উনিশ শতকের কৃষিনির্ভর রাশিয়ার একজন ক্ষুদ্র কৃষক পাহোমের গল্প ‘একজন মানুষের কতটুকু জমি প্রয়োজন’ নামের গল্পটা। তখন উদয়াস্ত পরিশ্রম করে জমিতে ফসল ফলানোর পরেও কৃষকরা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছেন; ভূস্বামীরা ফসলের ভাগ নিয়ে যাচ্ছে বেশি, তারা আরো ধনী হয়ে উঠছে ক্রমেই। আয়-বৈষম্যের এমন একটা পরিস্থিতিতে নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চায় পাহোম। কৃষিনির্ভর একটি সমাজে যেহেতু জমিই মর্যাদার প্রতীক, কাজেই অনেক জমি কেনার পরিকল্পনা করে সে। এখান থেকেই গল্পটার শুরু।
পয়লায় পাহোম ধারকর্য করে ৪০ একরের একটা ফার্ম কিনে ফেলে। সেই জমিতে সে ভুট্টার বীজ বোনে, ভালো ফসলও হয়। জমির উদ্বৃত্ত মূল্য থেকে তার পরে সে চাষের জমি এবং তৃণভূমি মিলিয়ে আরো ২০০ একর জমি কেনে। এমন করে ২৪০ একর জমির মালিক হয়ে যাওয়ার পরেও তার বোধ হতে থাকে, তার মালিকানায় যে পরিমাণ জমি রয়েছে তা যথেষ্ট নয়। কাজেই লোভের বশে সে আরো ১ হাজার ৩০০ একর জমি কিনে ফেলে এবং কিছু গমের জমির বর্গাও নেয়।
এত জমির মালিক হওয়ার পরেও তার পিছু তাড়া করে বেড়ায় অতৃপ্তি। কাজেই সে অবারিত স্তেপে যায় একসঙ্গে হাজার হাজার একর তৃণভূমি কেনার জন্য। এখানেই গল্পটা নাটকীয় মোড় নেয়। স্তেপের যে গোত্রের সঙ্গে পাহোম যোগাযোগ করে, তারা পাহোমকে বলে যতদূর পাহোমের চোখ যাবে, সে পর্যন্ত জমির মালিক হয়ে যাবে পাহোম। ‘যতদূর চোখ যাবে ততটুকু জমি কারো হয়ে যাবে’—এমন একটা সূত্র কোনো নির্দিষ্টতা দেয় না বলে পাহোম জমির পরিমাপের প্রশ্ন তোলে।
গোত্রপ্রধান তখন বলে যে একদিনে স্তেপের ভেতরে পাহোম আয়তাকার যতটুকু পথ হেঁটে অতিক্রম করতে পারবে, ততটুকুই জমির মালিক হতে পারবে পাহোম। তবে শর্ত থাকে—সূর্যোদয়ের সময় যেখান থেকে পাহোম যাত্রা করবে, জমি চিহ্নিত করে নিয়ে সূর্যাস্তের আগেই ঠিক সেখানে তাকে ফিরে আসতে হবে। এ শর্তে রাজি হয়ে যায় পাহোম।
পরদিন সূর্যোদয়ের সময় একটা টিলার ওপর থেকে পরিক্রমণ শুরু করে পাহোম। এর পরের ঘটনাটা খুবই স্বাভাবিক একটা সমস্যার দিকে ধাবিত হয়—অনেক দূর পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, জমি অধিকারের লোভে লোভে অবারিত স্তেপের ভেতরে, তবু সে তার আবর্তন থামাতে পারে না। একটা পর্যায়ে গিয়ে সে অবশ্য রাশ টেনে ধরে নিজের এবং জায়গাটা সে নিশ্চিত করে নিয়ে টিলার দিকে সে হেঁটে ফিরতে শুরু করে। সূর্য তখন প্রায় ঢলে পড়ছে কিন্তু পথ আর ফুরোচ্ছে না। কাজেই ক্লান্ত শরীর নিয়েই টিলা লক্ষ্য করে দৌড় দেয়া ছাড়া তার আর কোনো গতি থাকে না।
এর ফলাফল হয় মারাত্মক—শারীরিক পরিশ্রমের কারণে পাহোম ঘামতে থাকে, পিপাসায় গলা শুকিয়ে যায় তার, বুক ওঠানামা করতে থাকে হাপরের মতো, তার হূদপিণ্ডে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে কেউ, আর তার পা দুটো অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছে, যেন সেগুলো তার শরীরের কোনো অংশই নয়! এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে টিলার কাছাকছি সে যখন পৌঁছে যায়, ততক্ষণে দিগন্তে সূর্য ঢলে গেছে। তবু সে দৌড়ে টিলার ওপরে উঠতে চায়; উঠেও যায়। কিন্তু তার পরই সে এলিয়ে পড়ে মৃত্যুর কোলে। সেখানেই তাকে গোর দেয়া হয়। তখন দেখা যায়, তার মরদেহ গোরে শুয়ে দেয়ার জন্য যতটুকু জমি লাগছে, দৈর্ঘ্যে তা মাত্র ছয় ফুট! এখানেই শেষ হয়ে যায় গল্পটা।
এ গল্পতে তলস্তয় খুব সোজাসুজি বলছেন, সম্পদের জন্য লোভের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। অর্থাৎ, সম্পদ (এখানে জমি) লাভ করার জন্য লোভ না করাটাই ভালো। এমন লোভ থেকে ব্যক্তিমানুষের ক্ষতিই হয়। তার মৃত্যু ঘটে যাওয়াটাও বিচিত্র নয়। উনিশ শতকের রাশিয়ার আয়-বৈষম্যের বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে তলস্তয়ের গল্পটার মর্মবাণী খুব আদর্শবাদী একটা অবস্থান বলেই মনে হয়। এখানে বলতে হবে, কোনো রকমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার কৃষি-উৎপাদন প্রথাই যেখানে নিয়ম হয়ে গেছে, সেখানে টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করতেই পারে মানুষ, ভাববাদী জীবনদর্শন থেকে সেসব উপায়কে যতই বর্জন করার চেষ্টা চলুক না কেন। কাজেই পাহোমের তথাকথিত ‘জমির জন্য লোভ’-কে রাশিয়ার ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষকদের টিকে থাকার এবং সামাজিক মর্যাদা লাভের সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে খাটো করে দেখার কোনো অবসর থাকে না। অথচ তলস্তয়ের মতো ‘সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া’ একজন ধনী ব্যক্তির কাছে দরিদ্র মানুষদের টিকে থাকার ওই কৌশলকে ছোট বলেই মনে হয়েছে।
এবার প্রশ্ন তুলতে হয়—বেশ! পাহোম যদি হাজার হাজার একর জমির মালিক হওয়ার স্বপ্ন না দেখত, তবে কীভাবে সে তার ভাগ্য পরিবর্তন করে ধনী একজন কৃষকের সমান বা কাছাকাছি পরিমাণের সম্পদের মালিক হতে পারত? তলস্তয়ের আদর্শবাদী অবস্থান আমাদের তা বলে দেয় না! এর উত্তর আমরা পাই ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ঘটে যাওয়া অক্টোবর বিপ্লবের সময়—কৃষির উদ্বৃত্ত মূল্যের শ্রেয় অংশ থেকে বঞ্চিত ক্ষুদ্র কৃষকরা অস্ত্রের মুখে পরাস্ত করছেন ধনী ভূস্বামী ও বড় কৃষকদের এবং খুন করছে তাদের প্রতিভূ জার দ্বিতীয় নিকোলাসকে। তারপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে জমির যৌথ মালিকানা। উনিশ শতকের রাশিয়ার এসব সংগ্রামী ক্ষুদ্র কৃষককে যদি আমরা বলি—ইহকালে জমিজমার ওপর লোভ করো না বাপু! দেখো, একজন মানুষ মরণশীল, কাজেই তার মৃত্যুর পর তাকে কবরস্থ করতে ছয় ফুটের বেশি, সাড়ে তিন হাত গভীর একটু জমি ছাড়া তো আর কিছুই লাগছে না, তখন প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের ওপরে সেই ক্ষুদ্র কৃষকের স্বাভাবিক অধিকারকে দাবিয়েই রাখা হয়। কাজেই একজন মানুষের জন্য কতটুকুইবা জমি লাগে—ভাববাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এমন একটি উপসংহার প্রতিষ্ঠিত করতে যাওয়ার অর্থ ভূমির ব্যবহারের ওপরেও তত্কালে বড় কৃষকদের প্রচলিত অগ্রগণ্যতাকে, শোষণকে বহাল রাখা! আমরা জানি, এখান থেকেই সমাজে সূচিত হয় আয়-বৈষম্যের, বঞ্চনার। উনিশ শতকের রাশিয়ায় এমন একটি দুঃখজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই উদ্ভব হয়েছিল। ভূমি-ব্যবহারে বৈষম্যের এ চিত্র বিশ্বের প্রতিটি দেশেই এখনো বিদ্যমান। খোদ বাংলাদেশেই তার অজস্র উদাহরণ রয়েছে।
উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে জমির প্রয়োজনীয়তা আসলে নির্ভর করে নির্দিষ্ট একটি সময়ে, নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক এলাকায় উৎপাদন-ব্যবস্থার প্রকৃতিটা কেমন তার ওপরে। উৎপাদন-ব্যবস্থার বিকাশের পর্যায়ে যখন ঐতিহাসিকভাবেই কৃষিজ উৎপাদন পদ্ধতির উদ্ভব ঘটে, তখন শ্রম ও পুঁজির পাশাপাশি সেখানে জমি লাগবেই, হোক তা কোনো রকমে খেয়ে পরে বাঁচতে পারার পদ্ধতি! এবার যদি এমন একটি পদ্ধতি থেকে কৃষিজ উৎপাদন-ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণের ধারার উদ্ভব ঘটে, সেখানেও জমির প্রয়োজন পড়বে, হয়তোবা তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণেই।
এবার ধরা যাক, ঐতিহাসিক নির্দিষ্টতায় অথবা কৃষক-শ্রমিকদের বিপ্লবের মাধ্যমে কোনো ভূখণ্ডে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলো। তখনো শ্রম ও পুঁজির (নানা অনুপাতে) ব্যবহার ছাড়াও শিল্পোৎপাদন বা শিল্পজাত পণ্যের প্রসেসিংয়ের জন্য যে কলকারখানা বসাতে হবে, সেখানেও জমির প্রয়োজন পড়বে। কাজেই অর্থনীতির প্রতিষ্ঠিত এ সূত্র মেনে নিলে ক্ষুদ্র কোনো কৃষক বা কলকারখানার শ্রমিককে কোনো মতেই উপদেশ দেয়া চলছে না যে তার জন্য ছয় ফুট লম্বা এক চিলতে জমিই যথেষ্ট! হ্যাঁ, শেষকৃত্যের একটা প্রচলিত প্রথার অংশ হিসেবে এটুকু জমি তাকে কবরস্থ করার জন্য লাগবে নিশ্চয়। সেই প্রাপ্যতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহে আশস্ত হওয়ারই বিষয়। কিন্তু জমি ছাড়া একজন ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষকের সপরিবারে জীবন নির্বাহের সংস্থান হবে কীভাবে? তাকে যদি কৃষিজ উৎপাদনের ওপরেই নির্ভর করতে হয়, তখন উৎপাদন ও ভোগের সংস্থানের জন্য তার জমি লাগবেই—অবশ্যই তা লম্বায় ছয় ফুটের চেয়ে দীর্ঘই হবে। কাজেই গল্পতে তলস্তয় ক্ষুদ্র কৃষকদের যে ধর্মোপদেশ দিচ্ছেন—বেশি লোভ করার প্রয়োজন নেই তোমার! অল্প জমি নিয়েই তুষ্ট থাকো তুমি!—বাস্তবতার নিরিখে তা খুব একটা ধোপে টিকছে না।
এ গল্পের মূল চরিত্র পাহোম উনিশ শতকের রাশিয়ার একজন ক্ষুদ্র কৃষক—আগেই বলেছি। সে সময়ের কোনো ভূস্বামী বা বড় কৃষক এ গল্পে সম্পূর্ণতই অনুপস্থিত। তবে ভূস্বামী ও বড় কৃষকদের জন্য তলস্তয় কী উপদেশ ফরমাচ্ছেন? এ বিষয়ে লেখক নীরবই থাকছেন। এ নীরবতার অর্থ এই যে ইহজগতে ক্ষুদ্র কৃষকদের নির্লোভ হতে হবে; তাদের কৃচ্ছ্রতা চালু থাকবে। অন্যদিকে কৃষিজ উৎপাদন পন্থায় পুঁজি, শ্রম, ভূমি, উৎপাদন-উদ্যোগ ইত্যাদি উপকরণের নিয়োজন বাবদ যে উদ্বৃত্ত মূল্য উৎসারিত হবে, তার সিংহভাগ রয়ে যাবে ভূস্বামী ও বড় কৃষকদের পকেটেই। গল্পটা লেখার সময় নিশ্চয় তলস্তয়ের মনে উনিশ শতকের রাশিয়ার আয়-বণ্টনের প্রথাগত ভারসাম্যহীনতার পুনরুৎপাদনই জগদ্দল হয়ে বসেছিল। ভূমি অধিকারের লোভ সংবরণ করার জন্য তলস্তয় বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার ক্ষুদ্র কৃষকদের যে সদুপদেশ দিচ্ছেন, তা ক্ষুদ্র কৃষকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসানের ক্ষেত্রে কোনো মানবিক সমাধান দেয় না।
ফয়জুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক





