কবিতার মতো বাস্তব জীবনেও নতুন কিছু করার বিশেষ প্রতিভা রয়েছে। চাইলে এক বিকালেই কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে কবিতা লিখে ফেলতে পারেন তিনি।
সব সাক্ষাতে তার চমকপ্রদ কল্পনাশক্তি প্রদর্শনের কথা মনে আছে আমার। সাধারণভাবে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় নিমেষে পরিবেশে আধুনিক তাড়াকারী ধারণায় নাটকীয় সম্ভাবনা শনাক্ত করতে পারেন এবং অভিনেতা, কবি হিসেবে সাবলীলতার সঙ্গে তাকে আয়ত্তে নিয়ে নিজের ব্যক্তিত্বের ভেতর দিয়ে ক্ষণায়ু ঘটনাপ্রবাহের ওপর স্মরণীয় ছাপ ফেলেন। পাস্তারনাকের সঙ্গে সম্পর্কিত করে অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক স্বীকার করেন তিনি, ‘অভিনয় করে জীবন কাটিয়েছেন তিনি (পাস্তারনাক, হ্যামলেট)’, যদিও ইয়েভতুশেনকার অভিনয় আরো সচেতন প্রয়াস, পাস্তারনেকের চেয়ে ঢের বেশি পরিকল্পিত। ওই শীতে পড়ে লেনিনগ্রাদে বন্ধুদের সঙ্গে শ্যাম্পেন পান এবং পুশনিকের মহিমার উদ্দেশে অনন্য দীর্ঘ সম্মান জানানোর সময়— ‘পুশকিনের উদ্দেশে, যার শরীরে তুষার আর শ্যাম্পেনের সৌরভ...’, তার শহরেই গিয়েছিলাম আমরা। এক বছর পরে নিউইয়র্কে এক একাডেমিক সংবর্ধনায় তার তরতাজা আশাবাদী অন আ বাইসাইকেল আবৃত্তির পর দেখি তাকে। অনেক জটিল রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি। মোহনীয় চাতুর্যে বৈরী, আপাত সোভিয়েতবিরোধী শ্রোতাদের নিরস্ত্র করেছেন। ১৯৬২ সালের ভাবনাহীন বসন্তে মস্কোয় একটা ট্যাক্সি ক্যাবে বসে ‘মনোলগ অব দ্য বিটনিকস’ আবৃত্তি করেছিলেন তিনি। মস্কো আর্টিস্টস ইউনিয়নে যাচ্ছিলাম আমরা চারজন, সেখানে সে সময়ের শিথিল রাজনৈতিক মেজাজের ফলে ইয়েভতুশেনকার বন্ধু, চিত্রশিল্পী ইয়ুরি ভাসিলিয়েভের শিল্পকর্মে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে তার ধারণা নিয়ে বক্তব্য রাখার কথা ছিল। মনোলগ অব দ্য বিটনিকস ট্যাক্সি ড্রাইভারসহ ইয়েভতুশেনকার পাঁচ শ্রোতাকে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট করে দিয়েছে, কিছুক্ষণের জন্য কার্বে গাড়ি থামিয়েছিলেন তিনি, ‘যেন আমি তোমাদের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে শিল্পকলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি,’ ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি। আবৃত্তি করার সময় ততটা আধুনিক না হলেও রাশিয়ান ছন্দ অসাধারণ শুনিয়েছিল:
... দ্য টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ডাম্বফাউন্ডেড আস
লাইজ অ্যয়ার হেভি অ্যাজ ট্যাক্সেস
লাইক ড্যান্ডেলিয়ন সিডস
আইডিয়াজ ব্লিউ অ্যাওয়ে ফ্রম লিভিং ব্রিদ...
অ্যান্ড আওয়ার হ্যান্ডস লাফড অ্যাপ্লাউডিং
অ্যান্ড আওয়ার ফিট গ্রিন্ড অ্যান্ড ডান্সড...
২.
১৯৬২ সালে বসন্তকালে মস্কোয় প্রায়ই ইয়েভতুশেনকাকে দেখেছি। আমার প্রথম সফরের পর মস্কোয় বেশকিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। আরো প্রাণচঞ্চল, ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল শহরটা, চলাফেরাই দায় হয়ে উঠেছিল। ভাড়া কমানোয় মস্কোবাসী প্রাণশক্তি নিয়ে ট্যাক্সির জন্য যুদ্ধ করছে। ’৫৯-৬০ সালের তুলনায় লোকজন অনেক বেশি ভালো অবস্থায় আছে মনে হয়েছে। বেশ কয়েক সপ্তাহজুড়ে অবকাশের একটা পরিবেশ বজায় ছিল: ওই বছর ১ মে উদযাপন ও সনাতনী ইস্টার খুব কাছাকাছি সময়ে পড়েছিল। আবহাওয়া ছিল উষ্ণ। শহরের বাইরের লোকজন হানা দিয়েছিল মস্কোতে। কৃষাণীরা মস্কোর বিভিন্ন রসদবোঝাই দোকান থেকে কেনা জিনিসে— ঐতিহ্যবাহী ইস্টার পাশকা ও কুলিচ তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণ— উপচে পড়া ব্যাগ বইছিলেন। মেয়েদের রুমাল, প্রশস্ত স্কার্ট ও গোলপনা চেহারা দেখে মনে হয়েছে, বুঝি রাশিয়ার গভীর থেকে হাজির হয়েছে ওরা। এটা আবার রাজনৈতিক উপলক্ষ ছিল: লেনিনের পোস্টার চোখে পড়ছিল সর্বত্র, লাল আর হালকা নীল পতাকার ছড়াছড়ি ছিল শহরময়। যদিও দুটো উত্সবকে বেমানান ঠেকেনি, বরং উল্টো: বেশির ভাগ মস্কোবাসীই দুটো উত্সবই উপভোগ করার পরিকল্পনা করছিল।
বরাবরের মতো বন্ধুসুলভ ও খোলামেলা ইয়েভতুশেনকা সাফল্যে ঝলমল করছিলেন তখন; উদারমনা তরুণদের আধা সরকারি মুখপাত্র ছিলেন তিনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও প্রাভদার প্রতিনিধি হিসেবে কিউবা সফর করেছেন। তাকে দলে নেয়ার ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেছে বলে গুজব ছিল বাজারে। প্রতিভাবান অস্থির কবি বেল্লা আখমাদুলিনার সঙ্গে তালাক হয়ে গিয়েছিল তার। এখন সুস্থির, বুদ্ধিমতী মস্কোয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর রুচিবোধের অধিকারী হিসেবে খ্যাত এক কৃষ্ণকেশীর সঙ্গে সুখের সংসার করছিলেন।
ইয়েভতুশেনকা ও গেলিয়া শহরের কেন্দ্র থেকে বেশ দূরে কিয়েভ হাইওয়ে বরাবর শুধু রাইটার্স ইউনিয়নের সদস্য ও তাদের পরিবারের জন্য নির্মিত বিরাট নতুন কমপ্লেক্সের একটি ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন কেবল। একটা দ্রুত বর্ধনশীল নতুন এলাকা, যেখানে পুরনো গাছের গুঁড়ির বাড়িঘরের পাশাপাশি উঁচু উঁচু ইটের দালানকোঠা তৈরি হচ্ছিল। তখনো ল্যান্ডস্কেপ করা হয়নি জায়গাটা, খুঁড়ে রাখা পথঘাট তখনো নামহীন। ভবনগুলোর ভেতরে অ্যাপার্টমেন্টগুলোরও নামকরণ বাকি।
ইয়েভতুশেনকার বাসাটা এরই ভেতর মস্কো কেতায় সাজানো হয়ে গিয়েছিল। সমসাময়িক স্ক্যান্ডেভিয়ান এবং কিছুটা লোক কাহিনীর দ্বৈরথ— চমত্কার ইউক্রেনীয় সিরামিকের খেলনা— বিশের দশকের জিনিসের মতো উপকরণের সঙ্গে মিশে গেছে; অদরকারি কোণঅলা আর্মচেয়ার আর জটিল জ্যামিতিক নকশা। সব মিলিয়ে প্রভাবটা প্রীতিকর ও অমায়িক।
কবি ও তার স্ত্রীর পক্ষে ব্যস্ত দিন ছিল সেসব; সরকারি সফরে লন্ডনের পথে রওনা হওয়ার কথা ছিল তাদের। সারাক্ষণ লোজকনের আনাগোনায় গমগম করছিল অ্যাপার্টমেন্টটা। গোছগাছ করছিলেন গালিয়া, সবে সংযোগ দেয়া টেলিফোনটা অবিরাম বাজছিল। ইয়েভতুশেনকার বন্ধুবান্ধবরা বিদায় জানাতে হাজির হচ্ছেন। অনেকেই তাদের ছবির সংগ্রহ দেখতে এসেছেন। নিজের সংগ্রহ নিয়ে দারুণ গর্বিত ইয়েভতুশেনকা মাত্র টানানো শেষ করেছিলেন সেগুলো। বেশির ভাগ মস্কোর চিত্রশিল্পীদের কিছুটা আনাড়ি পরাবাস্তব কাজসহ অ্যাপার্টমেন্টের সাজসজ্জার মতো আবছা বিশের দশকের ছাপ ছিল তাতে। তবে কয়েকটা ভালো ছবিও ছিল। নিখোনভের একটি সুদর্শন, সুবিশাল ক্যানভাস ছিল— লোকেরা তাস খেলছে; ভাস্কর আর্নেস্ট নিয়েযভেস্তনির শক্তিশালী ও এক্সপ্রেশনিস্টটিক ওয়ার্কিং ড্রইং আর কিউবা থেকে ইয়েভতুশেনকার আনা বেশ কয়েকটা উপযুক্ত বিমূর্ত শিল্পকর্ম।
এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও দ্য প্যারিস রিভিউর জন্য সাক্ষাত্কার দিতে রাজি হলেন ইয়েভতুশেনকা। সাক্ষাত্কারের জন্য নির্ধারিত সন্ধ্যায় ইয়েভতুশেনকার ওখানেই ডিনার সারলাম। স্টিক ও ইয়েভতুশেনকার প্রিয় খাবার ছোট ছোট পাকা টমেটো দিয়ে সাপার খেতে বসলাম যখন, তখনো দিনের আলো ছিল। বিশাল একটা থালা ছিল ওগুলোর, ইয়ুরি ভাসিলিয়েভের ঝলমলে সাজসজ্জার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। আমরা যেখানে খাচ্ছিলাম, সেই কিচেনের প্রমিত অনুপাত বের করে আনতে রঙ করা কাঠের চামচ ও ইউক্রেনীয় মোটিফ ব্যবহার করেছেন তিনি। জানালা দিয়ে চেরেমুখার সুবাস আসছিল কিচেনে (এটা রাশিয়ান কবিতায় প্রায়ই দেখা যাওয়া এলডার ফুল, যার কড়া গন্ধ আমার কাছে ওই বসন্তের আগ পর্যন্ত অচেনা ছিল)। ঢেউ খেলানো সবুজ গাছপালা ও বিশাল কনস্ট্রাকশন ক্রেনগুলোর ওপাশে ধীরে ধীরে পাটে বসছিল সূর্যটা।
দারুণ খোশমেজাজে ছিলেন ইয়েভতুশেনকা দম্পতি। শ্যাম্পেন দিয়ে উপলক্ষটা উদযাপন করলাম আমরা। এভাবে ইয়েভতুশেনকার অসংখ্য কাজের মতো সাক্ষাত্কারটা এক ধরনের গ্ল্যামারাস উদ্ভাবনে পরিণত হয়েছিল এবং প্রাণবন্ত কথোপকথন ও রাশিয়ান উত্সবমুখর খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উদার টোস্টের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে। অবশেষে টেবিল পরিষ্কার করার পর গোছগাছের জন্যে গালিয়া পাশের কামরায় চলে গেলে ইয়েভতুশেনকা আর আমি লিভিংরুমে চলে এলাম। কবির টেবিলটা ছিল সেখানে, মধ্যবয়সে হেমিংওয়ে ও কাস্ত্রোর স্বাক্ষরিত বিরাট পোর্ট্রেট প্রাণবন্ত হয়ে ওঠা গোলাকার রেখাঅলা একটা সুবিশাল স্ক্যান্ডেনেভীয় নকশা— দুজন শ্মশ্রুমণ্ডিত দেবতা আমাদের আলাপে সভাপতিত্ব করছেন। মিষ্টি, প্রীতিকর সোভিয়েত শ্যাম্পেইন খেয়ে চললাম আমরা।
ওই মুহূর্তে আমাকে বিশেষ করে কৌতূহলী করে তোলা সাহিত্যে আন্তর্জাতিক প্রবণতা কিংবা সোভিয়েত কবি ও আমেরিকান লেখকদের ভেতর সম্ভাব্য যোগাযোগ-সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে অস্বীকার করে গেছেন ইয়েভতুশেনকা। কিন্তু বিশেষভাবে শিল্পকলা-সম্পর্কিত অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর সানন্দেই দিয়েছেন। ভাসিলিয়েভ ও নিয়েযভেস্তিনির শিল্পকর্মে ঘেরাও হয়েছিলাম আমরা, প্রথমে তাদের নিয়েই কথা বললেন ইয়েভতুশেনকা। তারপর সাক্ষাত্কার চালিয়ে যাওয়ার সময় নিজের ডেস্কে বসে উত্তরগুলো টাইপ করলেন, অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত বক্তব্যকে জোরালো করে তুলতে কবিতা আবৃত্তি করতে থামছিলেন। শিথিল ও প্রফুল্ল ছিলেন তিনি, অনেক সময় উঠে কামরায় চক্কর দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে তার সঙ্গে প্রথম দেখার সময়কার সেই একই অস্থির শক্তির প্রকাশ তুলে ধরছিলেন।
‘আমার কাছে আর্নেস্ট নিয়েযভেস্তিনি বর্তমান সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে মেধাবী ভাস্কর। নিয়েযভেস্তিনি হেনরি মুরের সমান মর্যাদার ভাস্কর। তার পরও আর্নেস্ট মাত্র ৩৮ বছরের এবং রাশিয়ান শৈল্পিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। তার কাজগুলো শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত কিন্তু বাহ্যিকভাবে বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গির নজির। পাশ্চাত্য কোনো দর্শকের চোখে এটা সামঞ্জস্যবর্জিত: স্টাইলের উপরিগত, মসৃণ ঐক্যকে গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছ তোমরা, নিয়েযভেস্তিনি সার্বিক অর্থেই বাস্তববাদী। আমি শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে জীবনে প্রত্যক্ষ, জোরালোভাবে দেখা মেলা যেকোনো কিছুতেই বাস্তববাদ দেখি। নিয়েযভেস্তিনির সবচেয়ে বাস্তববাদী কাজগুলো যদিও সবসময় কল্পনার এক ধরনের উপাদান, গভীরে এক ধরনের মাত্রা ধারণ করে, সেখানে তার কল্পনানির্ভর কাজগুলো বাস্তববাদের উপাদান ধরে রাখে। পিকাসো একই কারণে আমার কাছে আবেদন সৃষ্টি করেন: তার বাহ্যিক ঔদার্য আসলে মনোযোগের সর্বোচ্চ রূপেরই প্রকাশ। পিকাসো আগুন, তার শিখা সব কোণে পৌঁছে যেতে পারে। তবে মূলসত্তা সবসময়ই একই থাকবে।
আর ভাসিলিয়েভের বেলায় পিকাসোর মতোই সমান ঝোঁক রয়েছে তার, সবকিছুর চেষ্টা করতে চান তিনি— তেল, সিরামিক, মেটাল, মোজায়েক, পাথর... তিনি ঝুঁকি নেন, ব্যর্থতাকে ভয় পান না, এমনকি খোলামেলাভাবে অনুকরণের সময়ও নিজের মতো থাকতে পারেন। বিস্ময়কর তার শক্তি। আধুনিক শিল্পকলার মূলধারায় যদি নাও থেকে থাকেন, ব্যক্তিপূজার কালে যেটা ছিন্ন করে দেয়া এই বাঁধনকে ধরে রাখা গিঁট ছিলেন তিনি। তোমার কি মনে হয় না, ছিন্নপ্রান্ত ধরে রাখতে সাহসী প্রয়াস পেতে হলে যেনতেন একটা গিঁট হওয়ায়ও বিরাট গৌরব রয়েছে?’ (আমি পরাবাস্তববাদ যুগের স্পষ্ট প্রতীকে পরিপূর্ণ সোভিয়েত আভান্তে-গার্দে চিত্রকলার তেমন একটা সমঝদার নই, টের পেয়েই একথা বলেছেন ইয়েভতুশেনকা।) ইয়েভতুশেনকা চিত্রকলাকে নিজস্ব একটা ধারার বদলে বরং সাহিত্যের একটা প্রসারণ মনে করা রাশিয়ান কেতায় আগ্রহী জানা থাকায় এবং বিতর্ক এড়াতে— কারণ চিত্রকলা নিয়ে আমাদের ভেতর ভিন্নমত চলছিল— সোভিয়েত কবিতার ভবিষ্যত্ নিয়ে তিনি কী ভাবছেন জানতে চাইলাম।
‘এ মুহূর্তে আমাদের জীবনে প্রীতিকর পরিবর্তন ঘটে চলেছে,’ জবাব দিলেন তিনি, ‘এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেটা অনুভূত হচ্ছে। সাহিত্যের বলয়ে কবিতাতেই নিজেদের সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এখন রাশিয়ায় বহু কাব্যিক ধারা চলছে, অনেকটা ঘোড়ার দুলকি চালে ছুটে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো। অতীতের চিন্তা-ভাবনার শেওলা ধরা নুড়িপাথর দখল করে নিচ্ছে সেগুলো...।
কিছু মানুষ অবশ্যই নুড়িপাথরের চিন্তা-ভাবনা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার মতে, আজকের দিনে রাশিয়ান কবিতাকে পরিহাস আর সংশয়ী দৃষ্টিতে দেখা প্রায় অপরাধ। সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর কবিতার যে প্রভাব রয়েছে, দুনিয়ার আর কোন জিনিসটার তা আছে? আর কোন কবি দেশের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন?’
এরপর আওতার দিকে ক্রমেই বেড়ে ওঠা বার্ষিক উত্সবে অংশগ্রহণকারী কবিদের বার্ষিক সংকলন প্রকাশের ভেতর দিয়ে চিহ্নিত ডে অব পোয়েট্রির কথা বললেন ইয়েভতুশেনকা।
‘কয়েক বছর আগে কবি ভ্লাদিমির লুগোভস্কি প্রতি বছর প্রকাশ্যে কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করলে সবাই এর সাফল্যে বিশ্বাস করেনি: কিন্তু ডে অব পোয়েট্রি এখন রাশিয়ান জীবনযাত্রার অংশ, একটা প্রতিষ্ঠান, জনতার উল্লাসের একটা উপলক্ষ...। এই দিনে বুকস্টোরের কাউন্টারে বসেন কবিরা, অটোগ্রাফ দেয়া বই বিক্রি করেন, নিজেদের পঙিক্ত আবৃত্তি করেন এবং পাঠকদের সঙ্গে কথা বলেন। সারা দেশেই ঘটে এটা। কিন্তু মস্কোয় এর বিশেষ মাত্রা রয়েছে। ওই দিন সন্ধ্যায় মস্কোর কবিরা মায়কোভস্কির মূর্তির সামনে সমবেত হয়ে ৮-১০ হাজার মানুষের বিশাল সমাবেশের সামনে আবৃত্তি করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি অক্টোবরের জোরালো বাতাস সত্ত্বেও শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে শ্রোতারা। এমন বছরও ছিল, যখন সারা দিন তুষারপাত হয়েছে কিন্তু জনতা ছত্রভঙ্গ হয়নি; ঝড়ের ভেতরই দাঁড়িয়ে শুনে গেছে।’
আমি বললাম, হয়তো সঠিক বিনোদনের অভাব কবিদের অনুসরণের কারণ হতে পারে।
‘না, না,’ প্রতিবাদ করলেন ইয়েভতুশেনকা, ‘আবৃত্তিকারীরা মোটেই দলবদ্ধ ভাঁড় নন। একটা কিছু পরিপক্বতা না থাকলে কবিতার মতো গূঢ় শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের এমন ব্যাপক অনুসারী থাকতে পারে না। মস্কোর যেকোনো বইয়ের দোকানে গিয়ে আখমাতোভা, বেল্লা আখমাদুলিনা, বরিস স্লুতস্কি কিংবা আন্দ্রেই ফসনেসেনস্কিদের কাব্যিক রচনা কেনার চেষ্টা করে দেখো। বই বিক্রেতারা তোমার উদ্দেশে স্রেফ কাঁধ ঝাঁকাবে...।
আমার মনে দুটো বিষয় এর ব্যাখ্যা জোগাতে পারে। প্রথমত. এইমাত্র আমি যেসব কবির নাম বললাম, তারা প্রকৃত কবি; মনিবদের তোষামোদি করে রাজকবিদের পঙিক্ত রচনা করে নিজেদের কবি দাবি করার দিন ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে আমাদের বহু অসাধারণ পাঠকও আছে, মনোযোগী এবং বিবেচক। তার মানে এটা বলছি না যে, এইমাত্র আমি যেসব কবির নাম উল্লেখ করেছি (এবং আরো অন্য অসাধারণ কবি, যাদের নাম পশ্চিমের কাছে কোনো অর্থই বহন করবে না) পাঠকদের রুচির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, সেই রুচি যতই পরিমার্জিতই হোক। বিপরীত দিক থেকে এ কবিরা জনরুচি নির্মাণে অবদান রেখেছেন, রুচি নির্মাণ ও বিকশিত করেছেন তারা এবং এটাই তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঘটনাক্রমে আমি যাদের কথা বললাম, তাদের ভেতর প্রচুর পার্থক্য রয়েছে। ফযনেসেনস্কির এক ধরনের দর্শনীয়, ছন্দময় ঘূর্ণিভরা অ্যাটোমিক কায়দা রয়েছে। আখমাদুলিনা সংযত, তিনি শব্দের পরিশ্রমী রত্নকার কিন্তু তার পরও গীতিময়, সম্পূর্ণ আমাদের কালের। অন্যদিকে বরিস স্লুতস্কি পুরোপুরি অ্যাটোমিক জোয়ার থেকে বঞ্চিত, স্টোনকাটার তিনি, স্টোনকাটারের মতোই পৌরুষময় কবি। মর্তিনোভ সংকেতময় হতে পারেন, পরিহাসের উদ্গাতা। তার পঙিক্ততে গভীর দার্শনিক ভাবনা এক মোহনীয় সুরেলা ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে।
প্রবীণ কবিদের ভেতর, আলেক্সান্দার তভার্দোভস্কি আলাদা হয়ে আছেন। কিন্তু তিনি এখন আগের চেয়ে কম তাড়িত করছেন। আমার মতে, তিনি অসাধারণ কবি কিন্তু তার পঙিক্ততে জাদুর অভাব আছে— অবশ্য, তার কাব্যিক প্রতিভাই এমন। আমাদের চোখে মায়কোভস্কি একদিন যার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারই বাস্তবায়ন ঘটছে:
ওনলি ওয়ান থিং টু মি ইজ ইম্পোর্ট্যান্ট:
দ্যাট দেয়ার বি পোয়েটস,
মেনি এক্সেলেন্ট, ডিফারেন্ট পোয়েটস!
প্রচলিত রাশিয়ান কবিতা আমাদের সবচেয়ে বেশি আপ্লুত করে রাখা প্রশ্নগুলো নিয়ে মাথা ঘামায়, জটিল রাজনৈতিক জিজ্ঞাসা থেকে শুরু করে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো— রাশিয়ান কবিতা কখনই বিশেষভাবে বর্ণনামূলক বা মনস্তাত্ত্বিক কিংবা পাণ্ডিত্যপূর্ণ, এমনকি মেলোডিকও ছিল না (এখন আমি কেবল ভালো কবিদের কথা বলছি; কেবল তারাই প্রতিনিধিত্বমূলক।) এসব উপাদান নিয়েই রাশিয়ান কবিতা নির্মিত, তবে এটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভাবনাকেও ধারণ করে।’
“ব্যতিক্রমবিহীন, আমাদের সব শ্রেয়তর কবি আজকের দিনে এ ধারা বজায় রেখেছেন। এ কারণে তারা ভালোবাসা পাচ্ছেন। এজন্যই যেসব হলে কবিতা আবৃত্তি হয়, সেই সব পাবলিক মিটিং হলে জানালার কাচ ভেঙে পড়ে। কবিতা শুনতে উদগ্রীব জনতাকে সামলাতে গিয়ে মিলিশিয়া হিমশিম খেয়ে যায়। এ জনতা প্রবল, সাড়াদানকারী এবং প্রায়ই উত্সাহী। কিন্তু বিদ্রোহী বা অরুচিকর কিছু এসব পাঠে নেই, অনেক সময় যেমনটা বলার চেষ্টা করা হয়...। কবিতায় আগ্রহ কলঙ্কজনক মনে হওয়ার মতো লোক থেকে থাকলে আমরা তাদের নিয়ে মাথা ঘামাতে যাব না। এ ধরনের ‘কলঙ্ক’ মানুষের অভিরুচি।”
‘আমাদের শ্রোতারা বিকারের উপান্তে নয়। এটা শ্রমিক, ছাত্র, বিজ্ঞানীদের নিয়ে তৈরি। আমরা কবিরা মনে করি যে, আমাদের প্রতি তাদের আগ্রহ ও আস্থা কোনোভাবে ভবিষ্যতের পথে একটা পদক্ষেপ। আমরা তাদের হতাশ না করার চেষ্টা করে যাব।’
জানতে চাইলাম কাদের তিনি তার সাহিত্যিক গুরু মনে করেন।
‘আমি সবসময় যে কারো কাছ থেকে আগ্রহী করে তোলা বিষয় গ্রহণ করার চেষ্টা করি। তা সত্ত্বেও নিজের মতো থাকতে চাই। বুঝতেই পারছো, আমি আমার উদার শিল্পকলার ধারণায় ফিরে যাচ্ছি কিন্তু সেটা কারো ব্যক্তিত্বের শক্তিতে কেন্দ্রীভূত, অন্তঃস্থভাবে, দৃঢ়ভাবে সংহত। তবে আমাকে বলার সুযোগ দাও যে, পুশকিন... এসেনিন আমাকে প্রভাবিত করেছেন। সবাই নানা দৃশ্যমান উপায়ে সাহায্য করেছেন আমাকে। আমার নিজেরই কোনো পঙিক্ত ভবিষ্যতের কোনো কবির উপকারে এসেছে জানতে পারলে খুশি হব। আসলে এভাবেই আমি আমার শৈল্পিক লক্ষ্যকে বর্ণনা করব: তেমন একটা পঙিক্ত লিখতে পারা... ঘটনাক্রমে আমি ওয়াল্ট হুইটম্যানকে পছন্দ করি। পঙিক্তমালার সুরেলা বৈশিষ্ট্যের কারণে পল ভার্লেইনের প্রতিও আমার পক্ষপাত আছে। তোমার চোখে অদ্ভুত ঠেকতে পারে, তবে একসময় চ্যানেসন ডি’আতেনন্নর প্রত্যক্ষ প্রভাবেও কবিতা লিখেছিলাম আমি।’
সমসাময়িক পাশ্চাত্য প্রভাব সম্পর্কে কী বলবেন? জানতে চাইলাম।
‘আমি যেভাবে দেখি, এখানে হেমিংওয়ের প্রভাব সবচেয়ে প্রবল,’ বললেন ইয়েভতুশেনকা। ‘রেমার্কের প্রথম দিকের রচনাও ব্যাপকভাবে পঠিত। সেন্ট-এক্সুপেরি কেবল সম্প্রতি এখানে এসে পৌঁছেছেন, তার উল্লিখিত উপাদান সমসাময়িক সোভিয়েত রচনায় লক্ষ করতে পারে কেউ। ক্যাচার ইন দ্য রাই একটা বিরাট সাফল্য। আমরা পাশ্চাত্য লেখকদের বেলায় উদার, তাদের কৌশল কখনো কখনো ধার করতে পারি। এসব ঋণ কেবল বিচ্ছিন্নভাবে সফল, প্রায়ই সেসব বন্ধ্যা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে অনেক সময় এসব সংগঠিত কিছুর দিকে নিয়ে যায়; বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন সোভিয়েত লেখক জ্যাক প্রিভার্ত্যের কাব্যিক উচ্চারণ কৌশলে যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছেন, কিন্তু তার পঙিক্ততে এ উচ্চারণ সম্পূর্ণ নতুন কিছু এবং রাশিয়ানে পরিণত হয়েছে। ফযনেসেনস্কিতে লে বাতেউর র্যামবাড আর একজন অ্যালেন গিন্সবার্গের সুরের অনৈক্যের বিরোধের বিচিত্র মিশেল রয়েছে। কিন্তু ফযনেসেনস্কি সম্পূর্ণ মৌলিক কবি রয়ে গেছেন...’
দরজায় বেল বাজল। বিভিন্ন উপহার আর শ্যাম্পেইনের বোতল নিয়ে ইয়েভতুশেনকাদের বিদায় জানাতে এসেছেন বন্ধুরা। এর মানে আমার সাক্ষাত্কারের সমাপ্তি, যদিও ১৯৬২ সালে এবং তারপর আবার ১৯৬৪ সালে আমাদের আরো বেশ কয়েকবার কথোপকথন হয়েছে। ইয়েভতুশেনকা ‘আনুষ্ঠানিক’ সাক্ষাত্কারে প্রকাশিত মতামত তেমন একটা বদলাননি।
আমরা থেকে গিয়েছি, বসন্তের গভীর রাত অবধি কথা বলেছি, জানালাগুলো অন্ধকার মোলায়েম মস্কোর দিকে খোলা ছিল। আলাপচারিতা রাশিয়ান ও পশ্চিম, কবি ও কবিতা ঘিরে আবর্তিত হচ্ছিল। ইয়েভতুশেনকার অতিথিরা ছিলেন কবি ও চিত্রকর। সবাই সফরের সৌভাগ্য হয়েছে বলে আনন্দ করছিলেন। এই তরুণ রাশিয়ানদের ভেতর বিদেশের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের এমন আকাঙ্ক্ষা দেখে বিস্মিত হয়েছি। এখন এত বছর পরে সবচেয়ে প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী ও চিত্রকরদের বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার জন্য কিছুই করা হয়নি, তার বদলে ‘সরকারি’ মানসিকতা ও কল্পনাশক্তিহীন লেখকদেরই বেশি করে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উদ্দেশ্যে পাঠাানো হচ্ছে।
৩.
পরিকল্পিতভাবে সোভিয়েত সাংস্কৃতিক প্রাদেশিকতাকে অতিক্রম প্রয়াসী ইয়েভতুশেনকা বারবার বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক কিংবা জাতীয় আনুগত্য নির্বিশেষে ‘ভালো মানুষের সমাজে’র অস্তিত্বে বিশ্বাসের কথা বলে এসেছেন। ১৯৬২-৬৩ সালের শীতে এ দৃষ্টিভঙ্গি দমনের সরকারি কর্মসূচি শুরু করা হয়, কমিউনিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে যাকে অ-অর্থোডক্স মনে করা হয়েছে। তরুণ সোভিয়েত সমসাময়িকদের চোখে ইয়েভতুশেনকাকে খাটো করার লক্ষ্যে— যাদের ভেতর তিনি অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন— অন্য এক তরুণকে তলব করা হয়েছিল: নভোশ্চর ইয়ুরি গ্যাগারিন। রাইটার্স ইউনিয়নের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে আত্মজীবনী প্রকাশ করায় ইয়েভতুশেনকার দেশপ্রেমের ঘাটতির নিন্দা করেন গ্যাগারিন। বলা বাহুল্য, নভোচারীর কণ্ঠস্বর ইয়েভতুশেনকার কণ্ঠস্বরকে চাপা দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। ইয়েভতুশেনকার নেতৃত্বে থাকা তরুণ প্রজন্মের কথা গোটা সোভিয়েত ইউনিয়নে শোনা গেছে, সোভিয়েত জনগণকে রোমাঞ্চিত করেছে, এ রোমাঞ্চ এখনো দেশজুড়ে অনুরণিত হচ্ছে। তরুণ কবিরা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন, সোভিয়েত সাংস্কৃতিক প্রাচীর কতটা সময়বিরোধী, সেটা দেখিয়ে দিচ্ছেন।
কেবল রাশিয়াতেই নয়, বরং আজকের দিনে যেকোনো জায়গাতেই অপ্রত্যাশিত ভিন্ন কিছুও তুলে ধরেছেন ইয়েভতুশেনকা; মুক্তির কথা বলে এখনো একজন বেপরোয়া কবি লর্ড বায়রন ও ভিক্টর হুগো রোমান্টিসিজমের সময় যেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন, তেমনি জনপ্রিয়তা পেতে পারেন। এ দুজন কবির মতো ইয়েভতুশেনকার শক্তি কেবল সাহিত্যিক সাফল্যে নয়, তার সামগ্রিক ব্যক্তিত্বেই পাওয়া যাবে।
ইয়েভতুশেনকা নিজের ও তার প্রজন্মের অন্য সদস্যদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অর্জনে সাহায্য করেছেন। তার চতুর কিন্তু উদার পাবলিক পারফরম্যান্স ছাড়া তিনি এবং যাদের তিনি তারিফ করেছেন, তারা হয়তো ১৯৬২-৬৩ সালের সোভিয়েত শিল্পকর্মে অসমরূপতার বিরুদ্ধে চালানো অভিযানে টিকতে পারতেন না।
তবু বর্তমানে রাশিয়ায় অপরিবর্তনীয় আদর্শগত গোঁড়ামি এবং তার নিজস্ব শৈল্পিক সীমাবদ্ধতার কারণেও ইয়েভতুশেনকা সোভিয়েত জনগণের বাক-স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেননি, তিনি স্বয়ং যে মুক্তি সূচিত করেছিলেন। উদ্ভাবকদের ভাগ্য প্রায়ই এমন হয়। ১৯৬৫ সালে পাঠকদের একটি নতুন এবং আরো বেশি চাহিদাসম্পন্ন প্রজন্ম প্রায়ই ধারণাগত দিক থেকে তাকে বড্ড উপরিগত, নিজের ইমেজের প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্ত, কোনো সম্পাদকের দাবি মোতাবেক কোনো একটা লাইন বদলে ফেলতে অতি তত্পর বলে আবিষ্কার করছে।
কিন্তু সাহিত্যিক দৃশ্যপটে এখনো কেউ তার জায়গা নিতে পারেননি, এমনকি একই প্রজন্মের এক অনন্য কবি, যুগপত্ ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী আন্দ্রেই ফসনেসেনস্কিও না। অবশ্য ইয়েভতুশেনকার নেতৃত্ব ক্ষীণ হয়ে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মস্কোর চলমান অনিশ্চিত পরিবেশে জনগণের দিক থেকে সত্যির প্রতি এক চিরন্তন তাগিদ এবং সাহিত্যিক বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের ভেতর একে নিয়ে এক ধরনের ক্রমবর্ধমান ভীতি দেখা যাচ্ছে।
[‘দ্য প্যারিস রিভিউ’র ১৯৬৫ সালের ৩৪তম ও বসন্ত-গ্রীষ্ম সংখ্যায় প্রকাশিত]






