ষাটের দশকের মাঝামাঝি এবং সত্তরের দশকের শুরুতে যে সিসিলিয়ানরা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রেখেছিলেন, তারা মনোযোগ দিয়েছিলেন নগদের আগমন ঘটে এমন ব্যবসায়। এদের অধিকাংশই কাজ শুরু করেন সিসিলিয়ান কিংবা আমেরিকান এলসিএনদের (লা কোসা নস্ট্রা) নিয়ন্ত্রিত পিেজরিয়ায়। পেনসিলভানিয়া ক্রাইম কমিশন সেখানকার চিজ ও পিৎজা ইন্ডাস্ট্রির ওপর বিস্তৃত অনুসন্ধান চালিয়েছিল। ১৯৮০ সালে তারা সিদ্ধান্তে আসেন যে এ ইন্ডাস্ট্রির বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রিত হয় ‘অর্গানাইজড ক্রাইম’-এর মাধ্যমে। তাদের প্রতিবেদনে সিসিলিয়ান মাফিয়া ও আমেরিকান এলসিএনদের কথা উঠে আসে। আমেরিকার হেরোইন ও চিজ ইন্ডাস্ট্রিতে সিসিলিয়ান মাফিয়াদের সংযোগ বোঝা যাবে পেনসিলভানিয়া ক্রাইম কমিশনের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের (১৯৮০ সালের মার্চে প্রকাশিত) কয়েকটি লাইন থেকে—

নিউইয়র্কের ঈগল চিজের স্বত্বাধিকারী ছিলেন ফেলিপে কাজামেন্তো। ১৯৭৩ সালে হেরোইন পাচারের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়, তার সাজাও হয়েছিল। এর ১০ বছর পরে সিসিলিয়ান মাফিয়াদের সঙ্গে মিলে তিনি হেরোইন পাচারের বড় একটি ঘটনায় জড়িত হয়েছিলেন। ব্রুকলিনের ফেরো চিজ কোম্পানি চালাতেন সিসিলিতে জন্ম নেয়া পাওলি গ্যামবিনো। এই পাওলি আবার ছিলেন মাফিয়া বস কার্লোস গ্যামবিনোর ভাই। নিউ জার্সির পিৎজা প্লেস চালাতেন মাইকেল পিয়ানকোন। এ দুটো পিৎজা সেন্টারই ছিল হেরোইন চোরাচালানের স্টেশন। মাইকেল ১৯৭৩ সালে সাজাপ্রাপ্ত হন, কারণ তিনি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক করার জন্য একজন সিসিলিয়ানকে বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। ঈগল চিজের দুই কর্মী বেনেদেত্তো বাসচেট্টা ও তার বাবা টোমাসো ১৯৭০ সালে হেরোইন পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হন। ঈগল চিজের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন ফ্র্যাংক কাজামেন্তো। ইনি একই সঙ্গে ব্রুকলিনের ক্যাফে ডেলিরও মালিক ছিলেন।

এ ক্যাফেতে সত্তরের দশকে সিসিলিয়ান মাফিয়াদের নিয়মিত আড্ডা জমত। এ আড্ডার সদস্যদের ‘দ্য নিকারবোকার অ্যাভিনিউ ক্রু’ নামে সম্বোধন করা হতো। এদের ঘিরে হেরোইন পাচার নিয়ে বড় তদন্ত হয়েছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮৪ সালে ‘পিৎজা কানেকশন’ নামে বিখ্যাত হয়েছিল। এফবিআই ও ডিইএর এ যৌথ তদন্ত চলেছিল তিন বছর ধরে। নিউইয়র্ককে ঘিরে সিসিলিয়ান মাফিয়াদের যে সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে জমজমাট হেরোইন বাণিজ্য চালচ্ছিলেন, তাদের আটক করতেই এ অভিযান চলেছিল।

‘দ্য নিকারবোকার অ্যাভিনিউ ক্রুদের বিষয়ে তদন্তে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রে সিলিয়ান মাফিয়াদের হেরোইন চোরাচলান ও অর্থ পাচারের বড় এক চক্রের সন্ধান। মোট ৩৫ জনকে এ তদন্তে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তদন্তে উঠে আসে সিসিলিয়ান মাফিয়ারা যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ হেরোইন আমদানি করত। ১৯৮০-৮৩ সালের মধ্যে নিউইয়র্কের সিসিলিয়ান মাফিয়ারা নিউইয়র্ক থেকে সুইৎজারল্যান্ড হয়ে সিসিলিতে ৪ কোটি ডলার ক্যাশ পাঠিয়েছিল।

সত্তরের দশক থেকে এবার লাফ দিয়ে চলে আসা যাক ২০১১ সালে। জন ‘জনি পিৎজা’ পোর্সেলো এফবিআইয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মব রেইডে গ্রেফতার হন। পোর্সেলো ছিলেন ব্রংকস পিেজরিয়ার মালিক। একটি পিৎজা ট্রেড ম্যাগাজিন তাকে ‘সজ্জন-ভদ্রলোক’ বলে উল্লেখ করেছিল। পরবর্তী সময়ে কুসীদবৃত্তি ও আরো অনেক অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

বিশ শতকের শুরুর দিকে ৪০ লাখ ইতালীয় অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের হাত ধরে পিৎজা যুক্তরাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। একই সঙ্গে তাদের হাত ধরে গ্রামীণ সিসিলির পরিবারভিত্তিক অপরাধ সংগঠনের মডেল যুক্তরাষ্ট্রে পরিচিত হয়ে ওঠে। তৈরি হয় আমেরিকান কোসা নস্ট্রা বা মাফিয়া। তবে পিৎজা ব্যবসার আড়ালে মাফিয়াদের কর্মকাণ্ডের বিষয়টি প্রথমবার বিশদভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালের ‘পিৎজা কানেকশন’ ট্রায়ালে। পিৎজা ব্যবসার আড়ালে সিসিলিয়ান মাফিয়ারা ১৯৭৫-৮৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৬৫০ পাউন্ড হেরোইন আমদানি করেছিল। এ মামলার বিচার চলেছিল দুই বছর ধরে। এ সময় আরো জানা যায়, ইতালির পালেরমোয় তারা টার্কিশ মরফিন প্রক্রিয়াজাত করত এবং নিউইয়র্কে থাকা বোনানো ক্রাইম ফ্যামিলি সেগুলো উত্তর আমেরিকাজুড়ে বিপণন করত।

মাফিয়াদের নিয়ে গবেষণা করেছেন আন্তোনিও নিকাসো। মেড ম্যান: মাফিয়া কালচার অ্যান্ড দ্য পাওয়ার অব সিম্বলস, রিচুয়ালস অ্যান্ড মিথ বইয়ের লেখক আন্তোনিও মনে করেন, পিৎজা রেস্টুরেন্টগুলো ছাড়াও মাফিয়ারা যুক্তরাস্ট্রে মাদক পাচার করতে পারত। ‘কিন্তু সে সময় একটা পিেজরিয়া কিনে পেছনের দরজা দিয়ে হেরোইন বেচাকেনা করাটা ছিল সহজ কাজ। লোকজন কেউ পিৎজা, কেউ হেরোইন কিনতে আসত। পিেজরিয়াগুলো ছিল বোনানো ক্রাইম ফ্যামিলির সঙ্গে সম্পর্কিত। এরাই ছিল সিসিলির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ ও সহিংস।’

আন্তোনিও দেখিয়েছেন, পিৎজার সঙ্গে হেরোইন বিক্রি ছিল কাগজ-কলমে ঠিকঠাক হিসাব রাখার জন্যও সহজ। ব্যবসা হতো নগদ অর্থে, দিনশেষে সে হিসাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে করও দিত।

এফবিআইয়ের চেষ্টা, পিৎজা কানেকশন ট্রায়াল আমেরিকানদের পিৎজা ও হেরোইন আসক্তি এতটুকু কমাতে পারেনি। এ বিচারের এক দশকের মধ্যে জানা গেল বিখ্যাত রে’জ পিৎজা বিস্তৃত এক মাদক চক্রের সদর দপ্তর। এরা নিউইয়র্কে অন্তত ১০ কোটি ডলারের কোকেন বিক্রি করেছিল।

২০১৭ সালের এক অনুসন্ধনে দেখা যায় ইতালির অন্তত পাঁচ হাজার রেস্টুরেন্ট মাফিয়ারা পরিচালনা করে। দেশটির অর্থনৈতিক সংকটের সুযোগে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোকে ব্যবহার করে তারা এ খাতে বিনিয়োগ করে। এরা খাবারের মান নিশ্চিত করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের নাম দেয়া হয়েছে এগ্রোমাফিয়া। ২০১৬ সালে এরা ইতালিতে ২১ বিলিয়ন ইউরো সংগ্রহ করেছে। ইতালির খাদ্য ব্যবসায়ে এরা ধীরে ধীরে আরো জাঁকিয়ে বসছে। বার, রেস্টুরেন্ট, খাদ্য উৎপাদনের ব্যবসায়েও তারা বিনিয়োগ করছে। এখানে মাফিয়ারা তাদের প্রথামাফিক বলপ্রয়োগ ও সিন্ডিকেটেড ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। কৃষকদের কাছ থেকে তারা কম দামে পণ্য কিনছে এবং ব্যবসায়ীদের কাছে সে পণ্য তাদের ইচ্ছামতো দামে কিনতে বাধ্য করে। এভাবে তারা নিজেদের মনোপলি তৈরি করেছে।

ইতালির একটি ভোক্তা অধিকার সংগঠন কোলডিরেট্টির মতে, মাফিয়াদের কাছে এ যুগে কৃষি খাতে বিনিয়োগ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সংকটের সময়ে এটা বেশ কৌশলী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে তারা সিভিল সোসাইটি এবং মানুষের জনজীবনে মিশে যেতে পারছে। এসব ব্যবসা তার মাদক থেকে অর্জিত অর্থ বৈধ করতেও ব্যবহার করছে। ইতালির আবাসন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও মাফিয়ারা বিনিয়োগ করছে।

 

অমিত রহমান: লেখক