‘তিনি এত সব করেও নিজেকে সবার চোখের আড়ালে রেখেছেন। আমার মনে হয় এটা একটা অসাধারণ ব্যাপার। এ যুগে সবাই বিখ্যাত হতে চান অথচ তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করেননি’— কথাগুলো বলেছেন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা ব্রাড পিট। আর যাকে উদ্দেশ করে এই প্রশস্তিমূলক কথা বলেছেন তিনি বাঙ্কসি। আর এই বাঙ্কসি কে, তিনি কী করেন? এককথায় তিনি রাজনীতি সচেতন একজন ব্রিটিশ গ্রাফিতি আঁকিয়ে। দুনিয়ার অনেক দেশেই দেখা যায় তার গ্রাফিতি। বাঙ্কসির গ্রাফিতি সমাজ-রাজনীতির অনেক প্রশ্নকে মানুষের সামনে হাজির করে, মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে। তবে বাঙ্কসি নিজেই এক প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেছেন আজ অবধি। কেউই জানেন না তার পরিচয়!
বাঙ্কসি পিত্জা খেতে পছন্দ করেন, তবে পিত্জার স্বাদ বাড়াতে এর উপরে যে বিভিন্ন উপাদানের স্তর দেয়া হয়, সেটা তিনি পছন্দ করেন কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তার একটা সোনার দাঁত আছে। তার একটা রুপার দাঁত আছে। তার আছে কানের একটা রুপার মাকড়ি। তিনি একজন নৈরাজ্যবাদী পরিবেশবাদী, যিনি একটা এসইউভি গাড়ি নিজেই চালিয়ে ঘুরে বেড়ান। তিনি ১৯৭৮ বা ১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে জন্মেছিলেন নাকি ইয়টে? তিনি একজন কসাই ও একজন গৃহিণীর সন্তান বা হয়তো একজন গাড়িচালক ও হাসপাতাল কর্মীর সন্তান। তিনি মোটাসোটা, তিনি কংকালসার, তিনি কাজপাগল আত্মমগ্ন। কিছুদিন ধরে তিনি লন্ডনে বাস করছেন: আর তা নাহলে শোরেডিচ, তারপর হোক্সটন। লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দা, ওয়্যারহাউজের মালিক জোয়েল উনাঙ্গস্ট কয়েক বছর আগে বাঙ্কসির সাক্ষাত্ পেয়ে গিয়েছিলেন। বাঙ্কসি জোয়েলের কাছ থেকে শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর জন্য একটা ওয়্যারহাউজ কিনেছিলেন। জোয়েল নিশ্চিত করেছেন বাঙ্কসি টি-শার্ট, শর্টস ও স্নিকার পরেন। তিনি আরো জানিয়েছেন যে, বাঙ্কসির টি-শার্টে ছিল সাদা রঙের নকশা। তবে বাঙ্কসির ব্যাপারে জোয়েলের মুখ থেকে আরেকটি শব্দও বের করা যায়নি বরং বলেছিলেন যে তিনি অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছেন।
সৃষ্টিশীল অনেক ব্যক্তিত্বকেই দেখা গেছে নিজের পরিচয়কে কিছুটা আড়ালে রাখতে। কেউ বিতর্কিত লেখা (স্টোরি অব ও” এর লেখক), বিখ্যাত কারো সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক আড়াল করতে (স্টিফেন কিংসের ছেলে জো হিল) বা নিজের শিল্পের ধরনের প্রয়োজনে (সাচা ব্যারন কোহেন) অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছেন। এই আত্মগোপন শিল্পীকে বিখ্যাত করে কিন্তু তিনি বিখ্যাত হওয়ার অনেক ঝামেলা থেকে বেঁচে যান। বাঙ্কসি কিন্তু নিজের প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন না। আর তিনি কিছুটা সময় নয় বরং আজীবনই অজ্ঞাতনামা হয়েই রয়ে গেছেন।

বাঙ্কসি ইংল্যান্ডের মানুষের কাছে অতি পরিচিত নাম— পত্রপত্রিকায় বারবার তার নাম প্রকাশিত হয়। কিন্তু তার পরিচয় আজো কেবল অনুমানেই ঘুরপাক খাচ্ছে। বাঙ্কসির ব্যাপারে যা কিছু নিশ্চিত, তার মধ্যে আছে ১৯৯৩ সালে ব্রিস্টলের ট্রেন ও দেয়ালে তার গ্রাফিতির আবির্ভাব ঘটে, ২০০১ সালে স্প্রে রঙে যুক্তরাজ্যজুড়ে তার স্বাক্ষর দেখা যায়। নিজেকে তিনি ‘উপদ্রবকারী’ হিসেবে ভাবতেই পছন্দ করেন। পরিচয় গোপন রাখা যে পুলিশের হাত থেকে বাঁচার একটি কৌশল, সেটা কিন্তু বাঙ্কসির ক্ষেত্রে খুবই সত্য। বহু বছর ধরে তিনি সামনাসামনি সাক্ষাত্কার দিতে আপত্তি জানাচ্ছেন।
বাঙ্কসি সব সময় ফাঁকা কোনো ক্যানভাসে আধিপত্যবাদবিরোধী বার্তা ফুটিয়ে তোলেন— আমেরিকান আদিবাসী মোহকদের চুলের বিশেষ সাজে উইনস্টন চার্চিল, চুম্বনরত দুজন পুলিশ, গোলাপি বো টাই পরা হেলিকপ্টার— আধিপত্যকে খর্ব করেন। বাঙ্কসি সাধারণত স্প্রে পেইন্ট ও কাডবোর্ড স্টেনসিলে তার ছবিগুলো আঁকেন। এ ধরনের মাধ্যম ব্যবহার করেও তিনি অসাধারণভাবে তার ছবিগুলোর ডিটেইলিং করেন। তার ছবি পরিষ্কার, যে কেউ একবার দেখলেই এর বার্তাটি বুঝতে পারবেন। দেয়ালে আঁকা ছবিগুলো যেহেতু ক্ষণস্থায়ী, তাই মাঝে মাঝে তিনি নিজের ছবিগুলো দিয়ে তার সঙ্গে কিছু লেখা জুড়ে বই আকারে প্রকাশ করেন। তার প্রথম তিনটি বই হচ্ছে এক্সিসটেনসিয়ালিজম, ব্যাংগিং ইওর হেড অ্যাগেইনস্ট আ ব্রিক ওয়াল ও কাট ইট আউট। তার ওয়াল অ্যান্ড পিস বইটি প্রকাশ করেছে র্যানডম হাউজ এবং বইটি আড়াই লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। মোনালিসার মুখে হলুদ রঙের একটি স্মাইলি, ক্রাইম সিন টেপ দিয়ে ঘিরে থাকা চারণভূমির ছবি তিনি ছদ্মবেশ নিয়ে টানিয়ে দিয়েছিলেন যথাক্রমে লুভর ও টেট মিউজিয়ামে। সেবার ট্রেঞ্চকোট আর মুখে দাড়ি লাগিয়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়েছিলেন বাঙ্কসি। ২০০৫ সালে তিনি পশ্চিম তীর ভ্রমণ করেন। বেথেলহেমে ইসরায়েলিদের তোলা দেয়ালে তিনি একটি ছবি আঁকেন, মনে হবে গর্ত দিয়ে দেখা যাচ্ছে নয়নাভিরাম সমুদ্রসৈকত; যেন দেয়াল খুঁড়ে দূরে স্বর্গটাকে দেখা যাচ্ছে। বাঙ্কসি সম্প্রতি পশ্চিম তীরে একটি হোটেল খুলেছেন। এ বছরের ১১ মার্চ থেকে হোটেলটি যাত্রা করেছে। তবে হোটেলটি ঠিক আমাদের চেনাজানা কোনো হোটেলের মতো নয়। হোটেলটি বেথলেহেমে অবস্থিত। ইসরায়েলিদের তোলা দেয়ালের দিকে মুখ করে আছে। বাঙ্কসির এই হোটেল এক কথায় রাজনৈতিক বার্তাবাহী একটি শিল্পকর্ম। এই হোটেলে আপনি দুনিয়ার ‘সবচেয়ে খারাপ দৃশ্য’ দেখার জন্য বিল দেবেন। সেটি হলো দেয়াল। হোটেলের ভেতরে গেস্টরুমে একটি ম্যুরাল আছে, সেখানে দেখা যায় একজন ইসরায়েলি বর্ডার পুলিশ ও একজন ফিলিস্তিনি পুরুষ বালিশ যুদ্ধ করছেন। পুরো হোটেলে আরো অনেক চিত্রকর্ম রয়েছে। হোটেলটি উদ্বোধন করা হয়েছে বালফোর ঘোষণার শততম বার্ষিকীতে। হোটেলটি এ বছর পুরোটা সময় খোলা থাকার কথা রয়েছে।

বাঙ্কসির মতে, শিল্পের দুনিয়ায় বিরাট তামাশা চলে। তার কথায়, ‘শিল্পের জগত্ হচ্ছে দুনিয়ার ধনী, দাম্ভিক আর দুর্বল মানুষদের আশ্রয়স্থল।’ তার কাছে গ্রাফিতিই সেরা শিল্প মাধ্যম। কয়েক বছরে তিনি কাগজ ও ক্যানভাসে তার কাজ করছেন। এগুলোকে সহজেই যেখানে সেখানে ঝুলিয়ে দেয়া যায়। বাঙ্কসির কাজ সাধারণত লন্ডনের স্টিভ ল্যাজারিডসের গ্যালারিতে দেখা যায়। ল্যাজারিডস একসময় বাঙ্কসির এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। বাঙ্কসির কাজ নিলামে তোলার কাজটিও মূলত ল্যাজারিডস করতেন। ২০০১ সালে বাঙ্কসির ক্যানভাসে আঁকা স্টেনসিল ‘বম্বিং মিডল ইংল্যান্ড’ বিক্রির সময় নিলাম আয়োজকদের ধারণা ছিল সেটি ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ডলারে বিক্রি হবে। শেষমেশ তা ২ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। বম্বিং মিডল ইংল্যান্ড কাজটিতে বম্বিং শব্দটি গ্রাফিতি আঁকার স্ল্যাং হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। ২০০৭ সালে ‘স্পেস গার্ল অ্যান্ড বার্ড’ নামের একটি পেইন্টিং বিক্রি হয় ৫ লাখ ৭৫ হাজার ডলারে। বিখ্যাত নিলাম প্রতিষ্ঠান সথবির সমসাময়িক-শিল্প বিভাগের বিশেষজ্ঞ রালফ টেলর বলেন, ‘বাঙ্কসি সর্বকালের সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বিকশিত হওয়া শিল্পী।’ লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের একটি প্রদর্শনীর আগে তিনি একটা পিত্জা খেয়ে সেটার বক্সটা ডাস্টবিনে ফেলেছিলেন। পরের সপ্তাহে সেই পিত্জা বক্সটি ইবে তে ১০২ ডলারে বিক্রি হয়। বিক্রেতার কথা ছিল ওই বক্সে রয়ে যাওয়া খাবার থেকে বাঙ্কসির ডিএনএ সংগ্রহ করা সম্ভব, যা দিয়ে তাকে শনাক্ত করা যাবে।
কিপ ব্রিটেন টাইড প্রচারণার একজন কর্মকর্তা ডিয়ানে শেকসপিয়ারের মতে, ‘আমরা এ কারণে উদ্বিগ্ন যে বাঙ্কসির স্ট্রিট আর্ট গুণ্ডাগিরিকে উত্সাহিত করে।’ গার্ডিয়ানের জোনাথন জোনস লিখেছিলেন, ‘আমার মনে হয় বাঙ্কসির কাজে বুদ্ধির দীপ্তি আছে কিন্তু এগুলো প্রতারণার প্রবাহ।’
বাঙ্কসির প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী হয় ২০০০ সালে ব্রিস্টলের একটি রেস্টুরেন্টে, যার মালিক ছিলেন তার পরিচিত। এর তিন বছর পরে ‘টার্ফ ওয়ার’ নামে একটি আয়োজনের মাধ্যমে বাঙ্কসি লন্ডনের শিল্প জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। গোপন এক স্থানে আয়োজিত হয় এ প্রদর্শনী। এতে জ্যান্ত শূকর ও অ্যান্ডি ওয়ারহলের কাজের সদৃশ বাঙ্কসির স্প্রে পেইন্টিং স্থান পায়। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে এখানে শিম্পাঞ্জির চেহারায় উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তী প্রদর্শনী ‘ক্রুড অয়েল’-এর জন্য বাঙ্কসি নটিং হিল গ্যালারিতে দুইশ ইঁদুর জড়ো করেন। এই ছোট ছোট প্রাণী বাঙ্কসির খুব পছন্দের মোটিফ। তার আশা, দুনিয়ার ক্ষমতাহীন, ক্ষুদ্র মানুষ একদিন এই খুদে প্রাণীগুলোর মতো জোট বাঁধবে। বাঙ্কসির সবচেয়ে বিখ্যাত স্ট্রিট পেইন্টিং হচ্ছে সাদা ও কালো ইঁদুর নিয়ে করা স্টেনসিল। ছবিগুলো জীবন্ত ইঁদুরের আকারের। প্রতিটি ছবিতে কিছু দুষ্টামি ছিল, যা ছবিগুলোকে লন্ডনের পথচারীদের কাছে খুব জনপ্রিয় করে তোলে। স্মিথফিল্ড মার্কেটের কাছে বাঙ্কসি এঁকেছিলেন ‘গ্যাংস্টার র্যাট’, এই ইঁদুরের গলায় ছিল শান্তির চিহ্নযুক্ত মেডাল আর সে একটা ব্যানার বহন করছিল যাতে লেখা— ‘ওয়েলকাম টু হেল’। আরেকটায় লেখা ছিল, ‘প্লিজ লাভ মি’। সথবির কনটেম্পোরারি আর্ট ইন ইউরোপের চেয়ারম্যান শেনে ওয়েস্টফাল স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘আমি প্রথমবারের মতো বাঙ্কসির অস্তিত্বের মুখোমুখি হয়েছিলাম ২০০৪ সালের অক্টোবরে, একটা পার্টিতে গিয়েছিলাম। বাঙ্কসি সেই পার্টির বাইরে তার একটা কাজ রেখে গিয়েছিলেন।’ সেটা ছিল একটা ইঁদুর আর তার হাতে থাকা প্লাকার্ডে লেখা ছিল, ‘তুমি মিথ্যা বলো।’
২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জোয়েল উনাঙ্গস্ট দ্য নিউ ইয়র্কারের স্টাফ লেখক লরেন কলিন্সকে তার সেই ওয়্যারহাউজটি দেখিয়েছিলেন, যেখানে বাঙ্কসির একটি গোপন প্রদর্শনীর আয়োজন হয়েছিল। পুরো জায়গাটি ১২ হাজার বর্গফুটের, একসময় ফল আর সবজির আড়ত হিসেবে ব্যবহূত হতো। ১৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ছিল প্রদর্শনীর প্রথম দিন, শিরোনাম ছিল ‘বেয়ারলি লিগাল’। প্রদর্শনীর দিন সকালের আগ পর্যন্ত এর লোকেশন কাউকে জানানো হয়নি। সেদিন প্রদর্শনীতে এসেছিলেন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা ও অভিনেত্রী ব্রাড পিট এবং অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। বর্তমান লেখার শুরুতে বাঙ্কসিকে নিয়ে ব্রাড পিটের যে মূল্যায়ন উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি তিনি এই প্রদর্শনীতে এসে করেছিলেন। প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনে পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদ জানান। কারণ প্রদর্শনীতে একটা হাতি ব্যবহার করা হয়েছিল, এর শরীরে কিছু আঁকা হয়েছিল। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ ছিল হাতিটির শরীরে বিষাক্ত রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। আল জাজিরা এই বিতর্ক নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে। মাদার তেরেসার একটি ছবি ও তার ক্যাপশনকে ঘিরেও অনেকে ক্ষুব্ধ হন। রোববার নাগাদ বাঙ্কসির সেই প্রদর্শনী দেখার জন্য ৩০ হাজার মানুষ লাইন ধরে। লরেন কলিন্স জোয়েলকে বাঙ্কসির ব্যাপারে আরো কিছু জানানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন। জোয়েল জবাবে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে উনি আর সবার মতোই, কিন্তু ঠিক একইভাবে তিনি অন্য কারোর মতো নন।’ তিনি বলতে থাকলেন, ‘বাঙ্কসি একজন জিনিয়াস ও পাগল। তিনি ব্রিস্টলের মানুষ।’

লস অ্যাঞ্জেলেসে বাঙ্কসির কাজ স্থানীয়দের অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি সেখানকার বেশকিছু ভবনে গ্রাফিতি করেছিলেন। এর পর তিনি একটি পুতুলকে কুখ্যাত গুয়েন্তানামো বে কারাগারের পোশাক পরিয়ে ডিজনিল্যান্ডে হাজির করেন। সেখানে ছদ্মবেশে তিনি পুতুলটিকে বিগ থান্ডার মাউন্টেইন রেলরোডের পাশে স্থাপন করেন। ৯০ মিনিট পুতুলটি সেখানে ছিল। ব্রিস্টলের অ্যান্টি-গ্রাফিতি কর্মকর্তা বহু বছর ধরে বাঙ্কসিকে অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। শেষমেশ তার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে যে বাঙ্কসির ছবিগুলো বৈধ। গার্ডিয়ানের লেখক সাইমন হাটেনস্টোনের সঙ্গে বাঙ্কসির সাক্ষাত্ হয়েছিল। স্টিভ ল্যাজারিডসের গ্যালারি লন্ডনের সোহোতে অবস্থিত। বাঙ্কসির মতো ল্যাজারিডসও ব্রিস্টলে বেড়ে উঠেছেন। শিশু বয়সে তারা একে অন্যকে চিনতেন না। তবে তাদের বয়স যখন বিশের ঘরে, তখন এক বন্ধুর মাধ্যমে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। ল্যাজারিড বাঙ্কসির গ্রাফিতির ছবি তুলতেন। ধীরে ধীরে তিনি বাঙ্কসির আস্থা অর্জন করেন এবং তার এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ল্যাজারিডের গ্যালারির মূলনীতি হচ্ছে ‘আর্ট বাই পিপল’। তবে তারা নিজেদের বিশ্বস্ত, পরিচিতদের গণ্ডির বাইরে কারোর কাজকে গ্যালারিতে জায়গা দেন না।
গ্রাফিতির সমর্থকরা বলেন এটা সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাচিত্রের মতো। বাঙ্কসি নিজেও গ্রাফিতি নিয়ে রোমান্টিসিজমে ভোগেন। তার কথায়, ‘এমন একটা শহরের কথা কল্পনা করি, যেখানে গ্রাফিতি অবৈধ নয়। এমন একটা শহর, যেখানে যে কেউ যেকোনো জায়গায় আঁকতে পারবেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘শহরের রাস্তাগুলো লাখ লাখ ছবি, রঙ আর ছোট ছোট কবিতায় ভেসে যাবে। ...মনে হবে যেন সারা শহরে উত্সব, যেখানে শুধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধি আর ধনী ব্যবসায়ীরা নয় বরং সবাই আমন্ত্রিত।’ অ্যান্টি-গ্রাফিতি কর্মকর্তা কলিন সেসেল জানান, যুক্তরাজ্যে গ্রাফিতির আবির্ভাব ঘটে ১৯৮৩ সালে। আশির দশকের শেষদিকে গ্রাফিতি সংস্কৃতি ঝিমিয়ে যায়। এর পর ২০০৩ থেকে এটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বলা হয় ব্রিস্টল যদি ইংল্যান্ডের গ্রাফিতি রাজধানী হয়, তাহলে বাঙ্কসি হচ্ছেন তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ২০০৬ সালের জুনে ব্রিস্টলের অধিবাসীরা একদিন সকালে শহরের যৌন-স্বাস্থ্য ক্লিনিকের পাশে একটি ম্যুরাল দেখতে পান। কাজটি ছিল বাঙ্কসির করা। ব্রিস্টল সিটি কাউন্সিল ম্যুরালটির ভাগ্য শহরবাসীরে মতামতের ওপর ছেড়ে দেন। ৯৩ শতাংশ শহরবাসী ম্যুরালটি রাখার পক্ষে মত দেন। স্থানীয় পত্রিকায় একজন লেখেন, ‘বাঙ্কসির কাজটি অসাধারণ। সিটি কাউন্সিলের যদি কিছু করার থাকে, তাহলে তারা সামনের যে গাছের ডালপালা ম্যুরালটিকে আড়াল করে রেখেছে, সেটাকে কেটে দিতে পারে।’
অনেকে বাঙ্কসির ওয়েবসাইট বা মেইলের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউই সফল হননি। একবার অ্যানসলো নামের এক ব্যক্তি মেইলে চেষ্টা করেছিলেন। ডিন নামে কেউ একজন সেই মেইলের জবাব দিয়ে লিখলেন, ‘মি. বাঙ্কসি এখন তার ইয়ট পরিষ্কারে ব্যস্ত আছেন।’
বাঙ্কসি ও ল্যাজারিডসের সাফল্য হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে, তাই অনেকে অনুমান করেন যে ল্যাজারিডসই প্রকৃতপক্ষে বাঙ্কসি। এ বিষয়ে ল্যাজারিডস বিভিন্ন সময় অনেকের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। তিনি একবার বলেছিলেন যে, তার সঙ্গে বাঙ্কসির কখনো সাক্ষাত্ হয়নি। তিনি জানান, তার কাছে ফোন আসে এবং তিনি সেই মতো বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঙ্কসির কাজ তুলে নেন।
দ্য নিউ ইয়র্কারের লেখক লরেন কলিনস সৌভাগ্যক্রমে ই-মেইলে বাঙ্কসির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন। বাঙ্কসি কলিনসের করা কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন। ‘আমার মনে হয় আজকের যুগে শিল্প আর দর্শকদের জন্য তৈরি হয় না’— এভাবে শুরু করেন বাঙ্কসি। ‘শিল্প ঠিক রেডিওতে গান শোনার মতো নয়।’ ‘বলা হয় আমি আমার কাজ বিক্রি করি কিন্তু আমি তো হাজারের বেশি চিত্রকর্ম বিনামূল্যে মানুষকে দিয়েছি। আপনারা আর কত চান?’ তিনি আরো লেখেন, ‘যখন আমার তেমন কোনো খ্যাতি ছিল না সেটাই ভালো ছিল। এখন আমার কাজের জন্য যে টাকা আসছে, সেটা অস্বস্তিকর। তবে এই সমস্যা সমাধানের একটা সহজ উপায় রয়েছে। বিক্রি বন্ধ করে নিজের কাজ মানুষকে দিয়ে দিন। আমার মনে হয় দুনিয়ার দারিদ্র্য নিয়ে শিল্প করবেন আবার তা নিয়ে টাকা-পয়সা পকেটে পুরবেন, তা মোটেও সম্ভব নয়। এটা একটা নিদারুণ পরিহাস, এমনকি আমার জন্যও।’ বাঙ্কসি বলতে থাকেন, ‘পুঁজিবাদ যেভাবে সবার জন্য, এমনকি শত্রুদের জন্যও জায়গা তৈরি করে, সেটা আমার পছন্দের। বর্তমান যুগ অসন্তোষের কাল।’ এর পর কলিনস জরুরি একটি প্রশ্ন করেন। তিনি বাঙ্কসিকে জিজ্ঞেস করেন তার শিল্পচর্চা বা কাজের উদ্দেশ্য কী? উত্তরে বাঙ্কসি বলেন, ‘দুনিয়াকে দেখা এবং তাকে রক্ষা করাই আমার মূল্য উদ্দেশ্য। তবে এখন আমার মনে সন্দেহ জেগেছে যে কাজটা আমি সতিই খুব বেশি ভালোবাসি কিনা।’

লন্ডন টাইমসের শিল্প সমালোচক ওয়ালডেমার লিখেছেন, ‘বাঙ্কসির সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে শিল্পের প্রচলিত দুনিয়ার বাইরে থেকে তিনি সফলভাবে কাজ করার একটি পদ্ধতি বের করে নিয়েছেন। আমার মতে এটা একটা বিরাট সাফল্য।’
আবার ফেরা যাক কলিনস ও বাঙ্কসির আলাপে। ‘নিজেকে অজ্ঞাত রাখার কিছু সমস্যা আছে। একবার আমার প্রিয় এক পাবে একটা চিত্রকর্ম দিয়েছিলাম। সেটা তারা তাদের বারের ওপরে ঝুলিয়ে রেখেছিল। প্রচুর মানুষ সেই চিত্রকর্মটা নিয়ে পাবের লোকজনের কাছে প্রশ্ন করত। তাই আমি দুই বছর সেদিকে যাইনি।’ ‘পত্রিকায় আপনার কাজ প্রকাশিত হওয়া একটা নির্বোধের মতো ব্যাপার, যদি আপনি অন্তত নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত অজ্ঞাত থাকতে চান। আপনি কে সেটা অন্যরা জানে না, এটা আমার কাছে ভালো লাগে। আমার খোঁজে আমার ডিলারের বাবার দোকানেও পৌঁছে গিয়েছিল ডেইলি মেইলের সাংবাদিকরা। লস অ্যাঞ্জেলেসে একবার আমি রাস্তায় আঁকছিলাম, সে সময় এক গৃহহীন তরুণ কাছে এসে বলল, আপনি কি বাঙ্কসি?। পরদিন আমি লস অ্যাঞ্জেলেস ত্যাগ করি।’
কলিনসকে পাঠানো মেইলের শেষে একটি ফাইল যুক্ত ছিল। কলিনস ফাইলটি খুলতেই পুরো স্ক্রিনে একটা সাদা-কালো ছবি ফুটে উঠল। সেখানে লম্বা চুলের এক শিল্পীর চেহারার অবয়ব দেখা যাচ্ছিল। তার পাশেই একটা ইজেল। গ্রাফিতি আঁকা একটা ক্যানভাসও দেখা যাচ্ছিল। শিল্পীর আঙুলগুলো একজন জেদি মানুষের ইঙ্গিত দেয়, অনেকটা ইঁদুরের মতো।
সূত্র: দি নিউ ইয়র্কার-এ প্রকাশিত লরেন কলিনসের রচনা অবলম্বনে






