সে চোর নয়। গুণ্ডা, বদমাশও নয়। কারো কাছে কোনো ঋণ নেই। কাউকে খুন করেনি। এমনকি চড়-থাপ্পড়ও মারেনি। দেশের বড় কোনো ক্ষতি সাধন করেনি। কাউকে গাড়িচাপা দেয়নি। এমনকি রাজনীতিও করে না। সাদা, কালো, লাল, নীল কোনো দলের সাথেও নেই। তবে কেন তাকে এত মারধর? ভেবে ভেবে কোনো কূল-কিনারা করতে পারছে না। পায়ের গোড়ালিতে কোনো জোর নেই। মনে হচ্ছে, এখনই ধপাস করে পড়ে যাবে। আচ্ছা, একটা মানুষকে ধরে এত পিটাল, তার পরও ওদের জেদ গেল না? এমন কী অপরাধ করেছে সে? কারো ঘরের বউকে তো সে ভাগিয়ে নেয়নি কিংবা কোটিপতি বাবার কোনো মেয়েকে। তবে কোন অপরাধে? চিত্কার করতে ইচ্ছে করল তার। দেশটা মগের মুল্লুক, যাকে ইচ্ছে তাকে ধরে নিয়ে পিটাবে?

‘এই শুয়োরের বাচ্চারা, আমি একজন ছা-পোষা মানুষ, আমি কিছু করিনি। কোনোদিন কাউকে গালমন্দ করিনি, কারো টাকা-পয়সা চুরি করিনি। কারো পাকা ধানে আগুন দিইনি। কারো বাড়া ভাতে নোংরা ছিটাইনি। আমাকে মারিস না। আমাকে ছেড়ে দে। আমাকে ছেড়ে দে। আমাকে ছেড়ে দে হারামজাদারা। না-হয় আমি সবকিছু ধ্বংস করে দেব। একটাকেও ছাড়ব না।’

কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হলো না।

পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে রেখেছে। শীতল মেঝে। পানি চেয়েছিল, দেয়নি। বিনিময়ে পেচ্ছাব করে দিয়েছে। কই, সে তো রাগে গজ গজ করছে না? এত যে কথা বলত, এখন কেন কথা আসে না। এখন বুঝি মুখ খুলে কথা বের হচ্ছে না। কথাগুলো গেল কোথায়? কথা তার বের হচ্ছে না। কথা তার হারাতে পারে না। ক্লাসে বই পড়ার আহ্বান জানিয়েছে। ছেলেমেয়েদের নতুন স্বপ্নে বিভোর হতে আহ্বান জানিয়েছে। বই কাউকে তো কোনো পচা কথা কিংবা বকাঝকা করে না। তাহলে কোন অপরাধে তাকে এভাবে অসহায়ভাবে মাটিতে ফেলে রাখল।

সে ভাবতে পারছে। তার অপরাধ মনে হয় একটা হয়েছে। ওই যে মুখে আলো খেলা করা ছেলেগুলোকে বলেছিল, হিংস্র জানোয়ারদের চিনতে হবে। ওরা মানবসভ্যতা ধ্বংস করছে। মানুষে মানুষে প্রীতি ও সৌহার্দ ধ্বংস করছে, ওরা সামাজিকতা নষ্ট করছে। ওরা দেশ নষ্ট করছে। একটা ছেলে রোগা ঢেঙ্গা হাত তুলে দাঁড়িয়ে গেল। জিজ্ঞেস না করতেও হড়হড় করে বলে উঠল, ওদের চিনব কেমন করে। মুখে একটু হাসির আভা খেলে গেল কি! থাক ছেলেটাকে আশ্বস্ত করতে কিংবা নিজেকেই আশ্বস্ত করতে বলল, ওরা তোমার বন্ধু সেজে থাকবে। সময়-সুযোগ পেলে তোমার মাথায় বাড়ি মেরে দেখাবে। ছেলেটি কী বুঝল কে জানে! সে যেন অচেনা ভাব করে তাকিয়ে রইল। কিংবা এটাও হতে পারে, ছেলেটি সব বুঝেছে। তাই সে হিংস্র কিছু জানোয়ারের বিরুদ্ধে কথা বলেছে মনে করে হয়তো তাকে এখানে ধরে নিয়ে এসেছে।

দুই.

একবার বুড়ি দাদি জিজ্ঞেস করেছিলেন। বল তো মণি, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু কে? ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিলাম। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। মানুষের বড় শত্রু আবার কে? এ পৃথিবীর সব প্রাণীর বড় শত্রুই তো মানুষ। আবার এটাও হতে পারে, মানুষই মানুষের বড় শত্রু। কিন্তু উত্তরটা আমার মনঃপূত হচ্ছিল না। তাই দাদিকে কোনো উত্তর দিতে পারছিলাম না। দাদি মুখের দিকে তাকিয়ে আমার নাজুক অবস্থা বুঝতে পারছিলেন নিশ্চয়ই। কিংবা তিনি ভাবতে পারছিলেন আমার মাথার মধ্যে টর্নেডো চলছে। তাই তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে উত্তরটা বলেছিলেন। ওনার উত্তরটা আমাকে থমকে দিয়েছিল। ছোট ছিলাম বলে মনে হয় তখন কিছু বুঝিনি। কিন্তু এখন খুব বুঝতে পারছি, জিভকে দাদি সেদিন কেন দোষারোপ করেছিলেন। আর এটাকেই কেন মানুষের বড় শত্রু বলেছিলেন। এরপর এই জিহ্বাকে নিয়েই বিপদে পড়ে তার সহোদর। ও কিছুতেই ওর জিহ্বাকে বশে রাখতে পারছিল না। যেদিকে কথার গুলি ছুড়ে দেয়, সেদিকেই যেন এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। ওর জিহ্বার ধার কমাতে ও শ্রমিক পলিটিকস করত। আর সে কথার খেসারত দিতে গিয়ে কোম্পানির বদনজরে পড়ে চাকরি হারিয়েছে। বউ-বাচ্চা নিয়ে তারপর পথে নেমেছে। শুধু কি তাই, এক ইন্ডাস্ট্রির ম্যানেজারের সঙ্গে দহরম-মহরম হয়েছিল। কিছুদিন না যেতেই সততা ছিটকে ফেলল তাকে। সে দেখল, ওই ব্যক্তির বদগুণ অসহ্য। মুখের ওপরই বলে দিল সবকিছু। সেই থেকে ওই লোকটি ছোটোর পেছনে লেগেই রইল। চা বাগানে ছোটোর ভালো কোনো চাকরিই জুটল না অনেক দিন।

ওরা এই মুহূর্তে তার মা-বাবাকে উদ্দেশ করে গালি-গালাজ করছে। শুধু বেজম্মা নয়, এর সঙ্গে যে অশ্লীল শব্দ বন্দুকের গুলির মতো ছুড়ে দিতে থাকল, তা শুনলে যে কেউ বমি করে দেবে। ওদের মুখে মানুষের মলের গন্ধ। ওদের সঙ্গে কথা বলাই রুচিতে বাধে। সে মায়ের মুখ কল্পনা করে। দেশের মুখ ফুটিয়ে তোলে। নদীর মুখ ভাবে। ফুল-পাখির মুখ ভাবে। মা যদি তার এ খবর পায়, তবে চিত্কার করে কাঁদবে। পাড়ার মানুষজনকে কেঁদে কেঁদে সব বোঝাবে। পাহাড়ের পাশে তাদের নির্জন গ্রাম। সে গ্রামে মা তার চিত্কার করে কাঁদবে, মায়ের পাশে কে এসে দাঁড়াবে? কিছুই ভেবে পাচ্ছে না।

শীর্ণ দেহে বাবা পাগলের মতো দৌড়াবে। এর-ওর কাছে ফোন করবে। তাকে ধরে এনেছে ওরা কত ঘণ্টা হলো, বুঝতে পারছে না। রাত ১০টার মধ্যে বাসায় না ফিরলে শ্রেয়া টেনশন কবে। মায়ের কাছে ফোন না করলে বাড়ি থেকে বাবা ফোন করবে। আর এভাবে তার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটি চাউর হতে সময় নেবে না। ওরা এই মুহূর্তে গালি-গালাজ করছে। কে যেন এসে পাছায় কষে একটা লাত্থি মারল। সেই লাত্থির জোরে তার দেহটা একটু কেঁপে উঠল। পাছার শক্ত দাবনায় যে ঘা খেয়েছে, তার ব্যথা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।

আবার কে যেন কুিসত ভাষায় কথা বলতে শুরু করল। হারামখোরের বাচ্চা, খুব কাপ্পিগিরি দেখাছ না? একদিন একাডেমিক ভবনের সামনে বসেছিলাম, গার্লফ্রেন্ডের সামনে কী অপমানটাই না করল। পায়ের ওপর পা দিলে সমস্যা কী তোর? এই শালা বানচোৎ। এখন কই তোর কাপ্পিগিরি? পণ্ডিত হইছস? বড় ভাই কইছে, তোর চোখ উঠাইয়া নিবে, চামড়া ছিল্লা ডুগডুগি বানামু। ক্যাম্পাসে তোর চামড়া ছিলা শরীর খান ঝুলাইয়া রাখমু। খ্যাক খ্যাক করে হাসির রোল উঠল। চারপাশে হায়েনার দল আছে বুঝতে বাকি নেই তার। কিন্তু চোখে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। মুখটাও এমনভাবে বেঁধেছে, যেন কোনো শব্দ না বের হয়। মনে মনে সে ভাবল, তার আসল শক্তির জায়গা ওরা উদ্ভাবন করে ফেলেছে। না হলে মুখটা এমন শক্তভাবে বেঁধে রাখত না। কথা বলতে পারলে এখনই ওদের হূদয়ে গোলাপ ফোটানোর ব্যবস্থা করত। সে তো এ ব্রত নিয়েই কাজ করে। তা কথার জাদুতে ওদের চিত্ত গোলাপ বানিয়ে দিত। কিন্তু ওরা সে কাজটি করার কোনো সুযোগ রাখেনি। মনে হয় ওপরের নির্দেশনা আছে। বলেছে, নিশ্চয়ই এ বদলোকটার মুখ টাইট করে বেঁধে রাখবি, যাতে কথা না বলতে পারে। হয়তো এমনও বলেছে, লোকটা একটা জাদুকর। ভবিষ্যৎ কোনো নেতৃত্বের উত্থান সে সহ্য করে না।

মায়ের করুণ মুখটি ভেসে উঠল। মায়ের মুখে কত শুনেছে সে তার জন্মের ইতিহাস। তাকে জন্ম দিতে গিয়ে মাকে কতই না ছোটাছুটি করতে হয়েছে। যুদ্ধের বছরে তাকে পেটে নিয়ে জীবন বাঁচাতে মাকে ছুটতে হয়েছে। জলা-ঝোপ-ঝাড় ভেঙে ছুটে চলা খুবই কষ্টের ছিল। বাড়ির ওপর দিয়ে যখন গুলির ছররা আগুনের ফুলকি হয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি দৌড়ে গিয়ে গলাসমান ধানক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে পড়তেন। সঙ্গে সঙ্গে দাদিও যেতেন। মায়ের দিকে তার কড়া নজর ছিল। কারণ মায়ের যেকোনো সময় প্রসববেদনা শুরু হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছিলেন তিনি। রাতের বেলা প্রায়ই অনেক অচেনা মানুষ আসত তার বাবার কাছে। তারা এলেই বাবা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন। মা অসুস্থ শরীর নিয়ে চুলো জ্বালাতেন। ভাত, আলুর ভর্তা ও ডাল রান্না করতেন। চুলো থেকে নামিয়েই লোকগুলো খেতে বসত। গরম গরম ভাত, আলু ভর্তা আর ডাল ফুঁ দিয়ে খেত। মা দেখতেন আড়াল থেকে। তার মনে হতো, লোকগুলো যেন আগুন খাচ্ছে। ক্ষুধার্ত লোকগুলোর বর্ণনা মা করতেন অসাধারণভাবে। খাওয়ার পর বিদায় নেয়ার সময় বাবাকে লোকগুলো বলতেন, আলা ভাই, আপনেরে বিপদে ফেলাইলাম। ভাবিসাব অসুস্থ শরীর নিয়া রাইন্দা খাওয়াইছে আমাগো। আল্লাহ আপনেগো ভালো করব। বাবা ওদের খাওয়াতে পেরেই তৃপ্ত। তিনি বড় খুশি হয়ে ওনাদের আরো শক্তি নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহস জোগাতেন। সে কথা আরো পরে যখন তার বুদ্ধি হয়েছে, তখন সে মায়ের কাছে অনেকবার গল্প শুনেছে। কিন্তু ঈদের আগের দিন তার জন্মদিনের কথাটি মা যতবারই বলেছেন, ততবারই তিনি অশ্রুসিক্ত হয়েছেন। মা বলতেন, সেদিন রাজাকার আর পাকসেনাদের ভয়ে তারা দূরের গ্রাম আমতলীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমতলীর জমিদার পরিবার শামসু চেয়ারম্যানের বাড়িতে পাহাড়ি গ্রাম কৈয়াছড়া থেকে আসা অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে। সারা দিন উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠায় কাটিয়ে মায়ের খুব শোচনীয় মুহূর্ত শুরু হয়েছিল। বিকালের দিকে যখন মায়ের শরীর খারাপ হতে থাকে, তখন তিনি দাদির কানে কানে বলেছেন, আম্মা খারাপ লাগতেছে, চলেন বাড়ি যাই। সে সময় দাদি মনে হয় মায়ের কথা বুঝতে পারলেন। দাদি দেরি করলেন না। শেষ বিকালে বউকে নিয়ে আমতলী গ্রাম ছাড়লেন। হালদা পেরোতেই মা ব্যথায় চেঁচাতে শুরু করলেন। তখনো ১০-২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে হবে। আর এদিকে ইফতারের সময় হতেও খুব দেরি নেই। দাদি বললেন, একটু ধৈর্য ধরো। আর অল্প পথ। দাদি মায়ের কষ্ট দেখে নিজেও কেঁদে ফেললেন। নির্জন পথে তিনি এই মুহূর্তে কী করবেন? একটু পরই চা বাগানের পথ শেষ হবে। পথটুকু পেরিয়েই তিনি প্রথম বাসায় উঠে গেলেন। বাড়ির সবাইকে বুঝিয়ে বললেন। ইফতারের সময় হয়েছিল, সবাই তখন ইফতার নিয়ে বসেছে। দাদিও রোজা ছিলেন। তবে মুখে পানি দিয়ে এসেই তিনি আম্মার প্রসববেদনা দূর করতে যথাসাধ্য চেষ্টায় মগ্ন হলেন। ঠিক সন্ধ্যার মুখে তার জন্ম হয়েছিল। যদিও সময়টা ছিল খুব দুর্যোগের। আজ এই বিপদের মধ্যেই সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ল। মায়ের মুখে শোনা গল্প থেকেই চোখে অদ্ভুত ছায়াছবির মতো ঘটনাগুলো জীবন্ত হয়ে উঠল।

তিন.&dquote;&dquote;

নগরের সেনাপতি অনেকেই আছেন। তাই রূপনগরের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে চলে মল্লযুদ্ধ। সেনাপতিদের সৈন্যের অভাব নেই। তরুণ মেধাবী ছাত্রদের চাপ দিয়ে দীক্ষা নেয়ার প্রকল্প প্রতি সেনাপতি নিয়ে থাকেন। রূপনগরের দাপট দেখাতে হলে সৈন্যসংখ্যা বাড়াতে হবে। রূপনগর যতই রাজধানী বলে স্বীকৃতি পাক না কেন, এর রূপ দেখে কখনো রাজধানী বলবে না লোকে। রাস্তাঘাটের খুব শোচনীয় অবস্থা। নগরের প্রধান রাস্তায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়, আর গাড়ির যানজট। জনজীবনের নাকাল অবস্থা। উড়ালসেতু রূপনগরের আকাশটাকে ঢেকে দিয়েছে। এ নগরের বুকে যত স্কুল, বিদ্যালয় আর মহাবিদ্যালয় আছে, সবই কোনো না কোনো সেনাপতির আন্ডারে। তাদের মতামতের ওপরই সব প্রতিষ্ঠানের বাঁচা-মরা। কেউ কোনো ব্যতিক্রম কার্যক্রম করতে পারবে না। কেউ কোনো মতামত প্রকাশ করতে পারবে না। কেউ তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারবে না। কেউ কোনো সমালোচনা করতে পারবে না। সর্বত্র তাদের রাজত্ব। তবে এখানেও কথা আছে। নগরের পাঁচজন সেনাপতির মধ্যে এলাকা ভাগ থাকলেও সীমানা বৃদ্ধির জন্য তারা প্রতিনিয়ত সংঘাতে লিপ্ত হয়। এলাকায় প্রাধান্য বিস্তার নিয়েও নিজেদের মধ্যে লেগে যায় ধুন্দুমার। নগরের পঞ্চম সেনপতি শৌর্য-বীর্যে খুব খ্যাতিমান। তার দলের নবীন কর্মীরা দুর্ধর্ষ তুর্কি। সেনাপতির আদেশ তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। সেনাপতির আদেশ মানতে গিয়ে কারো মৃত্যু হলেও তার নাম স্মৃতি দিয়ে লেখা থাকে। শুধু তা-ই নয়, তার নামে নগরের বিভিন্ন জায়গায় তোরণ নির্মাণ করা হয়। তার নামে বিজয় মিছিল বের করা হয়। নগরের পঞ্চম সেনাপতির দল ক্রমেই ভারি হচ্ছে। সে যে কৌশলে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করছে, অন্যরা এসবের ধারে-কাছেও নেই। পঞ্চম সেনাপতি তার তরুণদের হাত থেকে বইপত্র কেড়ে নিয়েছে। তাদের কমান্ডো স্টাইলে ট্রেনিং শুরু করেছে। কোমরে থাকে ক্ষুদ্র মারণাস্ত্র। তাদের তিনি রূপনগরের সব প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছেন। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, ক্লাব, মহল্লা, বাজার, স্টেশন, আনাচে-কানাচে তিনি তার মন্ত্র উচ্চারণের নির্দেশ দিয়েছেন। এ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু সমস্যা হলো হঠাৎ করে। রূপনগরের বেহাল দশায় জনদরদি হওয়ার জন্য সুশীল সমাজ যখন একজোট হতে শুরু হলো, তখন তাদের সভা ও মানববন্ধন পণ্ড করার জন্য যে দলটাকে তিনি হকিস্টিক দিয়ে পাঠালেন, তারা তাকে বিস্মিত করল। সারা রাত তিনি পায়চারি করলেন। ইতিহাসে কোথাও মনে হয় এমন কোনো ঘটনা লেখা নেই। সে মনে হয় একা, যে ওই ঘটনার সাক্ষী। মূল ঘটনা হলো, সেদিন তার বিশেষ এই কমান্ডো দলটি ওই সুশীল সমাজের সুবোধ প্রতিনিধিদের হকিস্টিক দিয়ে ঘাড় না মটকে হাতে একটা একটা রজনীগন্ধার স্টিক দিয়ে এসেছে। একদল হায়েনাকে পাঠিয়ে দিয়ে সে দেখতে পেল নেড়ি কুকুর। অপমানে রাগে ক্ষোভে তার ব্রহ্মতালু দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল। কিন্তু পঞ্চম সেনাপতি ভেঙে পড়লেন না। তিনি অপেক্ষা আর ধৈর্য ধরলেন। ধীরে ধীরে রূপনগরের সেনাপতি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সেনাপতির কাছ থেকে একই খবর এল। তাদের দলেও একই অবস্থা। এ সংবাদগুলো মহাদুশ্চিন্তায় ফেলল রূপনগরের সেনাপতিদের।

চার.

রাতের কালো অন্ধকার দিনের আলোর স্বাদ পেয়েছে। তার পরও তাকে খেতে দেয়নি। ঠোঁট কেটে গেছে। মাথা ফেটে গেছে। শরীরের ত্বক ছিলে গেছে। তাকে নিয়ে এতক্ষণ নিশ্চয়ই জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। তার গুম হওয়ার খবরটি কি চাউর হয়ে গেছে? তার গুম হওয়ার খবরটি তার স্ত্রী, মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই জেনে গেছে? ওরা কী করছে? তার খুব জানতে ইচ্ছে করছে।

সবাই এখন কী করছে? বিশেষ করে তার মা? তার বাবা? তার স্ত্রী? তার প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি খবর পাবে না। পেয়েও যেতে পারে। একটা ফোন দিলেই তো খবর এখন ছড়িয়ে যায় সব জায়গায়। কিন্তু তার ফোনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে ওরা। গত রাতে যখন তাকে ধরে, তখনই ফোনটাকে অকেজো করে দিয়েছে। একজন মোবাইলটাকে ছুড়ে মেরেছিল। আর মোবাইলটা উড়ে গিয়ে একটা প্রাইভেট কারের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে যায়। তার মানে ওটা এখন মৃত। তারপর শেষ রাতের দিকে যখন তার ঝিমুনি এসেছিল, তখন মনে হয়েছিল, তার ফোনটা বুঝি কোথাও বেজে চলেছে। একটা অস্থিরতা তার ভেতরে পেয়ে বসেছিল। ভেবেছিল সে ঘরেই বুঝি রাত্রিযাপন করছে। কিন্তু চোখ খোলার পরও যখন সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না এবং কথা বলতে গিয়ে যখনই কোনো কথাই বলতে পারছিল না, তখন তার মনে পড়তে শুরু করে, তার জীবনে গত রাতে কী ঘটেছে।

সে প্রতিদিন যাদের কথা শোনাত, ওরা কি খবরটা জানতে পেরেছে, সে আর কোনোদিন তাদের কথা শোনাতে আসতে পারবে না। না, মনে হয় কেউ চিন্তা করবে না। চেনা-জানা অনেক মানুষের কথা মনে আসছে তার। গত দিনের একটা ঘটনার কথা খুব মনে পড়ছে। পরস্পর দুই সেনাপতির উন্মত্ত তুর্কি যোদ্ধারা যখন মুখোমুখি, তখন সে একটি শ্রেণীকক্ষে ক্লাস নিচ্ছিল। হট্টগোল শুনে বের হয়ে এল। দেখতে পেল দুই পক্ষের হাতেই ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র। খুনোখুনি যেকোনো সময় বেঁধে যেতে পারে। সে তাড়াতাড়ি এসে মাঝখানে অবস্থান নিল। গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা শুরু করল। বলো সবাই মা-মাটি-দেশ। সার্বভৌম অস্তিত্ব এসব কিছু মিথ্যে নয়। এসো, নতুন দিনের শপথ করি। এসো, নতুন শপথ করি মায়ের ছেলেরা মায়ের বুকে ফিরে যাও। এ দেশ তোমার আমার। এ মায়ের বুকে যেন কোনো সন্তানের রক্ত না ঝরে। সবাই ডান হস্ত সামনে বাড়াই। এসো, নতুন শপথ করি। হস্ত প্রসারিত করে আলোর মিছিলে শামিল হতে এগিয়ে চলো। মা-মাটি-দেশ তোমার যত্ন করব অনিঃশেষ। এগিয়ে চলল শখানেক তুর্কি তরুণ। অতিবর্ষায় এবড়ো-খেবড়ো হওয়া রাস্তা মেরামত করতে লাগল। ভিড় লেগে থাকা বাসগুলোকে সরিয়ে দিয়ে যানজট কমাতে সাহায্য করল। খোলা মাঠের মধ্যে বসে মা-মাটি-দেশ নিয়ে আবারো সেই বক্তব্য প্রদান করল। একজন একজন ডেকে চোখের ভেতর দিয়ে অদ্ভুত দ্যুতি পাঠিয়ে দিল। যেন কোনো দিন কারো মাথায় লাঠি না মারতে পারে। প্রতিদিনই এমন নতুন নতুন তরুণদের দলে তার অভিযান চলতে থাকল।

পাঁচ.

সেদিন রূপনগরে সাজ সাজ রব। পঞ্চ সেনাপতির মধ্যে কে প্রধান সেনাপতি হবেন, তারই মহড়া চলছিল। নগরের সাধারণ মানুষ তাদের শত শত মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক মাইক্রোবাসের শোভাযাত্রা দেখছিল। তবে রূপনগরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাঠ লাল মাঠ কে দখল করবে? সে নিয়ে বিবাদ তুঙ্গে। পঞ্চ সেনাপতি তাদের সব তরুণকে শক্তি প্রদর্শনপূর্বক লাল মাঠ দখলের হুকুম জারি করলেন। তারা বললেন, রক্তের গঙ্গা বইয়ে দাও। তার পরও লাল মাঠের অধিকার চাই। কিন্তু অবাক কাণ্ড, পঞ্চ সোনাপতির তরুণ তুর্কিরা এসে বিপদে জড়াল না। কোনো মারপিট করল না। খুনোখুনি করল না। কারো রক্ত ঝরাল না। কারো মাথা ফাটাল না। করণ তারা এরই মধ্যে রূপনগরের অলৌকিক মানুষের কথা শুনেছে। তারা লাল মাঠে এসে লটারি করল। কে নির্দিষ্ট দিনে সবার আগে লাল মাঠে বক্তৃতা করবে। লটারি অনুযায়ী তারা ঠিক করল একের পর এক বক্তৃতার ক্রম। এসব দেখে পঞ্চ সেনাপতি রেগে অগ্নিশর্মা। কার বুদ্ধিতে এ লড়াকু অগ্নিসৈনিকেরা এমন সাধুর আচরণ করছে? তবে সারা দেশে তথা রূপনগরের ভবিষ্যৎ কি অন্ধকার? এটাই নিশ্চিত জেনে পঞ্চ সেনাপতি এক হয়ে তরুণ সৈনিকদের এমন অধঃপতনের কারণ উদ্ঘাটনের জন্য উঠে পড়ে লাগল। শিগগিরই তারা কারণ আবিষ্কার করতে সক্ষম হলেন। যখন তারা দেখলেন, রূপনগরের যুবা পুরুষদের পালটে দিচ্ছেন একজন শিক্ষক, তখন তারা এর ব্যবস্থা করার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন।

ছয়.

কিছুতেই তারা মুখ খুলে দিতে চায় না। তার মানে কি এই, ওরা জানে তার মুখ খুলে দিলে যারা ওকে ধরে নিয়ে এসেছে, ওরাও পরিবর্তিত হয়ে যাবে? মেঝেতে শুয়ে থেকেই সে শুনতে পেল, একজন বলছে, ঝামেলা নিয়ে পাহারা দেয়ার কি আছে! লাশটা চাপা দিয়ে ওপরে টঙঘর বানিয়ে দিই। আরেকজন বলল, তুমি ওনাকে ছদাইয়া-মদাইয়া-কালাইয়া পাইছ নাকি! এ যেমন তেমন লোক নয়! হয়তো পঞ্চ সেনাপতির গ্রুপ থেকেই হট্টগোল উঠতে পরে। তাই স্যাররা বলেছে, আগে পরিবেশ অবজার্ভ করতে হবে। পরে যা হওয়ার হবে।

লোকগুলোর কথা শুনে তার কোনো কিছুই বোধ হচ্ছে না। মরে যাওয়ার ভয় লাগছে না। হাত-পা সব টন টন করছে। লিকুইড খাবার নল দিয়ে টেনে খেতে সাহায্য করছে ওরা। তার মানে আপাতত মারছে না। তার চিন্তায় স্ত্রীর মুখ, মা-বাবার মুখ আর হাজার হাজার সন্তানতুল্য ছাত্রের মুখ ভাসতে লাগল। চুপচাপ শুয়ে শুয়ে সে রূপনগরের সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যের কথা ভাবতে লাগল। সম্প্রতি রূপনগরের বুকে নেমে আসা দুর্যোগের কথা ভাবতে লাগল। ভাবতে লাগল রূপনগরের কোলের কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া রূপেশ্বরী নদীটির কথা। রূপশ্বেরী ধীরে ধীরে বন্ধ্যা হয়ে পড়বে। এখান থেকে ছুটতে পারলে অবশ্যই রূপেশ্বরীর জন্য কিছু করতে হবে। শত শত তরুণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, কী করে রূপেশ্বরীকে বাঁচানোর নতুন আবিষ্কার করা যায়। পাহাড় থেকে নেমে আসা রূপেশ্বরীর এঁকেবেঁকে যাওয়া রুপালি শরীরটা তার চোখে ভাসতে লাগল।

সাত.

রূপনগর ব্যানারে ব্যানারে ছেয়ে গেছে। একটি মানুষ কিছুতেই এভাবে হারিয়ে যেতে পারে না। পঞ্চ সেনাপতি দেখলেন, রূপনগরে কোন গাড়ি-ঘোড়া চলছে না। কোনো কাজ-কাম হচ্ছে না। এমনকি রূপনগরের কোনো দোকানপাট পর্যন্ত ভালো করে খোলেনি। রূপনগরে আজ সব অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে আছে। সব মানুষ আজ রাস্তায় নেমে এসেছে। সবাই স্লোগান দিচ্ছে পঞ্চ সেনাপতির বিরুদ্ধে। এ কথা চিন্তাও করা যায় না। পঞ্চ সেনাপতি কখনো ভাবেননি, তাদের বিরুদ্ধে এভাবে জনসাধারণ ক্ষেপে যেতে পারে। এবং তাদের এত বড় আস্পর্ধা হতে পারে, একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়ার জন্য ওরা তাদেরই দোষী করতে পারে। কখনো এমন হয়নি। এ থেকে মুক্তির উপায় কী?

পঞ্চ সেনাপতির রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। প্রধান সেনাপতি বয়সে প্রবীণ প্রাজ্ঞ। তিনি বয়সে প্রবীণ খুব চিন্তা করে বললেন, কিছুতেই লোকটিকে গুম করা যাবে না।

অন্য সেনাপতিরা আঁতকে উঠলেন। তাহলে উপায়। আমরা দল করব কী করে। ওই লোক তো আমাদের সব তুর্কি সৈন্যকে সুবোধ বালক বানিয়ে দেবে। সুবোধ বালক দিয়ে আর যা-ই হোক দল হয় না। বরং ওদের দিয়ে তখন লুকোচুরি কিংবা দাঁড়িয়াবান্ধা খেলানো যেতে পারে। তখন ওরা একটা ছুরি-চাকু দিয়ে আঙুল কাটতেও ভয় পাবে। কিন্তু লোকটিকে কঠিন শাস্তি দিতেই হবে। যাতে কিছুতেই আর কোনো তরুণকে পাল্টাতে না পারে। আসলে বেটা একজন জাদুকর। আরকেজন বলল, কঠিন জাদু শিখেছে বেটা। আরেকজন বলল, এটা নিশ্চয়ই মায়া জাদু। ছেলেগুলোকে কেমন রাতারাতি পাল্টে দিচ্ছে।

আরেকজন বলল, শুধু মায়া নয়, ছেলেগুলোকে আরেকটু হলেই চুড়ি পরিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখতে হতো। ওদের গলার স্বরও পাল্টে যাবে হয়তো। সবাই তখন মিহিসুরে মেয়েদের মতো কথা বলবে, কাউকে ধমক পর্যন্ত দিতে পারবে না। কিন্তু এখন উপায় কী!

এমন শাস্তি বের করতে হবে, যেন সে আর কোনোদিন কথা বলতে না পারে। সে কোনোদিন মা-মাটি-দেশ— এ কথা উচ্চারণ করতে না পারে।

কেন? কেন?

অন্য সেনাপতিরা উত্সুক হয়ে উঠলেন।

কারণ তার জাদু আছে এ কথাটিতে। মা-মাটি-দেশ। এই তিন শব্দের ভেতরে জাদু লুকিয়ে আছে। সে এভাবে সবাইকে জাদু করে, তাই তাকে মারা যাবে না। কিন্তু কঠিন শাস্তি দিতে হবে, যাতে সে আর কথা বলতে না পারে। এরপর পঞ্চ সেনাপতি অনেক ভেবেচিন্তে লোকটির শাস্তি নির্ধারণ করে বৈঠক মুলতবি করেন।

আট.

সে রাতেই একজন ডাক্তার এসে তার শাস্তির পথটি পাকা করে দিল। তার হুঁশ-জ্ঞান ছিল না। যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন সারা শরীরে যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছে। এখন তার হাত-পায়ের বাঁধন খোলা। রক্ত চলাচল করতে পারছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। আজ তারা সবাই মিলে তার চোখের বাঁধন খুলে দিয়েছে। কালো এক আবরণ চোখ থেকে সরে যাওয়ার পর অদ্ভুত একটা শান্তি এল। দুই চোখজুড়ে এখন ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু মুখের ভেতর তীব্র যন্ত্রণায় তার স্বস্তিবোধ মোটেও ভালো হলো না। এক নামি-দামি গাড়িতে চড়িয়ে তাকে চেনা রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হলো। উত্সুক জনতা একজন-দুজন করে তার পরিচয় জানতে চাইল। তার পরিচয় জানতে পেরে জনতার জোয়ার তাকে নিয়ে রূপনগরের প্রেস ক্লাবের দিকে এগোতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমগুলোর ঘুম ভাঙল। সাংবাদিক আর জনতার ঢলে রূপনগরের প্রেস ক্লাব জনসমুদ্রে পরিণত হলো। সবাই তাকে মঞ্চে বসাল। তার সম্পর্কে অনেক কথাবার্তা বলা হলো। তার ভালো কাজের গুণগান করে নানা বক্তৃতা দেয়া হলো। জনতার করতালি বন্দুকের গুলির মতো ছুটতে লাগল।

সবশেষে এল তার পালা। সবাই অপেক্ষা করছিল তার কথা শোনার জন্য। তার কথার তীব্র শক্তিতে সবাই উজ্জীবিত হতে চাইল। সে উঠে দাঁড়াল। চুপ করে রইল। লোকজন অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। কিন্তু কোনো কথাই বলতে পারল না। তখন সবার অনুরোধে সে তার মুখগহ্বর হা করল। লোকজন তার এ কর্মটি রসিকতা ভেবে হেসে ফেলল। লোকজন মনে করল সে বুঝি হাঁ করে লোকজনকে ভেংচি কাটছে। কিন্তু যারা কাছে ছিল, তারা অবাক হয়ে লক্ষ করল, তার মুখের ভেতর কোনো জিহ্বা নেই। ধীরে ধীরে সে খবর নগরের হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। আর কেউ কোনোদিন তার কথা শুনল না।