ভারতীয় উপমহাদেশে মাত্র অল্প কয়েক বছর কাটিয়েছেন আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট। তাই এখানে তার বিজয়ও ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত সময়ের। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ থেকে ৩২৫ পর্যন্ত সিন্ধু ও এর আশপাশের নদ-নদীগুলোর তীরবর্তী অঞ্চল জয় করার পর বিদায় নেন তিনি। আর কখনই এদিকে ফিরে আসেননি।
কিন্তু
আলেক্সান্ডারের গ্রিক সেনাবাহিনী ও ভারতীয়দের মধ্যে লড়াইয়ের প্রভাব ছিল বিস্তৃত। গ্রিকো-ব্যাকট্রিয়ান সাম্রাজ্য কিংবা এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে আলেক্সান্ডারের কথোপকথনের কিংবদন্তি; মেসিডোনীয় সম্রাটের এ অভিযান প্রাচীন বিশ্বের রাজনীতি ও সংস্কৃতি পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর জন্য বদলে দিয়েছিল। আরো কয়েক শতাব্দী পর এ উত্তরাধিকারের অন্যতম আকর্ষণীয় উপাদানের আবির্ভাব ঘটে। গ্রিক সাহিত্যের সর্বশেষ ও সর্ববৃহৎ মহাকাব্য: দ্য দিওনিসিয়াকা। গ্রিক দেবতাদের (খ্রিস্টধর্মের প্রভাবে তখন তারা হারাতে বসেছেন) উপাসনার নিমিত্তে লেখা দিওনিসিয়াকার বিস্তৃতি ছিল ২০ হাজারেরও বেশি লাইনজুড়ে (যা সম্মিলিতভাবে ইলিয়াড ও ওডিসির আকারের সমান)। ভারত বিজয়কে কেন্দ্রে রেখে আরো ডজনখানেক পুরাণ নিয়ে এ মহাকাব্য রচনা করেন নোনাস অব পানোপোলিস।
নোনাসের জন্ম পানোপোলিসে (বর্তমানে আখমিম)। দক্ষিণ মিসরের এ শহরটি ছিল গ্রিক ভাষাভাষী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় অধ্যুষিত। তার জীবন সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। তিনি কখন জন্মগ্রহণ করেছেন আর কখন মারা গেছেন, সে ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেন না পণ্ডিতরা। তাদের মতে, নোনাস দিওনিসিয়াকা লিখেছেন সম্ভবত চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে পঞ্চম শতাব্দীর শুরুর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ওই সময়টি ছিল রাজনৈতিকভাবে কলহপূর্ণ এবং সাংস্কৃতিকভাবেও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন হচ্ছিল, যে সময় জার্মান উপজাতিগুলো উত্তরের সীমান্তে অগ্রসর হচ্ছিল আর খ্রিস্টান সম্রাটরা সরকারি ধর্ম হিসেবে এটিকেই আরোপ করছিলেন। নোনাস নিজেও জীবনের কোনো একটি পর্যায়ে খ্রিস্টান হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন, যা তার ‘বুক অব রিভিলেশনস’ থেকে জানা যায়। যদিও প্রাচীন গ্রিসের দেবতাদের নিয়ে সাহিত্যচর্চার সবচেয়ে বড় লেখক হিসেবেই তিনি বেশি বিখ্যাত।
নোনাসের
কবিতায় ভারত বিজয়ী বীর কিন্তু আলেক্সান্ডার নন, তিনি দিওনিসাস, গড অব ওয়াইন। এশিয়ার সঙ্গে দিওনিসাসের দীর্ঘ যোগসূত্রের কিংবদন্তি রয়েছে। কথিত আছে, এশিয়ার বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে মদ তৈরির শিল্প শেখানোর পর তিনি রথে চড়ে পূর্ব থেকে গ্রিসে আগমন করেছিলেন, যে রথের বাহক ছিল চিতাবাঘ আর তার গ্রিসগামী দলের সঙ্গে ছিল হাতিসহ এশিয়ার নানা অদ্ভুত প্রাণী। নোনাস এ গল্পগুলোকে রূপান্তর করে দিওনিসাসকে নিয়ে গ্রিক সাহিত্যের অন্য সব গল্পের সঙ্গে এর সংশ্লেষ ঘটান। তিনি নজিরবিহীন আকৃতি ও আওতার এক কাব্য সৃষ্টি করেন, যা হাজার বছরের গ্রিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধকেন্দ্রিক আগেকার মহাকাব্যগুলোর জন্য এক অদ্ভুত প্যারোডি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
দিওনিসিয়াকার
গল্প শুরু হয়েছে গ্রিক দেবদূত জিউসকে দিয়ে, যিনি দিওনিসাসকে ভারত ভ্রমণের নির্দেশ দেন, যেখানের অধিবাসীরা তার পূজা করতে অস্বীকৃতি জানায়। ভারতীয়রা এক্ষেত্রে ছিল জেদি এবং তারা পূর্বপুরুষদের মতোই আগুন ও পানির পূজা করতে বদ্ধপরিকর থাকে। তারা মদ পান করতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। বিশাল সৈন্যবাহিনী জড়ো করেন দিওনিসাস। প্রাচীন বিশ্ব হয়ে ভারতের দিকে ধাবমান হওয়ার সময় তিনি একাধিক নারীর সঙ্গে প্রেমেও জড়িয়েছেন। তার শত্রু ছিল ভারতের শাসক দরিয়াদেস, যে ছিল আবার ঝিলাম নদীর পুত্র (কয়েক শতাব্দী আগে যে নদীর তীরবর্তী স্থানে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন আলেক্সান্ডার ও পুরু)। দরিয়াদেস নিজেও অর্ধেক নদী, যে শুধু পানি পান করত। দিওনিসাসের পানীয়কে সে প্রচণ্ড ঘৃণা করত। সে বলত, ‘বর্শাই
হলো আমার মদ।’ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের জাদুবিদ্যার সাহায্য নিয়ে দিওনিসাসের সঙ্গে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে লিপ্ত হন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত গ্রিক দেবতার শক্তির কাছে তিনি মাথা নত করেন। আলেক্সান্ডারের মতো জয় শেষে ফিরে যান দিওনিসাসও। ফেরার পথেও কয়েকটি ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ান তিনি।
নোনাস
কোনোভাবেই ভারত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। এমনকি তার নিজের সময় ও জায়গার মানদণ্ড বিবেচনায়ও না। এ নিয়ে তার ভাবনাগুলো ছিল কাল্পনিক আর ভ্রান্তি মিশ্রিত। যদিও আগেকার কিছু গ্রিক প্রতিবেদন থেকে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
ভারতীয়রা
আগুন ও পানির উপাসনা করে বলে যে ধারণা, উদাহরণস্বরূপ হয়তো তা জরথুস্ট্রীয়দের আগুন উপাসনালয় ও গঙ্গার পবিত্রতার বিষয়টি থেকে নেয়া হয়েছে। জরথুস্ট্রীয় ধর্মানুসারীরা ছিল অগ্নি উপাসক। আগুনের পবিত্রতাকে তারা ঈশ্বরের পবিত্রতার সঙ্গে তুলনা করত। তপস্বী জীবনযাপন, দার্শনিক শক্তি আর অনুমিত জাদকুরি ক্ষমতা দিয়ে গ্রিকদের দীর্ঘসময় মুগ্ধ করে রেখেছেন ব্রাহ্মণ ও যোগীরা। এরাই নোনাসের দিওনিসিয়াকায় অসংখ্যবার উঠে এসেছেন, অবশ্য সব সময়ই ভয়ংকর চরিত্র হিসেবে।
ভারতীয়
ইতিহাস সম্পর্ক কিছুই না জানলেও নোনাস পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করতেন, প্রতিটি খ্যাতিমান জাতি গঠন করেছেন কোনো না কোনো বীর। তিনি আবিষ্কার করেন ইন্দোসকে, কল্পনানুসারে যে দেবতা জিউসের সঙ্গে যুদ্ধ করে ভারতীয় জাতির জন্ম দিয়েছেন।
মধ্যযুগের
বেশির ভাগ সময়ই দিওনিসিয়াকাকে ভুলে গিয়েছিল মানুষজন, যদিও এটি ফিরে আসে সতেরো শতকে। ফরাসি, ইতালীয় ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত বিভিন্ন ধারায় রূপান্তরিত এর জটিল, বিজড়িত গল্প এবং এর ধ্রুপদী রূপকথাগুলো বারোক কবি ও চিত্রশিল্পীদের ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। এর মধ্যে অন্যতম নিকোলাস পুসিন। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ধ্রুপদী মহাভারত ও রামায়ণ ইউরোপীয়দের কাছে অধিকতর পরিচিত হয়ে উঠতে থাকলে পশ্চিমের অনেক পণ্ডিত নোনাসের কবিতার সঙ্গে এর সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজতে থাকেন। আঠারো শতকের প্রাচ্যবিদের অন্যতম উইলিয়াম জোনস মনে করেন, রামায়ণ থেকে প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে দিওনিসিয়াকা। জোনসের দাবি, অনেক ছোটকালেই প্রচণ্ড আগ্রহভরে তিনি দিওনিসিয়াকা পড়েছেন। তার বিশ্বাস, দুই কাব্যের মধ্যে তুলনা করলে মনে হতে পারে দিওনিসাস ও রাম আসলে একই ব্যক্তি!
আধুনিককালের
ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিতরা কল্পনাপ্রসূত এসব অনুমানকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যদিও ইউরোপ ও ভারতের দুটি বিরাট সাহিত্যকর্মের মধ্যে প্রথম দিককার তুলনাকারী হিসেবে বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার জোনস। দিওনিসিয়াকার প্রতি জোনসের প্রবল আগ্রহটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে যায়; দলটি ছোট হলেও ছিল বেশ নিবেদিত। বেলজিয়ান ঔপন্যাসিক মার্গেরিতে ইয়োরসেনার থেকে শুরু করে বহু ইউরোপীয় সাহিত্যিকের মধ্যে বেঁচে থাকেন নোনাস।
এক
দশক আগে ফ্রান্সিস ভিয়ানের তত্ত্বাবধানে এর বিপুলসংখ্যক কপি অনূদিত হলে নতুন করে সাহিত্যানুরাগী ও পণ্ডিতদের আগ্রহ তৈরি হয়; বিশেষ করে দিওনিসিয়াকা ও এশিয়ার সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে মানুষের কৌতূহল তৈরি হয়। সম্ভবত আরেকবার বিশ্ব জয় করতে চলেছে দিওনিসিয়াকা।
দ্য
ওয়্যার থেকে
অনূদিত





