বিশ্বজুড়ে হলিউডের অবস্থান এবং চীনের চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ২০০০ সাল থেকেই একাডেমিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সিনেমার নন্দনতত্ত্ব কিংবা ক্রিটিক্যাল রিভিউ কিন্তু এখানে মনোযোগের বিষয় নয়। বরং হলিউড-চীন সম্পর্ককে গবেষকরা দেখছিলেন রাজনৈতিক অর্থনীতির লেন্স দিয়ে। আর সঙ্গে থাকে মিডিয়ার বিশ্বায়ন। অনেকে হলিউডের বিস্তারকে সরল দৃষ্টিতে দেখলেও কেউ কেউ সেখানে আরো ক্রিটিক্যাল অ্যাপ্রোচ প্রয়োগ করেছেন। তারা হলিউড ও চীনের মধ্যে একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক দেখাতে চেয়েছেন। ১৯৯৪ থেকে চীন হলিউডের জন্য কিছু নীতি তৈরি করে। তাদের এ নীতির আলোকে স্থানীয় চলচ্চিত্র শিল্পও নতুন দিশা পায়।

১৯৯৪ থেকে চীন বছরে ১০টি বিদেশী সিনেমা তাদের দেশে প্রদর্শনের সুযোগ দিতে শুরু করে মুনাফা শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে। ২০০১ সালে চীন ডব্লিউটিওতে যুক্ত হওয়ার পর সংখ্যাটি ২০-এ দাঁড়ায়। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর সংখ্যাটি আরো বেড়ে হয় ৩৪। আমদানি করা এসব সিনেমার বেশির ভাগই ছিল হলিউডের ব্লকবাস্টার। অন্যদিকে বিকশিত হচ্ছিল চীনের নিজস্ব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও। ২০০০-১০-এর মধ্যে এ স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রি প্রতি বছর বক্স অফিসে ৩০ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি দেখেছে। কিন্তু চীনের স্থানীয় সিনেমা তখনো হলিউডের ব্লকবাস্টারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারেনি, এমনকি নিজের ঘরের বক্স অফিসেও না। ২০১১ সালে চীনে হলিউডের ১৭টি সিনেমা রফতানি হয়েছিল। এগুলো চীনের বক্স অফিসে ১০ কোটি ইউয়ান ব্যবসা করে। এর মাধ্যমে জাপানকে সরিয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে হলিউডের এক নম্বর মুনাফা অর্জনকারী বাজারে পরিণত হয়। এ পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—লড়াইয়ে তাহলে কে জিতল, হলিউড নাকি চীন? ঘরের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি একদিকে আর অন্যদিকে হলিউড সামলাতে চীনের রাষ্ট্রীয় নীতির ভূমিকা কেমন?

১৯৯০-এর দশকে চীনে বেশ দ্রুত গতিতে বৈশ্বিক পুঁজির প্রবেশ ঘটতে থাকে। চীন তার নিজের সমৃদ্ধি ও ক্ষমতাকে দৃঢ় করতে এ পুঁজিকে কাজে লাগিয়েছে। সংস্কৃতির বাজার, কাঠামো নিয়েও দেশটি তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনে। জনগণের জন্য বিনোদন ও মতাদর্শিক প্রচারণার চেয়ে এবার তারা বাজারের চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

চীনের দর্শকদের মধ্যে হলিউডের সিনেমার অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা বেশ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। হলিউডের সিনেমা আমদানিতে রক্ষণশীল মনোভাব ও স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সরকার বিরাট মুনাফার যুক্তিতে হলিউডের সিনেমা আমদানিকে বৈধতা দেয়। অন্যদিকে সরকার তার মতাদর্শিক আধিপত্য বজায় রাখতে স্থানীয় সিনেমা নির্মাণকেও উৎসাহ দিতে থাকে। এমনকি আমদানি করা সিনেমার আয় থেকে স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রিকে শক্তিশালী করতে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছিল। ২০০৩-১২ সালের মধ্যে চীনের স্থানীয় সিনেমা তৈরি দ্রুতগতিতে বাড়ে। ২০১২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৪৫। এর চেয়ে চমকপ্রদ যে ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় পলিসির কারণে ঘটেছিল তা হলো চীনের চলচ্চিত্র বাজারে বহুজাতিক পুঁজির প্রবেশ। ২০০৫ সালের মধ্যে হলিউডের সাতটি বড় স্টুডিও চীনে তাদের দপ্তর খুলে বসে।

সরকারের সহযোগিতায় চীনে থিয়েটারের চেইন সিস্টেমের আবির্ভাব হয়। বাজার ও সরকারের হস্তক্ষেপ মিলিত হয়ে তৈরি হয় সিনেমা দেখার নতুন ব্যবস্থা। নিজের ঘরে সিনেমা বিপণনের বাজার অবকাঠামো তৈরির কাজটি সেরে নেয় চীন সরকার। সিনেমা বিপণনের কাঠামো ভালোভাবে বোঝার জন্য ১৯৯৭ সালে চীনের চলচ্চিত্র ব্যুরো যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে টিম পাঠিয়েছিল। একই সঙ্গে নতুন সহস্রাব্দের শুরু থেকেই চীনের স্টুডিওগুলোকে বড় কনগ্লোমারেটে পরিণত করার পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়। এসবের ফলও পেয়েছে চীন।

২০২০ সালের ১৭ অক্টোবর কিংডাও নামের ৩০ বছর বয়সী এক চীনা নারী এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন। তিনি অ্যানিমেশন ফিল্ম জিয়াং ঝিয়ার টিকিট কিনেছিলেন। সে টিকিটের দাম ছিল ৩২ ইউয়ান বা ৪ দশমিক ৮ ডলার। সেদিন তিনি ও অন্যরা যে টিকিট কেটেছিলেন তার মাধ্যমে সে বছর চীনে সিনেমার টিকিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার, যা উত্তর আমেরিকার ১ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে যায়। চীন হয়ে যায় বিশ্বের এক নম্বর বক্স অফিস।

কভিডের সময় দেখা যায় হলিউড তার বড় সিনেমাগুলোর মুক্তি পেছাতে থাকে। এ সুযোগে নিজেদের সিনেমার প্রতি চীনাদের আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। চীনের স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলো হলিউডের স্টুডিওগুলোর জন্য বেশ লাভজনক জায়গা ছিল। বছরে ৮ কোটি ডলার দিয়ে একেকটি সাইটে প্রচারের স্বত্ব নিতে হতো। কিন্তু ২০১৮ সালের পর চীনে তাদের নিজস্ব টিভি ড্রামার জনপ্রিয়তা বাড়ে। কভিডের পর ওয়ান্ডার উইম্যান ১৯৮৪ থেকে এফ নাইনের মতো হলিউডের সিনেমা চীনে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম সাড়া পেয়েছে। এর মাধ্যমে শতবর্ষ ধরে চলা হলিউডের আধিপত্য বড় হোঁচট খেয়েছে।

আজকের দিনে নেটফ্লিক্স প্রায় ১৯০টি দেশে দেখা যায়। কিন্তু চীনের বড় বাজারটি তাদের জন্য উন্মুক্ত হয়নি। নেটফ্লিক্সের কর্তারা চীন সরকারের সঙ্গে অনেক দেনদরবার করেও এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজারটির নাগাল পায়নি। স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম চীনে এখন বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু সে বাজারে নেটফ্লিক্স এখনো পা রাখতে পারেনি। চীন সরকার এক্ষেত্রে তার স্ট্রিমিং বাজারকে বাইরের কোম্পানির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে ভূমিকা নিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন চীন সরকার তাদের সাংস্কৃতিক নীতি পরিবর্তন ও বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজার শক্তি এবং বহুজাতিক পুঁজিকে ব্যবহার করে চলচ্চিত্র খাতকে মুনাফা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত করেছে। সরকারের নীতি চীনের স্থানীয় সাংস্কৃতিক বাতাবরণ নতুন করে নির্মাণ করেছে, একই সঙ্গে তারা বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও নিজেদের প্রভাব বিস্তৃত করেছে। হলিউডের রÅাম্বোর জায়গা চীনের স্পেশাল ফোর্সের লেং ফেং কতটা নিতে পারবে সেটা এ শতকেই নির্ধারণ হয়ে যাবে।

এসএম রশিদ: লেখক