১.

বব ডিলানের নোবেল পুরস্কার সাহিত্যামোদীদের বেশ খানিকটা সংকটে ফেলে দিয়েছে। ডিলানের প্রতিভা নিয়ে দৃশ্যত কারোরই কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু অনেকেরই প্রশ্ন, একজন গীতিকার-গায়ককে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের মতো স্বীকৃতি দেয়া যায় কিনা। তাঁর গান কবিত্বময়। কিন্তু গায়ন ব্যতিরেকে গুরুতর সাহিত্যিক পরিসরে এই কবিত্বের স্বতন্ত্র মূল্য আছে কিনা? এই স্বীকৃতির মাধ্যমে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের ভুবনে গীতিকবিদের জন্য স্থায়ী স্পেইস তৈরি হতে যাচ্ছে কিনা?

এইসব অনটোলজিক্যাল ও শ্রেণীকরণ-সংক্রান্ত প্রশ্নের লেজ ধরে আরো বিমূর্ত নন্দনতাত্ত্বিক তর্কও হাজির করছে বব ডিলানের স্বীকৃতি। আমাদের কি আবার নতুন করে আলো ফেলতে হবে কবিতা ও সংগীতের মধ্যকার ধূসর জায়গাটায়? কবিতার সাংগীতিকতা আর সংগীতের কবিতাময়তার মধ্যে কতটুকু ফারাক?

সেই সাথে উঁচু আর্ট আর নিচু আর্টের তর্কটা তো থাকছেই।

এই পরিসরে এত সব গুরুতর প্রশ্নের ফয়সালা করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমার এই আলাপ মূলত বব ডিলানকে ধরে এই প্রশ্নগুলোর ওপর নানাদিক থেকে আলো ফেলার চেষ্টা। ফলত, এই লেখায় আমি যে বব ডিলানের গানের কবিত্বময়তার একটা পরিপূর্ণ সাহিত্যিক অনুধাবন করে ফেলতে পারব, এমন ভরসা নেই। সেটা আমি চাইছিও না। সংগীত আমার প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহের বিষয় হলেও এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়, সাহিত্য। বাংলা কবিতা। বব ডিলানের নোবেল স্বীকৃতির প্রেক্ষিতে।

বলা ভালো, কবি হিসেবে বব ডিলানের এটিই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়। অক্সফোর্ড আর কেমব্রিজের মতো নাক উঁচু প্রতিষ্ঠানের কবিতা সংকলনে তাঁর অন্তর্ভুক্তি পুরনো ঘটনা। নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তিনি বিশ বছর ধরেই ছিলেন। তখন তার সেখানে থাকা না-থাকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। সংগীতকার বা অসাহিত্যিক হিসেবেও তিনি প্রথম নন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আছেন, বার্ট্রান্ড রাসেল আর অঁরি বার্গসোঁর মতো দার্শনিকও আছেন, চার্চিলকে না হয় রাজনৈতিক বিবেচনা হিসেবেই মানলাম।

২.

এই লেখার নাম দিয়েছি ‘বিশুদ্ধ সাহিত্যের অভিমান’। বিশুদ্ধ শিল্পের অভিমানও দেয়া যেত। বব ডিলানের স্বীকৃতি যেসব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, তা আমার বিবেচনায়, বিশুদ্ধ শিল্পের অভিমান থেকে উত্থিত। এই অভিমান আজো জীবিত আছে, পরিতাপের কথা বটে। আমি আমার আঠারো বছর বয়সে একে ত্যাগ করার চেষ্টা করেছিলাম পাবলো নেরুদার ‘টুওয়ার্ডস অ্যান ইমপিউর পোয়েট্রি’ নামক ছোট্ট লেখাটির অনুবাদের মাধ্যমে। কবিতাকে তিলোত্তমারূপে বানিয়ে তুলবার ফরাসি প্রকরণবাদী ফর্মুলার বিরোধিতা করেছিলেন নেরুদা, তাঁর সেই প্রবন্ধে। নেরুদা তাঁর স্মৃতিকথায় একটা ঘটনার কথা লিখেছিলেন। দূর প্রত্যন্ত গ্রামে, একবার তিনি কিছু জেলেকে গান গাইতে শোনেন। তারা নেরুদার একটি কবিতাকে গান বানিয়ে গাইছিল। নেরুদা অবাক হলেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই গানটি কার লেখা তারা সেটা জানে কিনা। সেই জেলেরাও এই প্রশ্নে সমান অবাক হলো। তারা বলল, এটা লোকসংগীত। গ্রামীণ গান। নেরুদাকে তারা চেনে না। নামও শোনেনি কোনো দিন। অথরের মৃত্যু, রঁলা বার্থ নিশ্চয়ই এমনটা বলতেন!

বোঝা যায়, নেরুদা কবিতার সর্বোচ্চ অর্জন বলতে এ রকম একটি দশার পক্ষেই ছিলেন। এখান থেকে দুটি দিশা পাচ্ছি। এক. কবিতাকে মহত্তম শিল্প হতে হলে সাধারণ্যে সঞ্চারিত হওয়া লাগবে। দুই. সংগীতই যেকোনো শিল্পের সর্বোচ্চ গন্তব্য। দুটো প্রকল্পনাকেই কেউ অতিসরল মার্কসিস্ট হ্যাংওভার বলে বাতিল করে দিতে পারেন, বিশেষত এই পোস্টমডার্ন জামানায়। আমি বাতিল করছি না। বরং খতিয়ে দেখতেই চাইছি। কবিতার সংগীতময়তা আর সংগীতের কাব্যময়তার গন্তব্য অভিন্ন হলেও হতে পারে, কিন্তু যাত্রাপথ ভিন্ন। আবার সংগীতময়তা সংগীতের একার সম্পত্তি নয়। এটা মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমি আমলে নিতে চাই। বব ডিলানের নোবেল এই সিদ্ধান্তেরই অনুসিদ্ধান্ত। খেয়াল করুন নোবেল কমিটির মন্তব্য, মার্কিন সংগীত ঐতিহ্যে বব ডিলান কাব্যিক অভিব্যক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। অর্থাত্ সংগীতই উপকৃত হয়েছে, সাহিত্য নয়। সাহিত্য ব্যবহূত হয়েছে মাত্র। এখন কথা হচ্ছে, নোবেল পুরস্কারের মতো আয়োজনে সাহিত্য কেন তার পরোপকারী ভূমিকার স্বীকৃতি পাবে? এই জায়গাটিতে নোবেল পুরস্কার-প্রণেতারা সাংঘাতিক অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, বলাই বাহুল্য। প্রথমত. তারা পরিষ্কার করেননি যে, সংগীতকে তারা সাহিত্য গণ্য করছেন কিনা। দ্বিতীয়ত. তারা এটাও পরিষ্কার করেননি যে, সংগীতাঙ্গনে কাব্যিক অবদান রাখার জন্য বব ডিলান নোবেল পেয়েছেন, নাকি সেই কাব্যিক অবদান কবিতার অঙ্গনেও সমান অভিনিবেশ দাবি করে বলেই তিনি পুরস্কার পেয়েছেন।

ফলে এই স্বীকৃতিকে কেবলই কবিতার বলয়ে গীতিকবিতার বা গানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা মুশকিল। আবার একাট্টাভাবে — কবিতাই পেয়েছে — এমনও বলা যাচ্ছে না। আরেকটা বিষয় মাঝ থেকে কাউকে কাউকে বাগড়া দিচ্ছে: যে কবিতা নোবেল পায়, তাকে আমরা সিরিয়াস কবিতা হিসেবে মানি। কিন্তু বব ডিলানের গান পপ কালচারের অংশ, পাশ্চাত্যের সিরিয়াস সংগীতচর্চারও অংশ না। ফলে অনেকের ভাবনা, পপ কালচারকে স্বীকৃতি দিয়ে নোবেল কমিটি গুরুচণ্ডালি করে ফেলল কিনা। না, সেটা করেনি। কারণ হাই কালচার আর পপ কালচারের মধ্যে মূলগত কোনো পার্থক্য নেই। এরা বহুদিন ধরেই পরস্পর দিয়ে প্রভাবিত হয়ে আসছে। ফলে সাহিত্যের অভিমান যদি উচ্চম্মন্যতা থেকে আগত হয়, তাকে বায়বীয় ভাবাই ভালো। এর বাস্তব ভিত্তি নাই।
কিন্তু যে জিনিসটা বিশেষভাবে বোঝা দরকার, তা হলো, কবিতা স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিসেবে যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, অন্য শিল্পমাধ্যমের হাইব্রিড ঘটনা হিসেবে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিষয়টিকে একটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করি।

৩.

