প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ

 

(দ্বাবিংশ কিস্তি)

(তৃতীয় অধ্যায়)

‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় সাহিত্যসমূহের উদ্ভব’ (তৃতীয় পর্ব))

ইয়ুস্ট ভ্যান দেন ভনেদল ও ওলন্দাজ স্বর্ণযুগ (শেষাংশ)

যেসব ধ্রুপদী ফর্ম তিনি আত্মস্থ করেছিলেন, সেগুলো তার একান্ত নিজস্ব বা মৌলিক (original) লেখালেখিকে যথেষ্ট শক্তি জুগিয়েছিল। সেসব রচনার মধ্যে রয়েছে জনসম্পৃক্ত বিষয় বা ঘটনাবলি সম্পর্কে হোরেসীয় ধরনের স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গধর্মী কাজ, সেনেকার রীতিতে লেখা কিছু ট্র্যাজেডি এবং স্পেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে জাতীয় বিজয় উদযাপনমূলক, জাঁকালো বীরত্বব্যঞ্জক পদ্ধতিতে রচিত জয়োল্লাসপূর্ণ কবিতা। সেই সমাবেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত একটি নিরন্তর ধারাবাহিকতা বিদ্যমান: তার মানবতাবাদী বন্ধু ক্যাসপার বারলাইউস রচিত একটি নব্য লাতিন* কবিতার অনুবাদ থেকে। যে কবিতাটি লেখা হয়েছিল কাতুল্লুসের বিখ্যাত ‘চড়ুইপাখি’ ‘sparrow’ কবিতার অনুসরণে, ভার্জিলের অনুসরণে রোমক সম্রাট কনস্তান্তিনকে নিয়ে একটি খ্রিস্টীয় মহাকাব্য রচনার প্রচেষ্টা পর্যন্ত।

{‘নব্য লাতিন’* বা ‘নতুন লাতিন’ কিংবা ‘আধুনিক লাতিন’ হচ্ছে আনুমানিক ১৩৭৫ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ‘মৌলিক’ বা ‘একান্ত নিজস্ব’, বিদ্বজ্জনোচিত ও বিজ্ঞানবিষয়ক রচনায় লাতিনের ব্যবহারের পুনর্জাগরণ, যার পরের পর্বটিকে ‘সমসাময়িক লাতিন’ নামে অভিহিত করা হয় এবং সেটি ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের দিক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। অনুবাদক}

আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ট্র্যাজেডি খাইসেব্রখ্ট্ ভান্ আমস্টেল

(Gysbreght van Aemstel, ১৬৩৭), যা ছিল আমস্টার্ডামের নাট্যাঙ্গনে ভনেদলের সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সাফল্য। এখানে আবারো তিনি ভার্জিলীয় মোটিফের সঙ্গে খ্রিস্টীয় মোটিফের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তবে সেগুলোকে এবার তিনি জাতীয়, এমনকি স্থানীয় পরিবেশ-পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করেছিলেন যেমনয় ঈনিডের দ্বিতীয় সর্গটিকে তিনি আমস্টার্ডামের মধ্যযুগের ইতিহাসের একটি পর্বের ওপর প্রক্ষিপ্ত করে প্রধান চরিত্র খাইসেব্রখ্টেক ওলন্দাজ ঈনিয়াস হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যে কিনা ‘বড়দিন’-এ জ্বলন্ত শহরটা থেকে পালিয়ে যায়।

তিনি যখন তার সময়ের অগ্রগণ্য একজন ট্র্যাজেডি রচয়িতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন, তখন ১৬৩০-এর দশকে দুটো নাট্যানুবাদ ট্র্যাজেডি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির— ধীর কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল, সেনেকার ধরন থেকে দূরে সরে এসে তা গ্রিক নমুনাগুলোর নিকটবর্তী হচ্ছিল। তার Joseph or Sophompaneas (১৬৩৫)— পরে যা Joseph at Court নামে পরিচিত লাভ করে— ছিল নির্বাসিত হিউগো গ্রোটিয়াস রচিত একটি সমসাময়িক নাটকের অনুবাদ। ফারাওয়ের দরবারের একজন জ্ঞানী রাজপ্রতিনিধি সম্পর্কিত এ নাটক ভনেদলের একটি নব্য লাতিন রচনার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ হিসেবে রয়ে গেছে। গ্রোটিয়াস, খেরাদেস ভসিয়াস (Gerardus Vossius) ও অন্যান্য মানবতাবাদীর সংস্পর্শে আসার ফলে তিনি গ্রিক ট্র্যাজেডি রচয়িতাদের অপেক্ষাকৃত উচ্চমান সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। চল্লিশের কোটায় পৌঁছেও তিনি গ্রিক ভাষা শেখার উদ্যোগ নেন এবং তার কিছুদিন পর সফোক্লিসের ইলেকট্রা অনুবাদ (১৬৩৯) করেন, যদিও তখনো তার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। কারণ গ্রিক ভাষার ওপর তার দখল, তখন বা তার পরও সফোক্লিস ও ইউরিপিদিস অনুবাদ করার মতো যথেষ্ট দড় ছিল না। এ দুটো নাটক অনুবাদে ভনেদল অনুবাদক হিসেবে তার আগের কাজের চেয়ে উল্লেখযোগ্য রকমের বেশি স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছিলেন। দুটি টেক্সটের ভূমিকায়ই এ কথা স্বীকার করে নেয়া হয়েছিল যে, গ্রহীতা সংস্কৃতির সাহিত্যিক ও ভাষাতাত্ত্বিক দাবিগুলো একটি আক্ষরিক অনুবাদের (literalist rendering) প্রতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন যে কাব্যানুবাদে, ‘একটি সংকীর্ণ গলাবিশিষ্ট বোতলের ভেতর দিয়ে এক ভাষা থেকে কোনো কিছু আরেক ভাষায় ঢালতে বা স্থানান্তর করতে গেলে খানিকটা বস্তুচলকে পড়া অবশ্যম্ভাবী।’ দুটো নাটকই মঞ্চসফল হয়েছিল। অনূদিত নাটক হিসেবে আমস্টার্ডাম থিয়েটারের সফলতম প্রযোজনাগুলোর অন্যতম ছিল Joseph at Court।

{প্রথম অবস্থানে ছিল কর্নেইয়ের নাটক লা সিড-এর জোহান ভান্ হেইসস্ক্যাককৃত এবং ১৬৪১ াখ্রস্টাব্দে প্রকাশিত অনুবাদ।}

১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে ভনেদল বাইবেলোক্ত জোসেফকে নিয়ে দুটো ‘মৌলিক’ নাটক রচনা করেন এবং প্রায়ই এ তিনটি একসঙ্গে মঞ্চায়ন হতো। সাধারণত ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দেই রচিত তার নাটক ভ্রাতাকেই— যেখানে হাই প্রিস্ট কর্তৃক সঅলের নির্দোষ পুত্রদের হত্যা করতে আদিষ্ট হয়ে নিদারুণ মনোবেদনা নিয়ে পরিভ্রমণরত রাজা ডেভিডকে দেখানো হয়েছে— ভনেদলের প্রথম ‘গ্রিক’ ট্র্যাজেডি হিসেবে গণ্য করা হয়। নাট্যকার এটি তার বিদ্বান মেন্টর ভসিয়াসকে উত্সর্গ করেছিলেন।

{গেরিট জেনসুন ভস্ (Gerrit Janszoon Vos) ছিলেন ক্ল্যাসিকস, হিব্রু ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে একজন ওলন্দাজ পণ্ডিত। জেরার্দাস ভসিয়ুস— এই লাতিন নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন।}

১৬৪০-এর দশকে আবারো ব্যক্তিগত অনুশীলনের অংশ হিসেবে ভনেদল ওভিদের হেরোইদেস (Heroides) অনুবাদ করেন, কিন্তু অষ্টাদশ শতকের আগে তা মুদ্রিত হয়নি। অবশ্য এটি আরেকটি খ্রিস্টীয়করণমূলক imitatio বা অনুকরণের দিকে মোড় নেয়, তবে এবার বেশ কড়া ক্যাথলিক গন্ধসহ পুণ্য কুমারীবৃন্দ, শহীদদের পত্রাবলী, ১৬৪২ (Epistles of the Holy Virgins, Martyrs) হিসেবে। কিন্তু অনুবাদক হিসেবে এ সময়ে তার সবচেয়ে বড় ও উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে ভার্জিলের রচনাসমগ্রের সচেতনভাবে উত্সমুখী গদ্য সংস্করণ (১৬৪৬)। Sophompaneas ও Electra দিয়ে শুরু হওয়া ভনেদলের পরিণত কাব্যানুবাদগুলো যেখানে গ্রহীতা মেরুর কেতাবি দাবিগুলোর প্রতি মনোযোগ দিয়েছে, সেখানে ভার্জিলের রচনার এ গদ্য সংস্করণ বা অনুবাদ সর্বোত্তম পর্যায়ের একটি সাহিত্যিক আদর্শের প্রতি তার সশ্রদ্ধ নৈবেদ্য এবং যেটাকে ভনেদল ভার্জিলের ‘চৈতন্য’ ও ‘আত্মা’, ‘প্রতিটি শব্দ, সিলেবল ও অক্ষরের নিচে লুকিয়ে থাকা মানের বা শব্দের রহস্য’ বলে অভিহিত করেছেন, তার ভেতরে প্রবেশ করে তা সবার সামনে মেলে ধরার প্রচেষ্টা— এ দুয়েরই প্রতিনিধিত্ব করছে একই সঙ্গে। সন্ত জেরোমের প্রতিধ্বনিটি যে পুরোপুুরি আপতিক তা নয়। ভার্জিল সম্পর্কে ভনেদলের অন্তিম উচ্চারণও তা ছিল না। ১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঈনিডের দ্বিতীয় সর্গের একটি কাব্যানুবাদ প্রকাশ করেন এবং সম্পূর্ণ কাব্যানুবাদটি বের হয় ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে। ভনেদল এ রচনাগুলো আমস্টার্ডামের রিজেন্ট শ্রেণীর সদস্যদের প্রতি উত্সর্গ করেন, যাদের কাছে— তিনি বিশ্বাস করতেন— ভার্জিলীয় নায়ক বা বীরেরা নৈতিক ও নাগরিকোচিত সদ্গুণের আদর্শ হিসেবে গণ্য হতে পারেন। অবশ্য মজার ব্যাপার হলো, ভনেদলকৃত ভার্জিলের গদ্যানুবাদই কিন্তু পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ঘন ঘন মুদ্রিত হতো, যা এমন একটি পাঠক শ্রেণীর ইঙ্গিতই দেয়, যারা উত্স টেক্সটের জটিলতাগুলোর ব্যাপারে যথেষ্ট উত্সাহী, যাতে তাদের পক্ষে ভনেদলের পরিশ্রমী কিন্তু তার পরও সুচারু গৃহকোণটির সমাদর করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে তার অনুবাদগুলো ওলন্দাজ ভাষায় ভার্জিলের রচনা অনুবাদেও একটা জোয়ার আনতে সাহায্য করল: ১৬৫০ থেকে ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আরো আধা ডজন লেখক গদ্য ও পদ্যে ঈনিডের আংশিক বা সম্পূর্ণ অনুবাদ নিয়ে আবির্ভূত হলেন। ভনেদল নিজে বাইবেলভিত্তিক মহাকাব্য John the Baptist (১৬৬২)-এর imitatio বা অনুকরণ প্রণয়ন করলেন। কয়েক বছর আগে তিনি বিচিত্র কিছু ছন্দ ব্যবহার করে ‘গীত সংহিতা’র (the Pslams) একটি অনুবাদ প্রণয়ন করেন (১৬৫৭)।

ভসিয়াস ও অন্যান্য পণ্ডিতের সঙ্গে ভনেদলের আলাপ-আলোচনা অব্যাহত থাকার পরিপ্রেক্ষিতে এ ভার্জিল কাব্য নিবিষ্টতা ছাড়াও ১৬৪০ ও ১৬৫০-এর দুটি দশক ধারাবাহিকভাবে কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী নাটক প্রত্যক্ষ করল, যেগুলো ক্রমবর্ধমান হারে অ্যারিস্টটলীয় নীতি অনুসরণ করে রচিত হয়েছিল। ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে যখন মিনস্টারের সন্ধি ডাচ রিপাবলিক ও স্পেনের মধ্যে কয়েক দশকব্যাপী যুদ্ধের ইতি টেনে দিল, ভনেদল তখন সরকারি আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে একটি দেশাত্মবোধক প্যাস্টরাল বা রাখালিয়া জীবনের চিত্রধর্মী নাটক রচনা করেন। তিনি এটি রচনা করেছিলেন গুয়ারিনির Pastor Fido নামক ট্র্যাজিক মেডিটিকে সামনে রেখে। কিন্তু ভসিয়াসের সদ্য প্রণীত Institutiones Poeticae (১৬৪৭)তে এ জন্রা (genre) সম্পর্কিত লেখকের মতামতের অনুসরণে ভনেদল গুয়ারিনির উদাহরণের একটি সংশোধন লক্ষ করেছিলেন। তার সবচেয়ে জমকালো নাটক, স্বর্গের দেবদূতদের নিয়ে লেখা, লুসিফার (১৬৫৪) ছিল একটি একান্ত নিজস্ব তথা মৌলিক রচনা। অন্যদিকে বাইবেলনির্ভর জেপথা (১৬৫৯) রচিত হয়েছিল খাঁটি অ্যারিস্টটলীয় আদর্শনির্ভর ওলন্দাজ ট্র্যাজেডি হিসেবে।

{নাটকটি ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে জর্জ বুকানান (১৫০৬-৮২) রচিত নব্য লাতিন কাজ Jephthe-এর একটি aemulatio বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরনে উপস্থাপিত হয়েছিল এবং তাতে বুকানানের নাটক সম্পর্কে ড্যানিয়েল হেইনসিয়াস থেকে ভসিয়াস পর্যন্ত বিভিন্ন মানবতাবাদী সমালোচনামূলক যেসব কথা বলেছিলেন, সেসব বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল।}

জেপথা যখন মঞ্চায়ন হয়, তখন ভনেদলের বয়স ৭০ বছরের ওপরে এবং ওলন্দাজ সাহিত্যের সেরা লেখক হিসেবে তার খ্যাতি সুপ্রতিষ্ঠিত। তার শৈলী ও বিষয়বস্তুর উঁচু মান সবার সমীহ আদায় করে নিয়েছিল এবং একটি বিশ্বস্ত পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছিল। যদিও তা যে থিয়েটারের দর্শকশ্রেণীর কাছে নিরংকুশভাবে সমাদৃত হয়েছিল তা নয়। তার লুসিফার ঈশ্বরনিন্দার অভিযোগে ভয়ঙ্কর ক্যালভিনীয় আক্রমণের শিকার হয়ে একটি succèss de scandale তথা কেলেঙ্কারিমূলক খ্যাতি বা সাদা কথায়, ভীষণ কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। তার ফলস্বরূপ সেটি মাত্র দুবারের বেশি আর মঞ্চায়ন হতে পারেনি তখন। যদিও প্রথম বছরই নাটকটি সাতবার পুনর্মুদ্রিত হয়। অ্যারিস্টটলীয় সব গুণসমৃদ্ধ হওয়ার পরও তার জেপথা নিতান্ত সীমিত কিছু থিয়েটার দর্শককে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। ভনেদল তার নিজ পথে চলা অব্যাহত রাখলেন বটে, কিন্তু অন্তত আমস্টার্ডামের মঞ্চে তার ধরনের ক্ল্যাসিসিজম বা ধ্রুপদীবাদের দিন ফুরিয়ে গিয়েছিল। তিনি ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের পর যে নয় বা ১০টি একান্ত নিজস্ব কিংবা মৌলিক নাটক রচনা করেছিলেন এবং গ্রিক থেকে সফোক্লিস ও ইউরিপিদিসের যে চারটি নাটক অনুবাদ করেছিলেন, সেগুলো মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছেনি বললেই চলে বা পৌঁছতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছিল।

{ভনেদল সফোক্লিসের Oedipus Rex ও The Trachinian Women অনুবাদ করেছিলেন; দ্বিতীয়টির নাম দিয়েছিলেন তিনি Hercules in Trachin। তিনি ইউরিপিদিসের Iphigenia in Tauris ও The Phoenician Womenও অনুবাদ করেছিলেন। যদিও দ্বিতীয়টি মূলত গ্রোটিয়াসের লাতিন সংস্করণটির ওপর ভিত্তি করে রচিত।}

তার কারণ মূলত আরো জমকালো ইংরেজি ও বিশেষ করে হিস্পানি ধরনে রচিত ট্র্যাজেডি ও ট্র্যাজেডি কমেডির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, যে জন্রার উত্পত্তি টমাস কিড, সিরিল ট্যর্নার এবং সর্বোপরি লোপে দে ভেগার রচনার অনুবাদ থেকে। মোটামুটিভাবে সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝির পর যেমন মানবতাবাদী সংস্কৃতি আর প্রধান গঠনকারী শক্তি হিসেবে রইল না, তেমনিভাবে ভনেদলের স্টেজ ক্ল্যাসিসিজম বা মঞ্চ ধ্রুপদীবাদও শেষ পর্যন্ত দর্শকহীনভাবে বিদায় নিল। যখন ১৬৭০-এর দিকে হঠকারী ও চালবাজিমূলক জাঁকালো দৃশ্য ও নিওক্ল্যাসিক্যাল ধরনের প্রণয়ঘটিত চক্রান্তের বিরুদ্ধে বুর্জোয় প্রতিক্রিয়া ভালোভাবে জেঁকে বসেছিল, তখন নতুন আদর্শটির গায়ে একটি ফরাসি নিওক্ল্যাসিক্যাল তকমা এঁটে গিয়েছিল এবং সেটি এসেছিল সরাসরি ইউরোপের নতুনভাবে প্রাধান্য বিস্তারকারী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে। একটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক যুগ ততদিনে শুরু হয়ে গিয়েছিল।

পরবর্তী পর্ব: ইউরোপীয় মহাদেশে শেক্সপিয়র অনুবাদ