Chand Sultana or Chand Bibi, (was) one of the most distinguished women that ever appeared in India...” -Elphinstone.

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে প্রভুভক্ত বৈরাম খাঁর হতে আদিল শাহের সেনাপতি হিমুর পরাজয়ে ভারতে শাহী সাম্রাজ্যের উপস্থিত বিপদ কাটিয়া গেল। উত্তর ভারতে যে সকল ক্ষুদ্র-বৃহৎ পাঠান রাজ্য বিদ্যমান ছিল, উহারা একে একে আকবরের প্রবল পরাক্রমের সম্মুখে মস্তক অবনত করিল। চব্বিশ বৎসরের মধ্যে সমস্ত আর্যাবর্ত তাঁহার পদানত হইল। কিন্তু ইহাতেও তাঁহার রাজ্য-তৃষ্ণা নিবারিত হইল না। দাক্ষিণাত্যের সুসমৃদ্ধ জনপদে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তাঁহার শেষ জীবনের কাম্য হইয়া দাঁড়াইল। তিনি শুধু সুযোগের প্রতীক্ষায় রহিলেন।

সুযোগও শীঘ্রই জুটিয়া গেল। আহমদনগর রাজ্যের কতিপয় বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি কর্তৃক অনুরুদ্ধ হইয়া ১৫৯৫ খৃস্টাব্দে আকবর দাক্ষিণাত্যে সৈন্য প্রেরণ করিলেন। যুবরাজ মুরাদ বাদশাহর আদেশে গুজরাট হইতে ও সেনাপতি মির্জা খাঁ মালব হইতে সসৈন্যে দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর হইলেন। আহমদনগর হইতে অল্প দূরে উভয় সৈন্যদল পরস্পরের সহিত সম্মিলিত হইল। শত সহস্র বাদশাহী সৈন্য পঙ্গপালের ন্যায় নিজাম শাহী রাজ্য ছাইয়া ফেলিল। আহমদনগরের তখন অতি দুরবস্থা। রাজ্য প্রকৃতপক্ষে রাজশূন্য। সুলতান দ্বিতীয় বোরহান পরলোকে; নাগরিকেরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া আত্মকলহে নিমগ্ন; প্রত্যেক দলপতিই স্বার্থের বশবর্তী ও স্বদেশপ্রেম বিস্মৃত হইয়া স্বয়ং সিংহাসন অধিকারের জন্য প্রাণপণে চেষ্টিত। যে বিশ্বাসঘাতক দলের নিমন্ত্রণে শত্রুপক্ষ আহমদনগর আক্রমণ করিয়াছিল, গৃহ-বিবাদের সুযোগে তাহাদের সহায়তায় তাহারা রাজ্য জয়ের সুখ-স্বপ্ন দেখিতে লাগিল। চতুর্দিকে শত্রু পরিবেষ্টিত আহমদনগরের প্রতি মুহূর্তেই স্বাধীনতা নাশের আশঙ্কা ঘনীভূত হইয়া আসিতেছিল। এমন সময় আহমদনগরের সৌভাগ্যবশতঃ এক বীরাঙ্গনার আবির্ভাবে উভয় পক্ষের ভাগ্যচক্র সম্পূর্ণরপে পরিবর্তিত হইয়া গেল; যাহারা বিদেশীদের সাহায্য করিয়া তাহাদের অনুগ্রহে রাজ্যে প্রতিপত্তিশালী হইবার বাসনা পোষণ করিতেছিল, তাহাদের আশা নৈরাশ্যে পরিণত হইল,— চিরস্বাধীন আহমদনগরের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার ব্যবস্থা হইল।

এই বীরাঙ্গনা ইতিহাসে চাঁদ বিবি বা চাঁদ সুলতান নামে প্রসিদ্ধ। তিনি আহমদনগর রাজ্যের অধিপতি হোসায়ন নিজাম শাহের কন্যা। বিজাপুর-রাজ আদিল শাহের সহিত তাহার বিবাহ হয়। তিনি ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথের সমসাময়িক ও তুল্য পরিমিত রাজ্যের অধিকারিণী ছিলেন। কিন্তু বীরত্বে চাঁদ বিবি এলিজাবেথ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। পঁচিশ বৎসর বয়সে চাঁদ বিবি অপুত্রক অবস্থায় বিধবা হন। তত্পরে কয়েক বৎসর বিজাপুর রাজ্যের শাসন-শৃঙ্খলায় অতিবাহিত করিয়া তিনি পিতৃ-রাজ্যে আগমণ করেন।

জননী জন্মভূমির শোচনীয় অবস্থায় ব্যথিত হইয়া চাঁদ বিবি তত্প্রতিকারে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হইলেন। আহমদনগরের ঘোর সংকটকালে তাহার হূদয়ে এক ঐশী শক্তির আবির্ভাব হইল। স্ব রাজ্যে তো গৃহ-বিবাদ লাগিয়ই ছিল। তদুপরি বিজাপুর রাজ্যের সহিত পূর্ব হইতেই আহমদনগরের যুদ্ধ চলিতেছিল। রাজনীতিজ্ঞা সুলতানা দেখিলেন, বাদশাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করিতে হইলে বিজাপুর-রাজকে হয় স্বপক্ষভুক্ত করিতে হইবে, নতুবা যুদ্ধে নিরস্ত্র রাখিতে হইবে। অন্যথায় এই উভয় শত্রুর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার চেষ্টা করা পঙ্গুর গিরিলঙ্ঘন চেষ্টার ন্যায় অসম্ভব। তজ্জন্য তিনি বিজাপুরে অভিজ্ঞ দূত প্রেরণ করিয়া রাজাকে বুঝাইয়া দিলেন যে, উপস্থিত বিপদ একা আহমদনগরের নহে, সমগ্র মুসলিম দাক্ষিণাত্যের। আহমদনগর বিজয় সম্পন্ন হইলেই শাহী বাহিনী বিজাপুর, গোলকুন্ডা প্রভৃতি অন্যান্য রাজ্যের বিরুদ্ধে যাত্রা করিবে এবং দেখিতে দেখিতে সমগ্র দাক্ষিণাত্যে সম্রাটের বিজয়-পতাকা উড্ডীয়মান হইবে। এমতাবস্থায় বিজাপুর রাজ্যের পক্ষে আহমদনগরের শত্রুতাচরণ করা, আর স্ব-পদে কুঠারাঘাত করা একই কথা। বিজাপুরাধিপতি তাহার যুক্তি উপলব্ধি করিলেন। চাঁদ সুলতানার অসাধারণ বুদ্ধি-কৌশল কার্যকরী হইল। বিজাপুর-রাজ শত্রুতা বিস্মৃত হইয়া আহমদনগরের সহিত মৈত্রী-বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। এমন কি, তিনি তাঁহার পূর্বশত্রু, আহমদনগরের সাহায্যার্থ একদল সৈন্য প্রেরণ করিতেও কুণ্ঠিত হইলেন না।

অতঃপর এই সামান্য বুদ্ধিমতী মহিলা রাজ্যের অন্তর্বিপ্লব নিবারণে হস্তক্ষেপ করিলেন। এক্ষেত্রেও তাহার চেষ্টা সাফল্যমণ্ডিত হইল। তাঁহার অক্লান্ত উদ্যম, অকাট্য যুক্তি ও অনুপম বুদ্ধি-কৌশলে আহমদনগরের বিবাদমান দলপতিরা স্ব স্ব ভ্রম বুঝিতে পারিয়া স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রাণপণে যুদ্ধ করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। নগরের বাহিরেও তাঁহার কৌশল অনুরূপ ফল প্রসব করিল। জনৈক দেশ-বিরোধী সর্দার সুলতানার যুক্তিতে স্বীয় ভ্রান্তি অনুভব করিয়া এতদূর অনুতপ্ত হইয়া পড়িলেন যে, বিপক্ষ যখন নগর অবরোধে ব্যাপৃত, তখন তিনি পরাক্রান্ত শত্রু বাহিনী ভেদ করিয়া সসৈন্যে নগরে প্রবেশ করিলেন এবং স্বীয় মুর্খতাজনিত অপরাধের জন্য সুলতানার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। নগরের বহির্ভাগে অবস্থানকারী আরও দুই জন দলপতির হূদয়েও আত্মগ্লানির সঞ্চার হইল। তাহারাও সদলবলে বিজাপুর বাহিনীর সহিত যোগদান করিয়া যুদ্ধারম্ভের অপেক্ষায় রহিলেন। চাঁদ সুলতানা স্বয়ং নগরস্থ দলসমূহের নেতৃত্ব গ্রহণপূর্বক এশিয়ার তদানীন্তন শ্রেষ্ঠ রাজ-শক্তির বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হইলেন।

শত্রুসৈন্য নগর অবরোধ করিয়া রহিল, কিন্তু অত্যুচ্চ প্রাচীর অতিক্রম করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে পারিল না। তাহাদের দুর্গধ্বংসী যন্ত্রসমূহ পুরু প্রাচীরের কোন ক্ষতি করিতে সমর্থ হইল না। নিরুপায় হইয়া তাহারা ভূগর্ভে সুড়ঙ্গ খননপূর্বক বারুদের সাহায্যে প্রাচীর ভগ্ন করিয়া নগরে প্রবেশ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। তাহারা দেয়ালের নিম্নদেশে যে দুইটি সুড়ঙ্গ খনন করিল, চাঁদ সুলতানার প্রহরিগণের তীক্ষ দৃষ্টিতে তাহা আবিষ্কৃত হইয়া গেল। বীর সুলতানা স্বয়ং শ্রমিকদের অধিনায়কত্ব গ্রহণ করিয়া নিজের জীবন সমভাবে বিপন্ন করতঃ শত্রুপক্ষের চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিলেন।

কিন্তু শত্রুরা ইহাতে নিরুৎসাহ হইবার পাত্র ছিল না। তাহারা নবীন উদ্যমে অন্যত্র একটি সুড়ঙ্গ খনন করিয়া ফেলিল। এই সুড়ঙ্গ খনন-বার্তাও চাঁদ বিবির সতর্ক প্রহরিদের অগোচর রহিল না। শত্রুদের কার্যে বাধাদানের জন্য অবিলম্বে ঘটনাস্থলে সৈন্য প্রেরিত হইল। তাহারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করিয়া স্ব স্ব কর্তব্য পালন করিল। কিন্তু তাহাদের চেষ্টা সফল হইল না। চাঁদ বিবির যে সৈন্যরা সুরঙ্গ-মুখে অবস্থান করিয়া, শত্রুদের খনন ব্যর্থ করিবার চেষ্টায় নিরত ছিল, তাহারা শত্রুপক্ষের কামানের গোলার মুখে তুলার ন্যায় উড়িয়া গেল। শাহী বাহিনী নগর-প্রাচীরের এক বৃহদংশ ভগ্ন করিয়া ফেলিল। ইহা দেখিয়া সুলতানার সৈন্যেরা অত্যন্ত ভীত হইয়া স্থান ত্যাগ করতঃ শত্রু সৈন্যের প্রবেশ-পথ উন্মুক্ত করিয়া দিবার উপক্রম করিল। আহমদনগরের স্বাধীনতা-সূর্য অস্তাচলে গমন করিতে বসিল।

সৈন্যদের এই ভীষণ দুরবস্থা ও স্বদেশের স্বাধীনতার শোচনীয় পরিণাম প্রত্যক্ষ করিয়া চাঁদ সুলতানার হদয়ে ক্রোধাগ্নি প্রজ্জলিত হইয়া উঠিল। পরাধীন জীবন যাপন অপেক্ষা শত্রু-হস্তে মৃত্যুবরণ তাঁহার নিকট শত সহস্র গুণে শ্রেয় বলিয়া মনে হইল। তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন, হয় আহমদনগরের স্বাধীনতা অব্যাহত রাখিবেন, নতুবা শত্রুর অস্ত্রাঘাতে প্রাণ বিসর্জন দিবেন। এই প্রতিজ্ঞা করিয়া চাঁদ বিবি যুদ্ধের বর্ম পরিধানপূর্বক অবগুণ্ঠনে মুখমন্ডল আবৃত করতঃ যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হইয়া উলঙ্গ কৃপাণ হস্তে তেজস্বী অশ্বে সওয়ার হইয়া স্বয়ং সুড়ঙ্গ-মুখে উপস্থিত হইলেন। যে সকল শত্রুসৈন্য ভগ্নস্থান দিয়া নগরে প্রবেশের চেষ্টা করিতেছিল চাঁদ সুলতানা তাহাদিগকে তরবারি-মুখে নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। স্বয়ং সুলতানাকে শত্রুদলনে প্রবৃত্ত দেখিয়া নগরের যে সকল সৈন্য তখনও যুদ্ধে বিরত ছিল বা ভগ্নোৎসাহ হইয়া পড়িয়াছিল, তাহারাও লজ্জিত হইয়া রণাঙ্গনে ছুটিয়া আসিল এবং প্রবল উৎসাহে শত্রু সংহার করিতে লাগিল। ফলে শত্রু-সৈন্যদের নগর প্রবেশ-চেষ্টা ব্যর্থ হইয়া গেল।

কিন্তু চাঁদ বিবি এখনেই নিরস্ত হইলেন না। তিনি শত্রুদিগকে ভগ্নস্থান হইতে দূরে বিতাড়িত করিতে বদ্ধপরিকর হইলেন। তাহার জ্বালাময়ী উৎসাহ বাক্যে আহমদনগরের সৈন্যেরা নব বলে বলীয়ান হইয়া উঠিল। তাহারা পূর্ণ উদ্যমে প্রাণপণে শত্রু-সৈন্য-শোণিতে তরবারি রঞ্জিত করিতে লাগিল। একদল সৈন্য মঞ্চের সাহায্যে প্রাচীরের উপরিভাগে আরোহণ করিল। তথা হইতে বন্দুকের গুলি, ইন্টক, প্রস্তর ও শররাজি নিক্ষেপ করিতে লাগিল। শত্রু-সৈন্য সুরঙ্গ-মুখে কামান স্থাপন করিয়া বিপক্ষের উপর অনল-বৃষ্টি আরম্ভ করিল। কামানের পশ্চাদ্দেশ ও পার্শ্বদেশ হইতে সুড়ঙ্গ-মধ্যস্থ জনতার উপর অগ্নিবাণ, বন্দুকের গোলা, বারুদ ও অন্যান্য বহু দাহ্য পদার্থ সবেগে পতিত হইতে লাগিল। চাঁদ সুলতানা স্বহস্তে বন্দুক ধারণ করিয়া শত্রু-সৈন্যের উপর গুলিবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। যখন গুলি নিঃশেষিত হইয়া গেল, তখন তিনি ক্রমাগত তাম্র, রৌপ্য ও স্বর্ণ মুদ্রা বন্দুকে পুরিয়া শত্রু-সৈন্যের প্রতি নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। যখন উহাও শেষ হইয়া গেল, তখন এই স্বাধীন চেতা বীর-নারী নিজের বহু মুল্য মণিময় গাত্রালংকার পর্যন্ত বন্দুকে পুরিয়া দুর্দান্ত শাহী বাহিনীর উপর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন।

সূর্য আস্তাচলে; নৈশ অন্ধকার বিশ্ব গ্রাস করিতে ছুটিয়া চলিল। বহুক্ষণব্যাপী লোমহর্ষক যুদ্ধের পর শত্রুপক্ষ সন্ধ্যাকালে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইল। রাত্রি প্রভাত হইবার পূর্বে তাহারা আর নগর আক্রমণের চেষ্টা করিল না। কিন্তু চাঁদ সুলতানা আরাম হারাম করিলেন। নিদ্রা যাওয়া দূরের কথা, সময় দিবসের রণ-ক্লান্তি অপনোদনের জন্য তিনি একটি মুহূর্তও বিশ্রাম না করিয়া নিজ হাতে ইট আনিয়া প্রাচীরের ভগ্নস্থানে রাখিয়া দিতে লাগিলেন। তাঁহার এই অনুপম দৃষ্টান্ত সৈনিক মহলে প্রবল উৎসাহের সঞ্চার করিল। তাহারাও বিশ্রাম-সুখের আশা বিসর্জন দিয়া ইষ্টকাদি আনয়ন করত: সেই রাতেই ভগ্নস্থান পুননির্মাণ করিয়া ফেলিল। প্রাতঃকালে শত্রুরা দেখিতে পাইল, প্রাচীরের ভগ্নস্থান আবার এত উচ্চ ও পুরু, করিয়া নির্মিত হইয়াছে যে, পুনরায় সুড়ঙ্গ খনন করিয়া উহা ভগ্ন করা সহজসাধ্য নহে। ইহাতে তাহদের বিস্ময় ও নৈরাশ্যের সীমা রহিল না।

চস্বাগতাই তুর্কেরা বীর জাতি। অর্ধ এশিয়া বিজয়ী বীরবর তৈমুর ও চেঙ্গিজ খাঁর শোণিত তুর্ক সেনাপতির শিরায় শিরায় প্রবাহিত। সৈন্যাধ্যক্ষ যুবরাজ মুরাদ পাঠান-বিধ্বংসী সম্রাট আকবরের বীরপুত্র। তাঁহার বীর-হূদয় এই বিধবা বীর-নারীর অশ্রূতপূর্ব বীরত্ব ও অসাধারণ আত্মত্যাগ দর্শনে বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইল। চাঁদ সুলতানার প্রতি সৈন্যদের অন্তঃকরণও ভক্তি ও সহানুভূতিতে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। এরূপ স্বাধীনচেতা বীরনারীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করা তাহাদের নিকট ঘোরতর অন্যায় বলিয়া বোধ হইল। তাহারা তখনও সংখ্যায় অধিক ছিল; কিন্তু তাহারা আর যুদ্ধ করল না। বেরার রাজ্যের বিনিময়ে উভয় পক্ষে সন্ধি স্থাপিত হইলে শাহী সৈন্য আহমদনগর হইতে প্রস্থান করিল। এইরূপে একজন মহিলার অপূর্ব বীরত্বে একটি রাজ্যের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রহিল।

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে এইরুপ বীরাঙ্গনার জন্মগ্রহণে মুসলিম-ভারত গৌরবান্বিত হইয়াছিল। একজন মুসলিম বীরাঙ্গনা স্বীয় জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষার্থে শাণিত তরবারি ও বন্দুক হস্তে তদানিন্তন এশিয়ার সর্বাপেক্ষা প্রতাপশালী সম্রাটের বিরুদ্ধে নির্ভয় চিত্তে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়া মাতৃভূমির স্বাধীনতা অব্যাহত রাখিয়াছিলেন। চাঁদ বিবি ছিলেন ভারতের ‘যোয়ান অব আর্ক’। ইংল্যান্ডের আক্রমণে পরাজিত ফ্রান্সের এই কৃষক কন্যার ন্যায় তিনিও রাজ্য হইতে শত্রু বিতাড়িত করিয়া শেষে শত্রুহস্তে প্রাণ দেন। উভয়ের পরিণামই প্রায় এক। তবে চাঁদ বিবি নিহত হন গৃহ-শত্রুদের হাতে, আর যোয়ান অব আর্ককে ইংরেজেরা ধরিয়া নিয়া ডাইনী বলিয়া আগুনে পোড়াইয়া মারে, এই মাত্র পার্থক্য।

 

এম. আবদুল কাদের: ১৯০৮ সালের ১ এপ্রিল লক্ষ্মীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন।  ছাত্রজীবন থেকেই ‘মাসিক মোহাম্মদী’সহ একাধিক সাময়িক পত্রে লেখালেখির শুরু। প্রথম বই ‘মুসলিম কীর্তি’ (১ম খণ্ড) প্রকাশ পায় ১৯৩০ সালে। তাঁর লেখার মূল ক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম ইতিহাস। উল্লেখযোগ্য বই: মুসলিম কীর্তি (৫ খণ্ড), মুর সভ্যতা, তুরস্কের ইতিহাস, কামাল পাশা ও নবীন তুরস্ক, নোয়াখালীর কথ্য ভাষা ইত্যাদি। ১৯৯৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ৮৪ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় প্রয়াত হন। উপরের লেখাটি লেখকের ‘মুসলিম কীর্তি’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত।