প্রাচীনকাল থেকেই মানবসভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে আছে ধাতু ব্যবহারের প্রণালি। সাধারণভাবে মনে করা হয় যে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই ধাতুর ব্যবহার তথা ধাতুবিদ্যার প্রসার ঘটে। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যাবে যে ধাতুর ব্যবহার শুরু হয়েছে শিল্প বিপ্লবের অনেক আগে। আধুনিক ধাতুবিদ্যায় ব্যবহূত অনেক প্রণালির বীজ কিন্তু গাঁথা আছে সেই প্রাচীনকালের ধাতুবিদ্যার মধ্যে।

প্রাচীনকালে ধাতুর ব্যবহারের একটা স্পষ্ট ক্রমবিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রথমে ব্যবহার হতো মূল বা নেটিভ ধাতু। তারপর আসে সেই ধাতুর ব্যবহার, যাকে সহজেই আকরিক ধাতু থেকে স্মেল্টিং করে পাওয়া যায়। আর সবশেষে সেই সব ধাতুর ব্যবহার, যাকে স্মেল্টিং করা কঠিন। সেই সময় যেসব ধাতু ব্যবহূত হতো সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সোনা। ভারতের ইতিহাসে সোনার ব্যবহারের উত্পত্তি এবং বিবর্তনের একটা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বর্তমান লেখায়। 

ভারতের প্রাচীন ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে সোনার চল এখানে অনেক আগে থেকেই আছে। সোনার উল্লেখ পাওয়া যায় বেদে, উপনিষদে, মহাভারতে, রামায়ণে, পুরাণে এবং অনেক বৌদ্ধ, জৈন, আর সংস্কৃত সাহিত্য গ্রন্থে। ঋকবেদে উল্লেখ আছে যে হোম-যজ্ঞ অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহূত পাত্রটি সোনার হওয়া বাঞ্ছনীয়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে সোনার পাত্রকে তুলনা করা হয়েছে পদ্য ফুলের রঙের সঙ্গে—পাত্রটি হবে নমনীয়, চাকচিক্যময় এবং তাতে কোনো আওয়াজ হবে না। 

স্বর্ণ-রৌপ্যের গয়নার প্রচলনের উদাহরণ পাওয়া যায় সিন্ধু-সরস্বতী (হরপ্পা) সভ্যতার নানা শিল্পকর্ম থেকে, যা এখন রাখা আছে দিল্লির জাতীয় জাদুঘরের (ন্যাশনাল মিউজিয়াম) ‘হরপ্পা’ গ্যালারিতে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে ভারতে সোনার ব্যবহার নিওলিথিক (অর্থাত্ প্রস্তর যুগের শেষ পর্যায়) এবং চ্যালকলিথিক (অর্থাত্ প্রস্তর যুগ থেকে ধাতব যুগের মধ্যে; যে সময় তামার ব্যবহার হতো) থেকেই শুরু হয়ে গেছে। পেন্টেড গ্রে ওয়েয়ার (লৌহ যুগে পশ্চিম গাঙ্গেয় অববাহিকা এবং ঘগগর-হাকরা নদীর পাশে পাওয়া), প্রাচীন মেগালিথিক সমাধিক্ষেত্রে এবং আরো বহু ঐতিহাসিক স্থানে স্বর্ণ পাওয়া গেছে। প্রথম দিকে স্বর্ণ বের করা হতো নদীর ধারে আলুভিয়াল বালি ছেনে। তবে ভারতে স্বর্ণখননের ইতিহাস অনেক প্রাচীন—খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকেই কর্ণাটকের মাস্কি এলাকা থেকে স্বর্ণখননের কাজের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া কর্ণাটকেরই কোলার খনির চ্যাম্পিয়ন রিফের থেকে স্বর্ণ খনন করার জন্য মাটির নিচে ৫০ মিটার অবধি যাওয়া হয়েছিল গুপ্ত যুগে, অর্থাত্ তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস, যাকে ইতিহাসচর্চার জনক বলে হয়, তিনি তার বইতে একটা মজার কথা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন যে ভারতের এক ধরনের লোমশ শৃগালসুলভ ‘স্বর্ণ খোঁজা পিঁপড়ে’ আছে, যারা থাকে পারস্য সাম্রাজ্যের একেবারে পূর্ব প্রান্তে। ধরে নেয়া যায় যে তিনি সম্ভবত লাদাখ-গিল্গিট-বাল্টিস্থান অঞ্চলের কথা বলেছেন, যেখানে সত্যিই হিমালয়ান মারমট নামে একধরনের বড় আকারের কাঠবিড়ালি জাতীয় প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়। এ মারমটরা মাটির নিচ থেকে ক্রমাগত মাটি খুঁড়তে থাকে আর এ মাটির সঙ্গে উঠে আসে স্বর্ণ। নদীর ধারে এই মারমটদের খুঁড়ে রাখা মাটি বা বালির মধ্যে প্রচুর স্বর্ণ পাওয়া যেত বলে প্রাচীনকালে নানা উপজাতিরা এসব মারমটের খুঁড়ে রাখা মাটি থেকে স্বর্ণ উদ্ধার করত। ফরাসি নৃতাত্ত্বিক মাইকেল পেইসেল দেওসাই প্ল্যাটো অর্থাত্ ওই লাদাখ-গিল্গিট-বাল্টিস্থান অঞ্চলের মিনারো উপজাতির সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছেন যে এই উপজাতির লোকেরা এখনো এভাবে স্বর্ণ সংগ্রহ করে থাকে। আমাদের ঋকবেদেও (১০.৭৫.৮) আমরা সিন্ধু নদে স্বর্ণ পাওয়ার উল্লেখ পাই, যথা—

svasva sindhuh suratha suvasa hiranyaii sukrta vajinivati I

urnavati yuvatih iilarn-ava tyutadhi vaste subhaga madhuvrdham II

মহাভারতেও পাওয়া যায় স্বর্ণ বহনকারী নদীর কথা (রাজা সুহত্রার রাজ্যে), যা দিয়ে বোঝানো হয় কেন পৃথিবীকে বসুমতী বলা হয়। 

satyanama. vasumati yam prapyasijjanadhipam I

hiranyamavahan, nadzastasminjanapadesvare I

(Mahabharata, Shanti, ২৯.২৬)

কিছু পণ্ডিতের মতে, মহাভারতে যে পিঁপড়ের দ্বারা স্বর্ণ খননের কথা উল্লেখ আছে সেটা খুব সম্ভবত গুঁড়ো স্বর্ণের কথা, যা নদীর ধারে বা নদীর ভেতরের পাথরের গায়ে পাওয়া যায়। এসব প্রাচীন জায়গায় যেখানে একসময় স্বর্ণ পাওয়া যেত সেগুলোর এখনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাদের নামের মধ্যে যেমন সুবর্ণরেখা, স্বর্ণমুখী, সোনাজরী, sonawadi, সোনাপাহাড়ি, সোনেপাত ইত্যাদি। তেমনি এখনো অনেক উপজাতি ভারতে পাওয়া যায় যারা নদীর ধারের বালি থেকে স্বর্ণ ছেনে বের করার কাজে বিশেষজ্ঞ, যেমন সঞ্ঝারিয়া, ঝারিয়া, সনযারাস, তরাস, ডোকরা, বালটি ইত্যাদি উপজাতিরা।

ভারতে স্বর্ণের প্রচলনের সুস্পষ্ট উদাহরণ সেই চালকলিথিক যুগ থেকেই পাওয়া যায়, তবে স্বর্ণখননের সঠিক পদ্ধতি কী ছিল সে নিয়ে এখনো খানিকটা ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাচীনকালের কোনো খনি দেখলে বোঝা যায় যে সেই সময় ফায়ার সেটিং টেকনিক ব্যবহার হতো। এই টেকনিক অনুযায়ী খনির পাথর ভাঙার সময় একবার আগুন দিয়ে পাথরটাকে প্রচণ্ড তাতিয়ে নিয়ে আবার সেটাকে আচমকা ঠাণ্ডা করা হতো। এ প্রক্রিয়া করা হতো যতক্ষণ না পাথরটা ভেঙে যায়। তারপর ভাঙা পাথরকে গুঁড়িয়ে নিয়ে তার থেকে আকরিক ধাতু নিয়ে স্বর্ণ বের করা হতো। 

বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থের আর প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে ভারতে স্বর্ণখননের কাজকে প্রধানত তিনটি কালপর্বে ভাগ করা যায়:  ১. প্রাচীন (৪০০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৭০০-৮০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি, অর্থাত্ গুপ্ত যুগের শেষ অবধি)।  ২. ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ। ৩. ১৮৭০ থেকে ২০০২ খ্রিস্টাব্দ (ব্রিটিশ রাজত্ব থেকে স্বাধীন ভারতের সময়)

এই তিনটি কালপর্বের মধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ খননের কাজ হয়েছে প্রাচীনকালে অর্থাত্ ৩৯০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৭০০-৮০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি। প্রথম আর দ্বিতীয় কালপর্বের মধ্যে অনেক বছরের ফাঁক দেখা যায়, যেটাকে বলা হয় পিরিয়ড অব রিসেশন অর্থাত্ মন্দার বাজার। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ কালপর্বে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভারতের স্বর্ণ খননের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিদেশ থেকে স্বর্ণ আমদানির কাজ জোরকদমে শুরু হয়। ১৮৭০ থেকে ২০০২ খ্রিস্টাব্দ, এই পিরিয়ডে আবার নানান নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে স্বর্ণখননের কাজ শুরু হয় ভূতাত্ত্বিকদের নেতৃত্ব নিয়ে। যেমন কোলার, হুত্তি, গাদাগ এবং রামগিরি—এসব সোনার খনিতে। কিছুদিন পরেই অবশ্য সব থেকে বিখ্যাত সোনার খনি কর্ণাটকের কোলার খনির কাজ বন্ধ হয়ে যায় ৩০০০ মিটার অবধি খননের পর (২০০১ সালে)। কিছু প্রাচীন খনিতে দেখা গেছে সেই সময় খননের কাজ ৬৪০ মিটার অবধি হয়েছিল, যা প্রমাণ করে প্রাচীন খননকারীদের দক্ষতা। নানা কারণে কোনো কোনো খনির কাজ বন্ধ হয়ে যেত, যার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো মাটির নিচে জলের স্তর এসে যাওয়া।  

প্রাচীন ভারতে স্বর্ণের কদর ছিল নানান গয়না আর কয়েন বানানোর জন্য, আর বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহারের কাজে। সেই সময় ভারত আন্তর্জাতিক মহলে বিখ্যাত ছিল স্বর্ণের জন্য। তাছাড়া মসলা আর হিরের বিনিময়ে রোম থেকে উচ্চমানের স্বর্ণ আমদানি হতো প্রাচীন ভারতে। ভারতীয়দের স্বর্ণের প্রতি মোহ সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই প্রায় চলে আসছে এবং এখনো বিন্দুমাত্র মোহভঙ্গ হয়নি। কথায় বলে যে সাধারণ ভারতীয়দের কাছেই এত স্বর্ণ আছে (গহনা আকারে), যা নাকি ইউরোপের অনেক রাজবাড়িকেও অনায়াসেই টেক্কা দিতে পারে।


মণিদীপা দে: ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভ্রমণবিষয়ক লেখিকা