বহুদিন হলো, আমার কবিতাপাঠের চাহিদা আক্ষরিক অর্থে কবিতা দিয়ে মেটে না। লেনার্ড কোহেন, বব ডিলান, রজার ওয়াটার্স বা চন্দ্রবিন্দু — আমার কবিতার পিপাসা মেটে তাদের গানে। আমাকে কবিতা দেয় গড অব দ্য স্মল থিংস, খোয়াবনামা, কিংবা পাহাড় ও স্তেপের আখ্যান। কখনো ইভানস চাইল্ডহুড কিংবা নস্টালজিয়া সিনেমার তারকোভস্কি। সেলিম আল দীনের নাটক। মিশেল দ্য সার্তিয়ু, অঁরি লেফেব্রে কিংবা আশীষ নন্দীর প্রবন্ধ। একটা আস্ত বইভর্তি সনেটের চেয়ে সেই খুচরো, পথে পড়ে থাকা অন্যমনস্ক কবিতা অনেক স্বস্তিদায়ক। আবিষ্কারের আনন্দও পাওয়া যায়, যেহেতু তাদের শরীরে কবিতার দাবিও থাকে না। আর প্রথাগত অর্থে যেগুলো কবিতা, তাদের শরীরে কবিতার দাবি প্রকাশ্য। মাঝারি মানের কবিতার ক্ষেত্রে এই প্রকাশ্য দাবি যখন তার নান্দনিক গন্তব্য বিষয়ে আমাদের পূর্বানুমানের সীমা উতরাতে ব্যর্থ হয়, তখন তার পক্ষে ন্যূনতম রস সঞ্চার করাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে গানের মধ্যে একটা মাঝারি মানের কাব্যিক দ্যোতনাও যথেষ্ট উঁচুমানের অভিজ্ঞতা সরবরাহ করতে পারে। আর যদি সেটা বব ডিলান হয়, তার লিরিকের কাব্যিকতা স্রেফ অর্থোডক্স কবিতার অনুবর্তী হয়েই থাকে না — বরং কখনো কখনো যেন কবিতাকেও পথ দেখায়! কি উপমায়, কি ইঙ্গিতময়তায়, কি কল্পনার বিস্তারে, এমনকি ভাষার সংযত ব্যবহারে।

ফলে বিশ্বব্যাপী এই যে কবিতা ক্রমাগত পাঠক হারাচ্ছে, তার অর্থ এই নয় যে, লোকে কবিতা খুঁজছে না। কবিতার চাহিদা বরং বাড়ছে, তবে সেটা মেটানোর জন্য খোদ কবিতা মাধ্যমের কাছে আসবার প্রয়োজন কমে গেছে। অপরাপর শিল্পমাধ্যমগুলোয় এখন যথেষ্ট কবিতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।

৪.

বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের পারস্পরিক যোগাযোগের অভ্যাসের মধ্যে যেসব পরিবর্তন আসছে, তাও খেয়াল করা দরকার। বিশেষত চলচ্চিত্রের মতো সর্বগ্রাসী মিডিয়া, যেখানে নাটক, কবিতা, উপন্যাস, চিত্রকলা, সংগীত সবই এঁটে যাচ্ছে। বলিউডের সিনেমার গান যেমন লোকসংগীতের কাছ থেকে নিচ্ছে, তেমনি মার্গীয় সংগীতকেও ছাড়ছে না। মিউজিকের থেকে মিউজিক ভিডিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় আজকাল। মোদ্দাকথা, শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে বেশ নিবিড় আদান-প্রদান চলছে এই প্রযুক্তির যুগে। এই পারস্পরিক আদান-প্রদানের যুগে কবিতা কোথায়?

কবিতা গোড়া থেকেই পারফর্মিং আর্ট ছিল। আধুনিক যুগে এই তকমা সে ছুড়ে ফেলে ছাপাখানানির্ভর শিল্প হয়ে উঠেছে। তবু তার সাথে আরো কিছুকাল পরজীবীর মতো লেপ্টে ছিল আবৃত্তিশিল্প। অন্তত বাংলাদেশে। স্বৈরাচার এরশাদের বিদায়ের সাথে সাথে সেই পরাক্রমশালী আবৃত্তিশিল্পও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

তো, এই আদান-প্রদানের যুগে কবিতা এখন খুবই অনিচ্ছুক একটি পক্ষ। কবিতার ক্ষেত্রে জিনিসটা একতরফা ঘটছে। অর্থাত্ অন্য মাধ্যমগুলো কবিতা থেকে হরহামেশাই নিচ্ছে, কিন্তু কবিতার পক্ষে সেটা দিনে দিনে কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ তার ছাপাখানা-নির্ভরতা। কারণ তার শুদ্ধতম শিল্পের অহমিকা। ফলে আধুনিক কবিতার দশাও উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো হয়ে উঠছে। শ্রেষ্ঠত্বের আইভরি টাওয়ারে উঠে গিয়ে নিজের অহমের পরিচর্যা করা ছাড়া অন্য প্রচেষ্টা সমসাময়িককালে কমই চোখে পড়েছে। আন্তঃমাধ্যম যোগাযোগের এই কালে কবিতা হয়ে উঠেছে ইউনিভার্সাল ডোনার বা সর্বজনীন দাতা, কিন্তু খুবই রক্ষণশীল গ্রহীতা।

ফলে এই সময়ে এসে দুই ধরনের কবিতা সম্পর্কেই আমাদের ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। একটি প্রথাগত কবিতা, যা কবিতার বইতে কিংবা আইভরি টাওয়ারে অবিমিশ্র অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যটি পাওয়া যায় সর্বত্র — উপন্যাসে, গানে, চিত্রকলায়, ফটোগ্রাফিতে, নাটকে, সিনেমায়। প্রথমটি মাধ্যম, পরেরটি গুণ। প্রথমটি খুব আত্মসচেতন, পরেরটার তেমন কোনো আত্মাভিমান নাই। যদিও আমরা বব ডিলানকে প্রথাগত অর্থেও কবিতার চর্চা করতে দেখেছি। তিনি ব্যতিক্রম। একবার এক বয়োজ্যেষ্ঠ কবি তাঁর বয়সী নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, সিনেমা পরিচালকদের কাউকে কাউকে দেখিয়ে আমাকে বলেছিলেন, জানো, এরা কিন্তু প্রত্যেকেই ব্যর্থ কবি! কবিতায় সুবিধা করতে না পেরে অন্য মাধ্যমে চলে গেছে। যাদের কথা তিনি বলছিলেন, এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মাধ্যমে খুব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবু তাঁর চোখে, এরা ব্যর্থ কবিই! আমি এই অহমিকার কথাই বলতে চেয়েছি।

৫.

বব ডিলান যদিও জীবনের এক পর্যায়ে আটঘাট বেঁধে গদ্য কবিতা লিখেছেন, কিন্তু কাব্যিকতার স্বাদ তাঁর গানগুলো থেকেই আমরা পাই। ব্যালাড গান আর রক ঐতিহ্যকে মিশিয়ে তিনি নিজের জন্য এমন একটি ফর্ম বানিয়ে নিয়েছেন, যার ভেতরে অনায়াসে তিনি বড় বড় গল্প পর্যন্ত চালান করে দিতে পারেন। ফলে কখনো কখনো তিনি যে নিজেকে ‘স্টোরি টেলার’ দাবি করেন, এর একটা মানে দাঁড়ায়। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘পোয়েটিক এক্সপ্রেশন’, গীতিকবিতার কলেবরের কারণেই সেখানে তা সুবিধাজনক না। কিন্তু বব ডিলানের লিরিক হচ্ছে ঠাকুর মা-র ঝুলির মতো, ভেতরে প্রচুর জায়গা। উপমা, অনুপ্রাস, উেপ্রক্ষা, চিত্রকল্প, রূপক সবই সেখানে মেলে।

সঙ্গত কারণে বব ডিলানের সাহিত্য পুরস্কার কোনোভাবেই অর্থোডক্স কবিতার প্রতি স্বীকৃতি নয়। বরং এই যে বিবিধ মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ‘কবিতা’র ব্যাপারে তাদের যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে— এটা তারই নিশানা। একই নমুনা আমরা দেখি অস্কার পুরস্কারে। ২০১৫ সালে অস্কার পাওয়া ছবি দ্য রেভন্যান্ট-এর সিনেমাটোগ্রাফি প্রশংসিত হলো তার কাব্যগুণের কারণে। গল্প-উপন্যাসে এই ঐতিহ্য আরো বনেদি।

এখন কথা হচ্ছে, এই যে অপরাপর মাধ্যমগুলোতে ঘটতে থাকা কাব্যঘটনাগুলো— তার কি কোনো জায়গা নাই এই প্রথাগত কবিতাবিশ্বে? অতি সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার দিকে তাকালে এসেনশিয়ালিজমের একটি চেহারা ধীরে ধীরে আদল পাচ্ছে দেখতে পাই। কবিতাকে আরো বেশি অর্থোডক্স করে ফেলার পক্ষপাতী এরা। ছন্দ, ইডিয়ম আর অনুপ্রাসের শিকলে এমনভাবে বাঁধা, যাতে তাকে ধর্মান্তর করা সম্ভব না হয়। গদ্যের ঢিলেঢালা শাসন, যা কবিতাকে অনেক বেশি আটপৌরে করে ফেলেছিল গত শতকে, এই শতকের অভিমানী কবিদের একটি দল তাকে রীতিমতো ত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন। দৃশ্যনির্ভরতা যদি কবিতাকে সিনেমা কিংবা চিত্রকলার কথা মনে করিয়ে দেয়, সেই আশঙ্কায় চিত্রকল্প এবং রূপক বর্জন করছেন কেউ কেউ। এমনকি পৃথিবীর প্রাচীনতম কবিতার ফর্ম— যাকে আমরা ন্যারেটিভ কবিতা বলে থাকি— এই শতকের নিও-নািস কবিদের অভিধানে রীতিমতো ট্যাবু! এভাবে অপরাপর শিল্পমাধ্যমগুলোর সাথে কবিতার সব ধরনের যোগাযোগের সম্ভাবনা রদ করতে চাইছেন তারা। তাদের কাছে মাধ্যম বা ফর্মটাই কবিতা। মাধ্যমবহির্ভূত কাব্যঘটনাগুলোর কোনো স্বতন্ত্র সাহিত্যমূল্য নেই। অর্থাত্ যতই কাব্যিক হোক, গান গানই থাকবে, তার ভেতরের কবিতাকে অন্য কোনো বিবেচনার ভেতর নেয়া যাবে না!

সঙ্গত কারণেই, বব ডিলানের সাহিত্যিক স্বীকৃতিতে এই গজায়মান এসেনশিয়ালিজমের ভরাডুবি হলো। তাতে কিছু অভিমান হতেই পারে। কিন্তু বোঝা তো গেল, কবিতা শুধু একটা বাঁধাধরা শিল্পমাধ্যম হিসেবেই চিরকাল স্বীকৃত হবে এমন না, বরং সার্বজনীন নান্দনিক ঘটনা হিসেবেও তাকে ধর্তব্যের মধ্যে রাখতে হবে। এখানেই কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব, কবিতার জয়। কিন্তু কবির নয়। বব ডিলানের গান এর কবিত্ব দিয়ে এবং নোবেল কমিটি তাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে আধুনিক কবিতাকে এই দ্বিধাটুকু উপহার দিয়েছে। এই স্বীকৃতি কোনোভাবেই কোনো নান্দনিক দুর্ঘটনা নয়, এটা আধুনিক কবির আত্মপরিচয়ের সংকট। কবিতার আগামী বাঁক পরিবর্তনের জন্য কবি আর কবিতার মধ্যে এই বিসম্বাদটুকু তৈরি হওয়ার প্রয়োজন ছিল। আগামীর কবিকে নিশ্চয়ই এই পঞ্চভূতে বিরাজিত কবিতার সাথে মোকাবেলা করেই আগাতে হবে!

লেখক: কবি ও জনসংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক