প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
(১৫শ কিস্তি)
দ্বিতীয় অধ্যায়
‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় ভাষাসমূহের বিকাশ’
সুইডিশ ভাষার ক্রমবিকাশ
নরডিক দেশগুলো ইউরোপের উত্তর-পশ্চিম কোনায় অবস্থিত। ভুল করে এ অঞ্চলকে স্ক্যান্ডিনেভিয়া বলা হয়। এখানে পাঁচটি রাষ্ট্রে বর্তমানে ছ’টি ‘জাতীয় ভাষা’ প্রচলিত: সুইডেনে সুইডিশ, ডেনমার্কে ডেনিশ ও ফারোয়িজ, নরওয়েতে নরওয়েজীয়, আইসল্যান্ডে আইসল্যান্ডীয় এবং ফিনল্যান্ডে ফিনিশ (ও সুইডিশ)।
{স্ক্যান্ডিনেভিয়া কথাটা আসলে এই অঞ্চলের মধ্য ও প্রধান অংশের বেলায় আরো বেশি প্রযোজ্য, যেখানে আছে সুইডেন, ডেনমার্ক ও নরওয়ে, ফিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ড নয়, যদিও কখনো কখনো এই দুটো দেশকেও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অন্তর্ভুক্ত বলে লোকে মনে করে। এখন ১ কোটি ৮০ লাখের মতো মানুষ স্ক্যান্ডিনেভীয় ভাষাগুলোয় কথা বলে।}
এই পুরো ভাষাদলটির পটভূমি সম্পর্কে এখানে আলাপ করা হবে, তবে বিশেষ জোর দেয়া হবে প্রকৃত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ওপর এবং আরো বিশেষভাবে, সুইডিশ ভাষার ওপর।
নরডিক এবং স্ক্যান্ডিনেভীয়র মতো ঐতিহ্যগত ধারণাগুলো ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা। সেগুলো এই কথা বলে যে, এই পাঁচটি দেশ তাদের ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়জুড়েই রাজনৈতিকভাবে আলাদা থাকলেও তাদের এমন একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যা সুনির্দিষ্টভাবে নরডিক।
নরডিক/ স্ক্যান্ডিনেভীয় ঐক্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য (যদিও কোনোক্রমেই একমাত্র নয়) উপাদান বা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ভাষার ঐতিহ্য। কিন্তু এই ঐক্যটি সীমিত ও জটিল। ঐতিহাসিকভাবে আইসল্যান্ডীয় ও ফারোয়িজ ভাষাগুলোসহ তিনটি স্ক্যান্ডিনেভীয় ভাষা উত্তর-জার্মানীয় বা জার্মানীয় ভাষাগুলোর নরডিক শাখা থেকে আগত এবং তাদের ঘনিষ্ঠতম জীবিত আত্মীয়রা হচ্ছে পশ্চিম-জার্মানীয় ভাষাসমূহ (জার্মান, ওলন্দাজ ও ইংরেজি)। অন্যদিকে ফিনিশের সঙ্গে এদের কোনোই সম্পর্ক নেই। ল্যাপিশ এবং এস্তোনীয়র মতো, যে ভাষাগুলো একই বা সন্নিহিত অঞ্চলগুলোয় ব্যবহূত হয়, ফিনিশ এমনকি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীরও সদস্য নয়, বরং তা একটি ফিনো-উগরিক ভাষা বলে চিহ্নিত। তিনটি স্ক্যান্ডিনেভীয় ভাষা মূলগতভাবে পারস্পরিকভাবে বোধগম্য, ঠিক যেমন আইসল্যান্ডিক ও ফারোয়িজ।
এই পাঁচ নরডিক ভাষাই (ফিনিশ ছাড়া উল্লিখিত সব ক’টি) ‘আদি নরডিক’ (‘প্রোটো-নরডিক’) বিকাশের একটি স্তর থেকে উদ্ভূত। খ্রিস্টের জন্ম-পরবর্তী প্রথম আটটি দশকে এটাই ছিল দক্ষিণ ও মধ্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ভাষা (উত্তর স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলসমূহ এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ তখনো উপনিবেশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়নি)। আদি রুনিক উত্কীর্ণ লিপিতে এই ভাষার অস্তিত্বের সাক্ষ্য পাওয়া যায়, যে উত্কীর্ণ লিপিগুলোর অন্তত ডজনখানেক এখনো বিদ্যমান। এসব চিহ্ন থেকে যা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় তা হলো, ‘আদি নরডিক’ বা ‘প্রোটো নরডিক’ ছিল বিস্ময়কর রকমের এবং ভৌগোলিকভাবে সুষম একটি ভাষা।
{দেখুন, ১ম অধ্যায়, টীকা ৬}
‘অভিবাসন পর্বে’ এবং ‘ভাইকিং যুগে’, নরডিক লোকজন কিছু বিদেশী ভাষার সংস্পর্শে আসে এবং সে ভাষাগুলো স্ক্যান্ডিনেভীয় শব্দভাণ্ডারের ওপর তাদের ছাপ রেখে গেছে।
{‘বর্বরোচিত আগ্রাসন’ বলেও অভিহিত ‘অভিবাসন পর্বটি’ ছিল রোমক সাম্রাজ্যের ভেতরে এবং সেটার সীমান্তের বাইরে উত্তাল বিক্ষোভের কারণে ইউরোপে মানব-অভিবাসনের কাল। এই কালপর্বের পর (৩০০-৭০০ খ্রিস্টাব্দ) ভাইকিং বা নর্সমেন সহ নানান জাতিগোষ্ঠীর চলাচল ঘটে (অষ্টম থেকে একাদশ শতকে); তারা বাণিজ্য ও যুদ্ধ-বিগ্রহের উদ্দেশ্যে ইউরোপ পাড়ি দিয়েছিল।}
ধার করা শব্দের (বা কৃতঋণ শব্দের) এই প্রাক-সাহিত্যিক স্তর মূলত পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের সাংস্কৃতিকভাবে আরো অগ্রসর জাতিগুলোর সঙ্গে প্রারম্ভিক যোগাযোগের সাক্ষ্য বহন করে। সুইডেন ও ডেনমার্কের কেন্দ্রীয় উদ্যানগুলোয় রাখা প্রস্তর-নির্মিত নানান স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে সংরক্ষিত ভাইকিং যুগের হাজার হাজার রুনিক উত্কীর্ণ লিপিতে কিন্তু এই চিত্রটি প্রতিফলিত হয়নি; সেসবের ভাষাতাত্ত্বিক রূপ পুরোপুরি স্থানীয়। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সভ্যতার সঙ্গে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার চূড়ান্ত একীভবনের আগ পর্যন্ত স্বদেশী ভাষার ওপর বিদেশী প্রভাব শনাক্ত করার মতো কোনো প্রভাব পড়তে শুরু করেনি। লাতিন বর্ণমালাভিত্তিক একটি স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে টেক্সট তৈরির মাধ্যমে স্বদেশী ভাষাগুলোর লিখিত রূপের আবির্ভাবই ছিল এই একীভবন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত স্তর।
খ্রিস্টধর্ম প্রচার এবং তত্পরবর্তী লাতিন লেখাপত্তর প্রচলনের ফলেই স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় ভাষাতাত্ত্বিক সংস্কৃতির অবস্থাগত এই পরিবর্তন সূচিত হয়। প্রধানত দশম ও একাদশ শতকেই ঘটনাটি ঘটে। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে নরওয়ে ও আইসল্যান্ডে পশ্চিম নর্স ভাষায় একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য আবির্ভূত হয় এবং সে সাহিত্যের সবচেয়ে পরিচিত কাজগুলো হলো ধ্রুপদী সাগাসমূহ এবং এডিক কাব্য। সুইডেনে, স্বদেশী পূর্ব নর্স ভাষাগুলোয় (তবে লাতিন স্ক্রিপ্টে) লেখা গোড়ার দিককার ‘গ্রন্থগুলো’ ত্রয়োদশ শতকের প্রথমদিকের আগে রচিত হয়নি। সবচেয়ে প্রাচীন যে পূর্ণাঙ্গ কপিগুলো আজো বিদ্যমান, সেগুলো সেই শতকের শেষদিকের।
সুইডিশ সাহিত্যের এই অগ্রণী যুগের নথিপত্রগুলো ছিল প্রাদেশিক আইনের লিখিত বিবরণ। এবং এই লিখিত বিবরণের আবির্ভাবের মধ্য দিয়েই সভ্য লিখিত সুইডিশ ভাষার সূত্রপাত। এটা কেবল লাতিন বর্ণমালায় লেখা একটি ভাষার নিদর্শন ছিল না, বরং এটি এমন একটি ভাষাকে প্রতিফলিত করেছে, যা খ্রিস্টীয় সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার মৌল ধারণাগুলোকে ধারণ করছে: সংক্ষেপে, এটি ছিল একটি সুইডিশ ভাষা যা মূলত একটি জীবন্ত পশ্চিম-ইউরোপীয় সম্প্রদায়ে একীভূত, যখন সেটি তার ঐতিহাসিক বিকাশের মধ্যযুগীয় স্তরে রয়েছে। এটাকে খানিকটা কূটাভাস বলা যেতে পারে যে একটি ‘জাতীয় ভাষা’ প্রতিষ্ঠার জন্য সেটাকে একটি আন্তর্জাতিক ভাষাতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একীভূত হতে হয়। আর এই একীভবন সম্ভবপর হয়েছিল প্রধানত বিভিন্ন ধরনের ভাষাতাত্ত্বিক স্থানান্তরের মাধ্যমে; অনুবাদ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সন্ত ব্রিজেটের (১৩০৩-৭৩) নির্দেশনা তাঁর মৃত্যুর পর যথাযথভাবে অনুসরণ করে সুইডিশ অনুবাদের সূতিকাগার ভাদস্তেনা মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
{একটি অভিজাত পরিবারে, Norrtälje-এর কাছে জন্ম ব্রিজিটা (ব্রিজেট বা ব্রিট) পারসন-এর। তিনি ছিলেন ঘজ্জত্রশব প্রদেশের গভর্নর উল্ফোর স্ত্রী। সন্ত ক্যাথেরিনসহ আট সন্তানের জননী ছিলেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একজন ধর্মীয় মরমীপন্থীতে পরিণত হন, তার পর প্রথমে ভাদস্তেনা মঠ এবং এর পর সন্ত পরিত্রাতার ব্রিজিটিন সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। জীবনের শেষ পঁচিশ বছর তিনি রোমে পোপের মন্ত্রণাদাত্রী হিসেবে অতিবাহিত করেন। ‘ব্রিজিটিন রেভেলেশনস’ — যা গির্জার সংস্কারের আবহন সহ যিশু এবং কুমারীর জীবনের কাহিনীর একটি সমন্বয়— তা সাতটি গ্রন্থে ব্যক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে Liber celestis, the Revelations extravagantes I Opera Minora।}
এটি ছিল নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য নির্মিত একটি অগাস্টিনীয় মঠ। এই প্রতিষ্ঠানটিই অনুবাদের মাধ্যমে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সুইডিশ ভাষার সমৃদ্ধিসাধন করেছে। ধর্মীয় টেক্সটগুলোর অনুবাদকর্মে পরিচয়হীনতা বজায় রাখা হতো, তাই প্রকাশিত রচনাগুলোয় নির্দিষ্ট কোনো অনুবাদকের নাম উল্লেখ থাকত না। ফলে সুইডিশ ভাষার বিকাশে তাঁরা প্রভূত অবদান রাখার পরও তাঁদের নাম নথিভুক্ত হয়নি, যেমনটা কিনা অন্য অনেক দেশে হয়েছে।
নতুন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ ছিল সেটির প্রতিষ্ঠাত্রী রচিত Revelations-এর সম্পূর্ণ সংগ্রহ লাতিন থেকে তাঁর মাতৃভাষা সুইডিশে অনুবাদ করানো। এ কাজটি ছিল আসলেই প্রচণ্ড শ্রমসাপেক্ষ। মনে হয়, ১৩৮৪ খ্রিস্টাব্দে মঠের উদ্বোধন উপলক্ষে কাজটি করা হয়েছিল। আজকের ছাপার অক্ষরে, চমত্কার, শৈলীগতভাবে যথোচিত সুইডিশে সেটা ১ হাজার ২০০ পৃষ্ঠারও বেশি হবে। লিখিত সুইডিশ ভাষার পরবর্তী বিকাশে এ কাজটির গুরুত্ব অপরিসীম।
(ক্রমশ...)





