বাংলায় একটি জনপ্রিয় প্রবাদ আছে—লেজ দেখে যায় চেনা। ইতালির বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড গুচির ক্ষেত্রে প্রবাদটি যথার্থ। ১০০ বছর ধরে তুমুল জনপ্রিয় ব্র্যান্ডটিকে দুনিয়ার মানুষ এক নামে চেনে। গুচির নাম নেয়ারও এখন প্রয়োজন হয় না, লোগো দেখলেই গুচির পরিচয় এবং পরিচিতি মানুষের মাথায় চলে আসে। অনেকের কাছে নিজের পোশাক কিংবা অ্যাকসেসরিজে গুচির লোগো এক আরাধ্য স্বপ্ন। এমনকি সেটা বড় সেলিব্রিটিদের ক্ষেত্রেও। রক্তমাংসের অনেক সেলিব্রিটির চেয়ে ইংরেজি G অক্ষরের দুটি পরস্পরমুখী বা পরস্পরচ্ছেদী নকশার লোগো অনেক বেশি জনপ্রিয়, আকাঙ্ক্ষিত। লোগোটি দেখেই বিভিন্ন দেশের মানুষ আজ গুচিকে শনাক্ত করতে পারেন।

১৯২১ সালে সূচনার পর থেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুচির এ লোগো কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছে এবং লোগোটির একাধিক সংস্করণ রয়েছে, কিন্তু মুখোমুখি দুটো ‘জি’ই বিশ্বব্যাপী গুচির পরিচয় বহন করে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো লোগোটি গুচির সূচনাকাল থেকে ব্যবহূত হচ্ছে না। গুচির জন্মের প্রায় এক যুগ পর লোগোটি তৈরি হয়।

বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়, প্রশংসিত এ ব্র্যান্ডের জন্ম ১৯২১ সালে হলেও প্রাথমিকভাবে কোনো অফিশিয়াল লোগো ব্যবহূত হতো না। ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা গুচিও গুচি তার স্বাক্ষর থেকে একটি সাধারণ পরিচয় ব্যবহার করতেন। পরে তার পুত্র আলডো গুচি, ‘গুচি ফ্যাশন হাউজ’ পরিচালনায় এলে একটি স্বতন্ত্র লোগোর প্রয়োজনীয়তা থেকে লোগো তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। আলডো তার পিতার সম্মানে, পিতার প্রথম ও শেষ নামের প্রথম দুই অক্ষর নিয়ে একটি লোগোর পরিকল্পনা করেন। গুচিও গুচি তার স্বাক্ষরের ইতালিক ফর্ম ব্যবহার করতেন। সেখান থেকে বেরিয়ে ১৯৩৩ সালে আলডো গুচি দুটো রোমান G অক্ষর পরস্পরমুখী করে গুচিও গুচিকে সম্মান জানিয়ে গুচির অফিশিয়াল লোগো তৈরি করলেন। অনেকে মনে করেন লোগোর মিনিমালিস্ট নকশা মূলত জার্মান ‘বাউহাউজ’ ঘরানা থেকে অনুপ্রাণিত।


লোগোর নকশা চূড়ান্ত করার পর থেকে এ লোগোই ব্যবহার করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। সেরিফ ফ্রন্টে মুখোমুখি দুটো জি রাখার পরও যেন ব্র্যান্ডের নাম বুঝতে অসুবিধা না হয়, সে কারণে লোগোর ওপরে স্পষ্ট অক্ষরে GUCCI লেখা হয়। সবসময় পণ্যের ওপরে দেয়া সম্ভব না হলেও গুচির লোগো বেশির ভাগ সময়েই সোনালি রঙে অঙ্কিত হয়। এ রঙ মূলত বিলাসিতা, জাঁকজমক, গৌরবের ধারণাকে প্রকাশ করে। মূলত গুচি নামটিই এখন উত্কৃষ্ট, উত্কর্ষ, গৌরব প্রকাশক। গুচি তাদের সূচনা থেকেই পণ্যের গুণগত মান ও ডিজাইনের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে সমাজের উঁচুতলার ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করে আসছে। গুচির লোগোও তাদের এ নীতিকে প্রকাশ করে।


ষাটের দশকে গুচির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। হলিউড সেলিব্রিটি থেকে ধনী ব্যবসায়ীরা গুচির পণ্য ব্যবহার আরম্ভ করেন। তালিকায় গ্রেস কেলি থেকে জ্যাকলিন কেনেডি অবধি ছিলেন। এ সময়ে গুচির মনোগ্রাম প্রিন্ট জনপ্রিয়তা পায়। বাম পাশের জি সোজা রেখে ডান পাশের জি উল্টো করে তৈরি এ মনোগ্রাম, গুচির ব্যাগ থেকে শুরু করে স্কার্ফ, টাই সবখানেই ব্যবহার করা হতো। এমনকি আজও ক্যানভাস ব্যাগ থেকে শুরু করে উলের পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড়ে এ মনোগ্রাম ব্যবহূত হতে দেখা যায়। নব্বইয়ের দশকে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে টম ফোর্ড গুচিতে যুক্ত হয়ে পণ্যগুলোকে সেক্স পজিটিভ করে তোলেন। ব্যাগ, স্কার্ফ, প্যান্টে তিনি কিউবিক জি ব্যবহার করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে অ্যালেসান্দ্রো মিকেলে গুচির দায়িত্ব নিলে সত্তর দশকের বেল্ট-বাকলে ব্যবহূত দুটো একমুখী জি অঙ্কিত লোগো পুনরায় ব্যবহার শুরু করেন।

গুচির পণ্যমূল্য সবার সাধ্যের মধ্যে থাকে না। কিন্তু জনপ্রিয়তা ও গ্ল্যামারের কারণে গুচির পণ্য অনেকেরই আরাধ্য। গুচিকে যেহেতু এর লোগোই উপস্থাপন করত, লোগোটি বিভিন্ন জায়গায় নকল হতে আরম্ভ করে। মজার ব্যাপার, গুচি এ নকল করার বিষয়টিকে নিজেদের প্রচারণা হিসেবে দেখেছে। নকলকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করেনি। এ কারণে ঢাকা কিংবা এশিয়ার অনেক শহরের ফুটপাথেও ‘গুচির ব্যাগ, বেল্ট’ ইত্যাদি পাওয়া যায়!

গুচির লোগোর অবশ্য একটা ট্র্যাজেডিও আছে। গুচি হাউজের অসাবধানতার কারণে যুক্তরাজ্যের আইনানুসারে দেশটিতে তাদের লোগোর মেয়াদ ২০১২ সালে শেষ হয়ে যায়। মামলা করার পরও প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্যে তাদের লোগোর অধিকার ফিরে পায়নি।

অবশ্য তাতে কি-ই বা আসে যায়! গুচির পণ্য যারা কেনার তারা ‘আসল গুচি’ খুঁজেই নেবেন। আর বহুকাল ধরে লোগো নকল হওয়ার পরও গুচি তাদের স্বনামে, সুনামে টিকে আছে। পণ্যের সঙ্গে লোগোর নকশা বদলালেও পুরনো স্বাতন্ত্র্য নিয়েই তারা বাজারে টিকে থাকছে।

 

আলী আমজাদ: লেখক