লালনগীতি, হাছন রাজার গান ও শাহ আব্দুল করিমের গানে যেমন গীতিকবির নাম উচ্চারণ করা হয়, রমেশ শীল, কুটি মনসুর কিংবা মোহাম্মদ হাশেমের ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না।

ভৌগোলিক দিক বিবেচনা, জলবায়ু ও মানুষের সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া বিবেচনায় নোয়াখালীর ইতিহাস তাত্পর্যপূর্ণ। বিচিত্র পেশার মানুষের বসবাস এ জেলায়। সমাজে নিচুতলার মানুষ থেকে শুরু করে উঁচুতলার বাসিন্দাও রয়েছে এখানে। জীবিকার তাগিদে এ অঞ্চলের মানুষ মৌসুমি পেশাকে যেমন গ্রহণ করেছে, তেমনি চিত্প্রকর্ষের প্রণোদনায়ও প্রণোদিত হয়েছে। ফলে মানুষের আচরণ ও চরিত্রও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ আচরণ ও স্বভাব মোহাম্মদ হাশেম আত্মস্থ করেছেন পরম মমতায়। কাছ থেকে দেখেছেন এ অঞ্চলের মানুষের যাপিত জীবন। নিজেও যাপন করছেন সে জীবন। গীতিকবি হিসেবে লিখেছেন গান, তৈরি করেছেন স্বরলিপি; দিয়েছেন সুর, কণ্ঠও। এতে তার লেখা গানগুলো কেবল বাণীপ্রধান কিংবা সুরের ইন্দ্রজাল হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছে প্রাণের আকুতিও। সুরের ঝরনাধারায় জটিল বিষয়ও শ্রুতিমধুর হয়ে উঠেছে। মোহাম্মদ হাশেমের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১০ জানুয়ারি।

জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছিলেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ আমি খুঁজিতে যাই না আর’, তেমনি মোহাম্মদ হাশেম-এরও সগর্ব উচ্চারণ, ‘আঁই যাইতান্নো ডুবাই, দেশের বদিল্লা খুবাই।’ মাতৃভূমির প্রতি অপার টান থাকার কারণেই অধিক উপার্জনের মোহ তাকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি। আপন মৃত্তিকার আঁচলে স্বল্প আয়ের দিনমজুরিও তার কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে সুদূর মধ্যপ্রাচ্য গিয়ে অঢেল অর্থোপার্জনের চেয়ে।

মোহাম্মদ হাশেম সমাজসেবক নন, রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজ-চিন্তকও নন। তবু অবাক হওয়ার বিষয় নিজের অঞ্চলের মানুষের সুনাম ও গর্বকে অক্ষুণ্ন রাখার সংগ্রাম করেছেন। দীপ্তকণ্ঠে, তীব্র অহংকারে উচ্চারণ করেছেন, ‘আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়েল ডিস্ট্রিক ভাই/ হেনী মাইজদী চৌমমুনির নাম কে হুনে নাই।’ গানটি বক্রোক্তি ও অনুপ্রাসের সম্মিলনে শ্রোতার মনে গভীর রেখাপাত করে। 

নোয়াখালী বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কোথাও কাউকে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে দেখা যায় না। কেবল চরম অপমানে জ্বলে ওঠেন একজন মোহাম্মদ হাশেম। তার প্রতিবাদী কণ্ঠে ধ্বনিত হয়—

 

হোনা কিয়া রূপা কিয়া হোনাত্তোনো খাডি

আল্লায় দিছে বল্লার বাসা নোয়খাইল্লা মাডি

এই মাডিতে বাঁচি যেন এই মাডিতে চোক খাডি।

 

দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর উত্তুরে কুমিল্লা

মইধ্যআনদি এই কদ্দুরা নোয়াখালী জিলা

লাগে এক সোন্দর হাডি।

 

নোয়াখালী গর্ব আঙ্গো নোয়াখালী সুক

নোয়াখাইল্লা কইতে আঙ্গো হুলি উডে বুক

দ্যাশে আর বিদেশে আমরা সিনাকান হুলাই আঁডি।

 

শেকড়ের কথা ভুলে যে মানুষ ভিন্ন সংস্কৃতিকে কেবল মেকি আভিজাত্যের প্রলোভনে আঁকড়ে ধরতে চায়, সে কেবল আপন সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গেই সম্পর্ক ছিন্ন করে না; নিজের আত্মার সঙ্গেও তার একটি নেতিবাচক ও ভয়ানক সম্পর্ক তৈরি করে। অন্তর্দ্বন্দ্ব তাকে তিলে তিলে অপমান করে। ঠেলে দেয় চরম অধঃপতনের দিকেও। সে সত্যই ফুটিয়ে তুলেছেন মোহাম্মদ হাশেম ‘মাতাত লইন উনের ডরে/ মাডিত থুইন হিমড়ায় ধরে/ হড়াই লেয়াই জমি বেচি বিলাত হাডাইলাম/ বিলাতি মেম হুতের বোর লাই হোলা আরাইলাম’ গানে। 

নোয়াখালীবাসী জীবিকার টানে বহির্বিশ্বের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমায়। ফলে বাড়িতে থাকে তাদের বিয়ে করা বউ, মা, ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। প্রবাসীর অনুপস্থিতিতে সন্তান যেমন পিতার স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হয়, স্ত্রী হয় স্বামী বিরহে বিরহিনী। মা-ও হন সন্তান অদর্শনে ব্যাকুল। এসব কথা মমতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন ‘ডুবাই গেছে আঙ্গো বাড়ির মহাম্মদ আলী’, ‘এরিও ব্যাক যদি ডুবাই যাইব দেশে থাইকব কে’, ‘কত মানুষ ডুবাই গেছে আঁই কিন্তু যাইন’, ‘জাল ভিসাদি ডুবাই গেলে হিরি আইয়ন লাগে’ শীর্ষক গানে। এসব গানে যেমন মানুষের অসহায়ত্ব, প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-বেদনা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি প্রকাশ পেয়েছে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমও।

মোহাম্মদ হাশেম অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী শিল্পী। লালন-নজরুল যেমন জাতপাতের ধার ধারেননি, তেমনি জাতপাতের ঠুনকো অহমিকাকে তিরস্কার করেছেন এ গীতিকবিও। ‘ধর্মের লাই কি মানষ নাকি মানষের লাই ধর্ম/ আইজো মানষ বুঝে না এই সোজা কতার মর্ম’;  ‘জাইত গেলে কার কি ওইবো আর জাইতের খেঁতা হুড়ি/ টুন্নুর করি ভাঙি যাইব জাইত কি কাচের চুড়ি?’ গানের বাণী অনেকটা লালন-নজরুলেরই বাণীর প্রতিধ্বনি। জগতের সংগীতসভায় সত্মানবতাবাদী শিল্পীর উপলব্ধির ঐকতানে সংগীতও এক মহান ঐশ্বরিক প্রপঞ্চে উন্নীত হতে পারে এই-ই কি তার প্রমাণ? নয়তো কালে-কালে শিল্পীতে-শিল্পীতে চিন্তা ও চেতনার অভিন্ন সুর কেন?

মোহাম্ম হাশেমের গানগুলো অলংকারসম্পন্ন হলেও অলংকারের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে না। কোথাও কোথাও অন্ত্যমিলে সামান্য পতনের রেশ থাকলেও তা তাল-লয়-সুরের সংরাগে শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে। শ্রুতিনির্ভর শিল্পে উচ্চারণের কৌশলই মূল। গায়কের গায়কি ঢং শ্রোতার কানে যে অমৃতসমান সুরের আশ্রয়ে বাণী পৌঁছাতে পারে, তাতেই শ্রোতা মোহিত হন। অন্যান্য সাধারণ ত্রুটি তার কানে ধরা পড়ে না, তাত্ক্ষণিক।

দুই.

নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের একচ্ছত্র অধিপতি মোহাম্মদ হাশেম অর্ধশতাব্দীরও বেশিকাল ধরে গান লিখে, সুর করে, কণ্ঠ দিয়ে নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন বিভিন্নভাবে। যেমন আঞ্চলিক গান, তেমনি পল্লীগীতিতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। আঞ্চলিক গানের মতো পল্লীগীতি রচনায়, সুর ও কণ্ঠদানে তিনি অনন্য। তার গানের ভাষা সহজ-সরল। কোনো জটিল ঘূর্ণাবর্ত নেই। তবে অধিকাংশ গানে জীবনজিজ্ঞাসা রয়েছে। ২০০৫ সালে বের হয় তার একমাত্র গীতিসংকলন ‘নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান’।

নর-নারীর প্রেমের গল্পের চিরন্তন ট্র্যাজেডিকেও তিনি স্থানীয় প্রেক্ষাপটে সফলভাবে হাজির করেছেন। সে রকম একটি গান—‘আহারে ও কুলসুম/ কতুন আইল ডুবাইঅলা কইলো এ জুলুম/ এত্তো আশা ভালোবাসা কেন্নেগো ভুলুম।’ এগানের মূল বিষয় হলো—দরিদ্র কথক ভালোবাসে তার খালাতো বোনকে। কিন্তু আর্থিক সংগতির অভাবে তাকে সময়মতো জীবনসঙ্গিনী করে ঘরে তুলতে পারেনি। তার আগেই প্রবাসী কোনো এক পুরুষ এসে তার সে খালাতো বোন কুলসুমকে বিয়ে করে নিয়ে যায়। ফলে দুটি জীবনেই নেমে আসে দীর্ঘতম দুঃখের অমানিশা।

অনেক সময় দেখা যায় নারী হয়েও সৎ মায়েরা সাধারণত সতীনের মেয়ের অমঙ্গল কামনা করেন এবং নিজের কোনো স্বার্থ চরিতার্থ করার হীনমানসে সৎ মেয়েকে পিতার বয়সী পুরুষের লালসার কাছে জলাঞ্জলি দিতে প্ররোচিত করেন।  সে সত্যই ফুটে উঠেছে ‘দুঃখে যাগো জীবন গড়া তাগো আবার দুঃখ কি/ আঁরে বানাইছে খোদায় গরীপ বাপের ঝি/ দুঃখ কমু আবার কার কাছেগো/ আল্লা ছাড়া গরিবের আর বন্ধু কে আছে?’ 

মোহাম্মদ হাশেম মানবতাবাদী শিল্পী বলেই মানবতার অপমান যেখানে দেখেছেন, সেখানেই প্রতিবাদ করেছেন। আবহমান গ্রামবাংলার একটি চিরায়ত স্বভাব, পল্লীর ঘরে ঘরে মায়েরা ঘরের বউকে কাজের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজের মেয়েকে বিশ্রামের দিকে প্ররোচিত করেছেন। পুত্রের মা ঘরের বউকে স্বামীপূজার দিকে প্রণোদিত করে, মেয়েকে প্ররোচনা দিয়েছে স্বামীর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে। সে জীবনের প্রতিচিত্র এঁকেছেন মোহাম্মদ হাশেম। বলেছেন—‘ঝি হোত বউ উঠ হইকে ডাক দেয়/ ঝিরে কয় হুইত্তো/ ঝি হোত বউ উঠ হইকে বোলে/ বোরে কয় উইঠতো/ আঁট্টোন আইনছে ইলিশ মাছ আর/ বাঁডা মাছগুন কুইটতো।’

স্বল্প আয়ের মানুষ বদু মিয়া স্থানীয় ওদার হাটে লাউ বিক্রি করে সওদাপাতি কেনা শেষে যদি দু পয়সা বাঁচে তাহলে সে চা-নাশতা করার বাসনা করে মনে মনে। নিজের সামান্য এ চাওয়া পূরণের কথা যখন তার মনে হয়, তখনই মনে পড়ে বোনের আব্দার, ছেলের বায়না, মেয়ের আহ্লাদ, স্ত্রীর দায়। সামান্য পয়সাই যে গরিব মানুষ দিনানুদিনের চাহিদা মেটাতে চায় সে আর যাই করুক সংসারের সবার মুখে একসঙ্গে হাসি ফোটাতে পারে না। তাই এ গানের তৃতীয় স্তবকে বেদনাই মূর্ত হয়ে ওঠে—‘বদুর হোলা বানা ধইচ্ছে লইতো নাডাই ঘুড়ি/ মাইয়াগাও কইছে বাবা আইনও কাচের চুড়ি/ মাতা খাইজ্জায় বদু এত হইসা কোনাই হাইব।’

এ-ই মানবজীবনের চরম ও পরম ট্র্যাজেডি। মোহাম্মদ হাশেম এ গানের ভেতর দিয়ে সে অমোঘ সত্যকেই চিত্রায়িত করেছেন একজন চিত্রশিল্পীর মতোই। মায়ের অভাব যে কোনো কিছুতে পূরণ হওয়ার নয় সে বিষয়টি ফুটে উঠেছে ‘আহারে মা কোনাই গেলা আঙ্গোরে হালাই’ গানে।

মোহাম্মদ হাশেম জীবনশিল্পী, জীবনের উজ্জ্বলতর দিকগুলো যেমন তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তেমনি কদর্য রূপকেও চিনেছেন তৃতীয় নয়নে। তাই জীবনের মাঠে-মাঠে কেবল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অন্বেষণ করেননি, দুঃখ-বেদনাকেও শৈল্পিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। মোহাম্মদ হাশেম জীবন জিজ্ঞাসার প্রশ্নে জীবনশিল্পী। গানকে ফ্যাশন হিসেবে দেখেননি, গানকে করে তুলেছেন হাজার বছরের কথ্য সংস্কৃতির অংশ। মোহাম্মদ হাশেম কেবল নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের শিল্পী বলেই নয়, পল্লীগানেরও এবং সমস্ত জীবনব্যাপী সংগীত সাধনার প্রেক্ষাপটে সমগ্র বাংলা গানের স্বতন্ত্র এক অহংকারের নাম। ২০২০ সালের ২৩ মার্চে মোহাম্মদ হাশেম প্রয়াত হয়েছেন।

 

মোহাম্মদ নূরুল হক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক