দুপুরে শেয়াল ডাকে?
তনুর প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নির্বাক সুমন।
দুপুরে শেয়াল ডাকে?
তনু বসে আছে ওর টেবিলে। অন্যরাও আছে। হয়তো এখনি সব হামলে পড়বে। কথার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার না করলে চলে নাকি! রামপাল কলেজের ঝোপজঙ্গল থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসে। কিন্তু এই শেয়ালের ডাক অন্যসময় শোনা যায় না। এখন শোনা যায় ঠিক জোহরের আজানের ধ্বনির সময় হয় যখন। মসজিদের মিনার থেকে যখন আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন চারপাশ থেকে ক্ষুধার্ত শেয়ালেরা হুক্কা হুয়া করে ডেকে ওঠে। আগে আজানের ধ্বনির সঙ্গে ওদের খাবারের সংযোগ ছিল। এখন নেই। তাই হয়তো ওরা ডাকে। কিন্তু আমাদের গল্পের চরিত্ররা একেকজন ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে। আগে আমরা এই চরিত্রগুলোর কথা শুনতে পারি। তার পর এর সত্যাসত্য বিচার করা যাবে।
সুমন বলল, এই শেয়ালগুলো নিশ্চয়ই মুসলমান। না হলে আজানের সঙ্গে সঙ্গে ডেকে ওঠে কেন?
আর আফসার বলল, আরে না, এগুলো মনে হয় শিবির। তাই এরা আজানের সঙ্গে ডেকে ওঠে।
ওয়াকিল বললেন, এই আকালে ওই নাম মুখে আইনেন না। ওই জিনিস এই তল্লাটে নাই।
সুমন বলল, সব শেয়ালের এক রা।
অন্যরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। কিসের ভেতর কী! পান্তা ভাতে ঘি— বললেন, জলি ম্যাডাম। না; এই সুমন বেটাকে নিয়ে পারা গেল না। হচ্ছিল কি কথা, তার ভেতরে কি কথা চলে এল। সে তো সব শেয়ালই ডাকে। একই রকম স্বরে ডাকে। কিন্তু আপনি এখানে ওই কমেন্ট করেন কী করে? আপনি কোন যুক্তিতে ওই কমেন্ট করেন?
আফসার বলল, সুমন ভাই সদা সত্য কথা বলে। শেয়ালগুলো ম্যাডাম একই রকমই ডাকে। হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া।
একটু হাসির রোল উঠল। কিন্তু জলি ম্যাডাম ট্যারা চোখে তাকালেন। তার মানে তিনি আফসারকে থোরাই কেয়ার করেন। মনে মনে হয়তো তিনি বলছেন, অই আফসাইরা তুই চুপ যা। গাধার মতন কথা কইছ না।
ওদিকে আফসার ভাবছে, সুমন বেটার মজা বোঝা যাচ্ছে। সুমন নিজেকে কথার জাদুকর ভাবছে। সে তো বোঝেনি, আমি কোন পাবলিক! বেটা বুঝিয়ে দেব আমি কে? আফসার নিজে নিজে বুক ফুলায়। দশাসই চেহারাটা ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ইচ্ছে করলেই সে যেকোনো মতামত প্রতিষ্ঠা করার মতো হিম্মত রাখে। চোখে মুখে একটা বিজ্ঞের হাসি।
এই ফাঁকে বিভাগের ঘুমকাতুরে পিয়ন আমজাদ বলে উঠল, রাইতেরবেলা শেয়ালগুলো দেখলে ডর লাগে। লাইট মারলে চোখগুলো জ্বলে। হেই হেই করলেও যায় না। মনে হয় যেন দৌড়াইয়া নিয়া ছুটবে।
জলি ম্যাডাম বললেন, আমজাদ, তুমি হুঁশিয়ারে থাইকো। তোমারে শেয়ালরা কামড়ে দিতে পারে। তুমি তো হাঁটতে হাঁটতে ঘুমাও।
আমজাদ উত্তর দিল— না, আমারে কামড়াইতে পারবে না। আমজাদের বাসার কাছেই শেয়ালগুলো বসবাস করে বলে জলি ম্যাডাম সতর্ক করে তাকে।
এবার সুপণ্ডিত ছাবের আহসান গলা খাঁকারি দিলেন। তার মানে তিনি কিছু বলতে চান। তিনি বেশ রস করে বললেন, আমি এতক্ষণ আপনাদের কথা শুনছিলাম। কিন্তু না, এর প্রকৃত কারণ অন্যখানে। আপনারা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনুন। এর হ ১৩ পৃষ্ঠার পর
নিগূঢ় অর্থ মনে হয় এমন—
সবাই থ। কি জানি কি বয়ান হবে এখন। কান উত্কর্ণ। জলি ম্যাডাম কাপড়ের ভাঁজ ঠিক করেন। তনু ম্যাডাম মিটমিট করে হাসেন। আফসার প্রভুভক্ত কুকুরের মতো তাকিয়ে থাকেন ছাবের আহসানের দিকে। আর সুমন নির্বিকার। তারা ছাড়াও আরো একজন আছে বিচক্ষণ মিনহাজ। সে চুপচাপ। মনে হয় তার জীবনের রসকষ সব ফুরিয়ে গেছে। কী নিয়ে মগ্ন থাকে তাকে কেউ বুঝতে পারে না। তবে মুখে একটা ভাব আছে, সুবোধ শান্ত। তনু ম্যাডাম অবশ্য সারাক্ষণ মিনহাজকে চোখে চোখে রাখে। একদিন আফসার আর ছাবের আহসানকে তনু বললেন, শোনেন স্যাররা আমার মিনহাজের মতিগতি ভালো ঠেকছে না।
আফসার আর আহসান সঙ্গে সঙ্গে হই হই করে উঠলেন। কি বলেন তনু?
জলি ম্যাডাম কাতল মাছের মতো মাথাটা উপরে নিচে দুলিয়ে বললেন, তনু যা বলছে, তা ঠিক স্যার। অই ছোকরা কী যে করে বুঝি না। দশটা কথা বললে একটার উত্তর দেয়। ওর বিষয়ডা কী?
তনু বলল, স্যার, ওর সমস্যাটা কী? ওকে সবসময় তো চোখে চোখে রাখা সম্ভব না।
আফসার বলল, ধুর। কেন ওকে চোখে চোখে রাখবেন! ও বেশ ভালো ছেলে। আফসার উত্তর চট্টগ্রামের ছেলে। ওর কথায় আঞ্চলিক টান আছে। মুখের কথা টেনে নিয়ে তনু বললেন, কচু বোঝেন আপনি!
আফসার একগাল হেসে জবাব দিল, যা ম্যাডাম এসব কি বলেন। আমি কি শুয়োর নাকি!
আরে আমি কি তাই বললাম নাকি! তনু প্রায় অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
না ম্যাডাম বললেন না কচু বোঝেন।
তো হলোটা কি? কচুই তো বোঝেন।
না ম্যাডাম কচু বুঝি না। কচু বোঝে শুয়োরে।
এবার আরেক পশলা হাসির রোল উঠল। ছাবের আহসান সবকিছু শুনে বিজ্ঞের মতো হাসলেন। তার পর কদুর বিচির মতো দাঁত বের করে বললেন, আপনারা ডরাইয়েন না। ও ছেলে ভালো। একটু পান খাওয়ার অভ্যাস আছে আর কি! আর জানেন তো যারা পান খায়, তারা ভালো মানুষ হয়।
তিনজনের চোখ ছাবের আহসানের দিকে ফিক্সড হয়ে থাকল। মনে হয় ছাবের আহসান এবার চূড়ান্ত কিছু বলবেন। মিনহাজ ভাবুক ছেলে। ভাবনার জগতে বসবাস। বই পড়ুয়া ছেলে। সারাক্ষণ লেখার বিষয় মাথায় গিজ গিজ করে। ও একটু শান্ত স্বভাবের হবেই তো! আপনারা যদি এটাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যান, তবে টিম ওয়ার্ক ব্যাহত হবে। ওর মধ্যে একটা পোলাইট ভাব আছে। এটাকে নেগেটিভ অর্থে নেওয়া যায় না তনু ম্যাডাম। তনু ম্যাডামের দিকে আঙুল তুললেন ছাবের আহসান।
তনু ম্যাডাম কলকাকলিতে মুখরিত করে তুললেন সেই সময়ের অফিস রুম। বললেন, স্যার আপনি এত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছেন কেন? আমরা এমনিতে ওর সম্পর্কে মতামত দিচ্ছিলাম।
ঠিক সেই সময় সবার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। মধুর সমাপন আর হলো না। কারণ মিনহাজ তখন ঘর্মাক্ত কলবরে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এলেন। ছাবের আহসান তাকে বললেন, এই মিনহাজ, খবর কী? আপনি হাঁপাচ্ছেন কেন? মিনহাজ ছোট্ট এক টুকরো হাসি উপহার দিয়ে বললেন, স্যার আরেকটা ক্লাস আছে।
ছাবের আহসান জিজ্ঞেস করলেন, কয় নম্বর?
মিনহাজ বলল, তিন।
তনু মুখ ভেংচাল। হাফিজের কানে না যায় মতো বলল, মর বেটা।
তিন, তিন, তিন।
তোর বাজুক মরণ বীণ।
জলি ম্যাডামকে এই লাইন ক’টি শোনালে উনি হেসেই কুটি কুটি হতে থাকেন।
তনু, আপনি পারেনও বটে! কী ব্যাপার, মিনহাজের কাছাকাছি থেকে আপনারও অন্ত্যমিলের রোগে পেয়েছে নাকি! তনু ভ্রূ কুঁচকে বললেন, যা ম্যাডাম, কী যে বলেন! ওর কথা না বলে ওই দুপুরে ডাকা শেয়ালগুলোর কথা বললেও আমার অনেক ভালো লাগত।
জলি ম্যাডাম বললেন, তাই নাকি! কিন্তু কেন? মানুষ ছেড়ে শেয়াল কেন? বসেন তো দুজন কাছাকাছি।
তনু বলল, বসা নিয়ে কি হলো ম্যাডাম? এটা কোনো ব্যাপার না। বসার জায়গা তো আমরা দুজন মিলে ঠিক করিনি। অফিসের ডেকারম বলে একটা কথা আছে না!
না, তা ছাড়াও তো দেখি সবসময় মুখ নিচু করে দুজনে ফুসুর ফুসুর করেন। কি কথা কন এত?
কাজের কথা কই বুঝছেন, কাজের কথা কই। বাইক্কা আলাপ এই তনু করে না। তনু ম্যাডাম কপট রাগের ভান করে। জলি ভাবেন তনু বুঝি ক্ষেপেই উঠেছেন। তবে জলি আর কথা বাড়ান না। ততক্ষণে শেয়াল নিয়ে মুখরোচক গল্প শুরু করেছেন আফসার। চোখ বন্ধ করে তিনি একটি শেয়াল পণ্ডিতের গল্প করছেন। সবাই শুনছে কি শুনছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে এটুকু বোঝা গেল যে আজকের বিষয়টি শেয়াল থেকে বের হতে পারলে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। যদিও গল্পের প্রয়োজনে কিংবা চরিত্রের স্বভাব নিয়ে আপাতত শেয়ালের প্রসঙ্গটি চাপা পড়বে এখন, তবে এই শেয়ালই হয়তো গল্পের শেষের দিকে হাহাকার তুলবে।
এ বিষয়টি বেশ কিছুদিন যাবত্ চলতে থাকবে। কোন বিষয়টি বলে যদি কেউ প্রশ্ন তোলেন। তাহলে বলতে হবে এই যে দুপুরে শেয়ালের ডাক এবং আজান। বিষয়টি সবার মনে তোলপাড় তুললেও তারা কেউ সত্যটি ভুলতে বসেন না। এই কলেজের হোস্টেলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শেয়ালগুলোর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। খাদ্য সংকট দেখা দেয়ার কারণে শেয়ালগুলো আজানের ধ্বনির সময় কান্নার রোল তোলে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে এটাকে শেয়ালের হাঁক বলে সবার বিভ্রম হয়। তবে ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যাবে এর পেছনের প্রাণীটির কান্না লুকিয়ে আছে। কেউ কেউ বলে থাকবেন যখন ছাত্ররা দুপুরের আজানের পর খেতে আসত, তার পর তাদের খাদ্যের উচ্ছিষ্ট জানালা দিয়ে পাহাড়ের ঢালুতে ফেলত। শেয়ালরা তখন এদের সঙ্গে দুপুরের ভোজ সেরে নিত। কিন্তু দীর্ঘদিন হোস্টেল বন্ধ থাকায়, এখন আর তা সম্ভব নয়। আর এ জন্যই তাদের কান্নার ধ্বনি প্রতিনিয়ত সময় করে উচ্চ রবে চলতে থাকে।
নগরের বুকে কলেজটির অতি সৌন্দর্যবর্ধনের কাজটি যাদের দ্বারা সম্পন্ন হয়, সেগুলো হলো বৃক্ষ। এই বৃক্ষের মধ্যেই প্রথমেই রয়েছে মেহগনি, তার পর কাঁঠাল। তার পর নাম বললে অনেকগুলো নাম বলতে হয়। আপনাদের বৃক্ষের নামগুলো না বললেই নয়। এখানে আছে বেশ বড় বড় গর্জন, সেগুন, আকাশমনি, মিঞ্জিরি, গামারি, ইপিল ইপিল, কড়ই, গর্জন, আমলকী, অর্জুন ও জারুল। এছাড়া আরো আছে, আপাতত সেগুলোর নাম না নিলেও বুঝবেন। কী পরিমাণ বৃক্ষ এখানে ছিল আর কতদিন সময় লাগিয়ে এগুলো উজাড় হয়েছে। কারণ সময়টি আমাদের এখানে দেখানো সম্ভব নয়। তবে আমাদের উপলব্ধিতে তার উপস্থিতি জরুরি। কারণ গল্পের মোচড় নেয়ার জন্য বৃক্ষের হারিয়ে যাওয়ার কথাটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি রাতে এক এক করে যখন বৃক্ষগুলো হারিয়ে যেতে লাগল, তখন এটি কারো নজর এড়াল না। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ মনে করল কলেজের টুল বেঞ্চি বাড়ানোর কাজটি এই ফাঁকেই সম্পন্ন করা জরুরি। দ্রুত গতিতে বৃক্ষ নিধন শুরু হলে একটার সঙ্গে যখন অনেকগুলো চলে যেতে থাকল, তখন ন্যাড়া পাহাড়ে বৃক্ষের গোষ্ঠী আর অবশিষ্ট রইল না। এর সঙ্গে আততায়ীর ভয়ে ঝোপ-জঙ্গলগুলোও পরিষ্কার হতে থাকল। আমরা এখন সহজেই বুঝতে পারব গল্পের শুরুতেই যে অবিশ্বাস্য ব্যাপারটি ঘটেছিল, সেটা হলো নগরের বুকে দিন-দুপুরে শেয়ালের হাঁক, তা আর কেউ শুনতে পেল না। এখন তনু আর জলি ম্যাডাম প্রায়ই বসে থাকেন দুপুরে আর ক্ষুধার্ত শেয়ালের হাঁক শোনা যায় না।
কিন্তু গল্পের খাতিরে নয়, শেয়ালের প্রয়োজনীয়তা আমরা টের পাব একটু পরেই। যখন আমরা দেখব তনু ম্যাডাম খুব মনমরা হয়ে ডিপার্টমেন্টে বসে থাকবেন। তার একহারা লম্বা দেহটি দিন দিন কেমন ধূসর হয়ে উঠবে অন্যদের চোখে। শুধু তাই নয়, মিনহাজকে দেখা যাবে খুব মনমরা হয়ে এধার ওধার ঘুরতে। দুজনের চিন্তার সূত্র এক জায়গায় প্রোথিত, তা জলি ম্যাডাম যতটুকু বোঝেন, অন্যরা তত বোঝে না। তাই তারা কেউ বোঝেই না যে তনু ম্যাডামের মন খারাপের সঙ্গে মিনহাজের কোনো যোগাযোগ আছে কিনা।
গল্পের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি আমরা। আরেকটু ধৈর্য ধরতে হবে আমাদের। কারণ আমরা বুঝতে পারছি আস্তে আস্তে ঝোপজঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গে শেয়াল নামক প্রাণীটি আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। শেয়াল হারালে এমন কিছু হয় না, জলি ম্যাডামের মুখ থেকে আমরা এমন বক্তব্য পেতেই পারি। কিন্তু যখন তনু ম্যাডামের একমাত্র কন্যাসন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য শেয়ালের মাংস বিশেষভাবে জরুরি, তখন তনু ম্যাডাম তন্ন তন্ন করে সব জায়গায় শেয়ালের মাংসের খোঁজ করতে লাগলেন। টাকা খরচ করলেন, কিন্তু কোথাও শেয়াল পাওয়া গেল না। অথচ একদিন তনু ম্যাডামই শেয়াল নিয়ে বেশ ঠাট্টা-মশকরা করেছিলেন কলেজের ডিপার্টমেন্টে বসে। আজ তিনি অসহায়ভাবে চারদিকে শেয়ালের মাংস খুঁজতে লাগলেন। কী এমন কঠিন অসুখ তনু ম্যাডামের সন্তানের, তা আমরা জানি না। কিংবা জানলেও বলব এ কেমন অসুখ যে শেয়ালের এক টুকরো মাংসের মধ্যে সেই ঔষধি গুণ আছে, যাতে তার সন্তান ভালো হয়ে যেতে পারে। কি অদ্ভুত কথা! হ্যাঁ, অদ্ভুত আমাদের কাছে লাগতেই পারে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় যখন প্রয়োজনের জিনিসটি খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন মাথা বিগড়ে যায়। আমরা মিনহাজের মন খারাপ শুনেছিলাম। আসলে তনু ম্যাডামের সন্তানের জন্য মিনহাজ অনেক চেষ্টা করেও শেয়ালের মাংস জোগাড় করতে পারেনি। তার পরও সে শেষ চেষ্টা করেছে কলেজে মধ্যরাত্রিতে হোস্টেলের ঢালুতে যেখানে একসময় খাবার দিলে শেয়ালগুলো ছুটে আসত, সেখানে খাবার ছিটিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু রাত্রি ১ ঘণ্টা, ২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মিনহাজ কোনো শেয়ালের দেখা পেল না।
ঠিক যে সময়ে শেয়ালের মাংসের অভাবে তনু ম্যাডামের একমাত্র সন্তান পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল। সে খবর মিনহাজ যদি পেত, তাহলে হয়তো গল্পের পরিণতি একটু অন্য রকম হতে পারত। কিন্তু সময় মতো মিনহাজের কানে সে সংবাদ না পৌঁছানোর কারণে মিনহাজকেও তনু ম্যাডামের সন্তানের পিছু নিতে হলো। ক্যাম্পাসের একদল বিপ্লবী তরুণ রাতের মধ্যযামে হোস্টেলের পাহাড়ে এভাবে একজনকে লুকিয়ে থাকতে দেখে বিপরীত পক্ষের আগন্তুক ভেবে তপ্ত বুলেট ছুড়ে মারল। ভোরের দিকে যখন মিনহাজের লাশ আবিষ্কার হলো, তখন তনু ম্যাডাম তার সন্তান হারানোর খবরটি মিনহাজকে দিতে চাইলেন। ওর মন বেজার চেহারার কথা মনে করে তনু ম্যাডাম আরেক দফা চোখের জল ছাড়লেন। আহা, মিনহাজ কতই না কষ্ট করল! কিন্তু মোবাইল ফোনটি ভোরের কোমল বাতাসে বেজে বেজে ক্লান্ত হওয়ার পর যখন অচেনা কণ্ঠ ‘কাকে চাইছেন?’ প্রশ্ন ছুড়ে দিল, তখন তনু ম্যাডাম মিনহাজের ওপর যারপরনাই বিরক্ত হলেন। বেটা রাস্কেল, মোবাইলে বুঝি তনুর নাম্বারটি পর্যন্ত সেভ করেনি? তাহলে এটা কী ধরনের মশকারি। বহু লোকের কলরব যখন তনুর কানে আসছিল, তখন অন্য প্রান্ত থেকে মর্মান্তিক দুসংবাদটি তনুর কানে তীক্ষ বর্শার মতো এসে বিঁধল। দুর্বৃত্তদের গুলিতে কলেজ ক্যাম্পাসে একজন নিহত। এটি তার মোবাইল। তনু বুঝলেন, শেয়ালের মাংস আনতে গিয়েই মিনহাজ নিহত হয়েছে।





