‘ঢাকা শহরের দেয়ালের লিখন যদি বিপ্লব ছড়াতে পারে, স্বাধীনতার আগুন জ্বালাতে পারে, ফাঁসির দাবি জানাতে পারে, ভোট ভিক্ষা চাইতে পারে, সরকার উত্খাতের হুমকি দিতে পারে, জনৈক বাবুল মিয়া এবং আজ্ঞাত এক লাইলির মাঝখানে যোগচিহ্ন বসিয়ে তাদের ভালোবাসার ডঙ্কা বাজাতে পারে, নিরাপদ এমআর ও ডিঅ্যান্ডসির গ্যারান্টি দিতে পারে, তাহলে আইজুদ্দিন তার কষ্টের কথা কেন শহরবাসীকে জানাতে পারবে না?’
দেড় দশক আগে ঢাকা শহরের দেয়ালে দেয়ালে কেউ একজন লিখে গেছেন; কষ্টে আছে আইজুদ্দিন। তিনটি অক্ষরে এটিই তার বেদনার সিলমোহর। এ কষ্ট কোমলপ্রাণ দেয়াল পাঠকদের কাউকে কাউকে কষ্টও দিয়েছে। কষ্ট বড় সংক্রামক, আইজুদ্দিনের কষ্ট আমাদের মধ্যে হয়তো সংক্রমিত হয়েছে।
তখনকার একজন রসিক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে এ নিয়ে আমার কথা হয়েছে। তিনি বললেন, ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিন কথাটা এখন আর দেয়ালে দেখা যাচ্ছে না কেন?’
জবাবও তিনি দিলেন, তার কষ্টের দিন শেষ হয়ে গেছে। তিনি এখন দেশের সর্বোচ্চ পদে। তারপর হো হো করে হেসে উঠলেন।
(২)
দেয়াল লিখন কর্মটির নিজস্ব একটি পরিভাষা আছে; চিকা মারা।
দেয়ালে চিকা মারতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়া খেয়েছেন নেতাকর্মীদের কেউ কেউ; গ্রেফতারও হয়েছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে চিকা মেরেছেন: পুলিশি নির্যাতন বন্ধ করো কিংবা একটা করে পুলিশ ধরো সকাল-বিকাল নাশতা করো। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই— এ দেয়াল লিখন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত বহাল থেকেছে।
বন্দে মাতরম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়— এসব দেয়াল লিখন দেখতে দেখতে যারা বড় হয়েছেন, তাদের জন্য ষাটের দশকের শেষ দিকে দেয়াল বুক পেতে দিয়েছে, তাতে লেখা হয়েছে: তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা।
এ এক মহাকাব্যিক দেয়াল লিখন।
আটষট্টিতে একটি দেয়াল লিখন আমাকে আকৃষ্ট করেছিল: আইয়ুব-মোনায়েম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই।
আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এরা দুই সহোদর, দৃশ্যটিও ভাবতাম দড়ির দু’প্রান্তে দু’জন ঝুলে আছেন, জিহ্বা বেরিয়ে আছে দুজনেরই। একজন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান, অন্যজন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনায়েম খান।
সে বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ দেয়লগুলোয় পুরু হরফের লেখা বিস্মৃত হওয়ার নয়: জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব।
তারও আগে দেখেছি: সাম্রাজ্যবাদের দালালরা হুঁশিয়ার সাবধান।
আদমজি কোর্টে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কাছেই লেখা ছিল: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক।
সিয়াটো, সেন্টো মানি না মানি না।
সিয়াটো ও সেন্টো যে মার্কিন ব্লকের চুক্তি, তা বুঝতে বুঝতে দেয়াল লিখন মুছে গেছে।
ছয় দফা ও এগারো দফা মানার দাবি উত্কীর্ণ ছিল দেয়ালে দেয়ালে।
গেস্টাপো প্রতীক সোয়াস্তিকা ঢাকার দেয়ালে দেখি আশির দশকে।
বিশ্ববেহায়া পরিচিহ্নিত একজন ক্ষমতাসীনের কার্টুনও।
জিরো পয়েন্টে ‘মিশুকের’ গায়ে কেউ লিখে দিয়েছেন। এইডা কিন্তু গাধা।
১৯৮৮ সালে কলকাতার একটি দেয়ালে উত্কীর্ণ দেখেছি মুখ্যমন্ত্রীর জবাবদিহির দাবি: জ্যোতিবাবু জবাব দাও, তোমার নাতি বিলেত ক্যানে?
জ্যোতি বসুর নাতি সেবার উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশগমন করে। জ্যোতি বসু জবাব দিয়েছেনও: আমি চাই বাংলার সবার নাতিই যেন বৃত্তি পেয়ে উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত যাওয়ার সুযোগ পায়।
একটি অসাধারণ দার্শনিকী উক্তি দেখেছি নেত্রকোনাগামী একটি লক্কড়ঝক্কড় বাসের গায়ে:
‘টেকা খাবে লুকে, দেহ খাবে পুকে।’
আঞ্চলিক উচ্চারণের কারণে লোক হয়ে গেছে লুক আর পোকা হয়েছে পুক। কিন্তু আমি এর মধ্যেই পেয়েছি দর্শনের সারাত্সার।

(৩) দেয়ালের লিখন যতটা না আনন্দের, তার চেয়ে বেশি যন্ত্রণার মানচিত্র।
রাইটিংস অন দ্য ওয়াল
স্যাম স্মিথের গাওয়া জেমস বন্ড ফিল্ম স্পেক্টরের কটি প্রেমের গান ‘রাইটিংস অন দ্য ওয়াল’ একসময় মুখে মুখে ফিরেছে। স্যামুয়েল বেকেটের ‘এন্ডগেম’ নাটকের একটি চরিত্রের প্রশ্ন ও উত্তর:
‘তুমি তোমার দেয়ালে কী দেখতে পাও? নগ্ন শরীর।’ চার্লস ডিকেন্সের মিস্টেরি অব এডউইন ড্রুডের শেষে যোগ হয়েছে গান: দ্য রাইটিংস অন দ্য ওয়াল।
রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য দেয়াল:
হাম লেখে র্যাহেঙ্গে: আজাদি, আজাদি, আজাদি।
ভয়ঙ্কর নািসবাদী দেয়াল লিখন:
এইন ফক, এইন রাইখ, এইন ফুয়েরার
(এক জনতা এক দেশ এক নেতা।)
এ ধরনের ফ্যাসিস্ট স্লোগান দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো দেশের দেয়ালেও দেখা গেছে, পরিণতি অমঙ্গল ডেকে এনেছে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নািস বন্দিশিবিরের দেয়ালে লেখা থাকত: কাজ তোমাকে মুক্তি দেবে।
বলশেভিকদের কমিউনিস্ট স্লোগান দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছে: সব ক্ষমতা সোভিয়েতের।
আবার কমিউনিজমবিরোধী স্লোগান এসেছে: বেটার ডেড দ্যান রেড (লালের চেয়ে বরং মৃত্যু ভালো)।
ষাটের দশকে আফ্রিকান-আমেরিকানদের দেয়ালে লেখা থাকত: ব্ল্যাক ইজ বিউটিফুল।
রুশ দেয়ালে নিকিতা স্ক্রুশ্চেভের বাণী: আমেরিকাকে ধরো এবং ডিঙিয়ে যাও।
ঈশ্বর অ্যাডাম ও ইভ সৃষ্টি করেছেন, অ্যাডাম ও স্টিভ নয়
(গেবিরোধী স্লোগান)
হেই এলবিজে, আজ ক’টা ছেলেকে মারলে?
(ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনের বিরুদ্ধে স্লোগান)
জয় জওয়ান জয় কিষান
(ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর স্লোগান)
দুনিয়ার মজদুর এক হও
(কমিউনিস্ট স্লোগান)
আমেরিকা ফর দ্য হোয়াইট
(ট্রাম্পপন্থী বর্ণবাদী স্লোগান)
১৯২৮-এ আমেরিকার অনেক দেয়ালে লেখা হয়েছে, প্রত্যেক রান্নাঘরে একটি মুরগি প্রত্যেক গ্যারেজে একটি গাড়ি। এটি ছিল প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হার্বাট হুবারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পপন্থী ও বিরোধী সক্রিয় উভয় দল। হাতে কালো রঙ লাগানো ব্রাশ। আমেরিকার ফ্রি স্পেস আজ হুমকির মুখে।
শৌচাগারের দেয়াল
নিরাপদ দেয়ালের জন্য টয়লেট দেয়াল শিল্পীদের পছন্দ। বিশেষ করে গণশৌচাগারের দেয়ালে নর-নারীর ঢেকে রাখা লাজুক অঙ্গগুলোকে এতটাই সক্রিয় রাখা হয়, যেন মানবজন্মের প্রক্রিয়াটি ছোট্ট শিশুও বুঝতে পারে। এমনকি সরকারের সম্মুখ ও পশ্চাদ্দেশ মেরে দেয়ার জন্য ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা গণশৌচাগারের দেয়ালই বেছে নিয়েছে। গার্হস্থ্য শৌচাগারের দেয়ালে নির্দেশনামূলক ও জীবনদর্শনসমৃদ্ধ লেখা মেলে:
যতক্ষণ পারফর্ম করবেন (কমোডে) বসে থাকুন।
আগে কাপড় খুলুন।
জীবনটা বাথটাবের মতোই, যত বেশি সময় ডুবে থাকবেন, শরীর ততই কুঁচকে যাবে।
বাথরুমে নয়, সঠিক নারী খুঁজে নিন।
Here I sit
Broken-hearted
came to shit
But only farted.
চীনের প্রাচীর
গ্রাফিতি শিল্পীর জন্য ৫ হাজার ৫০০ মাইল দীর্ঘ চীনের প্রাচীরের চেয়ে ভালো ক্যানভাস আর কী হতে পারে?
শিল্পীরা দেয়াল দখল করতে চাইছেন ঐতিহ্য ও প্রাচীনত্বের পুনর্জাগরণ ঘটাতে। কর্তৃপক্ষ মনে করছে প্রাচীন সপ্তমাশ্চর্য এ প্রাচীরের তা হলে বারোটা বেজে যাবে। শেষ পর্যন্ত সাব্যস্ত হয়েছে বেইজিংয়ের সর্বদক্ষিণে মুতিয়ানইউতে দেয়ালের খানিকটা অংশ গ্রাফিতি শিল্পীদের জন্য নির্ধারিত থাকবে।
বার্লিন ওয়ালের দুই পাশেই প্রচুর গ্রাফিতি শিল্পকর্ম ছিল। দেয়াল ভেঙে ফেলার পর এখন চাপ পড়েছে পূর্বাংশের অন্যান্য দেয়ালে।
লিন্ডার জন্য ভালোবাসা
জার্মানির ফ্রেডরিখান জেলার দেয়ালগুলোয় বিষণ্ন সাবেক প্রেমিক ছবি এঁকেছেন এবং জানতে চেয়েছেন, লিন্ডা কোথায়?
সমব্যথী কেউ কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন: লিন্ডা, সে তোমাকে ভালোবাসে।
লিন্ডার জন্য শোক একটি শহরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
সুবোধ কেন পালাবে?
ঢাকার দেয়ালে লেখা আছে, সুবোধ তুই পালিয়ে যা?
কেন পালাবে?
ক্রসফায়ার
আমরা এখন আর ক্রসফায়ার বলি না, বলি এনকাউন্টার।
তাতে লাভ?
ভালো শোনায়।





