তার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে ভারতে সবাই স্বাধীন, কোনো ক্রীতদাস নেই। গ্রিক ঐতিহাসিক ও কূটনীতিবিদ মেগাস্থিনিসের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ অব্দ, মৃত্যু খ্রিস্টপূর্ব ২৯০ অব্দ। প্রায় ১৪ বছর তিনি চন্দ্রপুপ্ত মৌর্যের দরবারে সেলুকাস নেকটার প্রেরিত রাজদূত ছিলেন। তাকে বিশ্বখ্যাতি এনে দিয়েছে তার লেখা ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থটি। গ্রন্থের পুরো অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করা হয়। একাধিক অনুবাদক গ্রিক থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। এ বিখ্যাত বই থেকে আগ্রহ সঞ্চারক কিছু অংশ উপস্থাপন করা হচ্ছে:

w   ভারতে দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে সপ্তর্ষিমালা দেখা যায় না আর ছায়া বিপরীত দিকে পড়ে।

w   ভারতবর্ষে ১১৮ জাতির বসবাস। ই. এ. শোয়ানবেক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মেগাস্থিনিস নিজ গুণে এ সংখ্যা নির্ধারণ করেননি।

w   ভারতবর্ষে সাত শ্রেণীর মানুষ:

     দার্শনিক, কৃষক, গো ও মেষ পালক, শিল্পী, সৈনিক, পর্যবেক্ষক, মন্ত্রী ও বিচারক।

w   ভারতবর্ষে দুই শ্রেণীর দার্শনিক বা পণ্ডিত রয়েছেন:

     ব্রাহ্মণ ও শ্রমণ

w   পাণ্ড্যদেশের নারী ছয় বছর বয়সে সন্তান প্রসব করে।

     ভারত দেখতে চতুর্ভুজের মতো। ভারত বিশাল একটি দেশ, এখানে বিভিন্ন জাতির বাস। তবে বিদেশ থেকে আসা কোনো জাতি ভারতে বাস করে না। এখানে যাদের বসবাস তারা প্রথম থেকেই ভারতে আছে, এটিই তাদের জন্মস্থান। ভারতীয়রা কখনো নিজেদের দেশের বাইরে উপনিবেশ স্থাপন করেনি, বিদেশী কোনো উপনিবেশও তারা গ্রহণ করেনি।

ভারতের বৃশ্চিক ও সাপ

মেগাস্থিনিস ভারতে সাপ ও বৃশ্চিক সম্পর্কে সন্ত্রস্ত্র ছিলেন আঁচ করা যায়। তিনি লিখেছেন, ভারতবর্ষে পাখাওয়ালা বড় আকারের সাপ রয়েছে, যা ইউরোপ ও ভারতের মানুষকে একইভাবে দংশন করে। সাপ ও বৃশ্চিক দিনের বেলা বের হয় না। রাতে বিচরণ করে। সাপ ও বৃশ্চিকের মূত্র কারো গায়ে লাগলে তাত্ক্ষণিকভাবে সেখানে গলিত ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং পীড়াদায়ক যাতনা শুরু হয়।

ভারতে বানরের জন্য নিত্যভোজ

মগধকে প্রাচ্যদের দেশ বলা হয়েছে—এখানে প্রকাণ্ড আকৃতির বানর রয়েছে, যার আকার কোনোভাবেই সবচেয়ে বড় কুকুরের চেয়ে কম নয়।

এসব বানরের লেজের দৈর্ঘ্য পাঁচ হাত। মাথার সামনের দিকে অনেক চুল, বুকের ওপরের দিক ঘন লোমে ঢাকা। মুখের পুরোটাই সাদা বর্ণের, কিন্তু দেহ পুরোপুরি কৃষ্ণবর্ণ। এসব বানর পোষ মানে, মানুষ তাদের ভালোবাসে। অন্যান্য দেশের বানর যেমন হিংস্র হয়, ভারতের বানর ভিন্ন স্বভাবের, হিংস্রতা নেই।

মেগাস্থিনিস শুনেছেন, মগধের বানর মানুষের মতোই বুদ্ধিমান এবং সেগুলো কাস্পিয়ান হ্রদের বড় কুকুরের মতো। তাদের মুখ ঊর্ধ্বমুখী, লেজ সিংহের লেজের মতো। তাদের জন্ম ও বসবাস বনে, বুনো ফল খেয়ে তারা জীবন ধারণ করে। এসব বানর দলবদ্ধ হয়ে লটগি নামক স্থানে গমন করে। রাজার আদেশে সেখানে তাদের ভাত পরিবেশন করা হয়। ভাতের সাথে তরকারিও দেয়া হয়। প্রতিদিনই বুনো বানরের জন্য এ আয়োজন করা হয়। খেয়ে তৃপ্ত হয়ে বানরগুলো অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কোনো ধরনের অনিষ্ট সাধন না করে আবার বনে ফিরে যায়।


মৃত মাছের আতঙ্ক

মেগাস্থিনিস জানিয়েছেন, ভারতবর্ষের সাগরে ভয়ংকর এক প্রকার ক্ষুদ্রাকৃতির মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছ জীবিত অবস্থায় দেখার সুযোগ নেই। সমুদ্রের অনেক গভীরে তাদের বিচরণ। কেবল মারা গেলে এসব মাছের মৃতদেহ ভেসে ওঠে। এই মৃতদেহ কেউ স্পর্শ করলে প্রথম দিকে অবসন্ন হয়ে পড়ে, তারপর মুর্ছা যায় এবং সবশেষে মৃত্যুবরণ করে।

মেগাস্থিনিস ভারতীয় সমুদ্রে তিমির উপস্থিত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এসব তিমি বৃহৎ ভারতীয় হাতির পাঁচ গুণ বড়। ভারতের নদীতে রয়েছে কচ্ছপ—একেকটি কচ্ছপ ডিঙি নৌকার চেয়ে ছোট নয়।

ভারতবর্ষে অশ্ব ও গর্দভের মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মাদি ঘোড়া ও পুরুষ গর্দভের মিলনে দ্রুতগামী একটি অশ্বাকৃতির জন্তুর সৃষ্টি হয়।

নদীবাহুল্যর কারণ

ভারতবর্ষ নদীবহুল। কিন্তু কেন? ভারতের দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের কাছ থেকে মেগাস্থিনিস জানতে পেরেছেন, ভারতের চারদিকের শক, আর্যদের দেশগুলো ভারতের চেয়ে উঁচু ভূমিতে অবস্থান করে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী উঁচু জমি হতে জলধারা প্রবাহিত হয়ে নিচু জমিকে প্লাবিত করে এবং কালক্রমে বহু নদীর উত্পত্তি হয়। গঙ্গা ও সিন্ধু—দুটোর মধ্যে গঙ্গা অনেক বড়। এক তীর থেকে অন্য তীর দেখা যায় না। ভারতের শিল নদী জলপ্রপাত থেকে সৃষ্টি হয়েছে। মেগাস্থিনিস বিস্মিত হয়েছেন যে শিল নদীতে যা-ই ফেলা হয় তার সবই ডুবে যায়। কোনো কিছুই ভাসে না।

বিদেশীদের প্রতি আচরণ

বিদেশ থেকে যারা ভারতবর্ষে আসেন, ভারতীয়রা তাদের জন্য ভৃত্য নিয়োগ করে দেন, যারা বিদেশীদের ওপর দৃষ্টি রাখেন, যাতে তারা কোনো অত্যাচারের শিকার না হন। বিদেশ থেকে কোনো ব্যক্তি ভারতে এসে যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন, ভারতীয়রা তাদের জন্য চিকিৎসক প্রেরণ করেন এবং তার সেবা-শুশ্রূষারও আয়োজন করেন। তার পরও যদি দুর্ভাগ্যবশত ওই ব্যক্তি ভারতে মৃত্যুবরণ করেন তাহলে তার মরদেহ কবরে সমাহিত করে দেন। কোনো বিবাদ-বিসম্বাদে বিদেশী কেউ জড়িয়ে পড়লে ভারতবর্ষের বিচারকরা ন্যায়নিষ্ঠভাবে যাচাই-বাছাই করে মামলার মীমাংসা করে থাকেন। কোনো ভারতীয় বিদেশীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করলে তাকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হয়।

মেগাস্থিনিসের চোখে ভারতের মানুষ

খাবারদাবারে ভারতীয়রা সর্বগ্রাসী ধরনের এবং তারা মিতাচারী। তারা বহুসংখ্যক মানুষের সঙ্গপ্রিয় নয়। তারা সংযত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। ভারতবর্ষে লেখালিখির ব্যাপার নেই, ব্যবহার নেই। লিখিত অনুশাসন নেই, তারা লিখতেও জানে না। তাদের সবকিছুতেই স্মৃতিনির্ভর থাকতে হয়। তবু তারা অন্যায়ের দিকে ঝোঁকে না। তারা সরল ও মিতব্যয়ী—এটা তাদের সুখী জীবনযাপনের কারণ। রাতে চুরির ঘটনা বিরল। চন্দ্রগুপ্তের শিবিরে তিরিশ মুদ্রার অধিক মূল্যের কোনো সামগ্রী চুরি হয়েছে এমন অভিযোগ শোনা যায়নি। উৎসব ছাড়া অন্য কোনো সময় ভারতীয়রা মদ পান করে না। তাদের মদ ভাত হতে তেরি হয়। যব হতে নয়।

ভারতীয়রা উদার। পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে তারা রাজদরবারে হাজির হয় না। বন্দক রাখা দ্রব্য ফেরত না দেয়া নিয়ে অভিযোগ হয় না। কোনো কিছু মোহরাঙ্কিত করতে হয় না। কোনো সাক্ষী রাখার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ ভাতরীয়রা পরস্পরকে বিশ্বাস করে তাদের মূল্যবান জিনিস গচ্ছিত রাখে। তাদের ঘরবাড়ি তালাবদ্ধ করে সুরক্ষিত করার প্রয়োজন হয় না।

ভারতীয়রা আড়ম্বর পছন্দ করে না এটা সত্য, কিন্তু অলংকার পরে সাজতে ভালোবাসে। তারা স্বর্ণ ব্যবহার করে। অলংকারে থাকে মূল্যবান পাথর। মসলিন পোশাকের ওপর কৃত্রিম ফুল লাগিয়ে রাখে। তারা যখন এক স্থান হতে অন্য স্থানে যায় রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে ভৃত্যরা ছাতা নিয়ে তাদের অনুসরণ করে। তাদের সমাধিতে মাটির অনুচ্চ স্তূপ থাকে। কখনো সমাধি সজ্জিত করে সুরক্ষা করে। তারা সুন্দর হতে বিভিন্ন দ্রব্য গায়ে মাখে।

অন্য অধ্যায়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, ভারতের মানুষ মৃত ব্যক্তির স্মৃতি ধরে রাখার জন্য স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে না। স্ত্রোস্ত গীতের মাধ্যমে মৃতের যে গুণগান করা হয় তা-ই যথেষ্ট মনে করা হয়। জ্ঞানী না হলে সেখানে বৃদ্ধরা বিশেষ মর্যাদা পায় না।

ভারতীয়দের মধ্যে বহু বিয়ের প্রচলন রয়েছে। কন্যার পিতাকে জোড়া গরু দান করে কন্যাকে স্ত্রী হিসেবে তুলে আনার প্রথা প্রচলিত রয়েছে। স্ত্রীদের কেউ গৃহকর্মে সহায়তা করে, কেউ মুস ও সন্তান প্রদান করে—অন্তত এই উদ্দেশ্যে তাদের বিয়ে করা হয়। সতী হওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলে নারী বহুগামিনী হয়ে থাকে। যারা মিথ্য িসাক্ষ্য দেয় তাদের অঙ্গছেদের শাস্তি দেয়া হয়। অন্যের অঙ্গ হানি যে ঘটায় তার অঙ্গ ছেদন করা হয়। কোনো দুষ্কৃতকারী যদি শিল্পীর হাত বা চোখ নষ্ট করে দেয়, তাকে প্রাণদণ্ড দেয়া হয়।

দেবতাকে উৎসর্গীকৃত পশু ভারতীয়রা খড়গ দিয়ে প্রাণ হরণ করে না, শ্বাসরোধে হত্যা করে। তাতে যজ্ঞের পশু অঙ্গহীন হয় না। অক্ষত অবস্থায় নৈবেদ্য প্রদান করা যায়।

রাজার জীবন ছিল অনিশ্চিত। দিনের বেলায় তিনি ঘুমাতেন না। আবার রাতের বেলায় নির্দিষ্ট কোনো বিছানায় ঘুমানোর সুযোগ ছিল না। কারণ যেকোনো সময় হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারেন। কাজেই তাকে শয্যা পরিবর্তন করেই রাত কাটাতে হতো। রাজার বর্মধারী নারী দেহরক্ষী থাকত। ভারতবর্ষে অঙ্গমর্দনের (গা মালিশ করা) সংস্কৃতি তখনই চালু ছিল।

ভারতে বহুসংখ্যক পণ্ডিতের উপস্থিতির কথা মেগাস্থিনিস লিখেছেন। তাদের মধ্যে যারা পর্বতে বসবাস করেন তারা দিওনিসাসের উপাসনা করেন। তারা মসলিন কাপড় পরেন এবং মাথায় পরেন পাগড়ি। পণ্ডিতদের মধ্যে যারা সমতলবাসী তার হেরাক্লিসের পূজারি। মেগাস্থিনিস পণ্ডিতদের দুই ভাগে ভাগ করেছেন—ব্রাহ্মণ ও শ্রমণ। ব্রাহ্মণরা তাদের স্ত্রীদের দর্শনজ্ঞানের শিক্ষা দিতেন না। কারণ স্ত্রী শ্রষ্টা হলে ওই জ্ঞান অন্য কোনো পুরুষের কাছে ফাঁস করে দিতে পারে। ব্রাহ্মণদের জ্ঞানের স্থূলতার কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, বস্তু জগৎ সম্পর্কে তারা কেবল বালকোচিত জ্ঞানের অধিকারী। শ্রমণরা বনে বাস করেন। বনের ফল ভক্ষণ করেন। তারা গাছের ছাকলবাকল দিয়ে লজ্জাস্থান ঢাকেন। তারা যৌনাচার থেকে দূরে থাকেন। মধ্যপান তাদের জন্য নিষিদ্ধ। তারা কষ্ট ও যন্ত্রণাসহিষ্ণু। নারীরা তাদের সঙ্গে জ্ঞানের চর্চা করতে পারেন। তবে নারীরাও তাদের যোগ্য হওয়া থেকে নিজেদের নিবৃত রাখেন।

 

ইবনে মোতালিব: লেখক