১৯৬৬ সালের জুন। সেতার নিয়ে জর্জ হ্যারিসনের মোহ চরমে ওঠে রবিশংকরের সঙ্গে তার সাক্ষাতের পর। বিটল ও সেতার মায়েস্ত্রোর মধ্যে সাক্ষাৎ হয়েছিল লন্ডনের হ্যাম্পস্টিডে ব্রিটিশ পোর্ট্রেট আঁকিয়ে ও ঔপন্যাসিক প্যাট্রিসিয়া আঙ্গাডি ও আয়ানা দেবের বাড়িতে। আয়ানা ছিলেন ভারতের কর্ণাটকের বেলগাম জেলার বাসিন্দা। ১৯৪৬ সালে এ দম্পতি এশিয়ান মিউজিক সার্কেল প্রতিষ্ঠা করেন। প্যাট্রিসিয়ার বাসাতেই ছিল এ সার্কেলের কর্মস্থল। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এ এশিয়ান মিউজিক সার্কেল (্এএমসি) ছিল ভারত থেকে ইংল্যান্ডে আসা সংগীতশিল্পীদের কেন্দ্র।
এএমসির অসাধারণ ভূমিকাতেই সেকালে ভারতীয় অনেক শিল্পী পশ্চিমা (মূলত ব্রিটেন) দুনিয়ায় পরিচিত হন এবং সেখানে পারফর্ম করার সুযোগ পান।
রবিশংকরের পাশাপাশি আঙ্গাডি আলী আকবর খান, বিলায়েত খান, আল্লা রাখা, চতুর লাল এবং অন্যদের ব্রিটেনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং তাদের হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এএমসির একটি বোর্ড ছিল, যেখানে অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ছিলেন, যেমন— ভায়োলিন বাদক ইয়েহুদি মেনুহিন, কম্পোজার বেঞ্জামিন ব্রিটেন, ব্যালে ড্যান্সার বেরিল গ্রে। এ শিল্পীদের মাধ্যমে বিভিন্ন মহলে এএমসির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় এবং সংগঠনটিকে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
আয়ানা দেবের বাড়ি কর্ণাটকের জাকানউর গ্রামে। ১৯২৪ সালে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। কেউ কেউ বলেন, সেখানে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অবশ্য আঙ্গাডির পুত্র শংকর নিউম্যানের অ্যাবরাকাড্যাবরা: দ্য কমপ্লিট স্টোরি অব দ্য বিটলস রিভলভার গ্রন্থে জানিয়েছেন, তার বাবা লন্ডনে এসেছিলেন তার গণিতের ডিগ্রি সম্পন্ন করার জন্য। আয়ানা ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব বোম্বাইয়ের ছাত্র।
আয়ানা আঙ্গাডি র্যাডিক্যাল বাম ঘরানা থেকে সরে আসেন, শুরুতে হয়েছিলেন ট্রটস্কিপন্থী এবং যোগ দেন সিএলআর জেমস রেভলুশনারি সোশালিস্ট লিগে। ১৯৩০-এর দশক এবং চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে কমিউনিজমবিরোধী হিস্টিরিয়ার যুগে আঙ্গাডি রাজা হংস ছদ্মনামে কমিউনিজমের বিপক্ষে প্যাম্ফলেট লিখতেন। সিএলআর জেমস লিখেছেন, রাজা হংস বামদের অনেক মিটিং পণ্ড করেছেন যেমন— কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রেট ব্রিটেনের এক সভায় তিনি স্ট্যালিনের ‘মস্কো ট্রায়াল’ নিয়ে আলোচনা করতে বাধ্য করেন।
আঙ্গাডির জীবন নিয়ে আরো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পায় ১৯৯৩ সালে তার মৃত্যুর পর শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে বিভিন্নজনের লেখায়। রেজিনাল্ড ম্যাসে দ্য অবজারভারে আঙ্গাডির আরেকটি ছদ্মনামের সন্ধান দেন— জয়া দেব। এ নামে তিনি রাজনৈতিক বইপত্র লিখেছিলেন, যার মধ্যে আছে ১৯৪৩ সালে লেখা জাপান’স ক্যাম্ফ। জাপান তখন অক্ষশক্তির তাগড়া ঘোড়া। বইটি প্রকাশ করেছিলেন বামপন্থী প্রকাশক ভিক্টর গোলানজ। আঙ্গাডি বইটি উৎসর্গ করেন প্যাট্রিসিয়া ফেল-ক্লার্ককে। আঙ্গাডির সঙ্গে প্যাট্রিসিয়া ফেল-ক্লার্কের সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৩৯ সালে। ১৯৪৩ সালে মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ক্লার্ক আয়ানাকে বিয়ে করেন। আয়ানা আঙ্গাডি থেকে ক্লার্ক ছিলেন ১২ বছরের ছোট। ক্লার্কের জন্ম ১৯১৩ সালে, তিনি অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারে গভর্নেসের সেবায় বেড়ে উঠছিলেন। পড়াশোনা শেষ করেন ইউরোপে। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান শিল্পী এবং একই সঙ্গে এশিয়ান মিউজিক সার্কেলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। শেষ জীবনে ক্লার্ক উপন্যাস লিখেছেন, স্কুলে নাটক ও সংগীত শিক্ষা দিয়েছেন।
আয়ানা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তাই তার কোনো নিয়মিত চাকরি ছিল না। এ পরিস্থিতি এবং শ্রেণী ও জাতির পার্থক্যের কারণে ক্লার্কের পরিবার তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি ছিল না। এ যুগলের বিয়েতে প্যাট্রিসিয়া ক্লার্কের পরিবারের কোনো সদস্য যোগ দেননি।
বিয়ের তিন বছরের মাথায় তারা তাদের বাড়িতেই এশিয়ান মিউজিক সার্কেল গড়ে তোলেন। বাড়ির উপরের তলায় তারা থাকতেন এবং একই সঙ্গে সেটা ছিল এএমসির স্টেশন। এমসির পৃষ্ঠপোষকতাতেই যোগগুরু বিকে আইয়েঙ্গার তার প্রথম ক্লাসটি নিয়েছিলেন প্যাট্রিসিয়াদের বাড়ির পেছনের বাগানের চত্বরে।
১৯৬৫ সালে জর্জ হ্যারিসন এএমসির সঙ্গে পরিচিত হন। সে বছরই তিনি প্রথমবারের মতো সেতার দেখেন। লেখক রে নিউম্যানের তথ্যমতে, হ্যারিসন লন্ডনে একটি ভারতীয় দোকান থেকে তুলনামূলক কম দামের একটা সেতার কেনেন। লেননের নরওয়েজিয়ান উড গানটির সঙ্গে সেতারের বাজনা তৈরিতে হ্যারিসন এ সেতারটি ব্যবহার করেন। অ্যাবি রোডের স্টুডিওতে গানটির রেকর্ডিং করার সময় সেতারের একটি তার ছিঁড়ে যায়। পরের ঘটনার দুটি বয়ান পাওয়া যায়। ভারতীয় দূতাবাস এগিয়ে আসে এবং তারা জানায়, এএমসি হয়তো এ সমস্যার সমাধান দিতে পারবে। অন্যদিকে নিউম্যানের বই জানাচ্ছে, পরিচালক জর্জ মার্টিন এএমসির নাম প্রস্তাব করেছিলেন।
সত্যি সত্যিই হ্যারিসন এএমসিতে সমস্যার সমাধান পেয়েছিলেন। তারপর সেখানে তার যাতায়াত নিয়মিত হয়ে ওঠে। আঙ্গাডি বিটলসের একটি রেকর্ডিং সেশন পর্যবেক্ষণ করার আমন্ত্রণ পান। ধারণা করা হয়, সেই সুযোগেই আঙ্গাডি হ্যারিসন ও লেননের প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন।
১৯৬৫ সালের মধ্যভাগে বিটলস যুক্তরাষ্ট্রে একটি সফল ট্যুর করেছিল। সে সময় হ্যারিসন ও বিটলসের অন্য সদস্যরা ডেভিড ক্রসবি ও রজার ম্যাকগুইনের মাধ্যমে রবিশংকরের কাজের সঙ্গে পরিচিত হন।
১৯৬৬ সালের জুনে বিটলস যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসে। এ সময় হ্যারিসন ও পল ম্যাকার্টনি আঙ্গাডির বাড়িতে রাতের খাবারের আমন্ত্রণে যান। সেদিন সেখানে রবিশংকর ছিলেন বিশেষ অতিথি। এটা ছিল বিটলস এবং রবিশংকরের প্রথম সাক্ষাৎ, যা পরবর্তীতে কিংবদন্তি বন্ধুত্বের ইতিহাসে পরিণত হয়। রবিশংকরের সঙ্গে হ্যারিসনের বন্ধুত্বের ফলস্বরূপ শেষের জন বিভিন্ন ভারতীয় বিষয়— হিন্দু ধর্ম, ধ্যান এবং অতি অবশ্যই সেতার নিয়ে বিভিন্ন নিরীক্ষা শুরু করেন, যা তাদের পরবর্তী অ্যালবাম রিভলভারে ছাপ ফেলেছিল। লাভ ইউ টু গানটিতে হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল সংগীতের ছন্দ এবং সেতারের ব্যবহার থেকে হ্যারিসনের আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এশিয়ান মিউজিক সার্কেলের অনিল ভগবত তবলা বাজিয়েছিলেন এবং সে অ্যালবামে তার নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।
হ্যারিসনের পরিচালনায় আরেকটি একক গানে (উইদইন ইউ, উইদাউট ইউ) এএমসির শিল্পীরা অংশ নিয়েছিলেন, এটা ছিল বিটলসের ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত অ্যালবাম সার্জেন্ট পেপারস লোনলি হার্টস ক্লাব ব্যান্ড। কিন্তু এবার ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো এ শিল্পীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত কেউই সেই শিল্পীদের নাম জানত না, তারপর ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলের এক গবেষকের অনুসন্ধানে পাওয়া যায় সেই অজ্ঞাত শিল্পীদের সন্ধান। গবেষক ড. মাইক জোনস জানিয়েছেন, সেই শিল্পীরা ছিলেন প্রয়াত অমৃত গাজ্জার (দিলরুবা), বুদ্ধদেব কানসারা (তানপুরা) এবং নটবর সোনি (তবলা)— এরা এখন অশীতিপর।
আয়ানা আঙ্গাডি ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে জাকানউর ফিরে যান। এরপর এএমসি আর খুব বেশিদিন টিকে থাকেনি। তিনি দেশে ফিরে গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেন। তিনি মারা যান ১৯৯৩ সালে। প্যাট্রিসিয়া আঙ্গাডি তাদের চার সন্তান নিয়ে লন্ডনেই থেকে যান। উপন্যাস লিখে তিনি জীবনে নতুন যাত্রা শুরু করেন। ৭০ বছর বয়সে তিনি তার প্রথম উপন্যাস দ্য গভর্নেস লেখেন। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তার দ্য হাইলি ফ্লেভারড লেডিজ বইটি প্রশংসা কুড়ায়। তিনি ২০০১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার স্মৃতিকথা এখনো অপ্রকাশিত। প্রকাশের পর নিশ্চয়ই এশিয়ান মিউজিক সার্কেলের আরো অনেক অজানা গল্প জানা যাবে।
ভাবানুবাদ: এস এম রশিদ
সূত্র: স্ক্রলইন





