এক.

নোবেল কমিটি যখন বব ডিলানকে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিলেন তখন ফেসবুকে ছোট একটি মন্তব্য করেছিলাম। সেটা হলো, “নোবেল কমিটি বব ডিলানকে পুরস্কৃত করায় বব ডিলানের খ্যাতি বাড়েনি, কিম্বা তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবারও প্রয়োজন কেউ বোধ করছে না। তবে খবর এতোটুকুই যে শ্রুতি ও কণ্ঠের মাধ্যমে যে ‘সাহিত্য’ তার নতুন স্বীকৃতি মিলল। সাহিত্য যে শুধু ছাপাখানার অক্ষর দিয়ে মুদ্রিত হয় আর লোকে পড়ে— গুটেনবার্গ টেকনোলজির দ্বারা নির্ধারিত সেই পরিমণ্ডল ভাঙতে শুরু করেছে। ভালো যে সেটা শুরু হলো শ্রুতি ও কণ্ঠকে মাধ্যম হিসাবে স্বীকারের মধ্য দিয়ে, অর্থাত্ গায়ক ও কবি বব ডিলানকে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার দিয়ে।”

পুরস্কার দেয়ার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে নোবেল কমিটিও বলেছে বব ডিলান মস্তবড় কবি। এই গ্রেট কবিকে পুরস্কৃত করবার এটাই প্রধান কারণ। কেমন কবি বব ডিলান? “মিল্টন আর ব্লেইক থেকে শুরু করে যে ইংলিশ ট্রাডিশানের বিস্তার তার মধ্যে বব মস্ত একজন কবি। এবং খুবই মৌলিক অর্থে তিনি খুব চমত্কার ঐতিহ্যাশ্রয়ী। শুধু লিখিত-পঠিত ঐতিহ্য নয়, মুখস্থ ভাষার দিক থেকেও বটে। খুব অভিজাতের সাহিত্য নয়, এমনকি সাধারণ মানুষের ভাষাও বটে”

`We are really giving it to Bob Dylan as a great poet – that’s the reason we awarded him the prize. He’s a great poet in the great English tradition, stretching from Milton and Blake onwards. And he’s a very interesting traditionalist, in a highly original way. Not just the written tradition, but also the oral one; not just high literature, but also low literature.’

বব ডিলানকে আমার ভালো লাগে। বলাবাহুল্য, ইংরেজি সাহিত্যের দিক থেকে বিচার করলে কাব্যভাষায় তিনি যে মেধাবী কাজ করেছেন তা বিতর্কের বিষয় নয়। কিন্তু সাহিত্য স্রেফ সাহিত্যগিরি নয়। তার সামাজিকতা, রাজনীতি, ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি বিবিধ বিষয় আছে, সাহিত্য যার বাইরের আসমানি কিছু নয়। ডিলানকে দূর থেকে প্রশংসা করা যায়, কিন্তু ভালোবাসতে গেলে একটা বাধা সামনে চলে আসে। ফিলিস্তিন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের প্রতি তাঁর পক্ষপাত। বব ডিলান ইহুদি জাতিবাদী, জায়নিস্ট। ব্যক্তি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে তাঁর অবস্থান দিয়ে তিনি তা জারি রেখেছিলেন। সেটা তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান হলে একে কিছুটা উপেক্ষা করা যেত। তিনি জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে গান লিখেছেন এবং গেয়েছেন। ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বেইনসাফির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নোয়াম চমস্কি কিংবা ফিঙ্কেলস্টাইন হতে পারেননি। ‘নেইবারহুড বুলি’ তেমনি একটি গান। তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধের গান থাকলেও শেষাবধি তিনি বিশ্বব্যাপী অন্যায়, অবিচার, বেইনসাফির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংস্কৃতির সর্বজনীন মঞ্চে গায়ক কিংবা কবি হয়ে উঠতে পারলেন না। আফসোস। একজন ইহুদি জাতিবাদী থেকে গেলেন। ফিলিস্তিনের নিপীড়িত জনগণ তাঁর সাহিত্যের ভূগোল থেকে নির্বাসিত। তাঁর মেধার প্রশংসা করা যায়, কিন্তু গুণমুগ্ধ হওয়া কঠিন।

তাঁর নোবেল বিজয় আমার কাছে সে কারণে বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে না। হয়তো বব ডিলানের কাছেও নয়। শেষ খবরে শুনতে পাচ্ছি, তাঁকে নোবেল কমিটি খুঁজে পাচ্ছে না। সত্যি বলতে বব ডিলান নোবেল পুরস্কার পেলেন কি পেলেন না তাতে তাঁর কিছুই আসে-যায় না।

তবে নোবেল কমিটি যে কারণেই তাঁকে পুরস্কৃত করুক, তাদের সিদ্ধান্ত আমার কাছে তাত্পর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। এর ফলে ‘সাহিত্য’ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা, অর্থাত্ ছাপাখানার সঙ্গে সাহিত্য নামক ব্যাপারের অবিচ্ছেদ্য ও নিত্যসম্পর্কের বদ্ধমূল অনুমান ভাঙল। তাদের সিদ্ধান্তের তাত্পর্য সম্পর্কে নোবেল কমিটি নিজেরা কতটা অবহিত আমার জানা নেই। তারা বব ডিলানকে পুরস্কার দেয়ার পক্ষে যে কৈফিয়ত দিয়েছেন তা খুবই মামুলি। সেই বক্তব্য থেকে বিশেষ কিছু বোঝার উপায় নেই, অধ্যাপকীয় ঢঙ্গে প্রশস্তি ছাড়া। এতটুকু বোঝা গেল, ইংরেজি কাব্যভাষার মধ্যে নিজেকে জারি রেখেও বব ডিলান নিজেকে ঐতিহ্য ও মুখস্থ উচ্চারণ ও অভ্যাসের জগত্ দ্বারা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। বেশ।

তবে ছাপাখানা থেকে ছাপা হওয়া কবিতার বই বাদ দিয়ে নোবেল কমিটি মুখস্থ ভাষার রচনাকে স্বীকৃতি দিয়ে এই প্রথম প্রমাণ করলেন, ছাপাখানার বাইরেও ‘সাহিত্য’ হতে পারে। ছাপাখানা বা মুদ্রিত অক্ষরই সাহিত্যের একমাত্র মাধ্যম নয়। এই ঘটনাটিকে আমি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ গণ্য করি। এখানে সে বিষয়েই কিছু কথা বলব। শেষে বব ডিলানের ‘পাড়ার পাপী’ নামক গানটি নিয়ে কিছু উদ্ধৃত করব। গানটি নিয়ে বিশেষ কিছু বলার প্রয়োজন দেখি না। ইংরেজি থেকে সহজ বাংলায় অনুবাদ করেছি। গানটি আরবদের মধ্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি নিয়ে লেখা। পাঠক নিজের মতো করে বুঝে নেবেন। এটাই যথেষ্ট বলে মনে করি।

সাহিত্যের সঙ্গে ছাপাখানার সম্পর্ক নিত্য কিনা তা বেশ পুরনো বিতর্ক। যে কোনো মাধ্যমেই সাহিত্য হতে পারে। এ কথাটা আমি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি। কেন ছাপা অক্ষরই আমাদের দেশে সাহিত্যের একমাত্র মাধ্যম বলে বিবেচিত হতে আরম্ভ করল, তার একটি প্রধান কারণ ইংরেজি লিটারেচারের অনুবাদ হিসেবেই আমরা সাহিত্য কথাটা বুঝতে শিখেছি; দ্বিতীয় কারণ আমাদের নিজেদের হীনম্মন্যতা। আমাদের নিজেদের ডিস্কোর্সে ‘সাহিত্য’ নামে একটা ধারণা ও চর্চা থাকতে পারে— যা পাশ্চাত্যের ধারণা অনুবর্তী নয়, এই কথাটি ভাববার মতো আত্মবিশ্বাস আমাদের নেই। আমরা দীর্ঘকাল পরাধীন ছিলাম বলে হারিয়ে ফেলেছি। অনুকরণপ্রিয় বলে নিজের মতো করে কোনো কিছু নিয়ে নতুনভাবে ভাবাও আমাদের ধাতে নেই।

সহিত থেকে সাহিত্য— সবার সঙ্গে যুক্ত হওয়া ও বিরাজ করবার বাসনা, সাহিত্যের এই প্রাচীন কিন্তু তাত্পর্যপূর্ণ ধারণাটি একালে বিশেষভাবে আমাদের মনোযোগ দাবি করে। বব ডিলানকে নোবেল পুরস্কার দেয়ায় এই মনোযোগ কিনা জানি না। কিন্তু এই খবরে উত্সাহিত হওয়ার এটাই আমার প্রধান কারণ। ছাপাখানার বাইরেও সাহিত্য হয়, এই ধারণা সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের আরো গভীর ও মৌলিকভাবে ভাবতে সহায়তা করতে পারে। দাবি আছে সবার সঙ্গে যুক্ত হওয়া ও বিরাজ করবার বাসনা আছে বলেই মানুষ কথা বলে। ওর মধ্য দিয়ে সমাজ নামক যে-পদার্থটা দানা বাঁধে, তা একই সঙ্গে এক ও অনেক। চিহ্ন বা আরো সুনির্দিষ্ট অর্থে অক্ষর নিয়ে কায়কারবারের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েরই উত্পাদন হয়। সাহিত্য নিয়ে নতুনভাবে ভাবার অর্থ লিটারেচারের অনুবাদ হিসেবে সাহিত্যের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। একে আরো ব্যাপক পরিসরে উপলব্ধি ও চর্চার ক্ষেত্রে তৈরি করা। সহিত থেকে সাহিত্য কথাটার মধ্যে যে ধারণা বিধৃত, সেই ধারণাকে আশ্রয় করে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বিচার করবার একটা সুযোগ বব ডিলানকে পুরস্কার দেয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হলো।

সাহিত্য তাহলে সকলের সহিত বর্তমান থাকার চর্চা।  ‘সবার সঙ্গে যুক্ত হবার ও বিরাজ করবার বাসনা’ যদি কোনো না কোনো চিহ্নব্যবস্থা বা মাধ্যমের মধ্য দিয়ে ‘যুগপত্ ব্যক্তি ও সমাজ হয়ে ওঠে’, তাহলে প্রাচীন অর্থের দিক থেকে দেখলে সাহিত্য একই সঙ্গে সমাজ রচনাও বটে। নিদেনপক্ষে এটা আমরা বুঝতে পারি যে, সাহিত্য ব্যাপারটা শুধু কোনো ব্যক্তির লিখিত ভাষাচর্চার ব্যাপার না। সাহিত্য আরো বড় জিনিস। সাহিত্যচর্চা শুধু গুটেনবার্গের টেকনোলজি দিয়ে হতে হবে তারও কোনো কথা নেই— যে কোনো মাধ্যম বা টেকনোলজির মধ্য দিয়ে সাহিত্যচর্চা সম্ভব। অর্থাত্ মুদ্রিত অক্ষরের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য ও চিরায়ত— এই ধারণার অবসান ঘটলে মুদ্রিত অক্ষরের বাইরেও আরো অনেক কিছুর সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক আছে, সেদিকে আমাদের নজর নিক্ষিপ্ত হতে পারে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে অন্যান্য মাধ্যম তখন সহজে দৃষ্টিগোচর হতে পারে। সাহিত্য কথাটির অন্তর্নিহিত ধারণা ও সম্ভাবনার কথা আমরা এখন ভাবি না। সহিত থেকে সাহিত্য— কথাটা আমাদের এখন খুবই অপরিচিত মনে হয়। আমরা ভাবতে ভুলে গিয়েছি। একালে কৃেকৗশলের বিপ্লবের যুগে ‘সাহিত্য’ কথাটা কীভাবে বোঝা জরুরি সেটাও আমাদের অনুসন্ধিত্সার বিষয় হয়ে উঠতে পারে না। ‘প্রতিপক্ষ’ নামে একটি স্বল্পস্থায়ী পত্রিকা আমি একসময় সম্পাদনা করতাম। নতুন পর্যায়ে সে পত্রিকাটিকে ঘিরে সমপ্রতি উদ্যোগ নেয়ার সময় এই দিকটাকেই মাথায় রেখে আমরা সাহিত্যচর্চা শুরু করি।  বব ডিলানের সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া সেই দিক থেকে আমার আগ্রহের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। বব ডিলান কৃতিমান সন্দেহ নেই। তাঁর নোবেল পাওয়া খবর নয়, তাঁর দিক থেকে তুচ্ছ। কিন্তু নোবেল কমিটি ছাপাখানার বাইরে একজনকে সাহিত্যের জন্য পুরস্কৃত করছে— এটাই এই পুরস্কারের তাত্পর্য।

দুই.

বব ডিলানকে সবাই গায়ক হিসেবে চেনে, তার গানের কথাকে আলাদা করে সে ফ কবিতা বা ‘সাহিত্য’ হিসেবে পড়বার জন্য কেউ পড়ে কিনা সন্দেহ। কিন্তু তারপরও তিনি সাহিত্যের জন্যই পুরস্কার পেয়েছেন, গানের জন্য নয়। কিন্তু বব সাহিত্য যদি কিছু করে থাকেন তবে সেটা ছাপাখানার বদৌলতে নয়, অর্থাত্ তিনি কোনো পত্রিকায় কবিতা ছেপে কিংবা কবিতার বই প্রকাশ করে ‘কবি’ কিংবা সাহিত্যিক হননি। তিনি কবিতা লিখেছেন বটে তবে সেটা গিটার, হারমোনিকা ও কণ্ঠের মাধ্যমে। ‘মাধ্যম’ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেখা যাচ্ছে বেশ বড়সড় কিন্তু পুরনো একটি তর্ক আবার উঠল। সেটা হলো, মাধ্যম আর তার বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বিচারের প্রশ্ন। সাহিত্য করতে হলে সেটা যে শুধু ছাপাখানার যন্ত্রে ছেপে চোখে দেখে পড়াবার জন্য প্রকাশ করতে হবে, তা না। সেটা গলায় আবৃত্তি করে কিংবা গান গেয়ে কান বা শ্রুতির কাছেও পেশ করা যেতে পারে। সারকথা হলো ছাপাখানাতেই শুধু সাহিত্য তৈয়ার হয় না। তার বাইরেও সাহিত্যের চর্চা আছে। ছিল। এবং ভবিষ্যতেও হবে। বব ডিলানকে সাহিত্যের জন্য পুরস্কার দেয়ার মধ্য দিয়ে নোবেল কমিটি এই প্রাচীন সত্যটাই শুধু নতুন করে স্বীকার করল।

এই সিদ্ধান্তের মধ্যে আরেকটি ইঙ্গিতও আমরা পড়তে পারি। সম্ভবত ডিজিটাল যুগে সাহিত্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে ছাপাখানা বা গুটেনবার্গ টেকনোলজির ভূমিকা গৌণ হয়ে যাচ্ছে। সাহিত্যিকরা আর ছাপাখানার ওপর নির্ভর করতে চাইছেন না। ছাপা জিনিস চোখ দিয়ে পড়ে সেই পাঠ থেকে ভাষার ধ্বনি, ছন্দ, অলঙ্কার, মূর্ছনা, প্রতীক, ইঙ্গিত, ইশারা ইত্যাদি কল্পনায় কানে শুনে নেয়ার অভ্যাস আমরা রপ্ত করেছি বলে চোখ দিয়ে শোনাকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি। কিন্তু চোখ দিয়ে কানে শোনা স্বাভাবিক ব্যাপার না। বই পড়ছি চোখ দিয়ে, নিঃশব্দে, কিন্তু মনে মনে অক্ষরের ধ্বনিগুলো উচ্চারণ করে নিচ্ছি। এটাই হচ্ছে চোখ দিয়ে শোনা। কিন্তু চোখ ইন্দ্রিয় হিসেবে দেখবার জন্য, শোনার জন্য না। তাহলে গুটেনবার্গ টেকনোলজি কিংবা অক্ষরের মেশিন একই সঙ্গে আমাদের অজান্তে আমাদের বিশেষ জৈবিক প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত করে তোলে। এই জৈবিক প্রক্রিয়াকে বোঝার একটি চেনাজানা নামও আছে: লিটারেসি  বা সাক্ষরতা। বর্ণমালা শিক্ষা, অক্ষর জ্ঞান বা বইপড়া শেখা। অর্থাত্ চোখ দিয়ে কানে শোনার অভ্যাস তৈরি করা। অক্ষর টেকনোলজির আধিপত্যের যুগটাই তথাকথিত ‘আধুনিক’  বা সভ্য যুগ। এই যুগের দাবি হচ্ছে এই যে, ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে আমাদের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক আদতে প্রাগৈতিহাসিক সম্পর্ক, এটা ঐতিহাসিক বা সভ্য সম্পর্ক নয়। সভ্য সম্পর্ক হলো লেখাপড়া শেখা। চোখ দিয়ে কানে শোনার অভ্যাস রপ্ত করা। নিজের শরীরের স্বাভাবিক শক্তি ও সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাবার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক চর্চা চলবে না, আমাদের টেকনোলজির অধীন হতে হবে। টেকনোলজির পরাধীনতা মেনে নিয়ে এমন সব জৈবিক প্রক্রিয়া আমাদের রপ্ত করতে হবে যাতে আমরা চোখ দিয়ে শুনতে পারি।

দেখা যাচ্ছে, টেকনোলজি সভ্য-অসভ্যের ভেদরেখাও তৈরি করে। সাক্ষরেরা সভ্য, শিক্ষিত ও জ্ঞানী। আর নিরক্ষরেরা অসভ্য, অশিক্ষিত, বর্বর। ছাপাখানা এই বিভেদগুলোও তৈরি করে। টেকনোলজির ভূমিকার বিচার ছাড়া এদের বিচার শুধু আর্থ-সামাজিক পর্যালোচনায় সম্পূর্ণ হয় না। মানবেতিহাসে টেকনোলজির কোনো ইতিবাচক অবদান নেই, সেটা আমার দাবি না। যদিও কোনটি ইতি আর কোনটি নেতি তার পর্যালোচনা ভিন্ন আরেকটি বিষয়। এখানে আপাতত উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেদের অজান্তে আমরা নিজেরা কীভাবে বদলে যাই— শুধু চিন্তায় নয় শরীরে বা শারীরিক জৈবপ্রক্রিয়ার দিক থেকেও— সেই দিকটা ধরিয়ে দেয়া, যাতে নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে মাধ্যম ও সাহিত্যের সম্পর্ক পর্যালোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব হয়। টেকনোলজির পরাধীন থেকে দেহের বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ব্যবহারের অভ্যাসের কারণে আমরা সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে যে রূপান্তর ঘটাই, সেই দিকটা যে খুবই গভীর ও অতি-প্রাসঙ্গিক ব্যাপার, তার কিছুটা আন্দাজ দিতে পারলেই আপাতত বব ডিলান নিয়ে আমাদের আলোচনা কাজের হতে পারে।

ইংরেজি ‘লিটারেচার’— যাকে অনুবাদ করে বাংলায় আমরা ‘সাহিত্য’ বলি— সেটা লিটারেসির সঙ্গে যুক্ত একই ধারণা। বিস্তৃত অর্থে লিটারেচার হচ্ছে যে কোনো লিখিত কাজ। যদি ব্যুত্পত্তি বিচার করি, তাহলে সেটা এসেছে ল্যাটিন থেকে (literature/litteratura ~ ইত্যাদি); এর অর্থ যাকে অক্ষর দিয়ে তৈয়ার করা হয়। গীত বা মৌখিক সাহিত্যকে মাঝে মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু সেটাও তার মুদ্রিত রূপকে। মুখস্থ সাহিত্যের মৌখিক রূপ সাহিত্য বিচারের বাইরে রয়ে গিয়েছে।

এই কারণে লিটারারি ব্যাপার বা বিষয় বলতে আমরা কী বুঝব তা নিয়ে বিস্তর তর্ক আছে; যেমন, কোনো একটি মুদ্রিত লেখার সাহিত্যিক মূল্য কি? লিটারেচারের যেটা লিটারারি ব্যাপার বা তার ‘সাহিত্য মূল্য’ সেই মূল্যের বিচার করার সময় ধরা পড়ে লিটারেচার একান্তই মুদ্রণ যন্ত্র ও মুদ্রিত অক্ষরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ লিটারেচার নিয়ে কোনো কিছু বিচারের আগেই মুখস্থ সাহিত্য বা মুখে তৈরি সাহিত্য— শ্রুতি আর কণ্ঠ যার মাধ্যম— সেই জগত্ আগেভাগেই বাদ দিয়ে রাখা হয়। যেমন কবিতার আলোচনায় আমরা লালন, জালাল উদ্দীন খাঁ, কুবীর গোঁসাইদের নিয়ে আলোচনা করি কি? করি না। তাঁদের আমরা পছন্দ করলেও সাহিত্যের প্রচলিত সংজ্ঞায় তাঁরা পড়েন না। কারণ তাঁরা তাদের কাজ মুদ্রিত অক্ষরে প্রকাশ করেননি। গলা দিয়ে পেশ করেছিলেন। চৈতন্য থেকে শুরু করে ফকির লালন শাহ অবধি নদিয়ার ভাবচর্চায় ভাষাকে কখনই ‘দেহ’ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ভাবা হয়নি। চৈতন্য পণ্ডিত ছিলেন, লেখাপড়া জানতেন। কিন্তু নামকীর্তন ছাড়া লিখিত ভাষার অধীনে নিজেকে পরাধীন করতে চাননি, নিরক্ষরের মুখের ভাষা তাঁর ধর্মচর্চার প্রধান বাহন ছিল। ফকির লালন শাহ লেখাপড়া জানতেন না বলা হয়, যদিও ভিন্ন দাবিও আছে, কিন্তু তিনি কথা দিয়েই নিজেকে পেশ করলেন, ছাপাখানার অধীন হলেন না। নদিয়ায় ‘দেহ’ কথাটা এই দিকে থেকে বিস্তৃত ও গভীর। যাকে অতি ক্লিশে দেহাত্মবাদ দিয়ে বোঝা যাবে না।

ফলে সেটাও শারীরিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, জৈবিক প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ অভ্যাস— চোখ দিয়ে শোনা— তার সঙ্গে লিটারেচারের যোগ আছে। ধারণাটি পাশ্চাত্যের। এর পরিণতি আধুনিক সভ্যতায় বহুমুখী ও অনেকান্ত। সেই সকল দীর্ঘ আলোচনায় এখানে যাওয়ার সুযোগ পাব না। কিন্তু গুটেনবার্গ টেকনোলজি এমন এক স্বাভাবিকতা তৈরি করেছে যাতে ছাপাখানাতেই শুধু সাহিত্য তৈরি হয়, এই দাবি মানলে সাহিত্য শুধু বর্ণ আর চোখের মধ্যে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। অথচ তার বাইরেও ‘সাহিত্য’ আছে, কালো কালো অক্ষরের তৈরি চিহ্ন ব্যবস্থা আর দৃষ্টির বাইরেও সাহিত্য নামক ব্যাপার ঘটে। ছাপাখানা আবিষ্কার হওয়ার পর কণ্ঠ ও শ্রুতিনির্ভর সাহিত্যচর্চার ধারা গৌণ হয়ে যায়। পড়বার জন্য হিসাবে হাজির হয়েছে। কোন? মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে ‘সাহিত্য’ তৈরি ও পেশ করা হলো সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

তিন.

তুলনীয় নয়, কিন্তু গানের জন্য নোবেল পুরস্কার ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথও পেয়েছিলেন। নিজের গান তিনি নিজে ইংরেজিতে অনুবাদ করে ১৯১২ সালে সং অফারিংস (ইংরেজি : Song Offerings) নামে প্রকাশ করেছিলেন। বাংলা ভাষার ব্যঞ্জনা ইংরেজি অনুবাদের ছাপা বইয়ে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় অবদানের জন্য পুরস্কারটি পাননি। পেয়েছিলেন ইংরেজি ভাষায় অবদানের জন্য। রবীন্দ্রনাথের পুরস্কার মিলেছিল “because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West”. অর্থাত্ তাঁর নিজের কাব্যিক চিন্তা তাঁর নিজের ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য, যে অনুবাদ পাশ্চাত্য সাহিত্যের অন্তর্গত। রবীন্দ্রনাথের অতিভক্তির কারণে এই সত্যগুলো আমরা ভুলে যাই।

তেমনি ভুলে যাই যে, বব ডিলানের নাম তাঁর পারিবারিক নাম নয়। তাঁর নাম রবার্ট এলেন জিমারম্যান। বব  মার্কিন দেশে দেশান্তরী হওয়া ইহুদি পরিবারের সন্তান। ষাট দশকের দিকে মার্কিন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বব ডিলানের আবির্ভাব ঘটে। সিভিল রাইটস মুভমেন্ট— বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গ, ইহুদি ও অন্য অভিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলছে, চলছে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর হিসেবে দারুণ কয়েকটি গান লোকসংগীতের আদল মেনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খুব কম সংগীতপ্রেমীই আছেন যারা ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড কিংবা লাইক এ রোলিং স্টোন শোনেননি। এর কথা ও সুরের সিমপ্লিসিটির জন্য অভিভূত হননি। ষাট-সত্তর দশকের মধ্যেই পাশ্চাত্যে গানের জগতে বব ডিলান একটা বড়সড় বদল ঘটিয়ে দিলেন। কিন্তু একটা সময় প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গায়ক হিসেবে তাঁকে আর জাগ্রত পাওয়া যায়নি। সেটা অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে ভাবমূর্তি বদলাতে শুরু করে তাঁর ইহুদি জাতিবাদী অবস্থান নেয়ার কারণে। যার প্রকাশ ‘Neighbourhood Bully’ গানটিতে স্পষ্ট।

বলাবাহুল্য, কবিতা গদ্য নয়। তার প্রকাশের ধরন নানান প্রতীক ইশারা ইঙ্গিতের মধ্যস্থতায়। কিন্তু বব ডিলানের এই গানটি বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিছু কিছু অংশ পাঠকের সুবিধার জন্য আমি সাদাসিধা অনুবাদ করছি। নেইবারহুড বুলি কথাটা ইডিওম, অনুবাদ করা কঠিন। বলা যায়, ‘পাড়ার পাপী’, অর্থাত্ পাড়ার যে কোনো খারাপ কিছুর জন্য যাকে দায়ী, দোষারোপ ও শাস্তি দেয়া হয়। ইসরায়েল রাষ্ট্রকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে সমালোচকরা দাবি করেন। আরবদের ‘পাড়ার’ মধ্যে এই দেশটি সকলের চক্ষুশূল। এই হচ্ছে থিম।

 

পাড়ার পাপী

বেশ, এইতো পাড়ার পাপী,  সে একা একমাত্র একজন

তার দুষমনরা বলে সে তাদের ভূমি দখল করে রেখেছে

পাড়ায় তারা সংখ্যাতীত, লক্ষের বিরুদ্ধে সে একা

তার কোন লুকাবার জায়গা, পালাবার সুযোগ নাই

সে হলো পাড়ার পাপী।

 

বেশ, এই তো পাড়ার পাপী, সে শুধু বাঁচার জন্য বেঁচে আছে

স্রেফ বেঁচে আছে বলে তাকে কথা শুনতে হচ্ছে, চলছে সমালোচনা

পালটা সে লড়তে পারবে না, তার চামড়া মোটা হওয়া দরকার

তার দরজায় যখন লাথি মারা হবে তখন শুয়ে পড়া ও মরে যাওয়া উচিত

সে হলো পাড়ার পাপী

 

পাড়ার পাপী, তাকে অন্য সকল ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে

নির্বাসিত মানুষ, সে ভূমণ্ডলে ঘুরে বেড়িয়েছে একা

দেখেছে পরিবার ছত্রভঙ্গ, তার লোকজন হামলায় ছিন্নভিন্ন

সে ফ জন্ম নিয়েছে বলেই তার বিচার চলছে

সে হলো পাড়ার পাপী।।

 

বেশ, তাকে পিটিয়ে মারার জন্য পাগলা লোকজন ছুটে এসেছিল তাদের সে পরাস্ত করেছে

বুড়িরা এখন বলছে তার নাকি দুঃখ প্রকাশ করাই উচিত কাজ ছিল

তারপর সে বোমা বানাবার কারখানা ধ্বংস করল, কেউই খুশি হলো না

আর বোমাগুলা তার জন্যই বানানো হয়েছিল, তার খারাপ বোধ করবার কথা

এই হলো আমাদের পাড়ার পাপী।

 

পৃথিবী তার জন্য নিয়ম বানাবে সেটা মেনে সে চলবে

তার সম্ভাবনা নাই, সুযোগ সীমিত

কারণ তার গলায় ফাঁসির রশি বাঁধা, আর পিঠে ঠেকানো আছে বন্দুক

দুনিয়ার উন্মাদদের প্রতি তাকে গুলি করে মারার হুকুম দেয়া আছে

এই হলো পাড়ার পাপী।

 

ওহো, তার বন্ধু বলে কেউ নাই যার কথা বলা যায়

তার অর্জন দাম দিয়ে পরিশোধ করতে হয়, ভালোবেসে কেউ কিছু দেয় না

সে পুরা অস্ত্র কেনে, তাকে কেউ অস্বীকার করে না

কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে লড়বার জন্য কেউ রক্ত কিংবা শরীর পাঠায় না

সে আমাদের পাড়ার পাপী

 

তাকে শান্তিপ্রিয়রা ঘিরে রেখেছে যারা সবাই শান্তি চায়

রক্তপাত বন্ধ হোক তারা প্রতি রাতে মোনাজাত করে

এখন একটি মাছিকেও আঘাত করবে না, একটিও আঘাত পায় তো তারা কাঁদবে

তারা বসে আছে, অপেক্ষা করছে পাড়ার পাপী যেন ঘুমিয়ে পড়ে

এই তো আমাদের পাড়ার পাপী।

 

তাকে দাস করেছিল সেই সকল সাম্রাজ্য লোপ পেয়েছে

মিসর আর রোম, এমনকি মহান ব্যাবিলন

সে মরুভূমির মধ্যে মরূদ্যান গড়ে তুলেছে

কারো সঙ্গে থেকে নয়, কারো হুকুমে নয়

সে পাড়ার পাপী

 

এখন তার পবিত্র গ্রন্থ পদদলিত করা হয়েছে

যে সকল চুক্তি সে স্বাক্ষর করেছিল সেখান যা কিছু লেখা তার কোনো দাম নেই

সে পৃথিবীর ভাঙা কণাগুলোকে সম্পদে পরিণত করেছে

রোগ আর অসুখের রূপান্তর ঘটিয়েছে স্বাস্থ্যে

সে আমাদের পাড়ার পাপী

 

কে কিসের জন্য তার কাছে ঋণী?

কিছুই না, তারা বলে। সে কেবল যুদ্ধের কারণ হতে পছন্দ করে

হামবড়ামি, খারাপ ভবনা আর কুসংস্কার। আসলেই।

এই পাপীর জন্য তাদের অপেক্ষা, যেন কুকুর বসে আছে গিলবার জন্য

সে আমাদের পাড়ার পাপী

 

গালে এত দাগ কেটে বসে যাওয়ার কি কাজ সে করল

সে কি নদীর গতিপথ বদলে দিল? চাঁদ বা নক্ষত্র দূষিত করল কি?

পাড়ার পাপী, একটি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে

ঘড়িকে পরাজিত করে, সময় দাঁড়িয়ে আছে স্থির

পাড়ার পাপী।

 

বব ডিলানের ইহুদি জাতিবাদ নিয়ে প্রচার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তাঁকে তার জায়গা থেকে বোঝাই আমাদের কাজ। গানটির মানে পাঠক নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে বুঝে নেবেন।

১৯ অক্টোবর ২০১৬। নবপ্রাণ আখড়াবাড়ি।

            লেখক: কবি ও দার্শনিক