ঘরের কোনায় ছায়াগুলো অসহনীয় অনুতাপ, অনেকটা যেন অসম্ভব ক্রোধ নিয়ে গাঢ় হয়ে উঠছে— জীবনের জন্য ততটা নয়, যতটা অর্থহীন স্বীকারোক্তির জন্য। শুনতে পাচ্ছেন। রেডিও বেজে যাচ্ছে।

ফ্ল্যাটবাড়ির ১০ বাই ১০ ঘর দিগন্ত ছুঁয়ে মাঠ হয়ে শুয়ে পড়ে, ঘুম চোখের ভাঙা ভাঙা ঘাসে বিন্দু বিন্দু ছায়া মাড়িয়ে আলো ক্যাকটাসের কাঁটাময় পাতায় ঝরেছে। কে যেন কঁকিয়ে কেঁদে ওঠে বুকের ভেতর। ঘরের চতুর্দিকে নদী, আকাশে এক চিমটি নক্ষত্র। পাদ্রির আলখাল্লা প্রজাপতির মতো উড়ছে। চমত্কার মসৃণ চামড়ায় তৈরি জুতো। রোদভেজা সমুদ্রতটে কচ্ছপগুলো শীতে কাঁপছে, নদীর তলদেশ থেকে গোঙাচ্ছে পূর্ণচাঁদ। বালিকাটি চিত্কার করছে ব্যাপক যন্ত্রণায়। অবন্তিকা কান পাতে পোষা বিড়ালটি হালফিল শোনাচ্ছে তাকে আমাদেরই জীবনের গল্প। চিরায়ত সময় চলে আসছে খুব কাছে।

তোমার সঙ্গে বেইমানি করা হলো না পুরুষ, আজ অপরাহ্নে আমি লিখে রাখব— কেমন করে চুমুক দিয়ে পান করতে হয় পুষ্পের মুগ্ধতা। কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার স্বাদই বা কেমন? একবার আমি আমার স্বরচিত গানে বিমুগ্ধ হয়ে ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম। গড়িয়ে আসছিল— আমার দিকে সৈন্যদের জলপাই রঙের আর্মাড কার— বহরের পর বহর। চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিতে উষ্ণ হয় আমার অশ্রু। রাখালরা বিশ্রাম ও ভ্রমণের মাঝে এমন কোনো প্রভেদ দেখে না; এ নিয়ে তারা ভোগেও না নৈতিক কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে। আমি সে কথা অবন্তিকাকে বলতেই সে তার গান থামিয়ে বলেছিল, সম্পর্কের বাগানে ঘাস কতটা গাঢ় সবুজ, জানো? তুমি কি জানো বন্ধু, এ পৃথিবীতে সম্পদ বলতে সবার আছে পেছনের আঙিনায় একটি দেয়াল। বুলেটের প্রয়োজন নেই আমাদের। রেডিও বেজে যাচ্ছে ভালোবাসার মতো। তবু শহরগুলোর আঙুলের ইশারায় বিধ্বস্ত হচ্ছে গ্রাম ও গঞ্জ। খুব বাজে কাঁকরময় ময়দায় তৈরি আমার রুটি।

দৃশ্যের পরের দৃশ্যে আমরা মাছে নুনের বদলে ছিটিয়ে দিচ্ছি ছাই। পুরুষ আজ মেয়েদের ডরমিটরিতে যাওয়া যেতে পারে রাতে; কিন্তু তাদের কেউ প্রেমিক হবে, এমন কাউকে দেখি না। যার প্রতীক্ষায় মেয়েটি শনিবার ছুটির দিনেও খুলে রাখবে দুয়ার। দশদিকে আতঙ্ক, পুরুষ গন্ধের কাগজগুলো আমি পুড়িয়ে ফেলব অক্ষর এসে পড়ার আগেই। আমি সেই পুরুষকে চাই, যে নিশিরাতের রেলগাড়িতে বসে বসে ঢলে পড়বে আমার ঘুমে। আমার দুহাত ও পায়ে পরানো লোহার শিকল। কাঠের যে বেঞ্চে বসে আছি— দিনকয়েক আগেও তা ছিল হরপ্পার। পোতাশ্রয়ের পানশালায় চোখে আলো ছড়ানো মেয়েটি, পুরুষ তোমার নাম জপ করছে তারার নিভৃতে। আমি দেখি হীরকের অনুসন্ধান করে করে ক্লান্ত হয়ে অজানা আগন্তুকরা ফিরে এসেছে ঘরে। দীর্ঘশ্বাসে গড়িয়ে আসা পাথরে ডানা ছড়িয়ে বসে হাই তুলছে বৃদ্ধ বাজপাখি।

অবন্তিকা বিবর্ণকে রঙ ভেবে লিখে রাখে, ‘একবার আমি কিন্তু শিশুচন্দ্রকে ধরে রেখেছিলাম আমার করতলে। পার্কের সুশীতল বাতাবরণ ছেড়ে মানুষ অন্যত্র যায় কেন? তোমার হাত আমি আর স্পর্শ করতে চাই না। সময় পাকিয়ে তৈরি দড়িতে ঝুলিয়ে আমাকে ছুড়ে দিও না। আমি আজ খুঁজে পেয়েছি বেগবান একটি প্রপাত।’

গঞ্জের কোনো অলস বাজারের মতো মন নিয়ে আমরা প্রপাত খুঁজি, রেডিও শুনতে পাচ্ছেন?

চোখ কেড়ে নেয় বোকাবাক্স আর ইথারে চুরি যায় শৈশব! বোধ ও বোধনের বেদনায় আলোকিত রাত আর রোদের শহর একদিন ফিরে যায় টুকরো টুকরো মেঘের মিছিল নিয়ে, চোখের কার্নিশে খড়িমাটির দেয়াল পেছনের আঙিনা খোঁজে আর সম্পদহীন দাঁড়িয়ে থাকে ঠোঁটকাটা সন্ধান।

অবন্তিকা, জলরঙ যুবতী!

এখন সে মাটি, পাহাড়ের মতো স্থির, সে বাতাসের মতো বাঁচে। সমুদ্রের মতো উচ্ছল তার কথামালা পাতার মতো নেড়ে ওঠে রঙিন বাতির ম্রিয়মাণ আলোর ভেতরে গাদা গাদা প্ল্যাকার্ডের ভিড়ে পাতাল রেলের প্লাটফর্মে। অবন্তিকা শেষ বৃক্ষের কাছে এসে পৌঁছে, ধরিত্রী কন্যা জানত না যে, আমরা মনোযোগী হতে পারছিলাম না। সে যখন জাহাজে প্রত্যাবর্তন করছে, দেখছে অনুপস্থিতি জড়ো করছে তার প্রিয় বস্তুসামগ্রীকে, আমাদের চারপাশে টেনে দিচ্ছে শাশ্বতের তাঁবু।

ঠিক এখানে, যখন অতীত আলিঙ্গন করছে বর্তমানকে, রাতের অবয়বে এঁকে দিচ্ছে বর্ণমালা অদ্ভুত শব্দসমূহের মধ্যে যে গহ্বর, সেইখানে আমাদের নিমজ্জমান সাহসিকতায় কেবলমাত্র প্রজাপতি নিঃসৃত আলো ছড়িয়ে পড়ছে।

অবন্তিকা এখন লিখতে ভুলে গেছে, আর সে বলতে চায় না কিছুই, অবক্ষয়ের পাশে ফ্যালফ্যাল করে তাকায় আর ভাবে, আমি, বোধকরি, এখানে মানিয়ে নিতে পারি আমার জীবন, আমি আমাকেই দিতে পারি জন্মদান এবং নিতে পারি ভিন্ন এক নাম।

আহত এক বর্তমান, এখানে, শূন্য এক জানালা থেকে তাকিয়ে রয়েছে সে সাহায্যনদী অতিক্রমী ট্রাকগুলোর দিকে। এ সেই বর্তমান, বাতাস মসৃণ করে তুলছে কান্না কিংবা নারী নির্যাতন। বোধকরি কথা হতে পারে স্বচ্ছ, ফলে শব্দরাজির ভেতরে দেখতে পারি আমরা উন্মুক্ত জানালা, বোধকরি সময়ও আমাদের মতো দ্রুততায় সময়ের থলিতে পৌঁছে দিতে পারি নোংরামিহীন মানবীর ভবিষ্যৎ।

আছে সময়হীন এক বর্তমান, এখানে কেউ পায় না খুঁজে অন্যকে। কেউ রাখেনি মনে, কীভাবে সে বের হয়েছিল দরজা দিয়ে ঝড়ো হাওয়ার মতো এবং সময়ের কোন সন্ধিক্ষণে সে কুড়িয়েছে অতীত জন্মের ‘গতকাল’ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরায় অন্যের জন্য রূপান্তরিত আয়নায়, সে আজ তাদের প্রতিফলিত প্রতিবিম্ব মেলে ধরছে আমাদের ওপর। আমরা আজো জানি না, এখানে আছে ভূগোলহীন এক বর্তমান। বোধকরি অবন্তিকা জেনে গেছে, জীবন সম্ভব এবং পেঁচার রাতে কেঁদে উঠতে পারে তাবৎ নারী তার মায়ের শব্দ এবং জীবন প্রণালির গানে, ঠিক যেমন হওয়া উচিত!

অবন্তিকার ঠোঁটে আঁচড় কাটছে নাইটিঙ্গেল। এখানে এখন ক্ষণস্থায়ী বর্তমান। আগন্তুকরা জলপাই শাখায় ঝুলিয়ে রাখে তাদের ভ্রমণ কাহিনী আর পথ দ্রুততায় ফিরে যায় তাদের ট্রাঙ্কে। একদিন হারিয়ে যাবে সিন্ধু এবং মাতৃতান্ত্রিক স্তবগান বেহুলা মিথের জন্য লুপ্ত হয়ে যাবে গায়েত্রী সংগীত, যেভাবে সীতা হয়ে যাবেন বিস্মৃত এবং বিলুপ্ত হবে উপত্যকার উদ্গ্রীব জলপদ্ম। নারী, তোমাদের যা প্রয়োজনীয় তা হলো উন্মাদ ঘোড়াকে বশ্যতায় নিয়ে আসার স্মৃতি, ভায়োলিনের মূর্ছনায় হূদয় মসৃণ করার পদ্ধতি এসবই তোমাদের প্রয়োজন, প্রয়োজন দ্বিধাহীন একটি অবন্তিকা। যে কিশোরী নয়, যুবতী কিংবা নারী নয় একজন মানুষ, ঈশ্বরের হাতে লেখা একটি মিথ একটি মহাকাব্য...

রেডিও বেজে যায়, বেজেই যায়! রেডিও শুনতে পাচ্ছেন?