সল্টপিটার। বাংলায় পরিচিত শোরা নামে। রাসায়নিক নাম পটাশিয়াম নাইট্রেট। এক ধরনের খনিজ পদার্থ। কাচের জিনিসপত্র, রঞ্জক ও বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে এটি ব্যবহূত হয়। বারুদ তৈরির অন্যতম কাঁচামাল শোরা। আর এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই এর প্রেমে পড়ে পশ্চিমারা। বাংলায় ইউরোপীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যের একেবারে শুরু থেকেই শোরা হয়ে ওঠে প্রধান রফতানি দ্রব্য। ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। আবার শোরা রফতানির মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি মারার কাজ সারতেন ইউরোপীয় বণিকেরা। ব্যাপারটি পরিষ্কার করা যাক। উত্তাল সাগরে জাহাজকে সুস্থিত রাখার জন্য এর তলায় ভার হিসেবে শোরা ব্যবহার করত বণিকেরা। অন্যথায় তাদের লোহা ব্যবহার করতে হতো। এতে খরচ বেড়ে যেত। সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইংল্যান্ডে সল্টপিটারের অভাব দেখা দেয়। ফলে বারুদের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অথচ তাদের যুদ্ধজাহাজ এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যবহূত আগ্নেয়াস্ত্র বারুদ ছাড়া ছিল অচল। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষ থেকে সল্টপিটার আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেয়।

১৬২৬ সালে ইংল্যান্ডে সল্টপিটারের প্রথম চালান পৌঁছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে ব্যবসা। শুরুতে সল্টপিটার সরবরাহের প্রধান উৎস ছিল ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত করমণ্ডল উপকূল ও গুজরাট। তবে ১৬৩০-এর দশকের শেষের দিক থেকে এ তালিকায় যুক্ত হয় বাংলা প্রদেশের নাম। আর ১৬৫০-এর দশক থেকে করমণ্ডল ও গুজরাটকে পেছনে ফেলে বাংলাই হয়ে ওঠে সল্টপিটারের প্রধান উৎস।

বাংলায় মূলত পাটনার বিভিন্ন অঞ্চলে সল্টপিটার উত্পন্ন হতো। বারুদ তৈরির জন্য এখানকার শোরা সর্বোত্কৃষ্ট হিসেবে বিবেচিত হতো। তাছাড়া অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলার শোরা ছিল অধিকতর সস্তা। পরিবহন ব্যবস্থাও ছিল তুলনামূলক সহজ ও সাশ্রয়ী। কার্গো বোঝাই শোরা নদীপথে পাটনা থেকে হুগলিতে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখান থেকে তা তুলে দেয়া হতো ইউরোপগামী জাহাজে। এ উৎস আবিষ্কারের ফলে কোম্পানির সল্টপিটার বাণিজ্যে ব্যাপক গতি আসে। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের মধ্যে তা শীর্ষে পৌঁছে।

মূলত তিন প্রকারের সল্টপিটার পাওয়া যেত। পরিশোধিত শোরাকে বলা হতো দোবারা-কাবেসা। অর্ধপরিশোধিত শোরা পরিচিত ছিল দোবারা নামে। আর অপরিশোধিত শোরার নাম ছিল কুচা। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো সাধারণত পরিশোধিত সল্টপিটার রফতানি করত। অন্য প্রকারগুলো বারুদ তৈরিতে ব্যবহার উপযোগী ছিল না। কোম্পানিগুলো নিজস্ব ফ্যাক্টরিতে সল্টপিটার পরিশোধন করত। ১৬৪০-৪১ সালের দিকে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওড়িশার পিপলি নামক শহরে একটি শোধনাগার স্থাপন করে। এ কোম্পানি পাটনা থেকে বিপুল পরিমাণে অপরিশোধিত শোরা সংগ্রহ করত। অতঃপর পিপলিতে তা পরিশোধিত হয়ে চলে যেত বাটাভিয়ায়। সপ্তদশ শতাব্দীর ফরাসি পর্যটক টেভার্নিয়ারের মতে, ডাচরা পাটনা থেকে বিশ মাইল দূরে গঙ্গা নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী ছাপড়া নামক বড় একটি গ্রামে সল্টপিটার পরিশোধন করত। ইংরেজরাও পাটনাতেই পরিশোধনের কাজটি সেরে নিত। সাধারণত মাটির পাত্রে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে এগুলো পরিশোধন করা হতো। ১৬৮৮ সালের একটি ডাচ রিপোর্ট অনুসারে, প্রতি বছর ২ লাখ ২৬ হাজার ২০০ মণ অপরিশোধিত সল্টপিটার সংগ্রহ করা হতো। পরিশোধনের পর এর পরিমাণ দাঁড়াত ১ লাখ ২৭ হাজার ২৩৮ মণ। এর মধ্যে ১ হাজার ২০০ মণ হুগলিতে, ৩ হাজার মণ ঢাকায় এবং ৭ হাজার মণ পাটনায় বারুদ তৈরির কারখানায় চলে যেত। অবশিষ্ট ১ লাখ ৫ হাজার ২৩৮ মণ ইউরোপে রফতানি হতো।

 

রবিউল হোসাইন: লেখক