লন্ডনের সঙ্গে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগরী কলকাতার কিছু কিছু মিল হয়তো ছিল। গরমিলও বিস্তর। সেটা স্বাভাবিক। দুই দেশের ভূগোল, ইতিহাস, জলবায়ু সবই আলাদা। সুতরাং আলাদা সমাজও। ভিক্টোরিয়া ইংল্যান্ডের হাওয়া আদৌ কলির শহর কলকাতাকে স্পর্শ করেনি এমন নয়, কিন্তু মনে রাখতে হবে কলকাতা এক ঔপনিবেশিক শহর, এখানে সেদিনও শন শন বইছে পুবের হাওয়া। পরিবেশ পরিস্থিতি স্বভাবতই অন্য রকম। ২২ হাজার ‘আদিরসাত্মক’ বইয়ের কথা কলকাতার বাঙালি সেদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। রেভারেন্ড জেমস লঙ ১৮২০ সনে মুদ্রিত বাংলা বইয়ের যে তালিকা রচনা করেছেন, তাতে ১৯ খানা বইয়ের কথা আছে। তার মধ্যে চারখানা ‘আদিরসাত্মক’। নাম— ‘আদিরস’, ‘রতিমঞ্জরী’, ‘রতিবিলাস’ ও ‘রসমঞ্জরী’। ১৮৫৫ সনে আগেকার বছরগুলোয় ছাপা ১৪০০ বাংলা বইয়ের যে তালিকা লঙ প্রকাশ করেছিলেন, তার মধ্যেও বেশকিছু ‘আদিরসাত্মক’ বইয়ের উল্লেখ আছে। উল্লেখ আছে দুই বছর পরে তৈরি (১৮৫৭) তার অন্য তালিকাটিতেও। তিনি জানিয়েছিলেন, সে বছর প্রকাশিত মোট ৩২২ খানা বইয়ের মধ্যে ১৩ খানাই আদিরসাত্মক। লঙের তৈরি ১৮৫৫ সনের তালিকা থেকে কিছু বইয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যথা— ‘কামশাস্ত্র’, ‘লক্ষ্মী-জনার্দ্দন বিলাস’, ‘প্রেম অষ্টক’, ‘প্রেমবিলাস’, ‘প্রেম নাটক’, ‘প্রেমতরঙ্গ’, ‘প্রেমরহস্য’, ‘বেশ্যারহস্য’, ‘সম্ভোগ রত্নাকর’, ‘রমণীরঞ্জন’, ‘রসতরঙ্গিণী’, ‘রতিকেলি’, ‘রসরত্নাকর’, ‘শৃঙ্গাররস’, ‘স্ত্রীচরিত্র’ ইত্যাদি। বলতে গেলে বটতলার ছাপাখানার আদি যুগ থেকেই ছাপা হচ্ছিল এসব বই। অর্থাৎ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই। একটি বই সম্পর্কে লঙ মন্তব্য করেছেন, ‘ষোলখানি নোংরা ছবিসহ।’ বইগুলো সম্পর্কে তার পাইকারি মন্তব্য, ‘দিজ ওয়ার্কস আর বিস্টলি, ইকুয়াল টু দি ওয়ার্সট অব দ্য ফ্রেঞ্চ স্কুল!’ পশুসুলভ রচনা, নিকৃষ্টতম ফরাসি বইয়ের তুল্য!

কিন্তু সত্যই কি তাই? এসব বই সহজপ্রাপ্য নয়। সুতরাং বিচার ও বিশ্লেষণের অবকাশ অল্প। তবে অনুমানের পক্ষে প্রমাণ এখনো নিশ্চয় কিছু কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে। সেগুলোর পাতা উল্টালে কিন্তু মনে হয় না, এসব বই বিলিতি মানে বিচার করলে পর্নোগ্রাফি বলে মার্কা পাবে। মেরিডিথ বর্থউইক উনিশ শতকের বাঙালি ভদ্রমহিলাদের জীবনাচার আলোচনা করতে বসে (‘দ্য চেইনজিং রোল অব উইমেন ইন বেঙ্গল, ১৮৪৯, ১৯০৫) যৌন জীবন প্রসঙ্গও উত্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, নবযুগের প্রয়োজন মেটাতে কিছু কিছু চিকিৎসা ও যৌন বিজ্ঞানের বই বের হয়েছিল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। যথা— যোগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘জীবন রক্ষা’, ভারতচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শুশ্রূষা প্রণালী’, কেদারনাথ সরকারের ‘ঋতুরক্ষা’, সূর্যনারায়ণ ঘোষের ‘বৈজ্ঞানিক দাম্পত্যপ্রণালী’ এবং ধাত্রীবিদ্যা ও শিশুপালন সম্পর্কে অন্নদাচরণ খাস্তগীরের একটি ইংরেজি বই। সব কয়টি বইয়ের লক্ষ্যই সুখী স্বাস্থ্যকর নর-নারী জীবন। স্পষ্টতই দাম্পত্য জীবন। লঙ উল্লিখিত বইগুলো হয়তো সে বিচারে কঠোরভাবে ‘পারিবারিক পুঁথি’ নয়, কিন্তু ওগুলোকে পশ্চিমি সংজ্ঞায় কিছুতেই ‘পর্নোগ্রাফি’ আখ্যা দেয়া চলে না। কেননা যৎসামান্য যেটুকু প্রমাণ হাতের সামনে রয়েছে, তাতে এগুলোকে ‘কামশাস্ত্র’ বা ‘কোকশাস্ত্র’র বংশধর বলেই মনে হয়। কাহিনীমূলক যেগুলো, সেগুলোর সূত্রও প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য। কিছু কিছু হয়তো বা ‘গোলেবকাওয়ালি’র মতো ফার্সি হাওয়ায় রচিত।

যথা— ১২৭০ সনে প্রকাশিত ‘বাতছবির লজ্জতন্নেসা’। সচিত্র এ বইটির ছবিগুলো পাদ্রী কেন, যেকোনো রুচিমানের চোখে ‘অশ্লীল’ ঠেকতে পারে, বিশেষত যারা মন্দির ভাস্কর্যে ‘অশ্লীলতা’ দেখে আঁতকে ওঠেন তাদের চোখে। কিন্তু বিষয়বস্তু ততখানি ‘আপত্তিজনক’ নাও ঠেকতে পারে। আখ্যাপত্রে বলা হয়েছে, ‘লজ্জতন্নেসা এই কেতাবের নাম/ রশিক লোকের এতে/ নেকলিবে কাম/ রসের ভাণ্ডার এ কেতাব জানিবে/ আসল করিলে নারি বসেতে রহিবে’ ইত্যাদি। যদিও লেখক বলছেন, ‘গোপনে পড়িবে এই কেতাব রতন/ সবার চরণে মোর এই নিবেদন’, তবু ছবির জন্য লজ্জাবোধ না করলে গোপনীয়তা খুব জরুরি নয়, কেননা বইটি পদ্যে কোকশাস্ত্রেরই রকমফের। অথচ তত্কালে এ বইয়ের দাম ছিল নগদ ৫ টাকা! বিশ শতকের সূচনায় (১৯০০ সন) প্রকাশিত আরেকটি বই ‘সচিত্র সম্ভোগ রত্নাকর’, ‘কোঁকারাম পণ্ডিত কৃত/ নদে-চাঁদ পাইন কর্তৃক সংগৃহীত ও প্রকাশিত।’ এ বইয়ে কালীঘাটের পটের আদলে আঁকা কিছু ছবি রয়েছে। অন্য ছবিও মামুলি। পাঠ্য অংশও মোটেই অশ্লীল বা কুরুচিকর নয়। বইটির দ্বিতীয় নাম, ‘নারী বেদ বা মহব্বতে দুনিয়া’। শুরু হয়েছে চার শ্রেণীর নারী ও পুরুষের লক্ষণাদি বর্ণনা করে, শেষ কিছু তুকতাক মন্ত্রতন্ত্র শিখিয়ে। যথা— ‘পঞ্চাদশ রকমের বশীকরণ কৌশল’, ‘কামরূপ কামিখ্যার মন্ত্র’ ইত্যাদি। ‘কীভাবে গৃহ সর্পময় দেখা যায়’, কিংবা কেমন করে ‘রজনীতে বিনা আলোকে পুস্তক পাঠ করা যায়’, তারও কৌশল শিখতে পারবেন উৎসাহী পাঠক! আর একখানা বই ‘সচিত্র রতিশাস্ত্র’।

নামপত্রে বলেই দেয়া হয়েছে, ‘পদ্মপুরাণ হইতে সংগৃহীত’। ‘বইটির লেখক ‘যশোহর মল্লিকপুর নিবাসী বন্দ্যঘটীয় কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন’, প্রকাশক আপার চিত্পুর রোডের ‘শ্রীশরত্চন্দ্র শীল’। তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩১৫ সনে। এ বইয়ে গদ্য, পদ্য, ভাষা খুবই সাধু এবং পরিচ্ছন্ন। ছবিগুলোও তা-ই। মধ্যবিত্ত ঘরের বাবু ও বিবির প্রতিকৃতি। সবই সুবেশ, সুসজ্জিত। যেন ফটোগ্রাফারের সামনে বসেছেন বা দাঁড়িয়ে আছেন। অশ্লীলতার লেশমাত্র নেই কোথাও। এতেও রয়েছে নানা উদ্ভট কথা। লেখক সতী-অসতী বিচার করার পদ্ধতি শেখাচ্ছেন পাঠককে, ‘বর কন্যা নামে নাম।/ দুয়ের বয়স ঠিক দিয়া আন!!/ চারের গুণ তিনে বাপ।/ ফিরে নাম কর সাত / তিন হরি এক রয়।/ তারে সতী সবে কয়।’

এ বই হাতে পড়লে সতী কিংবা অসতী— সবাই নিশ্চয় হেসে খুন হয়ে যেত। পরবর্তীকালে ছাপা চণ্ডীচরণ বসাকের ‘চিত্রে ও রচনায় ১৩৮ খানি চিত্র সম্বলিত সংযম শিক্ষা সম্বন্ধীয় যৌবনপাঠ্য’ বই ‘যৌবন পথে’ যারা দেখেছেন, তারা অনায়াসে অনুমান করতে পারবেন, উনিশ শতকের বাঙালি প্রকাশকদের পক্ষে কতদূর পা বাড়ানো সম্ভব। এ বইয়েও তথাকথিত বিজ্ঞানের পাশাপাশি নানা উদ্ভট তত্ত্ব রয়েছে। কখনো কখনো মনে হবে বুঝিবা কল্পবিজ্ঞান রয়েছে। এমনকি মেল কামরায় মাতাল ফিরিঙ্গির হাত থেকে স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষার জন্য সাহসিকতার প্রশংসা। এ বইয়ের লক্ষ্যও সুখী দাম্পত্য জীবন। বইয়ের শেষে দীর্ঘ পদ্যের দুটি ছত্র, “তুমি আমি আমি তুমি— এই দুটী ফুল/ দু’জনার সুরভিতে দু’জনে আকুল।”

সত্য, বিভিন্ন ধর্মপুস্তকের মতো উনিশ শতকে লঙ কথিত ওই সব বইয়েরও চাহিদা ছিল। ‘সমাচার দর্পণ’-এ (২২ ফেব্রুয়ারি, ১৮২৩) নিশ্চিন্তপুর থেকে জনৈক ‘শ্রীযথার্থবাদিন’ একটি দীর্ঘ চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘সংপ্রতি এই কলিকাতা মহানগরে বিদ্যাসুন্দর ও রতিমঞ্জরী ও রসমঞ্জ প্রভৃতি আদিরসঘটিত যে যে গ্রন্থ ছাপা হইয়াছে তাহা বাবুদিগের নিকটে আগতমাত্র সমাদর পুরঃসরে মূল্যপ্রদান করিয়া দিবামাত্র তদামোদে আমোদিত হইয়া থাকেন কিন্তু এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তিথিতত্ত্বের অন্তর্ভূত কর্মলোচন নামক এক গ্রন্থ অতি যত্নে ভাষাতে পয়ার করিয়া সংস্কৃত সমেত ৫০০ শত গ্রন্থ ছাপাইয়াছেন অনেক চেষ্টাতে শতাবধি গ্রন্থ বিশিষ্ট লোকদ্বারা আদৃত হওয়াতে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ঋণ মাত্র শোধ হইয়াছে...। এই গ্রন্থ আধুনিক বাবুজি মহাশয়দিগের নিকটে লইয়া গেলে প্রথমত আদিরস জ্ঞানে হস্তে করেন পরে কিঞ্চিৎ দর্শনে রজ্জুজ্ঞানে সর্পধারণ জ্ঞান করিয়া দূরে নিক্ষেপ করেন।’ ... ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১১৯৪-১২৫৪ সন) ‘দূতীবিলাস’ (১৮২৫) রচনার পক্ষে কৈফিয়ত দিয়েছিলেন, বাবুদের আন্তরিক দাবি মিটাইতে এ বই। তাদের খেদ, ‘যে দেখি ভারতকৃত নব্য কিছু নই।’ অথচ ‘এখন কতক নব্যনামক মজিয়া।/ করে কত রস নানা নায়িকা লইয়া/ সে রস বর্ণিলে ভাল গ্রন্থ এক হয়/ তাহারা কুকর্ম্ম ত্যাজে ইথে সুখোদয়/ সভাস্থ সকলে বলে তাঁহার নিকটে।/ এই মত গ্রন্থ করা যুক্তিযুক্ত বটে’ সুতরাং রচিত হয়েছিল ‘দূতী বিলাস’।

‘দূতীবিলাস’-এ ‘সমর’ ‘মন্থন’, রন্ধন’, ‘পূজা’ ইত্যাদি রূপকের আড়ালে ভাষার ধূম্রজালে নায়ক নায়িকার মিলন বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে কিছু কিছু রুচিবাগীশের বিচারে হয়তো সেটি ‘অশ্লীল’ বলে গণ্য হতে পারে। যদিও এ দেশে ‘কামশাস্ত্র’ শাস্ত্রগ্রন্থের অন্তর্গত এবং কাম ‘ধর্ম, অর্থ ও মোক্ষ’র মতো জীবনের লক্ষ্য হিসেবে স্থিরীকৃত। লঙ অবশ্য তার তালিকা থেকে ‘দূতীবিলাস’-কে বাদ দিয়েছেন। না দিলেও কোনো অসুবিধা ছিল না। কেননা আগেই বলা হয়েছে, কোনো বিচারেই তার তালিকভুক্ত বইগুলো পশ্চিমের ‘পর্নোগ্রাফি’র সঙ্গে তুলনা করা চলে না। নর-নারীর শারীরিক সম্পর্কের বিবরণ আধুনিক উচ্চশ্রেণীর বাংলা সাহিত্যে যা দেখা যায়, ওসব বইয়ে তার কণামাত্র ছিল কিনা সন্দেহ। মনে রাখা চাই, তথাকথিত কাহিনীমূলক আদিরসাত্মক বইয়ের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত তখন একদিকে ‘বিদ্যাসুন্দর’, অন্যদিকে ‘দূতীবিলাস’!&dquote;&dquote;

তবু ‘অশ্লীলতা’, ‘অশ্লীলতা’ বলে একটা রব উঠেছিল। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অশ্লীলতাবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত শুরু হয়েছিল শহরে। সন্দেহ কী, ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের পরিশোধিত সুপবন স্পর্শ করেছে কলকাতাকে। লঙ লিখেছেন, ১৮৫৬ সনে একটি অশ্লীল বই প্রকাশ এবং প্রচারের নামে তিনজনকে ধরা হয়েছিল। সেই বছরই কিছু ‘সম্ভ্রান্ত নেটিভ’ এবং কয়েকজন যাজকের আর্জি শিরোধার্য করে রচিত হয় এ দেশের প্রথম অশ্লীলতা-নিরোধক আইন। ১৮৫৬ সনের ১৪ নম্বর এ আইন অনুযায়ী কোম্পানির রাজত্বের চৌহদ্দির মধ্যে কোনো কিছু অশ্লীল পুথিপুস্তক ছবি প্রকাশ এবং প্রচার দণ্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষিত হয়। শুধু বই বা ছবি নয়, প্রকাশ্যে অশ্লীল নাচ, গান, অঙ্গভঙ্গি, আবৃত্তি ইত্যাদিও নিষিদ্ধ হয়। বলা হয়, কেউ এসব করলে অন্যরা যে কেউ তাকে হাতেনাতে ধরে তত্ক্ষণাৎ পুলিশের হাতে সমর্পণ করতে পারেন। এ আইন অনুসারেই ধরা পড়েছিলেন ওরা তিনজন। তারা নাকি একটি অশ্লীল বই বিক্রি করছিলেন। বইটির দাম ছিল চার আনা। লঙ বলেছেন, সেটি বিক্রি হয়েছিল ৩০ হাজার কপি। সুকুমার সেন মশাইয়ের অনুমান বইটি দাশরথি রায়ের পাঁচালি গ্রন্থ (নং ১, ১২৫৯)।৬ যাই হোক, বিচারে তাদের জরিমানা হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। ইংরেজ রাজত্বে অশ্লীলতার দায়ে সেই বোধ হয় প্রথম দণ্ড। কেননা খাস বিলেতেও তখন চালু হয়নি অশ্লীল সাহিত্য বা ছবি দমনের কোনো আইন। অথচ আগেই বলা হয়েছে, লন্ডন তখন অনায়াসে দাবি করতে পারে গোটা সাম্রাজ্যের অশ্লীল সাহিত্যের রাজধানীর গৌরব।

পরবর্তীকালে আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে। ১৮৫৭ সনের সংবাদপত্র সম্পর্কিত ৩০ নম্বর আইনেও অশ্লীলতাবিরোধী ধারা ছিল। ১৮৬২ সনের পেনাল কোডে (সেকশন ২৯২-৯৪) তো বটেই। তবু ১৮৭৩ সনে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় অশ্লীলতা নিবারণী এক সভা— ‘দ্য সোসাইটি ফর দ্য সাপ্রেশন অব অবসিনিটি ইন ইন্ডিয়া’। সে বছর ৩০ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টায় টাউন হলে এক সভায় সোসাইটির কর্মকর্তাদের নাম ঘোষিত হয়। সেই সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষিত হয় সব ধরনের অশ্লীলতার বিরুদ্ধে। কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশিষ্ট যাজকরা ছাড়া কেশবচন্দ্র সেনসহ বেশ কয়েকজন ব্রাহ্ম নেতা ছিলেন। ছিলেন কয়েকজন খ্যাতনামা হিন্দু ও মুসলিম সমাজ নায়কও। যেমন— রাজা কালীকৃষ্ণ বাহাদুর, নবগোপাল মিত্র, সৈয়দ আমির আলি, মৌলবী আবদুল লতিফ খান বাহাদুর প্রমুখ। তাদের দাবি নতুন কোনো আইন নয়, সরকার যাতে পেনাল কোডের অশ্লীলতাবিরোধী ধারাগুলো প্রয়োগ করতে তত্পর হয়, তার জন্য চাপ সৃষ্টি করা, অশ্লীলতাবিরোধী জনমত গড়ে তোলা। সভায় বক্তারা আশ্বাস দিয়েছিলেন, হিন্দু ধর্ম বা মহাকাব্য, পুরাণ ইত্যাদি তাদের লক্ষ্য নয়। তারা চলতি অশ্লীল সাহিত্য, শিল্পকলা, নাচ, গান ইত্যাদির উচ্ছেদ চান। এ প্রসঙ্গে কথাচ্ছলে সেদিন তিনখানা বইয়ের কথা শোনা যায়— ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’, দাশু রায়ের ‘পাঁচালী’, আর ‘কি মজার শনিবার’ নামে বটতলার একটি প্রহসন।

বলা বাহুল্য, এ আন্দোলনের বিরুদ্ধেও আন্দোলন গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। সমসাময়িক বেশকিছু পত্রপত্রিকা রুখে দাঁড়ায় এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে। ব্যঙ্গ পত্রিকা ‘বসন্তক’ দু’খানি ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে। একটিতে দেখা যায়, সাহেবি পোশাক পরা এক বাঁদর নাচিয়ে বাঁদর নাচ দেখাচ্ছে। সঙ্গে যথারীতি একটি ছাগলও রয়েছে। বাঁদর ও ছাগল দুই-ই পোশাক পরা। নিচে চিত্রপরিচিতি, ‘এক্ষণে টুপিওয়ালা বেদেরা অনেক পেন্টুলেন পরা বাঁদরকে এইরূপে নাচাচ্ছে।’ আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, শাড়ি-ব্লাউজ পরা কালী ঠাকুর দাঁড়িয়ে আছে পেন্টলুন পরা মহাদেবের বুকের ওপর। নিচে মন্তব্য, ‘অশ্লীলতা নিবারণী সভার একজন সভ্যের বাটীর কালী’।

‘বসন্তক’ সেদিন একাধিক রচনার অশ্লীলতা নিবারণী সভার পাণ্ডাদের তীক্ষ ব্যঙ্গবাণে জর্জরিত করে। একটি রচনায় দেখি, বাবু অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে কোকিলের ডাক শুনে রীতিমতো বিরক্ত। বিরক্ত বাবুর হাতে ‘সক্ষপীরের ভিনাস এন্ড এডোনিস বহি’। পুত্রবধূ গর্ভবতী, স্ত্রীর মুখে এ সংবাদ শুনে তিনি হতাশ, ‘হাঃ পরমাত্মন আমার ঘরে এই! কাল আমি ভারতচন্দ্রের বহিয়ালা বেটাকে জেলে দিয়ে এসেছি, আজ আমার ঘরে কি না এই অশ্লীলতা, হাঃ বিধাতা!’

কোকিলের ডাক প্রসঙ্গে মনে পড়ে কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের ‘রুচিবিকার’ (১৩০৪) কাব্যখানির কথা। তার পাতায়ও ব্যঙ্গচ্ছলে সমীরণ, শশধর, কোকিল, নদী, লতিকা, জলধর, গিরি ইত্যাদিকে ধিক্কার দেয়া হয়েছিল অশ্লীলতা প্রচারের জন্য। এগুলো হয়তো বাড়াবাড়ি, তবে ভারতচন্দ্রের সমালোচনা যে অনেকেই মেনে নিতে রাজি নন, সেটা অচিরেই স্পষ্ট হয়ে গেল। বঙ্কিমচন্দ্রও ‘বঙ্গদর্শন’-এ ভারতচন্দ্রের সমালোচনা করেছিলেন। জবাবে ‘মধ্যস্থ’ মুখর হয়ে ওঠে বঙ্কিমচন্দ্রের সমালোচনায়। আরেকটি প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘বঙ্গদর্শন গর্দ্দভ’। ‘বিদ্যাসুন্দর’ প্রসঙ্গে ‘মধ্যস্থ’ আরো একটি রচনা প্রকাশ করেছিল। নাম ‘অশ্লীল’ (ফাল্গুন, ১২৮০)। রচনাসূত্রে জানা যায়, ‘বিদ্যাসুন্দর’ বিক্রির অভিযোগে পুলিশ বটতলার কয়েকজন বই বিক্রেতাকে ধরে নিয়ে গেছে। ‘তাহারা জামিন দিয়া খালাস হইয়া আসিয়াছে, অতি শীঘ্র মোকদ্দমা হইবে। শুনিতেছি পুস্তক বিক্রেতাগণ চান্দা তুলিতেছে— তাহাদিগের স্বশ্রেণী ব্যতীত দেশস্থ অনেক লোকে নাকি তাহাদিগের সাহায্যার্থে অগ্রসর হইয়াছেন।’

বাবুরা স্পষ্টতই বিদ্যাসুন্দর হারাতে সম্মত নন। টাউন হলের সভায় কেশবচন্দ্র সেন ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর অশ্লীল অংশ বর্জনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারও উত্তর দেয় ‘মধ্যস্থ’ এ রচনায়। “— কিন্তু এরও তৈল বা শর্করা প্রভৃতি পদার্থের ন্যায় সে সমস্ত কাব্যকে ‘রিফাইন’ করার প্রক্রিয়া ও যন্ত্র অদ্যাপি প্রস্তুত হয় নাই!”

সংক্ষিপ্ত। শ্রীপান্থ রচিত বটতলা গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত অংশ।