নতুন চাঁদ উঠলে মাকে কদমবুচি করতেন হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া। এটি তার দীর্ঘদিনের রীতি। তেমনই একবার নতুন চাঁদ ওঠার পর কদমবুচি করতে গেলে মা স্মিত হেসে বললেন, ‘বাবা, সামনে নতুন চাঁদ উঠলে তুমি কাকে কদমবুচি করবে?’ অশ্রুসজল বালক নিজামউদ্দিনের দুই চোখ। মায়ের কথার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ধরতে পেরেছেন তিনি। বুঝে গেছেন পরের মাসে নতুন চাঁদ ওঠার আগেই ইহজাগতিক সফর শেষ করে খোদার সান্নিধ্যে চলে যাবেন মমতাময়ী মা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘মা, আমাকে কার জিম্মায় রেখে যাবেন?’ ছেলের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে মা বললেন, ‘তা এখনই বলব না বাবা। যথাসময়ে বলব।’

কিছুদিন পরের ঘটনা। অসুস্থ মায়ের সঙ্গে দেখা করে পার্শ্ববর্তী মসজিদে ঘুমাচ্ছেন নিজামউদ্দিন আউলিয়া। জন্মস্থান ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদায়ুন থেকে হিজরত করে দিল্লিতে আসার পর ছোট একটি ঘরে মা, একমাত্র বোন ও গৃহপরিচারিকার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। স্থানাভাবে পার্শ্ববর্তী মসজিদে থাকতে হতো নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে। সে রাতেও ঘুমাচ্ছিলেন। মাঝরাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন পরিচারিকা। জানালেন মায়ের শরীরটা হঠাৎ করে বেশ খারাপ হয়ে গেছে। তিনি ছেলেকে দেখতে চাইছেন। ছুটে গেলেন নিজামউদ্দিন আউলিয়া। মৃত্যুশয্যায় মা। তথাপি এক অনির্বচনীয় স্বর্গীয় আলোয় উজ্জ্বল তার মুখমণ্ডল। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্যতম নিদর্শন। মৃত্যুর সময়ও তাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল থাকবে। হলুদ আভায় ভরে যাবে ললাট। পরবর্তী জীবনে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া মৃত্যুশয্যায় তার মায়ের এ অলৌকিক নিদর্শনের কথা অনেক বার বলেছেন। তার মহীয়সী মা যে একজন সুফি ছিলেন, আল্লাহর ওয়ালি ছিলেন, তার অকাট্য ও অন্যতম দলিল হিসেবে বিভিন্ন মজলিসে তিনি এ ঘটনার অবতারণা করেছেন।

বালক নিজামউদ্দিনকে বুকে টেনে নিলেন মা। তারপর বললেন, ‘বাবা, আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। সেদিন তোমার প্রশ্নের উত্তর দিইনি। এখন দিচ্ছি। তোমাকে আমি মহান রবের জিম্মায় রেখে যাচ্ছি।’ পরবর্তী সময়ে মাঝে মাঝে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া বলতেন, ‘মায়ের এ কথা শুনে আমি এতটাই আনন্দিত হয়েছিলাম, আমার জন্য যদি তিনি ধন-রত্নে ভরপুর একটি মহলও রেখে যেতেন, তাও সে আনন্দের কাছে ম্লান হয়ে যেত!’ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বলা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মায়ের এ কথা খোদাতাআলার প্রতি তার তাওয়াক্কুলের (সর্বপরিস্থিতিতে খোদার ওপর দৃঢ়ভাবে নির্ভরশীল থাকা) প্রমাণ। একজন সুফির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো তাওয়াক্কুল। আর তা পূর্ণমাত্রায় ছিল বলেই সুফি হতে পেরেছিলেন হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মা। সুফিদের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ‘সবর’ (ধৈর্যধারণ) ও ‘শোকরগুজারি’ (সবসময় খোদার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা) অন্যতম। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মায়ের মধ্যে এ দুটো বৈশিষ্ট্যেরও কোনো ঘাটতি ছিল না। তার সবর ও শোকরগুজারির একটি চমৎকার উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। নিজামউদ্দিন আউলিয়া শৈশবে পিতাকে হারান। সংসারে নিত্য অভাব। কোনো বেলায় খাবার জুটে, কোনো বেলায় উপোস। এমনও হয় সারা দিনে একটি দানাও মেলে না। সেসব দিনে মক্তব থেকে ফিরলে অভুক্ত নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে মা বলতেন, ‘বাবা, আমরা আজ আল্লাহর মেহমান!’ নিজামউদ্দিন আউলিয়া পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মজলিসে বলতেন, ‘মায়ের এ কথা শুনে আমার শিশুমন বুঝে যেত যে আজ ঘরে কোনো খাবার নেই। তাই আজ সবাই রোজা। আমার কোনো কষ্ট হতো না। বরং মায়ের এ কথা শুনে আমার হৃদয় স্বর্গীয় প্রশান্তিতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যেত। এখন আমার খাবারের অভাব নেই। কিন্তু মায়ের বলা “বাবা, আমরা আজ আল্লাহর মেহমান” কথাটি শুনে যে আনন্দ আমি পেতাম, তা এখন আর পাই না।’ এ বর্ণনা থেকে এটি পরিষ্কার যে একজন প্রকৃত সুফি হিসেবে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মা চরম দারিদ্র্যের সময়ও ধৈর্যধারণ করেছেন এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থেকেছেন। কোনো অভিযোগ করেননি। সন্তানদেরও শৈশবেই এ শিক্ষাগুলো দিতে পেরেছেন তিনি। তাই উপবাসে তাদের কষ্ট হতো না, বরং আনন্দ হতো। এটি খোদাতাআলার বিশেষ রহমত ছাড়া আর কী! এ থেকেই বোঝা যায়, নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মা ছিলেন একজন পবিত্রাত্মা সুফি। সত্যিকারের পরশ পাথর!

হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মহীয়সী মায়ের নাম হজরত বিবি জোলায়খা। দিল্লিসহ সারা বিশ্বের চিশতিয়া তরিকার অনুসারীদের কাছে তিনি ‘মায়ি সাহেবা’ নামে পরিচিত। তার পিতার নাম খাজা আরব। তিনি বোখারার অধিবাসী ছিলেন। তিনি ও তার ভাই খাজা আলী মিলে ব্যবসা করতেন। বিত্তশালী পরিবার। ১৩ শতকের প্রথমার্ধে বোখারায় মোঙ্গলদের প্রাদুর্ভাব ঘটলে খাজা আরব ও খাজা আলী সপরিবারে হিজরত করে লাহোরে চলে আসেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে চলে আসেন উত্তর প্রদেশের বাদায়ুনে। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা কারণে হিজরত করে আসা সুফি ও সুফি ভাবাপন্ন শান্তিপ্রিয় মানুষের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাদায়ুন। শান্ত পরিবেশ, চমৎকার আবহাওয়া, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সর্বোপরি ইসলামী জ্ঞানের চর্চাকেন্দ্র হিসেবে বাদায়ুনের সুনাম তামাম ভারতবর্ষে সুবিদিত ছিল। রাজনীতি থেকে দূরে থেকে যারা নিরিবিলি জীপন যাপন করতে পছন্দ করতেন, তারা বাসস্থান হিসেবে বাদায়ুনকেই বেছে নিতেন। খাজা আরব ও খাজা আলীও বাদায়ুনকে বাসভূমি হিসেবে আপন করে নিলেন। খাজা আরবের কন্যার নাম হজরত বিবি জোলায়খা। আর খাজা আলীর পুত্র হজরত খাজা আহমদ। দুজনেরই তখন পরিণত বয়স। বাদায়ুনে বসতি স্থাপনের পর খাজা আলীর পুত্রের সঙ্গে নিজের কন্যাকে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করেন খাজা আরব। খাজা আহমদ ও বিবি জোলায়খা দুজনই সুফি ছিলেন। আর এ সুফি দম্পতির ঘরেই জন্ম নিয়েছেন জগদ্বিখ্যাত সুফি খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া। 

হজরত খাজা আহমদ যখন ইন্তেকাল করেন, নিজামউদ্দিন আউলিয়া তখনো তার শৈশব পার করেননি। পুত্র-কন্যাকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, এ চিন্তা হজরত বিবি জোলায়খাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করেনি। আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরলেন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি সন্তানদের বিদ্যার্জনের যথাযথ বন্দোবস্ত করেছিলেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে মক্তবে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। নিজ হাতে চরকায় সুতা কাটতেন মায়ি সাহেবা। তাকে সাহায্য করতেন কন্যা। গৃহপরিচারিকা সে সুতা বাজারে গিয়ে বিক্রি করতেন। সুতা বিক্রির যৎসামান্য আয়ে চলত সংসার। হজরত বিবি জোলায়খা ছিলেন নবীজির বংশধর। সৈয়দ বংশীয় সম্ভ্রান্ত নারী। তার স্বামী হজরত খাজা আহমদও ছিলেন সৈয়দ। তিনি বাদায়ুনের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। মায়ি সাহেবারও আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রখর। তাই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে অর্ধাহারে, অনাহারে দিনাতিপাত করলেও কখনো কারো কাছে সাহায্য কামনা করেননি। এমনকি কারো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কোনো দানও তিনি গ্রহণ করতেন না। তেমনই একটি উদাহরণ আমরা জানতে পারি নিজামউদ্দিন আউলিয়ার জবানিতে। বাদায়ুনের তৎকালীন কোতোয়ালের ছেলে মক্তবে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার সহপাঠী ছিলেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার পরিবারের অভাব আঁচ করতে পেরে কোতোয়ালের ছেলে তাদের জন্য আটার বস্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠালে বিবি জোলায়খা তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেন। এও সুফিদের আরেক অনন্য গুণ। অমুখাপেক্ষিতা। অন্য কথায় বলতে গেলে, সৃষ্টির সাহায্য না নিয়ে কেবল স্রষ্টারই মুখাপেক্ষী থাকা। সুফি বিবি জোলায়খা এ বৈশিষ্ট্য এতটাই দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছিলেন যে নিজের বিত্তশালী পিতৃকুল থেকেও কখনো ন্যূনতম সহযোগিতা কামনা করেননি। একজন আদর্শ সুফির মতো দারিদ্র্যকে তিনি স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছিলেন। নবীজির একটি হাদিস আছে, ‘আল ফক্বরু ফখরি’। অর্থাৎ ‘দারিদ্র্য আমার অহংকার’। তারই বংশধর হজরত বিবি জোলায়খার জীবন যেন হাদিসটির সার্থক প্রতিফলন। একজন খাঁটি সুফি হিসেবে তিনি দুনিয়ার ভোগ-বিলাসকে অবলীলায় তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। তীব্র অভাবের মধ্যেও যত বেশি সম্ভব দান করতেন তিনি। সুফি মায়ের এসব বৈশিষ্ট্য নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে প্রভাবিত করেছিল। যা পরবর্তী সময়ে তার জগৎ বরেণ্য সুফি হওয়ার পথ সুগম করেছিল। 

হজরত বিবি জোলায়খা ১২৫০ সালে ইন্তেকাল করেন। দিল্লির শ্রী অরবিন্দ মার্গ সড়কে অবস্থিত বিখ্যাত আধচিনি বাজারের সন্নিকটে মায়ি সাহেবার মাজার। প্রতি বুধবার সেখানে হাজার হাজার ভক্ত, বিশেষত নারীরা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ভিড় জমান। জনশ্রুতি আছে, মায়ি সাহেবা নারীদের কষ্ট সহ্য করতে পারেন না। তাই নারীরা বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে কিংবা স্রেফ দোয়ার উদ্দেশ্যে তার মাজারে হাজিরা দেন।

সুফিদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ‘কারামাত’। হজরত মায়ি সাহেবারও অসংখ্য কারামাত আছে। তন্মধ্যে একটি এখানে উল্লেখ করছি। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার জবানিতে এ ঘটনা জানা যায়। মায়ের ইন্তেকালের পরও রীতি থেকে সরে আসেননি নিজামউদ্দিন আউলিয়া। প্রতি মাসের নতুন চাঁদ উঠলে মায়ের মাজারে হাজিরা দিতেন তিনি। প্রার্থনায় রত থাকতেন নির্দিষ্ট সময়। তার কাছে দোয়া কামনা করতেন। কিন্তু দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন খিলজি নিয়ম করলেন নতুন চাঁদ ওঠার রাতে সবাইকে তার দরবারে হাজিরা দিতে হবে। সুফিরাও এ নিয়মের বাইরে নন। কিন্তু নিজামউদ্দিন আউলিয়া এতে সাড়া দিলেন না। তিনি সুলতানদের সংশ্রব সযতনে এড়িয়ে চলতেন। তাদের দরবারে যাওয়া তো দূরের কথা, তিনি নিজের খানকাহতেও সুলতানদের আসার অনুমতি দিতেন না। তাই তিনি কুতুবউদ্দিন খিলজির ফরমানও অগ্রাহ্য করলেন। নতুন চাঁদ উঠার রাতে তিনি যথারীতি মায়ের মাজারেই হাজিরা দিতে লাগলেন। এভাবে কয়েক মাস যাওয়ার পর ক্ষিপ্ত হয়ে কুতুবউদ্দিন খিলজি ফরমান জারি করলেন, হয় নিজামউদ্দিন আউলিয়া সুলতানের দরবারে যাবেন, অথবা তাকে দিল্লি ত্যাগ করতে হবে। নতুন চাঁদ উঠল। সবাই ভাবল, নিজামউদ্দিন আউলিয়া বুঝি এবার সুলতানের দরবারে যাবেন। না, তিনি বরাবরের মতোই মায়ি সাহেবার জেয়ারতে গেলেন। বললেন, ‘মা, সামনের মাস থেকে আমি তো আর আপনার জিয়ারতে আসতে পারব না।’ আশ্চর্য! সে রাতেই ঘটনাচক্রে নিজের প্রাসাদে খুন হন সুলতান কুতুবউদ্দিন খিলজি। নিজামউদ্দিন আউলিয়া তাই বলতেন, ‘মায়ের মাজারে করা আমার কোনো প্রার্থনা কখনো বিফল হয়নি।’ উপমহাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বের নারী সুফিদের অন্যতম হজরত বিবি জোলায়খা ওরফে মায়ি সাহেবা।

উপমহাদেশের আরেক বিখ্যাত নারী সুফি ছিলেন হজরত বিবি ফাতেমা শাম। তিনিও ১৩ শতকে দিল্লিতে বাস করতেন। তবে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। যতটুকু জানা যায়, চিশতিয়া তরিকার বিখ্যাত সুফি হজরত খাজা ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জে শকর ওরফে বাবা ফরিদ ও তার ছোট ভাই হজরত খাজা নজিবউদ্দিন মোতাওয়াক্কেলকে তিনি ভাই ডেকেছিলেন। হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার সঙ্গেও তার ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিল। তারা প্রত্যেকেই এ মহীয়সী নারীকে সুফি হিসেবে একবাক্যে স্বীকৃতি দিয়েছেন। হজরত বিবি ফাতেমা শাম সম্পর্কে বাবা ফরিদ বলেছেন, ‘যখন একটি বাঘ বন থেকে লোকালয়ে আসে, তখন কেউ জানতে চায় না, সেটি নারী নাকি পুরুষ। ঠিক তেমনি কেউ যখন খোদার নৈকট্য অর্জন করে, তখন তাকে আর নারী বা পুরুষ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না।’ বাবা ফরিদের এ বাণী দ্বারা বোঝা যায়, বিবি ফাতেমা শাম দৈহিক আদলে নারী হলেও খোদাপ্রেমে লীন হয়ে সাধনায় সিদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে তিনি ‘ইনসান-এ-কামালিয়াত’ তথা পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়েছিলেন।

ভারতবর্ষের নারী সুফিদের আলোচনায় হজরত বিবি রাস্তির নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বিবি পাকদামান নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দী তরিকার বিখ্যাত সুফি হজরত শায়খ রোকনউদ্দিনের মা। তার স্বামী মখদুম শায়খ সদরউদ্দিন সোহরাওয়ার্দী। শ্বশুর ভারতবর্ষে সোহরাওয়ার্দী তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হজরত খাজা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানি। বিবি পাকদামানও ১৩ শতকের সুফি ছিলেন। তার জন্ম ফারগানায়। পিতার নাম সুলতান জামালউদ্দিন। পরিবারের সঙ্গে হিজরত করে মধ্য এশিয়ার জন্মভূমি থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় এসেছিলেন তিনি।

হজরত বিবি রওশন আরার জন্ম ১২৭৯ সালে। তার পূর্বপুরুষ ভারত থেকে মক্কা শরিফে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল। ১৩২১ সালে তিনি তার ভাই পীর সৈয়দ আব্বাস আলী ও ভ্রাতৃবধুর সঙ্গে দিল্লি ভ্রমণ করেন। তখন শায়খ হাসান শাহ নামে দিল্লির কাদেরিয়া তরিকার একজন সুফি তাকে ও তার ভাইকে বাংলায় পাঠান। ১৩৪২ সালে বাংলা মুলুকেই ওফাত বরণ করেন হজরত বিবি রওশন আরা। পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট জেলার কাঁঠালিয়া গ্রামে ইছামতি নদীর তীরে তার মাজার অবস্থিত। 

হজরত মা সাহেবা আশরাফ-এ-দো-জাহান নামে একজন নারী সুফির নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। তিনি বোখারা থেকে এসেছিলেন। ১৩৬৯ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মুলতানে তার মাজার অবস্থিত। 

সুফিবাদের প্রচার ও প্রসারে দক্ষিণ এশিয়ার নারী সুফিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তারা একাধারে আধ্যাত্মবাদী, শিক্ষক, পৃষ্ঠপোষক ও কেউ কেউ পুরুষ সুফিদের মা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক