স্টিভেন স্পিলবার্গ একজন আমেরিকান সিনেমা পরিচালক। বিশ্বসেরা বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাতাদের মধ্যে প্রথমেই আসে স্পিলবার্গের নাম।

স্পিলবার্গ বেইজিংয়ের স্কোয়ারে পৌঁছলেন ২০০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। তখন তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে একটি বড় ঘড়ি টানানো হচ্ছিল। মাও সেতুংয়ের একটি বড় প্রতিকৃতিও ছিল। ২০০৪ সালের এ দিনে ঘড়িটি টানানো হয়েছিল। কারণ চীনা নেতারা তিয়েন‌আনমেন স্কোয়ারকে দমন-নিপীড়নের প্রতীক থেকে মুক্ত করে দেশের উদার, মুক্ত পরিবেশ এবং নতুন শক্তির প্রতীকে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। ঘড়ির কাঁটা চালু হয় ১ হাজার ৪১৭ দিন গণনার জন্য, আর সেটা ছিল ২০০৮ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে। এ প্রস্তুতিতে ব্যস্ততম শহরে রূপ নিয়েছিল বেইজিং।

অলিম্পিক আয়োজন করে বিশ্বদরবারে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চেয়েছিল চীন। এ আয়োজন তাদের অর্থনৈতিক সংস্কারেরও প্রতিনিধিত্ব করবে। ২০০৮ সালে এমন ভাবনা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিলেন চীনা নেতারা। অলিম্পিকের কয়েক মাস আগে চীনা রাজস্ব বৃদ্ধি ও চীনা নেতাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নতুন পরিকল্পনা হাজির হয়। তারা চীনে একটি নিউ ডিজনিল্যান্ডের পরিকল্পনা করেন। চীনের নেতারা তাদের দেশের ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ইংরেজি শেখার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন তারা পর্যটকদের নিয়ে অসুবিধায় না পড়েন। এ প্রস্তুতিতে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল। সিলভার আয়োডিন ও নানা সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছিল মেঘের ওপর, যেন আবহাওয়া আর্দ্র থাকে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন বৃষ্টির অসুবিধা এড়াতে এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। তিয়েনআনমেনের ইতিহাস ভুলে বিশ্ব যেন নতুন চীনকে জানতে পারে, সে প্রচেষ্টাই চলছিল।

হলিউডে তখন ভিন্ন এক ঘড়ি টিকটিক করছিল। একসময়ের নিশ্ছিদ্র ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় ফাটল তৈরি হচ্ছিল। সাংস্কৃতিক বাঁক পরিবর্তনের সময় চলছিল হলিউডে। সুপারহিরো সিনেমাগুলো হলিউডকে শেখাচ্ছিল এ বড় বাজেটের সিনেমাগুলো আরো ব্যবসাসফল ও বড় পরিসরে এগিয়ে যাবে। চীনের নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হলিউডকে চীনের দিকে নিয়ে যাবে। আর হলিউডকেও টিকতে হলে দরকার চীনের বাজার। অলিম্পিকে প্রবেশ করার আগে চীনা নেতারা এ ভাবনা থেকেই থিম পার্কের চিন্তা করেছিলেন। ২০০৮ সালে ডিজনির রবার্ট ইগার সাংহাই কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ইউ ঝেংশেংয়ের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তার কোম্পানিকে চীনে প্রবেশ করতে দুটি বড় ছাড় দেন। একটি ছিল তিনি চীনে ডিজনি পার্কের বেশির ভাগ অংশীদারত্ব ছেড়ে দেবেন এবং চীনা কোম্পানি এ থিম পার্কের ৫৭ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে পারবে। এছাড়া রুম ভাড়া, থাকা-খাওয়া এবং মিকি মাউসের টুপি কেনা থেকেও ব্যবসা করতে পারবে চীনা কোম্পানি। দ্বিতীয়টি ছিল চীনা এয়ারওয়েব থেকে অনুমতি পেতে ডিজনি চ্যানেলে নিজেদের প্রচার বাদ দেবেন। চীনা নেতারা সেখানেই থেমে থাকেননি। তারা তাদের নাগরিকদের জন্য চীনা ডিজনিতে আরো সুযোগ তৈরি করেছিলেন। তার পরও কোম্পানিগুলোর জন্য এ চীনা ডিজনি ছিল তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক সুযোগ।

ওয়াল স্ট্রিট সে মুহূর্তে হলিউডকে প্রাধান্য দিয়েছিল। তখন শেয়ারহোল্ডারদের খুশি রাখতে চীনা বিশাল বাজারের প্রয়োজন ছিল হলিউডের। হলিউড স্টুডিওগুলোর প্রতি করপোরেট ক্ষুধা বাড়তে থাকে ১৯৮০-৯০ দশক থেকেই। এ সময় থেকে প্রতি বছরই ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানিকে দেখা গেছে বড় কোনো চুক্তির মাধ্যমে স্টুডিও স্থাপন করতে বা কিনে নিতে। এটি কোকা-কোলার ১৯৮০ সালে কলাম্বিয়া পিকচার্স কেনার মাধ্যমে শুরু হয়। প্যানাসনিক কিনে নেয় এমসিএ। এ কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে। ১৯৮৯ সালে ওয়ার্নার কমিউনিকেশন টাইম ইনকের সঙ্গে চুক্তি বদ্ধ হয়। দুটি কোম্পানি একীভূত হয় কোম্পানির নির্বাহীদের চেষ্টায় এবং টাইম ওয়ার্নার হিসেবে যাত্রা করে। ২০০০ সালে ইতিহাসের রেকর্ড করে এ কোম্পানি এওএলের সঙ্গে চুক্তি করে ১৬৫ বিলিয়ন ডলারের। এ ধরনের শক্তিশালী কোম্পানিগুলো হলিউডের মোড় পরিবর্তন করে দিয়েছিল। স্টেকহোল্ডার এ কোম্পানি মালিকরা সিনেমা পরিচালকদের ওপর আলাদা চাপ রাখতে শুরু করেন। যে স্টুডিও মালিকদের আগে ব্যক্তিমালিক কিংবা স্বাধীন বোর্ডকে খুশি রাখলেই চলত, এখন তাদের পাবলিক ট্রেড কোম্পানির মতো স্টক প্রাইস নিয়ে ভাবতে হলো।

২০০৮ সালের জনপ্রিয় অ্যাকশন সুপারহিরো সিনেমা আয়রন ম্যান। টনিক স্টার্কের চরিত্র ছিল বেশ আলোচিত ও জনপ্রিয়। ফ্র্যাঞ্চাইজি সিরিজের প্রথম পর্ব ছিল আয়রন ম্যান। এটিকে মার্ভেলের প্রথম সিনেমাটিক অ্যাডাপটেশন হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল। কারণ সিনেমাটি অল্প বয়সী শিশুদের খুব প্রিয়। সিনেমাটি আমেরিকার অভ্যন্তরে আয় করে ৩১৯ মিলিয়ন ডলার এবং আন্তর্জাতিকভাবে ২৬৭ মিলিয়ন ডলার। তখন থেকে প্রতিটি বড় স্টুডিও পরিকল্পনা পরিবর্তন হতে শুরু করে। এখন স্টুডিও পোর্টফোলিওতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ একটি ফ্যাঞ্চাইজি। যেখানে কয়েকটি অ্যাকশন কমিক, থিম পার্ক রাইড সিরিজ থাকবে। যার মাধ্যমে কয়েক ডজন কনজিউমার পণ্য তৈরি করা যাবে। তবে এ ধরনের সিনেমা তৈরি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শেয়ারহোল্ডারদের খুশি করতে হলে আয়রন ম্যানের মতো সিনেমার আয় বাড়াতে হবে এবং দেশের বাইরেও প্রচার করতে হবে। দুই-তৃতীয়াংশ টিকিট বিদেশী দর্শকের কাছে বিক্রি করতে পারলেই তা সম্ভব হবে। তাই দরকার চীনের মতো একটি মেগা মার্কেট হাতে রাখা।

সনি স্টুডিওতে সফলভাবে মুক্তি পেয়েছিল ব্রেকিং ব্যাড। এমসির সিনেমাটি ছিল একজন রসায়ন শিক্ষককে নিয়ে। শোটি পাঁচটি সিজনে ধারাবাহিক হিসেবে প্রচার করা হয়। সনি এ ধারাবাহিক থেকে প্রচুর অর্থ আয় করেছিল। ম্যাড মেন, হাউজ অব কার্ডের পাশাপাশি এ সিরিজ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল টেলিভিশনে। স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে এগুলো ছিল দারুণ সম্ভাবনাময়। টেলিভিশনের পাশাপাশি তখন অভিনেতারা নেটফ্লিক্সের মতো প্লাটফর্মগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। তখন সিনেমা দেখা মানুষের সংখ্যা অনেকটা কমে এল। ২০০৮ সালে এ সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, মার্কিন সিনেমার টিকিট বিক্রিতে কিছুটা স্থবিরতা নিয়ে এসেছিল।

তবে ফ্ল্যাটস্ক্রিন টেলিভিশন ও নানা অনলাইন প্লাটফর্মের যুগে এসে ডিভিডির বাজার ধসে গেল। ডিভিডির উৎপাদন ছিল সস্তা ও ক্রয় করতে মাত্র ২০ ডলার খরচ হতো। এগুলো ছিল স্টুডিওর আয়ের একটি বড় উৎস। এমনকি ফ্লপ সিনেমাগুলোর জন্যও থিয়েটারগুলোকে ব্যবসাসফল করতে সহায়তা করেছিল। ২০০০ সালে ডিভিডির বাজারে প্রবেশের প্রথম বছরে বিক্রয় ছিল ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০৪ সালে তা ১০ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ২০০৪ সালের মন্দা আমেরিকাকে গ্রাস করেছিল। ফলে অনেকেই তখন ডিভিডি কেনার পরিবর্তে তা ভাড়া নেয়া শুরু করে। ২০০৮ সাল নাগাদ ডিভিডি বিক্রয় ৩৩ শতাংশ কমে গিয়েছিল, যা ফিল্ম স্টুডিওর মোট আয়ের ৬৪ শতাংশ কমিয়ে নিয়েছিল। তাই তখন ডিজনি ও হলিউডের স্টুডিওতে দ্রুত অর্থ সন্ধান দরকার হয়।

১৯০৮-এ চীনা সরকার একটি ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে। যেখানে নাগরিকদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, পিকিংয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক আয়োজন করে সারা বিশ্বকে আমন্ত্রণ জানাতে তারা প্রস্তুত কিনা। তারা তাদের এ লক্ষ্য পূরণ করে বিশ্বের সামনে হাজির হতে পেরেছিল ঠিক ১০০ বছর পর। যদিও কিছু আমেরিকান মনে করে, চীন ২০০৮ সালের অলিম্পিক আয়োজক হওয়ার জন্য নিজেকে একটি বিশ্বশক্তি হিসেবে তৈরি করতে চলেছিল। তবে বাস্তবতা হলো চীন নতুন শতাব্দীতে উত্থানের ভূমিকাটি পালন করেছিল, যা আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একবার করেছিল।

বেইজিংয়ে অলিম্পিকের নতুন আকর্ষণ ছিল ‘‌বার্ডস নেস্ট’। আই ইউইউ নামের একজন চীনা সমসাময়িক আর্টিস্ট অলিম্পিকের জন্য বৃত্তাকার কাঠামো গঠন তৈরি করেছিলেন। পরে তিনি বিশ্ববিখ্যাত হয়েছিলেন চীনা নেতাদের বিরোধিতা করার মাধ্যমে। কারণ এখানে যে আর্কিটেক্টরা কাজ করতেন তারা সবাই চীনা সরকারি ফার্মের অধীনে ছিলেন। তবে আই ছিলেন একটি সুইস ফার্মের অধীনে কর্মরত। তাই তার সঙ্গে বেইজিংয়ের কর্তৃপক্ষের বেশ দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

পৃথিবীর সব বাজে ডিরেক্টররা একসঙ্গে হয়েছেন বলে আই মনে করেন। তাদের সবার লক্ষ্য ছিল একই। এর মধ্যে দুজন বিশ্ববিখ্যাত সিনেমা নির্মাতার নামও বাদ যাবে না। একজন হলেন ঝাং ইমৌ ও স্টিভেন স্পিলবার্গ। ঝাংয়ের অস্কার মনোনীত সিনেমা চীনা সেন্সরশিপে দীর্ঘ ২০ বছর আটকে ছিল। একসময় এটিকে মুক্তি দেয়া হয়। এর মাধ্যমে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রচার প্রসারে সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনায় যুক্ত হন। কমিউনিস্ট সরকারের মনোযোগ পেতে তিনি কাজ করছিলেন। সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি ঝাং দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি সমালোচকদের মতে, তিনি এমন কিছু সিনেমা নির্মাণ শুরু করেছিলেন, যা সরাসরি কর্তৃত্ববাদকে পর্দায় সমর্থন করে। সরকারের সঙ্গে তার সহযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সিনেমাগুলোও বক্স অফিসে ব্যবসাসফল হতে শুরু করে।

রাজনৈতিক সমস্যা দ্রুতই স্পিলবার্গের ওপর গ্রাস করেছিল। এমনকি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তার পরিচালনায় অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। সাবেক টেলিভিশন প্রযোজক রিক বার্চ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনা নাগরিকদের একটি দলকে সহায়তা করেছিলেন। বেইজিংয়ে তরুণদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তার ভাবনায় আসে নতুন কিছু। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন অলিম্পিক মাঠের মাঝখানে একটি পাতা ছাড়া গাছ লাগাতে, যা হবে চীনা পরিবর্তনশীল ইতিহাসের প্রতীক। তবে তার সহকর্মীরা বিব্রত ছিলেন বিষয়টি নিয়ে। তাদের একজন জানালেন, ১৬৪৪ সালে শেষ মিং সম্রাট গাছে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিলেন। মাঠে গাছ লাগালে মানুষ ভাবতে পারে এটা সেই গাছ। ফলে তারা এ চিন্তা পরিত্যাগ করল। বার্চ ভেবেছিলেন বিদেশী বন্ধুদের কথা যারা কখনো চীন বলতে ধান ও চপস্টিকের বাইরে ভাবেনি। 

চীনে আটকে শুভ সংখ্যা হিসেবে ধরা হয়। তাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান রাখা হয় ২০০৮ সালের ৮ আগস্ট, সন্ধ্যা ৮টা ৮ মিনিটে। এক যোগে ২০০৮ জন ড্রামার এক রকম জামাকাপড়ে উদ্বোধনী মাঠে নামে। ম্যাজিক আই আঁকা হয় মাঠে। চীনের সাংস্কৃতিক লোগো একযোগে বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়, এটি প্রথম কাগজ উদ্ভাবনকারী সেই দেশ। এখানে কুনফসীয় আদর্শের সঙ্গে মিশেছে ৮১ বছরের পুরনো পিপলস লিবারেশন আর্মির আতশবাজি। মূল লক্ষ্য ছিল অন্যান্য দেশকে চীনের প্রতি আকৃষ্ট করা। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এ আয়োজন ছিল অনেকটাই নতুন। টেলিভিশনে প্রচার করেছে, এটি একটি দেশের ঐতিহ্য ও চীনের মহাপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সরাসরি অনুষ্ঠানটি দেখেছিলেন। সে সময়টিতে ইরাক নিয়ে আমেরিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এ অনুষ্ঠানের কিছুদিন পরই মহামন্দার শিকার হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চীন তখন একটি পুঁজিবাদী ভূমিকা পালন করে অলিম্পিক গেমসের মাধ্যমে। এটি ব্যবসায়িকভাবে চীনকে দ্বিগুণ সফলতা এনে দিয়েছিল। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জরিপে ২৫টি দেশের জনগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল চীন কি বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে শীর্ষস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। তখন ১৩টি দেশের চীনের পক্ষে মত এসেছিল। আমেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্য আরো দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

ড্রিমওয়ার্কস অ্যানিমেশন কুংফু পান্ডা নামের একটি সিনেমা তৈরি করেন। সিনেমাটিতে একজন অতিরিক্ত ওজনের আনাড়ি পান্ডা কুংফু শেখার স্বপ্ন দেখে। এটি দর্শক এত বেশি পছন্দ করেছিল যে বিশ্বব্যাপী বেশি আয় করেছিল ৬০ কোটি ডলার। সিনেমাটি এমন একসময় প্রকাশিত হয়, যখন হলিউড চীনের অর্থনৈতিক শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল। প্রায় পাঁচ বছরের চেষ্টায় কুংফু পান্ডা ২০০৮ সালে গ্রীষ্মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখানো হয়েছিল। অভ্যন্তরীণভাবে এটি আয় করেছিল ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ড্রিমওয়ার্কসের হাতে আর একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি ছিল, যা আন্তর্জাতিক প্রক্ষাগৃহে ৪১ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করে, যা ছিল দ্বিতীয় মাদাগাস্কার কিস্তি ও তৃতীয় শ্রেক চলচ্চিত্রের সমান। উভয় ধারাবাহিক চিত্র দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ধারাবাহিকটি চীনে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করে।

কুংফু পান্ডা দেখে জেফরি ক্যাটজেনবার্গ যখন চীনে আসেন, তিনি চীন সম্পর্কে আরো জানার চেষ্টা করেছিলেন। চীন তখন বাণিজ্যিক সফলতা পেতে থাকে। ২০১০ সালে চীনে থিয়েটার সংখ্যা দ্বিগুণ হতে শুরু করে। বক্স অফিসে আয় দাঁড়ায় আগের চেয়ে ঢের বেশি। চীনে নগরায়ণ ও উন্নয়ন বাড়ছিল। অন্যদিকে আমেরিকায় চলছিল থিয়েটারের টিকে থাকার সংগ্রাম। ২০০৮-এর মন্দার পর খুব কমসংখ্যক মালিকই থিয়েটার ব্যবসায় নামতে চেয়েছিলেন। তবে এ সময়েই চীন আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের বিশ্বদরবারে নিয়ে আসে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় কোম্পানিগুলো মুনাফা অর্জন করতে থাকে। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূত্র ধরেই রাজনৈতিক অগ্রগতিও ঘটে। 

চীন সর্বদাই বিশ্বদরবারে নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিনোদনের একমাত্র খেলোড়ায় হতে চেয়েছে। সে অবস্থানে যেতে চীনকে খরচ করতে হয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। কুংফু পান্ডার মতো ছবি বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলবে এটা সিনেমা প্রযোজকরা আশা করতে পারেননি। এমনকি ডিভিডি যুগের পতন হওয়ার কারণে সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলো আয়ের ক্ষেত্র হিসেবে চীনের মোট আয়ের ওপর নজর রেখেছে। অথচ সিনেমাগুলোর আয় নিয়ে প্রযোজকরাও দ্বিধায় ছিলেন।

চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল এবং চীন অর্থ উপার্জনের সব পথও উন্মুক্ত করেছিল। আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক অগ্রগতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সফলতা তৈরি করেছে চীন।

[এরিখ শোয়ার্টজেলের রেড কার্পেট: হলিউড, চায়না অ্যান্ড দ্য গ্লোবাল ব্যাটল ফর কালচারাল সুপ্রিমেসি গ্রন্থ অবলম্বনে]