গ্রিসের এথেন্স শহরের অ্যাজু কনস্ট্যানটু সড়কে অবস্থিত দেশটির জাতীয় থিয়েটার ভবন। ভবনের নকশা অঙ্কন করেন অস্ট্রীয় স্থপতি আর্নস্ট মোরিত্জ থিওডর জিলার [জন্ম সেরকোভিচে, ১৮৩৭; মৃত্যু এথেন্সে, ১৯২৩ সালে]। ভবনটি ১৮৯৫ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে নির্মিত হয়। থিয়েটার ভবনের অভ্যন্তরে বিশাল হলের মূল প্রবেশপথে গ্রিসের সুপরিচিত ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক ও থিয়েটার সমালোচক গ্রেগরিওস জেনোপুলোসের [জন্ম কনস্ট্যান্টিনোপলে, ১৮৬৭; মৃত্যু এথেন্সে, ১৯৫১ সালে] মূর্তি রাখা হয়েছে। তার আদি বাসভূমি ছিল গ্রিসের Zakynthos দ্বীপে। গ্রেগরিওস জেনোপুলোস ১৮৮৮ সালে ‘ম্যান অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ উপন্যাসের জন্য প্রথম পরিচিতি লাভ করেন। তার উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে একটি ছিল, তিনি গত শতাব্দীর প্রথমাংশের পুরোটা সময় গ্রিসের কিংবদন্তি কিশোর ম্যাগাজিন ‘দি এডুকেশন অব চিলড্রেন’-এর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একই সঙ্গে তিনি ম্যাগাজিনের মূল লেখকও ছিলেন। তিনি বিভিন্ন নামে লিখতেন, যেমন তার একটা হাস্য-কৌতুক ছদ্মনাম ছিল এবং সেই নামটি ছিল ‘অ্যানানিয়াস’।

সম্প্রতি আমরা ১৯১৮ সালে প্রকাশিত ওই কিশোর ম্যাগাজিনের ৬ অক্টোবরের সংখ্যাটি হাতে পেয়েছি। সেখানে গ্রেগরিওস জেনোপুলোসের লেখা ‘স্প্যানিশ’ ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রিসের এথেন্স শহরে যে বিস্তার লাভ করেছিল, তার রেফারেন্স চিহ্নিত করেছি। বিশেষ করে অ্যানানিয়াস, যিনি নিজেই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, হাস্যোচ্ছলে বিষয়টির ভূমিকা উপস্থাপন করেছিলেন। তবে পরে তিনি রোগ ও রোগের উপসর্গ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন, এমনকি ১৯১৮ সালে ব্যবহূত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়েও বিশদ আলোচনা করেছিলেন। তবে প্রাদুর্ভাবের কয়েক দিনের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা যে কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, সে বিষয়ে লেখক কোনো ধরনের ধারণা করতে পারেননি। ৩০ দিনের কম সময়ে মহামারী ‘স্প্যানিশ’ ইনফ্লুয়েঞ্জা গ্রিসের নিকটবর্তী ইজিয়ান সাগরের Skyros দ্বীপের বাসিন্দাদের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছিল। তার সেই অনন্য সাহিত্য প্রতিবেদনটি ছিল এ রকম, যা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে:

“এথেন্স, ৬ অক্টোবর ১৯১৮।

মনে পড়ে, ছেলেবেলায় আমি রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অতিশয় আত্মঅহংকারী রাজসভার একজন সদস্যকে নিয়ে কৌতুক শুনেছিলাম এবং শোনার সময় প্রচুর হেসেছিলাম। একদিন রাজা রাজসভার সেই সদস্যকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মহাশয়, আপনি কী স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে পারেন?’

‘না, মহামান্য!’ জবাবে রাজসভার সদস্য বললেন এবং পরক্ষণেই তিনি ভাবতে শুরু করেন, ‘এ বিষয়ে রাজা কেন আমাকে প্রশ্ন করবেন? তিনি হয়তো আমাকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করে স্পেনে পাঠাতে চান!…কি যে লজ্জার বিষয়! আমি স্পেন দেশীয় ভদ্দরলোক এবং ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াইকারীদের ভাষা জানি না!…কিন্তু আমি কি শিখতে পারব? অবশ্যই! আমি শিখতে পারব, যদি সত্যি আমি তা চাই।’ এবং সেদিনই তিনি স্প্যানিশ ভাষা শেখার ছবক নেয়া শুরু করেন। একজন ফরাসির জন্য স্প্যানিশ ভাষা শেখা খুব কঠিন কিছু নয় এবং এক মাস পর রাজসভার সেই সদস্য স্প্যানিশ ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারার দক্ষতা অর্জন করেন।

‘হে মহামান্য,’ তিনি রাজার সম্মুখে ঘোষণা করেন, ‘আমি স্প্যানিশ ভাষা শিখেছি।’

‘ওহ্, সত্যি তাই!’ রাজা চতুর্দশ লুই বললেন, ‘সুতরাং তাহলে তো আপনি দন কিহোতের আদি সংস্করণ পড়তে পারবেন।’

মুহূর্তেই কল্পিত রাষ্ট্রদূত বিষম খায়।

এ কৌতুকটা পুনরায় আমার মনে পড়েছে যেসব দিনগুলোতে ‘স্প্যানিশ’ ইনফ্লুয়েঞ্জা এথেন্স শহর পরিদর্শন করেছিল এবং আমার বন্ধু অ্যাজারিয়াসকে আমি বলেছিলাম:

 তুমি কি স্প্যানিশ ভাষা জানো?’

 না, অ্যানানিয়াস। আমি জানি না।

যত দ্রুত সম্ভব তোমার স্প্যানিশ ভাষা শেখা উচিত।

 কিন্তু কেন?

 প্রথমত, তাহলে তুমি দন কিহোতের আদি সংস্করণ পড়তে পারবে এবং দ্বিতীয়ত, যদি মিসেস ইনফ্লুয়েঞ্জা তোমার দর্শন লাভের জন্য আসেন, তাহলে তুমি তার সঙ্গে খোশ গল্প জমাতে পারবে। আমি শুনেছি যে তিনি একমাত্র স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে পারেন।

একটি কথাও না বলে অ্যাজারিয়াস হাসে। কিন্তু ঘটনা যা ঘটেছে, তা হলো মিসেস ইনফ্লুয়েঞ্জা অ্যাজারিয়াসকে দর্শন করার আগে আমার সঙ্গে মোলাকাত করেছেন এবং তারপর আমি বুঝতে পেরেছি, অ্যাজারিয়াসকে যে উপদেশ দিয়েছি, তা নিজেকেই দেয়া উচিত ছিল। সত্যি, লজ্জার বিষয় যে আমি স্প্যানিশ ভাষা জানি না। আমি যদি স্প্যানিশ জানতাম, তাহলে এ অদ্ভুত রমণীর সঙ্গে অনায়াসে মানিয়ে নিতে পারতাম। প্রথম যে জিনিসের জন্য আমি তার কাছে ভিক্ষা চাইতাম, তা হলো তাকে অনুরোধ করে বলতাম, তিনি যেন আমাদের আচমকা আক্রমণ না করেন। আমি যদি তার ভাষায় কথা বলতে পারি, আমার বিশ্বাস তিনি আমাকে বুঝতে পারবেন। কি জঘন্য শয়তান! কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই হঠাৎ ৪০ ডিগ্রির জ্বর। এটা কি কৌতুক নয়! এ অদ্ভুত রমণীর আক্রমণে যতটুকু তাপমাত্রা হয়েছে, আনন্দোৎসব উদযাপন উপলক্ষে অভ্যর্থনা কক্ষে সমবেত হওয়া ৪০ জন উন্মত্ত মুখোশধারীর উপস্থাতিতে ততটুকু তাপমাত্রা হবে না। আন্দালুসিয়ার ‘ছেলেমেয়েরা’ উচ্ছল ও প্রাণবন্ত সত্ত্বেও তারা অপরিচিত জায়গায় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ভালো ব্যবহার করতে সক্ষম…আমি তার কাছে আরো ভিক্ষা চাইব যে তিনি যেন বেশি দিন না থাকেন। আর্মেনীয়রাই শুধু ৪০ দিন পরিদর্শন করে না, কিন্তু স্প্যানিশ রমণীও করে…আমি ৪০ দিন পায়ের ওপর ভর করে থাকতে পারিনি। তার পরও আমাকে সেসব দিনগুলোয় আমার নাছোড়বান্দা দর্শনার্থীদের বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল…গরম পানীয়, কুইনাইন, তরল পদার্থ শোষণের জন্য কাপ, সরিষা প্লাস্টার, পা ধোয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের টনিক এবং এমন আরো অনেক কিছু…এবং আমি স্প্যানিশ ভাষা জানি না, এমনকি মিসেস ইনফ্লুয়েঞ্জা আমাকে একাকী থাকার সুযোগ দেয়ার পরও আমি দন কিহোতের আদি সংস্করণ পড়তে পারিনি!...”

 

সূত্র: নিবন্ধটি Experimental and Therapeutic Medicine-এর ২০১৯ সালের ১৭তম সংখ্যায় প্রকাশিত