নাদের শাহ কি ইতিহাসে যথেষ্ট জায়গা পেয়েছেন? তার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয় পাননি। পারস্যের ইতিহাস-রাজনীতির পণ্ডিত মাইকেল অক্সওর্থি মনে করেন, বিশেষত পশ্চিমাদের কাছে নাদের শাহ একেবারেই অপরিচিত। কিন্তু মধ্যযুগের বর্ণময় ইতিহাসের শেষভাগের উল্লেখযোগ্য চরিত্র পারস্যের এ সামরিক নেতা। তার সামরিক সাফল্যের কারণে ইতিহাসবিদরা তাকে পারস্যের নেপোলিয়ন, দ্বিতীয় আলেকজান্ডার বলে অভিহিত করেন। অভিজাত নয়, তিনি উঠে এসেছিলেন একেবারে সমাজের সাধারণ স্তর থেকে। তারপর পারস্যের নেতা হিসেবে তার দেশকে মুক্ত করেছেন অটোমান তুর্কি, আফগান ও রুশদের আগ্রাসন থেকে। অটোমানদের ভূমিতে প্রবেশ করে তাদের পরাজিত করেছেন। আফগানদেরও তাদের ঘরে ঢুকে পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছেন। জগত্খ্যাত ভারতের মোগল সাম্রাজ্যের গৌরব দিল্লিকে প্রায় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন, চূর্ণ করেছেন তৈমুর বংশের গৌরব। ১৭৪০-এর দশকে নাদের শাহর সেনাবাহিনী ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সেনা দল।

নাদের শাহর দিল্লি জয়ের বড় রাজনৈতিক তাত্পর্য ছিল। এ ঘটনা থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগলদের দুর্বলতা টের পেয়ে গিয়েছিল। তারা বুঝতে পারে, কোম্পানি চাইলে মোগল প্রশাসনকে হটিয়ে দিতে পারবে। মাইকেল অক্সওর্থি লিখেছেন, ‘নাদের শাহ না থাকলে ভারতে ব্রিটিশ শাসন আরো পরে আসত এবং ভিন্ন চেহারায়, এমনকি ভারতে ব্রিটিশ শাসন নাও আসতে পারত।’

এত কিছুর পরও তাহলে নাদের শাহ কেন ইরানের বাইরে খুব একটা পরিচিত নন? এক্ষেত্রে ব্রিটিশদের ভিক্টোরিয়ান ইতিহাসতত্ত্বের একটি ভূমিকা পাওয়া যায়। ভিক্টোরিয়ান দৃষ্টিভঙ্গিতে পারস্য কিংবা প্রাচ্য মানে অদক্ষ, অধঃপতিত, দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকদের রাজত্ব। এ কারণে তাদের দখল করে তাদের উন্নতি ঘটাতে হবে। কিন্তু এমন চিত্র তৈরি করতে গেলে নাদের শাহর মতো দক্ষ সামরিক নেতা, শাসক, শক্তিশালী চরিত্রকে আড়াল না করে উপায় নেই। আরেকটি ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশও ছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠায় লর্ড ক্লাইভের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। পলাশীর প্রান্তরে তার বীরত্বেই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা—এ মত মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। ক্লাইভের অর্জন অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে তার পলাশী জয়ের ১৮ বছর আগে নাদের শাহর দিল্লি জয়ের ইতিহাসে এবং সামরিক সাফল্যের তুলনা শুরু হলে পশ্চিমাদের অস্ত্র-কৌশলের যে উত্কর্ষের প্রতিষ্ঠিত ধারণা সেটাও প্রশ্নের মুখে পড়ত। আর তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাম্রাজ্য তৈরির মিথ। তাই ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় ইতিহাস বইয়ে নাদের শাহ যথেষ্ট জায়গা কখনই পাননি। এ পর্যায়ে আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য উল্লেখ করা যেতে পারে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারত আক্রমণের আগে নাদের শাহকে নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় আলোচনা হতো। তাকে নিয়ে ভালো-মন্দ খবরও সেখানকার পত্রপত্রিকায় ছাপা হতো।

১৭৩৯ সালে প্রবল পরাক্রমের মোগল সালতানাতকে রীতিমতো উড়িয়ে দিলেন নাদের শাহ। মোগল সম্রাট মাথা ঝোঁকালেন ইরানের শাহেনশাহর সামনে। এ ঘটনা ইউরোপে রীতিমতো আগ্রহের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষে থাকা মিশনারি ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর এজেন্টদের মাধ্যমে খবর ছড়াচ্ছিল ইউরোপে। নাদেরের দিল্লি অভিযান নিয়ে প্রথম লিখিত বিবরণীটি তৈরি করেছিলেন সম্ভবত বাংলায় অবস্থান করা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্টরা। এটি লিখিত হয়েছিল ১৭৩৯ সালে এবং হল্যান্ডে ১৭৪০ সালে প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে অজানা লেখকের একটি বইও প্রকাশিত হয় কিছুদিন পর। বইটি অনূদিত হয়েছিল ইংরেজি, ইতালীয় ও স্প্যানিশ ভাষায়। ব্রিটিশ সংবাদপত্রে তাকে নিয়ে অনেকগুলো নিবন্ধ লেখেন স্যামুয়েল জনসন। ১৭৪২ সালে অ্যাংলো-স্যাক্সন দুনিয়া নাদের শাহর সঙ্গে আরো ভালোভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে জেমস ফ্রেজারের লেখা হিস্ট্রি অব নাদের শাহ বই থেকে। ফ্রেজার তার বইটি লিখেছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্ট উইলিয়াম ককেলের তৈরি করা প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে। এই ককেল নাদের শাহর শাসনামলে ইরানে ছিলেন বেশ কিছুদিন। একই বছর রুশ বণিক জেমস স্লিম্যান ১৭৩৯ সালে তার ইরান সফরের বৃত্তান্ত প্রকাশ করেন, যা ছিল নাদের শাহর উত্থানের ইতিহাস।

নাদের শাহর জন্ম হয়েছিল আনুমানিক ১৬৮৮ সালে। জন্মেছিলেন তুর্কি আধা যাযাবর আফশার গোষ্ঠীতে। পরিবারটি থিতু হয়েছিল পারস্য সাম্রাজ্যের খোরাসানে। পিতা ইমাম কুলি ছিলেন পশুপালক। ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে পরিবারের দায়িত্ব অনেকটা তার কাঁধে চেপে বসে। কাঠ কুড়িয়ে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করে মাকে সাহায্য করতেন। অনেক বছর পর যখন দিল্লি জয় করে ইরানে ফিরেছিলেন তখন তার সেনাবাহিনীকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের জন্মস্থানে। জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে তার জেনারেলদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনারা দেখছেন ঈশ্বর আমার ওপর কতটা সন্তুষ্ট যে আজ আমাকে এমন অবস্থানে তুলে এনেছেন। তাই সাধারণ মানুষকে কখনো অবজ্ঞা করবেন না।’

১৫ বছর বয়সে গভর্নরের বন্দুকধারী হিসেবে নিয়োগ পান। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি গভর্নরের ডান হাত হয়ে ওঠেন। নাদের যখন বড় হয়ে উঠছেন তখন পারস্যের প্রতাপশালী সাফাভিদ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আফগানরা এগিয়ে এল। তাদের হাতে ১৭২২ সালে পতন হলো পারস্যের গৌরব, রাজধানী ইসফাহানের। এ গোলমালের সুযোগে পারস্যের জমিনে থাবা বসায় রুশ ও তুর্কি অটোমানরা। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ তাবরিজ, কেরমানশাহ, হামাদান দখল করে তুর্কিরা। ১৭২০ এর দশক পারস্যের ইতিহাসে এক দুর্যোগকাল হিসেবে হাজির হয়। আফগান নেতা মোহাম্মদ হোটাকি ইরানের উত্তরাঞ্চলের কালাতে শাসন শুরু করেন। কিন্তু তিনি নিজের নামে মুদ্রা চালু করতে গেলে তাতে বাধা দেন নাদের। সাফাভিদদের বংশধর তাহমাস্প ও আফগানদের একটি পক্ষের নেতা ফাতেহ আলী খান নাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন হোটাকি শাসন উত্খাতের জন্য। মানে নাদের শাহ তখন জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছেন। তাহমাস্প এক পর্যায়ে নাদেরকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেন। ১৭২৬ সালে নাদের মাশাদ শহর পুনরুদ্ধার করেন। এরপর তিনি আফগানদের বিরুদ্ধ সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেন। এজন্য তিনি তার সেনাদলকে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে তোলেন। এর বিবরণ পাওয়া যাবে সে সময়কার এক গ্রিক বণিক ও পরিব্রাজক বাসিল ভাটাটজেসের মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন, নাদের ঘোড়ায় চড়ে সেনাদলে প্রশিক্ষণ ময়দানে আসতেন। কর্মকর্তাদের অভিবাদনের জবাব দিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে বসে সেনাদলকে পর্যবেক্ষণ করতেন। এরপর খোঁজ নিতেন সেদিন তার বাহিনী কোন কৌশল, অস্ত্রের অনুশীলন করবে সে বিষয়ে। নিজেও অংশ নিতেন অনুশীলনে। লক্ষ্যভেদে তিনি ছিলেন অব্যর্থ। তার নজরকে বাসিল ঈগলের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

নাদের এশিয়ায় আধুনিক সেনাবাহিনী তৈরির পথপ্রদর্শক। তিনি তার বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যকে আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত করেন। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলাবিধি নিশ্চিত করেন।

১৭২৯ সালের শেষ নাগাদ নাদেরের সেনাবাহিনী তিনটি যুদ্ধে আফগানদের পরাজিত এবং ইসফাহান পুনরুদ্ধার করে। এর মাধ্যমে সাফাভিদ বংশধর তাহমাস্পকে পুনরায় শাহ ঘোষণা করা হয়। এ সময় নাদের সেনাবাহিনীর ব্যয় নির্বাহের প্রয়োজনে কর আদায়ের অধিকার দাবি করেন এবং তা পেয়েও যান। এর মাধ্যমে নাদের রাষ্ট্রের মধ্যে নিজের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন।

এ সময় নাদের নিজেই বুঝতে পারেন পারস্যের ইতিহাস এবার তার হাতেই। সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই শাহ হবেন। প্রভাবশালীরা সমর্থন দিলেন। অবশ্য ‘না’ বলার উপায় ছিল না। কারণ পারস্যের দায়িত্ব নেয়ার মতো চওড়া কাঁধ তখন সেখানে কেবল নাদের শাহরই আছে। ৮ মার্চ ১৭৩৬—নাদেরের মাথায় উঠল ইরানের শাহর তাজ।

১৭৩৮ সালে নাদের কান্দাহার আক্রমণ করেন, কাবুল দখল করে অগ্রসর হন দিল্লি অভিমুখে। মোগলদের রাজধানীও তার পদানত হয়। এরপর নজর দেন মধ্য এশিয়ার দক্ষিণের এলাকাগুলোর দিকে। ১৭৪৩ সালে যুদ্ধ করেন তুর্কিদের সঙ্গে। শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করেন, জয় করেন ওমান।

ক্ষমতায় বসে তিনি সাফাভিদ আমলে বজায় থাকা শিয়া আধিপত্য খর্ব করেন। এর মাধ্যমে তার সেনাবাহিনীর সুন্নি অংশের আনুগত্য দৃঢ় হয়। সংখ্যালঘুদের প্রতি তিনি উদার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তার আমলে আর্মেনীয় ও ইহুদিরা ধর্মীয়-জাতিগত পরিচয়ের কারণে কোনো বৈষম্যের মখোমুখি হননি। তবে অতিরিক্ত কর আদায় ও স্বৈরশাসনের যে দুর্ভোগ তা সবাইকেই ভোগ করতে হয়েছে। নিজ দেশে কোনো বিশেষ মতকে উৎসাহিত না করলেও বাইরের দুনিয়ায় তিনি নিজেকে ও তার সাম্রাজ্যকে সুন্নি পরিচয়ে তুলে ধরতেন। এতে মুসলিম জাহানের নেতা হিসেবে অটোমানরা তাদের প্রভাব হারানোর শঙ্কায় পড়েছিল।

এসব সামরিক বিজয় নাদেরের ক্ষমতার ক্ষুধা আরো বাড়িয়ে দেয়। এমনিতেই তিনি আগাগোড়া একজন যোদ্ধা ছিলেন। স্বর্গে যুদ্ধ নেই বলে তা তার কাছে কম আকর্ষণীয় মনে হতো। কিন্তু তার সেনাবাহিনীর খরচ বহন করার সামর্থ্য পারস্যের অর্থনীতির ছিল না। তাই কর আদায়ে তিনি নিষ্ঠুরতা দেখাতে শুরু করেন। সব ক্ষমতা তার একার হাতে ছিল। তার শাসনের শেষদিকে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়। নাদেরের নিষ্ঠুরতাও বাড়তে থাকে। এ সময় তিনি মানসিক সমস্যাতেও আক্রান্ত হন। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে নিজের ছেলে রেজা কুলি মির্জাকে অন্ধ করে দেন। অভিজাতদের অনেকে তার কোপানলে পড়ে প্রাণ হারান। ঘনিষ্ঠরাও তার কাছে যেতে ভয় পেতেন। অবশেষে ১৭৪৭ সালে আফশার ও কাজার গোত্রের অভিজাতদের একটি দল বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে হত্যা করে।

সন্দেহ নেই শেষ জীবনে নাদের শাহ ভয়ানক এক স্বৈরশাসকে পরিণত হয়েছিলেন। তার নিষ্ঠুরতাও স্মরণযোগ্য। কিন্তু ওই যে বলে কঠিন সময় কঠিন মানুষদের তৈরি করে। তিনি পারস্যের কঠিন সময়ে তৈরি হয়েছেন। তার সামরিক সাফল্য নেপোলিয়ন-আলেকজান্ডারের সমতুল্য। এমন ঐতিহাসিক চরিত্রকে আমাদের অভিজ্ঞতার পরিবেশ-পরিস্থিতি দিয়ে মাপতে যাওয়াটা কাজের কথা নয়। রুশ সমাজতান্ত্রিক নেতা জোসেফ স্ট্যালিন নাদের শাহর ভক্ত ছিলেন, এমনকি তাকে শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করতেন। আবার ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের গ্রন্থাগারে স্ট্যালিনকে নিয়ে বইয়ের বড় সংগ্রহ ছিল। নাদের শাহ নিজেকে তৈমুরের সঙ্গে তুলনা করতেন। নিজের এক ছেলের নাম রেখেছিলেন তৈমুরের ছেলের নামে—শাহরুখ।

নাদের শাহকে নিয়ে মাইকেল অক্সওর্থির মূল্যায়ন ইতিবাচক। তবে শুরুতে একটি ‘যদি’ আছে। যদি শেষ জীবনে নাদের শাহ দেশ শাসনে আরো দক্ষতা দেখাতে পারতেন এবং ক্ষমতা কোনো যোগ্য উত্তরাধিকারের হাতে দিয়ে যেতে পারতেন, তাহলে সফল সেনাবাহিনীকে কেন্দ্র করে পারস্যের প্রশাসন ও অর্থনীতি মজবুত হতে পারত। যেমনটা ইউরোপের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে। সেক্ষেত্রে ইরান আধুনিক রাষ্ট্রের পথে যাত্রা করত। তাহলে নাদের শাহকে আজকের ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে রাশিয়ার পিটার দ্য গ্রেটের মর্যাদা দেয়া হতো। নিষ্ঠুর, সমরবাদী, কিন্তু যিনি নিজের দেশকে নতুন পথ দেখিয়ে গেছেন।

 

শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক